নিহত প্রজাপতি

অবিন সেন
কেয়া ফোনের ওপার থেকে কি বলল সেটা ঠিক বুঝতে পারল না মিহির। কথাটা এমনি অস্পষ্ট ছিল। মিহির রিপিট করল
--কেয়া শুনতে পাচ্ছ ?
--কেয়া শুনতে পাচ্ছ ?
ও দিক থেকে কোনো সাড়া এল না। ফোন কি তবে কেটে গেল? মিহির কানের কাছ থেকে মোবাইলটা সামনে নিয়ে এসে দেখল। নাহ! কল তো জারি আছে ! তবে ?
সে কল ডিস-কানেক্ট করে আবার ডায়াল করল। এবার আর কোনো সাড়া এল না। কেয়া ফোন রিসিভ করল না।
সরা রাত আর সে কোনো ফোন রিসিভ করল না। মিহির বলছিল—
সেই রাত কি যে দুশ্চিন্তায় কাটল বলে বোঝানো যাবে না। পরদিন সকালেই ছুটলাম কেয়ার ফ্ল্যাটে। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। লক করা। সেখানে দাঁড়িয়ে আবার কেয়ার মোবাইলে রিং করলাম। এবার ফোন সুইচ অফ পেলাম।
মিহির থামল।
সে কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার অর্ক মিত্রর চেম্বারে বসেছিল। অর্ক ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের দুঁদে অফিসার। বয়েস অল্প। লম্বা সুপুরুষ চেহারা।
গত চারদিন থেকে কলকাতা টেলি জগতের উঠতি অভিনেত্রী কেয়া সরকার রহস্য-জনক ভাবে নিখোঁজ। ঘটনাটা খুব সাড়া ফেলে দিয়েছে সারা কলকাতায়। টিভি চ্যানেলগুলো তো সারাদিন ধরে পুলিশ প্রশাসনের মুন্ডুপাত করে চলেছে। এই নিয়ে ডিসিডিডি সাহেব খুব চাপে আছেন। কারণ খোদ এক মিনিস্টার কেসটা নিয়ে নিজে খোঁজ খবর করেছেন। আজ সকালেই ডিসিডিডি সাহেব অর্ককে ডেকে পাঠিয়ে কেসটা নিয়ে অল আউট ঝাঁপাতে বলেছেন।
কেসটা হাতে নেবার পরেই অর্ক ডেকে পাঠিয়েছিল মিহিরকে। মিহিরই প্রথম এই নিয়ে থানায় কমপ্লেন করে।
মিহির মজুমদার একটি বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত। কলকাতার বনেদি বংশের ছেলে। বয়স ত্রিশের উপরে। কিন্তু দেখলে অতটা বয়স মনে হয় না। ফর্সা স্মার্ট চেহারা। কেয়ার সঙ্গে তার বছর খানেকের আলাপ বা প্রেমও বলা যায়। সামনের বছরেই তাদের বিয়ে করার প্ল্যান ছিল।
কেয়া কলকাতায় একাই থাকত। তার বাবা মা জামশেদপুরে থাকেন। ছেলেবেলা থেকেই তার অভিনয়ের সখ । কলকাতায় সে একটা অভিনয় শেখার স্কুলে কোর্স করছিল। সেখান থেকেই সে একটা টিভি সিরিয়ালে চান্স পায়। এই ব্যাপারে অবশ্য মিহিরও তাকে অনেক সাহায্য করেছে। ক্রমাগত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে কেয়াও প্রতিভাময়ী। সৌন্দর্য আর প্রতিভার আশ্চর্য মিশ্রণ ঘটেছে তার মধ্যে। অল্পদিনেই তার অভিনয়ের প্রশংসা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
মিহির থামতে অর্ক বলল
আপনি তারপর পুলিশে খবর দিলেন?
না, তার আগে আমি কেয়ার কয়েকজন বন্ধু বান্ধবকে ফোন করলাম। কেয়া যে সিরিয়ালে অভিনয় করছিল সেই প্রডাকশন হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু কোথাও যখন কোনো সু সংবাদ পেলামনা তখন লোকাল থানায় জানাই। আমি আর আমার বন্ধু পার্থ দত্ত থানায় গিয়েছিলাম।
অর্ক একবার নিজের মনে ঘাড় নাড়ল।
অকর্র চেম্বারে এই কেসের আই.ও টালিগঞ্জ থানার সুব্রত নায়েকও উপস্থিত ছিল। অর্ক নায়েককে বলল—
আপনারা কটা নাগাদ কেয়ার ফ্ল্যাটে যান?
থানায় কমপ্লেনটা জমা পড়ার কিছুক্ষণ পরেই বড়বাবুর ফোনে কোনো এক প্রভাবশালী নেতার ফোন আসে। নিখোঁজ নায়িকার ব্যাপারে। তারপরেই বড়বাবু আমকে পাঠায়। আমরা প্রায় চারটে নাগাদ কেয়া সরকারের ফ্ল্যাটে পৌছাই।
অর্ক কেসের ফাইলের মধ্যে চোখ ডুবিয়েছিল। সেখানে চোখ রেখেই সে বলল
তারপর কি দেখলেন?
দরজা বন্ধ দেখে তালা ভাঙতে হল। ঘরে ঢুকে দেখি ঘরে আলো জ্বলছে। টিভিটা চলছে। কিন্তু সাউন্ড মিউট করা। বসার ঘরের মেঝেয় কার্পেট পাতা ছিল। কার্পেট কুঁচকে ছিল। কিছু টানা হেঁচড়া করে নিয়ে গেলে যেমন হয়। কার্পেটের উপরেই একপাশে মোবাইল ফোনটা পড়েছিল। সুইচ অফ। চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
সুব্রত থামল।
অর্ক ফাইল থেকে চোখ তুলে বলল
কথা হচ্ছে রাত সাড়ে নটা নাগাদ এই ভাবে একজন কে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল কি ভাবে? ওটা তো একটা অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি। মেন গেটে সিকিউরিটি আছে। এনি আইডিয়া ?
স্যার, আমার মনে হয় এ ক্ষেত্রে অপরাধীর একটা অ্যাডভানটেজ ছিল। কেয়াদেবীর ফ্ল্যাটটা একেবারে লিফটের পাশেই। আর একেবারে নীচের তলায় লিফট থেকে নেমেই পার্কিঙে যাওয়া যায়।
অর্ক বলল
তাই ! কিন্তু আপনারা তো দেখছি সে ভাবে তদন্তই করেননি!
সুব্রত আমতা আমতা করল
না, স্যার অনেক খোঁজ খবর করেছি। আসলে কোনো ক্লু পাইনি যেখান থেকে শুরু করব।
অর্ক বিরক্তির গলায় বলল
ফাইলে তো দেখছি কয়েকজনের জবানবন্দী ছাড়া আর কিছু নেই। সেটাও নেহাতি দায়সারা। একটা গঠনমূলক ভাবে এগোনোর কোনো চেষ্টাই নেই আপনাদের। আর এদিকে মিডিয়া আমাদের মুন্ডুপাত করে চলেছে।
সুব্রত কিছু উত্তর দিল না। সেই মুখ নিচু করে বসে থাকল।
অর্ক মিহিরের দিকে ফিরে বলল
মিহিরবাবু আপনি বরং কেয়ার বন্ধু বান্ধবের কিছু ফোন নাম্বার আর নাম লিখে দিন।
তারপর সুব্রতকে বলল
কেয়ার বাবা মা বা বাড়ির লোকজন দের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ?
হ্যাঁ। ওনারা কলকাতাতেই আছেন। এক রিলেটিভের বাড়িতে। ওনাদের কি ডাকব?
পরে বলছি।
মিহিরের চোখমুখ বেদনায় থম থম করছিল। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ।
সে হঠাৎ বলল
স্যার, কেয়া বেঁচে আছে তো?
তার কথায় আকুতি ঝরে পড়ছিল।
অর্ক কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না। সে নিজের মনে যেন একবার ঘাড় নাড়ল। তারপর ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলল
মিহিরবাবু আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এর বাইরে সে আর কিছু বলতে পরল না।
মিহির চলে যেতে অর্ক মোবাইলে প্রবালকে রিং করল।
প্রবাল সেন অর্কর বন্ধু। কলেজ বেলার। সে একটা বহুজাতিক সংস্থায় ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার। রহস্যভেদ তার নেশা। অর্কর সঙ্গী হয়ে অনেক জটিল রহস্য সমাধান করায় পুলিশ মহলে তার একটা খ্যাতি হয়ে গিয়েছে। প্রবালের চেহারা গড়পড়তা বাঙালীর মতো। কিন্তু অ্যাথলেটদের মতো পেটানো গড়ন। রঙ শ্যামলা। দুটি অন্তর্ভেদী চোখ তাকে আর পাঁচ জনের থেকে আলাদা করে রাখে।
প্রবাল অফিসেই ছিল। অর্কর ফোন ধরে বলল
কি বস, নিখোঁজ নায়িকা নিয়ে ল্যাদ খাচ্ছিস মনে হচ্ছে!
কথাটা বলে সে ফাজিলের মতো হাসল। মাজা করল।
অর্ক মজাটা পাত্তা দিল না। বলল
ঠিকই ধরেছিস। ফাঁকা আছিস ?
তোমার জন্যে বস, সব সময়ই বান্দা ফাঁকা থাকে।
তা হলে অফিসেই থাক। আমি তোকে তুলে নিচ্ছি।
অর্ক আর কিছু বলার সুযোগ দিল না প্রবাল কে। ফোন রেখে দিল।



চকোলেট কালারের ভারি গেটটা খুলে পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরা সিকিউরিটি গার্ড সেলাম ঠুকল। গেটের দু ধারে সারি দিয়ে কয়েকটি বাহারি পাম গাছ। সেগুলোর মাঝে মাঝে ছোট ছোট ফুলের কেয়ারি। মরসুমি ফুল ফুটে হাসি খুশী হয়ে আছে।গেট দিয়ে ঢুকলেই ঢালাই করা সুন্দর লন দু হাতে ভাগ হয়ে সোজা গাড়ি পার্কিঙে চলে গেছে। দুটো পার্কিঙ। নর্থ। আর । সাউথ। নর্থ আর সাউথ ব্লকের মাঝে একটা হ্যাঙ্গিং যোগসূত্র। সব মিলিয়ে একটা “এইচ” অক্ষর এর ভাস্কর্য তৈরি করেছে যেন। দুটো ব্লক মিলিয়ে দশটি করে মোট কুড়িটি ফ্ল্যাট।
অর্কর শাদা স্কোরপিও সোজা নর্থ ব্লকের নীচে পার্কিঙে গিয়ে থামল।
গাড়ি থেকে অর্ক আর প্রবাল নামল। সঙ্গে সুব্রত নায়েক আর একজন কনস্টেবল। সুব্রত তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।
পার্কিং এর পাশেই লিফট। মাঝ বয়সী লিফট-ম্যান একটা টুলে বেসে ভাত ঘুমের ঝিমুনিটা সেরে নিচ্ছিল। শীতকালের দুপুর। অফিস বার । চারপাশটা শান্ত। সারা অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িটা যেন এটা দ্বি-প্রাহরিক ন্যাপ দিয়ে নিচ্ছিল।
ওরা দু-তলায় যাবে। লিফটের পাশেই কেয়া সরকারের ফ্ল্যাট। সে ভাড়ায় থাকত। ফ্ল্যাটের মালিক মিহিরের এক বন্ধু।
সুব্রত দরজা খুলে তাদের ভিতরে নিয়ে গেল। বাসার ঘরটা ছিম ছাম সুন্দর করে সাজানো। আসবাব পত্রের বাহুল্য নেই। যে টুকু আছে সে টুকুতে রুচির ছাপ স্পষ্ট। মেঝের কার্পেট পূর্বের মতো কোঁচকানো এলো-মেলো হয়ে আছে। প্রবাল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কার্পেটটা দেখছিল। নিচু হয়ে। গাড়িতে আসতে আসতে অর্ক তাকে কেসের ডিটেলটা ব্রিফ করে রেখেছিল।
বসার ঘরে একদিকে একটা জানালা। প্রবাল সেই জানালার কাছে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল। কেয়ার মোবাইল ফোনটা সেখানেই পড়েছিল। সুব্রত হাত দিয়ে দেখাল।
সুব্রতবাবু পায়ের ছাপ কিছু খুঁজে দেখেছিলেন?
প্রবাল জানতে চাইল।
সুব্রত আমতা আমতা করল।
তারা সে ভাবে পায়ের ছাপ হাতের ছাপ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেনি। তারা প্রথাগত পদ্ধতিতে নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত তদন্ত করেছে। অর্থাৎ পুরোটাই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও জিজ্ঞাসাবাদের উপর নির্ভর করে। এবং এই ভাবে তদন্ত করে যথারীতি প্রণিধানযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায় না। প্রথম দুএক দিন সুব্রতবাবুরা প্রণিপাত বই মুখস্থ জাতীয় তদন্ত করেছেন তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বস্তুত অধিকাংশ নিখোঁজের তদন্তই সে ভাবে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাজেশন মিলে গিয়ে দু একটা সূত্র হাতে এসে যায়। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভাবে দৈবের উপর নির্ভরশীল।
প্রবাল বুঝতে পারল পুলিশের নামমাত্র তদন্ত তার কোনো কাজে লাগবে না। তাকে শুরু থেকে আবার তদন্ত শুরু করতে হবে। কিন্তু নিখোঁজের তদন্তের সবথেকে দুরূহ ব্যাপার যে তার চারদিকই খোলা। পূর্ব—পশ্চিম—উত্তর—দ ক্ষিণ। কোনোদিকে যেতে হবে সেটা নির্বাচন করাই সবথেকে কঠিন এবং সবথেকে প্রথম কাজ।
প্রবাল ফ্ল্যাশ ব্যাকে চারদিন আগে ফিরে গেল। অর্থাৎ ঘটনাগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করল। যে, কি ভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে কেয়া সরকার নিখোঁজ হয়।
রাত নটার সময় কেয়া আর মিহির ফোনে কথা বলছিল। কথা বলতে বলতে ফোনটা কেটে যায়। তাইতো?
প্রবাল অর্ককে জিজ্ঞাসা করল।
অর্ক বলল
না। ফোন কেটে যায় না। মিহির কোনো কথা শুনতে পায় না কেয়ার দিক থেকে। কল ডিসকানেক্ট হয়নি। কয়েক বার হ্যালো হ্যালো বলার পরেও যখন কোনো সাড়া পায় না তখন মিহির ফোন কেটে দিয়ে আবার ডায়াল করে। এবার আর কেয়া ফোন ধরে না।
মিহির কি কোনো শব্দই শুনতে পায় না ?
না।
তাই !
অর্থাৎ সেই সময়েই আততায়ী(?) কেয়াকে কব্জা করে ফ্যালে।
প্রবাল স্বগতোক্তির মতো করে বলল।
আচ্ছা অর্ক ! প্রবাল একটা সোফায় বসে পড়ে বলল
আচ্ছা কেয়াকে কিডন্যাপ করা হল কেন? খুন করার হলে তো অনায়াসেই করা যেতে পারত। কারণ অ্যাপার্টমেন্টের এই দিকটা তখন নির্জন ছিল। অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন তখন সাউথ ব্লকের মিসেস ত্রিবেদীর মেয়ের বার্থডে পাটি তে গিয়েছিল। সেই ব্লকে হুল্লোড়। নাচা গানা। আর এই ব্লকটা তখন চুপচাপ। লিফটের সামনে গার্ড ও ছিলনা হয়ত। যদিও সে বলেছে সে কোথাও যায়নি। কিন্তু সে সত্যি নাও বলতে পারে। সুতরাং আততায়ী অনায়াসেই কেটাকে তার ফ্ল্যাটে খুন করে চুপ চাপ চলে যেতে পারত। বরং কিডন্যাপ করাই বেশী রিস্কি। বা খুন করে লাশ বয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার রিস্ক সে নিলো কেন?
অর্ক সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ল। বলল
তা হলে আমরা কি করনে ধরে নিচ্ছি যে কেয়া কিডন্যাপ হয়েছে?
সে সুব্রত নায়েকের দিকে ফিরে বলল
নায়েক, তোমরা কেন ধরে নিলে যে কেয়া কিডন্যাপড হয়েছে?
স্যার, ঘরের মধ্যে যথেষ্ট ধস্তা ধস্তির চিহ্ন ছিল। কার্পেটটা এলো মেলো ছিল। সোফার কুশন গুলো এলো মেলো। দু একটা খবরের কাগজ ছড়ানো। মোবাইল ফোনটা পড়েছিল। তা ছাড়া কেয়া নিজেই কোথাও চলে গিয়েছে,আর ফেরেনি, এমন প্রমাণ পাইনি। আমরা গত বেশ কয়েকদিনের কল লিস্ট চেক করেছি। তাতেই সন্দেহ করার মতো কিছু পাইনি। আমরা তার অভিনয় জগতের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলেছি। সেখানেও তেমন কিছু পাইনি।
প্রবাল বলল
তেমন কিছু মানে? কিছু পেয়েছেন?
অভিনয়ের জগতে যে রকম রেশা রিসি থাকে সেরকম তো আছে । তবে সেটা নিখোঁজ হবার মতো বা খুন হবার মতো না।
প্রবাল সোফা থেকে উঠে ভিতরের ঘরে গেল।
সমস্ত ফ্ল্যাটটা প্রায় ১২০০ স্কয়ার ফুটের। দুটো বড় বেড রুম। দুটো বাথরুম। কিচেন। ব্যালকনি। মোটকথা একজনের পক্ষে যথেষ্টই বড়।
প্রবাল দেখল, সমস্ত ফ্ল্যাটেই রুচির ছাপ স্পষ্ট।
শোবার ঘরের জিনিস পত্র কিছু অগোছালো। মনে হয় কেই যেন কিছু খোঁজার চেষ্টা করেছে। প্রবাল সুব্রতকে বলল
আপনারা কি এভাবে হুট পাট করে জিনিস পত্র গুলো এলো মেলো করেছেন?
না। আমরা যখন আসি তখন এমনটাই ছিল।
প্রবাল দেখল একটা বুক সেলফে কিছু বই পত্র, ম্যাগাজিন রয়েছে। তবে সে গুলোও অগোছালো।
প্রবাল সবকিছু উলটে পালটে দেখছিল। কোথাও যদি কিছু সূত্র পাওয়া যায়। সে একটা ডাইরি পেল। ডাইরিটা সে সঙ্গে রাখল। পরে পড়ে দেখবে।
সে ভাবছিল। কেয়ার নিরুদ্দিষ্ট বা কিডন্যাপড হবার কারণ কি? কেয়ার বাবা মা, আত্মীয় পরিজন, বন্ধুবান্ধব, মিহির অর্থাৎ সকলের দেওয়া জবানবন্দীর মোদ্দা কথা কেয়া সেন ছিল অজাতশত্রু।অন্তত সেই সব জবানবন্দী পড়ে তেমনটা ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ নেই। সে ছিল হাসি-খুশী, মিশুকে। সকলের সঙ্গেই সে হেসে ব্যবহার করত। হাসিতে নাকি শত্রুকেও জয় করা যায়।
তবু সবার অজান্তে তার কি কোনো শত্রু থেকে গিয়েছিল? যা ছিল সকলের অজানা? এবং এখন নিশ্চিত ভাবেই তা অনুমান করা যায় যে নিদেন পক্ষে একজন শত্রু সকলের অলক্ষ্যে ছিল। মেঘের আড়ালে মেঘনাদের মতো।
এবং কে সে ? কেনই বা এই অপহরণ বা সর্ব শেষে হত্যা? হত্যা কি ?
প্রবাল জিজ্ঞাসা করল অর্ককে?
অর্ক বলল—
হত্যা যদি না হয় তবে অপহরণ কি কারণে? মুক্তি পনের জন্য নিশ্চয়ই নয়! তাই না!
প্রবালও অকর্র কথায় সম্মতি দেয়। না! দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো সূত্রও তার হাতে নাই। প্রবালের মনে হচ্ছিল সে যেন হালে পানি পাচ্ছে না। কি ভাবে সে এগবে ? সে ভাবল তদন্ত পদ্ধতির একেবারে বেসিক তত্ত্ব সে অনুসরণ করবে। একেবারে আদি ও প্রাচীন পদ্ধতিটি অর্থাৎ অপরাধী নয় ভিকটিমের ইতিহাসের পাতাগুলো উল্টে পাল্টে দ্যাখো। হয়ত ইতিহাসের কোনো গোপন কুঠরির মধ্যে ভবিষ্যৎ অপরাধের কোনো গোপন সূত্র রক্ষিত আছে।
সে অর্ককে বলল
চল আজ এখানে দেখার মতো কিছু নেই। কাল সকালে আমরা কেয়ার বাবা মা’র সঙ্গে দেখা করব।




পরদিন সকালে প্রবাল আর অর্ক অনেকক্ষণ কেয়ার বাবা-মা’র সঙ্গে কথা বলে। তারা দুজনেই বেদনা-দুশ্চিন্তার অন্তহীন অন্ধকারে আক্রান্ত। তবু বহুক্ষণ তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রবাল। এবং কথা বলতে বলতে ঘটনাক্রম গুলি ক্রমান্বয়ে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু দেখা যায় কেয়ার জীবনে কোথাও কোনো খাদ নেই। তার ছেলেবেলা স্বচ্ছ আকাশের মতো নির্মল। কেয়ার বাবা কর্মসূত্রে টাটা-নগরের বাসিন্দা। কেয়ার স্কুল কলেজের পড়াশুনা সেখানেই। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবার যেমন হয় তেমনি নিস্তরঙ্গ এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে কেয়া। স্কুল কলেজের সময় থেকেই তার নাচ আর নাটকে অভিনয়ের সখ ছিল। সেটা উল্লেখ যোগ্য রকমের সিরিয়াস ছিল না। বরং পড়াশুনায় তার সিরিয়াসনেশ তুলনায় বেশী ছিল। তাদের বাঙালী কলোনির দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানে সে প্রতি বছর নাটকে অভিনয় করত। নাচ গানে অংশ গ্রহণ করত।
সেরকমই এক বছর তার নাচ আর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয় মিহির। মিহিরের সাথে তাদের আগে থেকেই অল্প বিস্তর জানাশোনা ছিল। কেয়াদের প্রতিবেশী সমীকরণ কাকুর দূর সম্পর্কের ভাইপো মিহির।
সেই মুগ্ধতার সূত্র ধরে তাদের পরিচয়। সেখান থেকে প্রেম। তারপর মিহিরের উৎসাহে আর চেষ্টায় কেয়ার অভিনয় জগতে আসা। ঠিক ছিল সামনের বছরেই তারা বিয়ে করবে। অর্থাৎ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও কোনো কীট কিংবা কীটের দংশন খুঁজে পায় না প্রবাল।
অনবরত মাথার ভিতর হাতড়েও প্রবাল কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। কোনো সূত্র সে খুঁজে পাচ্ছে না।এমন পরিস্থিতিতে সে কখনো পড়েনি। ঘটনার আগে পরের সমস্ত পরিস্থিতি নিষ্কলঙ্ক অথচ তার ভিতরেই একটা ক্রাইম ঘটে গেছে। কিন্তু এমনটা তো হবার কথা নয়া। অথচ সে যে কিছু মিস করে যাচ্ছে সেটা সে বুঝতে পারছে তথাপি সেই মিসিং-লিঙ্কটা সে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। এই রূপ ব্যোম-ভোলা পরিস্থিতিতে রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পেরে সে কেয়ার ঘরে যে ডাইরিটা পাওয়া গিয়েছিল সেটা নিয়ে বসল। ডাইরির কথাটা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
প্রবাল দেখল কেয়া ধারাবাহিক ভাবে রোজ ডাইরি না লিখলেও প্রায় দিনই সে ডাইরিতে কিছু না কিছু লিখেছে। তার হাতের লেখা ঝরঝরে। বাংলা লেখার ভঙ্গিও বেশ চমৎকার। ডাইরিতে সে ব্যক্তিগত কথা লেখেনি। বরং বিভিন্ন বিষয়ের উপর তার ব্যক্তিগত মতামত অনুভূতির কথা লিখেছে। সে সব বিষয় কখনো সঙ্গীত, কখনো সিনেমা, কখনো বা সাহিত্য ও কবিতা।
একটা জায়গায় প্রবাল দেখল
কেয়া লিখেছে—
“আজ ‘অ’ ফোন করেছিল। কেন করেছিল? একদিন আসবে বলেছে।”
আর কিছু লেখা নেই। তারপর পুরো পাতাটা ফাঁকা।
পাতাটায় এসে প্রবালের চোখ আটকে গেল। ‘অ’ কে? সে অর্ক কে ফোন করল। খোঁজ নিতে বলল ‘অ’ কে হতে পারে।
প্রবাল আবার সারা ডাইরি তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিন্তু আর কোথাও “অ” র উল্লেখ পেল না। সে ভাবল অ কি রহস্যময় কিছু? না এর সঙ্গে কেয়ার নিখোঁজ হবার কোনো সম্পর্ক নেই? প্রবাল ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু আর কোনো সূত্র হাতে না পেয়ে সে হতাশায় এটুকুকেই আঁকড়ে থাকতে চাইছে। সে ভাবল আগামীকাল একবার সে কেয়ার ফ্ল্যাটে যাবে। তার মনে হচ্ছে কিছু একটা সে দেখেছে কিন্তু তার সঠিক মনে পড়ছে না।
পরদিন অর্ক কে সঙ্গে নিয়ে সে কেয়ার ফ্ল্যাটে গেল। বসার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে চারপাশে একবার চোখ বোলাল। তার মাথার মধ্যে যেন একটা অস্থিরতা খেলা করছে। বা এক অস্থিরতা থেকে যেন কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু কি কারণে সেই অস্থিরতা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বলা ভালো না পারার একটা ভান তার অন্তর্গত চিন্তার ভিতরে খেলা করছে ক্রমাগত। তার মনে হচ্ছে একটা নিশ্চিত ধাঁধা নিশ্চয়ই তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
সে দেখল একটা গ্লাস টপ সেন্টার টেবিল ঘরের এক দিকে বুক সেলফের সামনে রাখা। তার হঠাৎ মনে হল, এটা কি প্রথম থেকেই এখানে রানা না, পরে রাখা হয়েছে। সেন্টার টেবিল ঘরের মাঝখানেই থাকার কথা। তা ছাড়া সোফাগুলোর যে ভাবে রাখা তাতে করে সেন্টার টেবিলটা তার যথার্থ জায়গাতেই ছিল বলে মনে হয়। প্রবাল হাঁটু গেঁড়ে বসে কার্পেটের উপরটা ভালো করে দেখছিল। তার পর সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ঠিক, চারটে গোল পায়ার দাগ যেন খুব হালকা ভাবে দেখা যায়। তারপর সে গুঁড়ি মেরে বসেই সেই টেবিলটার সামনে গেল। টেবিলটার নীচের থাকে বেশ কিছু পুরানো খবরের কাগজ ও একটা লেখার প্যাড রাখা। আগের দিন সে এগুলো ঘেঁটে দ্যাখেনি।
প্রবাল লেখার প্যাডটা তার ঝোলার ভিতর রেখে দিল। ডাঁই করা খবরের কাগজ গুলো ওলটাতে পালটাতে সে একটা খবরের কাগজের মাথায় একটা নাম্বার দেখতে পেল। তার সেটা ফোন নাম্বার বলেই মনে হল। সেই কাগজটাই সে তার ব্যাগে রাখল।
প্রবাল বুঝতে পারছে মানুষের ক্রিয়া কলাপ কি ভাবে চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। শুধু সেগুলিকে কুড়িয়ে নিয়ে পরস্পর সাজিয়ে নিলেই একটা ছবি। সেই একটা ছবির অনুসন্ধান ক্রমাগত প্রবালের মাথার ভিতর চলতে থাকে।
অর্ক ফোনে কথা বলছিল। অনবরত কথাই বলে যাচ্ছিল। আর প্রবাল শিকারি হাউন্ডের মতো হামা-টেনে টেনে সমস্ত বসার ঘরটা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একটা পাগলের মতো ত্বরা তার ভিতরে কাজ করছিল। তার মাথার ভিতর অসহ্য কিটের দংশন সে টের পাচ্ছিল। সেইটি নিয়ে, সেই দংশন নিয়ে এক প্রলুব্ধ পাগলের মতো সে সারা ঘর ময় হামা টেনে বেড়াচ্ছিল। এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর সেন্টার টেবিলটাকে তার আগের জায়গায় সরিয়ে নিয়ে এসে সে রাখল। তারপর কার্পেটটাকে সে টান টান করে পরিপাটি ও সামান করল। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করে সে কার্পেটের উপরে রাখা সেন্টার টেবিলের পায়ার কাছে রাখল। এবার সে সেন্টার টেবিলটাকে টেনে টেনে যেভাবে এটা র্যা কের কাছে রাখা ছিল সেখানে নিয়ে গেল। দেখল কার্পেটটা গুটিয়ে কুঁচকে গিয়ে একটা ত্রিভুজের মতো হয়ে গিয়েছে যেন। তার ফলে মোবাইল ফোনটা সরে একটু দূরে চলে গিয়েছে। প্রবাল মনে মনে টেবিলের পূর্বের অবস্থান, বর্তমান অবস্থান আর মোবাইলের অবস্থান এই তিনটি বিন্দুকে মনে মনে সরলরেখা দিয়ে যোগ করল। তারপর সে মনে মনে হেসে উঠল। এমন একটা অদৃশ্য ত্রিভুজ যেন সে প্রথম দিন এখানে এসেও দেখেছে। সে ক্রমাগত ঘাড় নাড়ল। গুন গুন করে সে একটা গান গাইল।
অর্ক তখনো ফোনে কথা বলছিল। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে।
প্রবাল ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এল। তার যেন মনে হল কে একজন দরজার সামনে উঁকি দিয়েই দ্রুত চলে গেল। সে বাইরে এসে কাউকে দেখল না। সামনে একটা লম্বা করিডোর। করিডোরের দু পাশে তিনটি করে ছটা ফ্ল্যাট। প্রবাল একবার করিডোর ধরে হাঁটল। না সে কাউকেই দেখতে পেল না। প্রতিটা ফ্ল্যাটের দরজাই বন্ধ। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। প্রবাল ভাবল। একেবারে শেষের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে সে দু-দণ্ড কি ভাবল। গত দিন যখন সে এখানে এসেছিল তখন সে এই ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া দেখেছিল। বাইরে থেকে কোল্যাপসিপল গেট বন্ধ ছিল। আজ দেখল সে গেটটা খোলা। কাঠের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। ভিতর থেকে কিসের যেন শব্দ আসছিল। হয়ত টিভি চলছে। প্রবাল কি ভাবল। কয়েক মুহূর্ত। তারপর কলিং বেলে চাপ দিল। কলিং-বেল বাজল। প্রবাল অপেক্ষা করল। না ! ভিতর থকে কেউ সাড়া দিল না। বা দরজা খুলল না।
অর্কর ফোনে কথা বলা হয়ে গিয়েছিল। সে প্রবালকে দেখতে না পেয়ে বেরিয়ে এসেছে। করিডোরে প্রবালকে দেখে সে বলল
এখানে কি করছিস?
প্রবাল তার কথার উত্তর না দিয়ে বলল
তোর ফোনে কথা বলে শেষ হল?
আর, বলিস না! যত্ত সব উটকো ঝঞ্ঝাট।
প্রবাল আরো কিছুক্ষণ সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। সে যেন কিছু দেখছিল এক মন দিয়ে। প্রবাল একবার সেই দরজায় হাত দিল। দেখল রং কাঁচা। মনে হয় দু এক দিন আগেই রঙ হয়েছে। সে বাইরে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস টেনে যেন রঙের গন্ধ শুঁকল। তারপর অর্ক কে দেখে বলল।
কাঁচা, রঙের গন্ধটা বেশ! তাই না!..
অর্ক বলল
কিছু পেলি?
প্রবাল ঘাড় নাড়ল—
খুঁজি খুঁজি নারি ! চল আপাতত যাওয়া যাক। তুই সবার ফোন কল ডিটেল, টাওয়ার লোকেশন এর লিস্ট আমাকে দিস।
সব রেডি আছে । বিকেলেই তোকে পাঠিয়ে দেব।
প্রবাল সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। নীচে নেমে দেখল যেদিন কেয়া নিখোঁজ হয় সেদিন যে সিকিউরিটি গার্ড ডিউটিতে ছিল আজ ও সে ডিউটিতে আছে।
অর্কদের দেখে সে সেলাম ঠুকল।
ছেলেটি বাঙালী। ত্রিশের আশপাশে বয়স। প্রবাল তার সামনে দাঁড়াল। চোখের ইশারায় সিলিঙের সঙ্গে লাগান শি.শি.টি.ভি. দেখিয়ে বলল
ওটা চলে।
সিকিউরিটি অমিত আদক ঘাড় নাড়ল।বলল
না, স্যার।
অর্ক বলল
সব জায়গাতে এক রোগ। CCTV লাগানো হয় কিন্তু সে গুলো কাজ করে না।
প্রবাল মজার ভঙ্গি করে বলল
পুলিশ যত CCTV লাগিয়েছে সেগুলো সব ঠিক ঠাক চলে ?
অর্কও হাসতে হাসতে বলল
কেন চলবে না! সব চলে।
প্রবাল বলল
অমিত তোমার বিয়ে হয়েছে?
সিকিউরিটি লজ্জার লজ্জার মতো মুখ করে বলল
হ্যাঁ স্যার।
ছেলে মেয়ে?
না। হবে।
বাড়ি কোথায়?
ঢাকুরিয়া।
নিজেদের বাড়ি?
ভাড়া থাকি। দেশের বাড়ি সোনারপুর।
কেয়াদেবী কেমন ছিল?
আমি স্যার কি ভাবে বলল। তবে হাসি খুশির ছিলেন। দেখা হলে হেসে বাড়ির খবরা-খবর জিজ্ঞাসা করতেন।
কেয়া দেবীর অভিনয় দেখেছো? টিভিতে?
হ্যাঁ স্যার।
কেমন অভিনয় লাগত। ভালোই তো স্যার। তবে আমাদের টিভি দেখার সময় কই স্যার!
কোনো ফ্ল্যাটে নতুন রঙ হচ্ছে ?
হ্যাঁ স্যার। কেয়াদেবীর ফ্ল্যাট যে ফ্লোরে সেই ফ্লোরেই। একেবারে কর্নারের ফ্ল্যাটে।
ভদ্রলোকের নাম কি?
এক নন-বেঙ্গলী ভদ্রলোকের নামে ফ্ল্যাট। মি. আগরওয়াল। তবে তিনি থাকেন না। ওনার এক বন্ধু মাঝে মাঝে আসেন। বাঙালী।
কি নাম?
নাম ঠিক জানিনা স্যার।
কতদিন থেকে রঙ হচ্ছে?
তিন চার দিন থেকে।
কেয়াদেবী যেদিন থেকে নিখোঁজ সেদিন থেকে?
না বোধহয় । তার পরদিন থেকে।
উপরে যাবার আর একটা সিঁড়ি আছে তাই না?
আছে পিছন দিকে।
সেখানে সিকিউরিটি থাকে ?
সব সময় থাকে না!
তাই!
প্রবাল অর্কর দিকে তাকাল।
অর্ক বলল
এ সেই বজ্র-আঁটুনি ফস্কা গেরো।



সন্ধ্যাটা খুব ব্যস্ততায় কাটল প্রবালের। সে অর্কর দেওয়া সবার ফোন ডিটেল নিয়ে বসেছিল। সে সেগুলো যত নিয়ে ঘাঁটছে তত যেন সে অন্ধকারের ভিতর তলিয়ে যাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে কেউই সঠিক কথা বলেনি। সবাই যেন কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে। প্রবাল সেই মিথ্যে গুলো নিয়ে একটা লিস্ট বানাল। তাকে এবার সমস্ত মিথ্যার ভিতর থেকে সঠিক এবং প্রয়োজনীয় মিথ্যাটা বার করতে হবে।
প্রবাল যখন এই সব নিয়ে ঘেঁটে ঘ হয়ে ছিল তখন অর্ক এল তার বাড়ি। কয়েকদিন থেকে তারও নিস্তার নেই। স্বস্তি নেই। সেও এক বুনো হাঁসের পিছনে ছুটে চলেছে। সে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে বলল
আর তো পারা যাচ্ছে না, প্রবাল। কিছু পেলি ! কেয়ার ফ্ল্যাট থেকে অফিসে ফিরে গিয়ে দেখি মিহির বসে আছে।যেতেই তাগাদা ‘ওখানে নতুন কিছু পেলেন স্যার?’
প্রবাল হঠাৎ সোজা হয়ে বসল। বলল
কি বলল মিহির?
জানতে চাইল, কেয়ার ফ্ল্যাটে আমরা নতুন কিছু পেলাম কিনা !
মিহির কি করে জানল? আমরা কেয়ার ফ্ল্যাটে গেছিলাম?
অর্ক চমকে উঠল! তাই তো!
প্রবাল বলল
অর্ক, চল আমরা একটা গেম খেলি।
কি গেম?
একটা মাইন্ড গেম। এই কেসটা নিয়ে তুই আমাকে প্রশ্ন করবি। আমি তোকে প্রশ্ন করব। দেখা যাক আমরা দু জনে কি কি জানি আর কি কি জানি না।
অর্ক সায় দিল। বলল
তার আগে তোর কুককে এক কাপ গরমা-গরম কফি দিতে বল।
কফি খেয়ে তারা খেলা শুরু করল
প্রবাল প্রথমে শুরু করল—
কেয়া বেঁচে আছে না মারা গেছে?
বেঁচে আছে। তোর কি মনে হয়?
মারা গেছে।
কেন?
কেয়া নিখোঁজ হয়নি। খুন হয়েছে। তুই কেন ভাবছিস কেয়া বেঁচে আছে?
আমার মনে হয়, কেয়া নিজেই পালিয়ে গিয়েছে।
কেন?
তা না হলে খুন কি ভাবে হল? বা ওই ভাবে কথা বলতে বলতে খুন হয়ে গেল। খুন করে খুনি লাশ নিয়ে চলে গেল কেন? বা অপহরণ করার মোটিভ কি?
মোটিভ নেই। কারণ অপহরণ করা হয়নি।
তুই কি ভাবে নিশ্চিন্ত হচ্ছিস?
একটা ত্রিভুজ। প্রবাল ব্যাখ্যা করল। কেয়ার বসার ঘরে কার্পেটটা কুঁচকে একটা ত্রিভুজের মতো আকার নিয়েছিল। কারণ কার্পেটের মাঝখানে রাখা সেন্টার টেবিলটা কেউ ঠেলে ঠেলে দেওয়ালের কাছে রাখা বইয়ের র্যা কের কাছে নিয়ে গেছিল। সেটা যদি ধস্তা ধস্তির ফলে হত তা হলে ওই ভাবে ত্রিভুজের একটি বাহু বরাবর সরলরেখায় হত কি? টেবিলে রাখা বই, খবরের কাগজ এলো মেলো হয়ে পড়ত।আসলে ধস্তা ধস্তির চিহ্নগুলো সাজানো।
অর্ক বলল
তা হলে লাশ কোথায়?
সেটাই ভাবছি। তবে কেয়ার পালিয়ে যাবার মোটিভ ছিল।
কি ভাবে?
কেয়ার বসার ঘরে সেন্টার টেবিলে রাখা পুরানো খরবের কাগজের ভিতর একটা ফোন নাম্বার পাই। সেটা এক ট্রাভেল কোম্পানির। পরদিন বিকেলে রাজধানী এক্সপ্রেসে কেয়ার দিল্লি যাবার টিকিট কাটা ছিল। কোনো শুটিং বা সিনেমার কাজ কিছু ছিল না। আমি জেনেছি। কিন্তু কেয়া যায় নি।
তাই ? একা ?
না। অতনু সমাদ্দার ।
কে সে?
জানিনা। তবে কেয়ার ডাইরিতে ‘অ’ দিয়ে শুরু এক জনের নামের উল্লেখ ছিল। হয়ত সে।
কে হতে পারে?
পুরানো বন্ধু? কেয়ার বামা মা জানে না। অতনু সমাদ্দার নামে তারা কাউকে চেনা না। আচ্ছা অর্ক কেয়া যে নিখোঁজ এই তত্ত্ব প্রথম কার মাথায় আসে?
মিহির মজুমদারের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে বলতে কেয়া হাসিয়ে গেল। ম্যাজিকের মতো হারিয়ে গেল।
তখন কটা বাজে?
সাড়ে নটা।
কটা বাজে? সাড়ে নটা ?
ঠিক তাই।
প্রবাল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল
চল, অর্ক । কুইক।
কোথায়?
কেয়ার ফ্ল্যাটে ।
এখুনি?
হ্যাঁ।
তারা যখন পৌঁছল তখন অ্যাপাটমেন্টটি জমজমাট ছিল। আলো ঝল-মল করছিল। সিকিউরিটি তে তখনো অমিত ছিল। প্রবাল তার কাছে গিয়ে কি একটা দেখাল মোবাইলে। কি বলল অর্ক শুনতে পেল না।
প্রবাল কেয়ার ফ্ল্যাটে না দাঁড়িয়ে একেবারে শেষের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াল। দেখল তালা দেওয়া নেই দরজা ভিতর থকে বন্ধ।
প্রবাল তার Glock 19 পিস্তলটা বার করে হাতে নিলো। অর্কও তার দেখা দেখি তার সার্ভিস রিভলভার বার করল।
প্রবাল কলিং বেল বাজাল। দু বার বেল বাজল। কেউ সাড়া দিন না। প্রবাল আই হোলের সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে আবার বেল বাজাল।
ভিতর থেকে কর্কশ সাড়া এল
কে?
প্রবাল গলা নকল করে বলল
আমি সিকিউরিটি একটু দরজা খুলুন প্লিজ।
দরজা একটু ফাঁক হলে এক গোঁপ দাড়ি পরা মুখ দেখা গেল।
আর্ক আর প্রবাল কিছু বোঝার সুযোগ দিল না তাকে। ধাক্কা মেরে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল তারা। সে ঘুরে তাদেরকে আক্রমণ করতে গিয়ে দেখল দুটো আগ্নেয়াস্ত্র তার দিকে তাক করা। সে কাঠের পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
অর্ক চারপাশে একবারর চোখ বুলিয়ে নিলো। সারা ঘরে কাঁচা রঙের গন্ধে নাক জ্বালা করে ওঠে।
প্রবাল হিম শীতল গলায় বলল
বডি দুটো কোথায় মিহিরবাবু ?
অর্ক ভীষণ অবাক হয়ে বলল
কে? কি বল্লি?
মহাশয়কে চিনতে পারলি না! মহামান্য মিহির মজুমদার।
প্রবাল তেমনি ঠাণ্ডা গলায় বলল
কেয়াকে মারলেন কেন?
মিহির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রবালের কথায় মুখ তুলে চাইল। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। মুখে মদের গন্ধ। বলল
মারলাম কেন ? কেন মারব না স্যার? আমি তো কেয়াকে ভালবাসতাম। শুধু কেয়ার পিছনে দৌড়েছি। তার ভালোর জন্যে নিজের সর্বস্ব দিয়েছি। বিনিময়ে কি পেলাম ? অভিনয়। শুধু অভিনয় স্যার। কেয়া শুধু আমার সঙ্গে অভিনয় করে গিয়েছে। আমাকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করেছে।
প্রবাল বলল
ভালোবাসতেন যদি, মারলেন কেন?
যেদিন জানলাম অতনু সমাদ্দারের সঙ্গে কেয়া পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে সেদিন আর আমি পারলাম না। ওকে ছাড়া থাকব কি করে স্যার?বলুন?
কি করে জানলেন ওরা পালাবে?
যাকে দিয়ে ওরা ট্রেনের টিকিট কাটিয়েছিল সে আমার বন্ধু। আপনি যখন আমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখনি বুঝতে পেরেছি আপনি আসবেন।
ততক্ষণে আরো ফোর্স এসে গেছিল। ভিতরের ঘরে থেকে দুটি টুকরো টুকরো মৃতদেহ পাওয়া গেল। তার কিছু টুকরো ছোট ছোট পলিথিনের কাগজে ভরা। সে এই ভাবে প্যাকেটে ভরে ধীরে ধীরে মৃতদেহের টুকরো গুলো বাইরে ফেলে দিয়ে আসছিল।
প্রবাল বলল
আপনি অর্ককে বলেছিলেন ‘ওখানে নতুন কিছু পেলেন স্যার’ এই কথাটাই আপনাকে ধরিয়ে দিল। আর কেয়ার নিখোঁজ হবার দিন সাড়ে নটার সময়ের আপনার মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন আপনার শেষ রক্ষা হতে দিল না।

গাড়িতে ফেরার পথে অর্ক বলল
মিহির খুন করেও পুলিশে খবর দিল কেন। চেপে যেতে পারত।
প্রবাল বলল
কারণ সে জানত তার মোবাইলের কল লিস্ট বা টাওয়ার লোকেশন পুলিশ ঠিক চেক করবে, তাই সে পুলিশকেই তার অ্যালিবাই সাজাল। সে ভেবেছিল আগে ভাগেই সে যদি তার ফোনের হিস্ট্রি পুলিশকে বলে দেয় তা হলে পুলিশ আর অত তলিয়ে তার নিয়ে ভাববে না।
কথায় বলে না অতি চালাকের গলায় দড়ি !
অর্ক হাসল।

আপনার মতামত জানান