অন্যরাস্তায়

ফজলে আজিজ আব্বাসী


পর্বঃ ক

ওরা ওভাবেই কাটিয়ে দিতে চায়।
ওরা অভাবেই সারাটা জীবন কাটায়। ট্রেনে লাগেনা টিকিট, বাসে লাগেনা ভাড়া।
মানুষেরই মত, অথচ নাকি একটু অন্যরকম। তাই ওরা ওধারেই রয়ে যায়।

ধুলিয়ান গঙ্গা থেকে মালদা টাউন হাওড়া ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে যাচ্ছি হাওড়া। এ অঞ্চলের ট্রেনে বেশ ভিড় হয় জানা ছিল। সিঙ্গললাইন। গাড়ি কম। অঙ্কের নিয়ম বলে ভিড় স্বাভাবিক। সকাল ৭টায় ধুলিয়ান ছেড়ে বেলা ২টোয় ঢুকবে হাওড়া, এমনই কথা।

সুনীল বলেছিলেন, কেউ কথা রাখেনা, কেউ কথা রাখেনি। এখন আই অ্যাম ফিলিং বোন টু বোন, কেউ কথা রাখেনা। অন্ততঃ, এই লাইনের ট্রেন তো নয়ই।

অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ, অরণ্যদেব নাকি কক্ষনো দেরি করেননা। কিন্ত এই অঞ্চলের প্রাচীন প্রবাদ, এ ট্রেনের লেট করাটাই দস্তুর।

////////////////////////////////

পর্বঃ খ

কোনদিন এই রুটে আসিনি। এ যাবৎ বীরভূমের মানুষ। বর্ধমান হয়ে হাওড়া সবচেয়ে শর্টেস্ট ওয়ে।

এই তল্লাটের একএকখানা করে অচেনা স্টেশন পেরোচ্ছে আর চমৎকৃত হচ্ছি ক্রমশঃ। বহুচেনা রুটে যাতায়াত করতে করতে নিত্যযাত্রীদের মুখচেনা হয়ে যায়। এটা নতুন যদিও, সবাইকেই তবু কেমন চেনা চেনা ঠেকছে। স্বাভাবিক। নিত্যযাত্রীরা তো সবখানেই আছেন, বহাল তবিয়তে আছেন এবং তাঁদের স্বভাব সর্বত্রই এক।

আলাদা শুধু এদিকের মানুষজনের কথ্যভাষা। এটা অবশ্য আর কারুর অজানা নয় যে স্থানবিশেষে কথ্যভাষা বদলে বদলে যায়। ঝাড়খণ্ড বিহার ঘেঁষা মুর্শিদাবাদে, আরো স্পেসিফিক ভাবে বললে পাকুড় ধুলিয়ান অঞ্চলের কথ্যভাষা বীরভূমের ভাষার সঙ্গে যায়না। এখানে মূলতঃ বিহারী হিন্দি মিশ্রিত বাংলা চলে।

প্রথম প্রথম হাসি পেতো, এ আবার কি! শুনতাম, এটা নাকি বাগড়ি ভাষা বা খোট ভাষা। খোট্টাদের ভাষা। কিন্তু কারা এই খোট্টা, ধুলিয়ানে এদের নিবাস কোথায় তা বহু খুঁজেও পাইনি। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ভাষার পার্থক্য নিয়ে ভাবতে ভারি ভালো লেগেছে।

////////////////////////////

পর্বঃ গ

বিদ্বান যেমন সর্বত্রই পূজ্যতে, হকারেরাও তেমনি সর্বত্র বিরাজেন। হকারের সংজ্ঞা দিয়ে বোর করতে চাইনা। তো তাঁদের পবিত্র কনুইয়ের স্পর্শ পেতে পেতেই (মানে, গুঁতো খেতে খেতে) আবিষ্কার করলাম যে এই দুঃসহ জার্নি টা বেশ এনজয় করতে শুরু করেছি।

জানালাগুলো দিয়ে দিব্যি সুন্দর হাওয়া আসাযাওয়া করছে।

মন ভালো হয়ে গেলো জঙ্গীপুর স্টেশন থেকে ওঠা অল্পবয়সী দুটি ছেলেমেয়েকে দেখে। বসলো আমারই সামনের সিটে। বুড়ো হয়ে যাওয়ার ঠিক আগে খুব চেনা কিছু দৃশ্য মনে পড়িয়ে দিলো এরা।

দুজনেতে যাবে একইসাথে, পাশাপাশি সিট, অথচ, বেচারা ছেলেটিকে তার বাবা ছাড়তে এসেছেন। আর মেয়েটি এসেছে ওর এক বান্ধবীর সাথে। ট্রেন না ছাড়লে দুজনেই না পারছে সিটে বসতে (যেহেতু পাশাপাশি, আর জানালার বাইরে বাবারূপী অমরীশ পুরী), না পারছে কথা বলতে। অগত্যা, কেলো!

কাঁচুমাচু আর ভীতু মুখ নিয়ে ছেলেটি ভ্যাবাচ্যাকা। মেয়েরা সচরাচর সাহসী হয়। এক্ষেত্রেও অন্যথা নয়। মেয়েটি দেখি মুচকি মুচকি হাসছে ছেলেটির বেহাল অবস্থা দেখে। শেষে ট্রেন ছাড়লো। বেচারা! (নাঃ, অমরীশ পুরী ওঁর ওই অমোঘ উক্তি দিয়ে ছেলেকে বিদায় জানান নি!)


কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম মেয়েটির অভ্যেস হুবহু একজনের মত। সে আমার খুব চেনা এক মফঃস্বলের মেয়ে। হয়তো বা কুম্ভমেলায় বিছড়ে যাওয়া দো বেহনে!

একইরকম দেখতে, তোর যেমন রামধনু রং দেয়া একটি গাঢ় সবুজ গোলগলা গেঞ্জি ছিল, এরও তেমন। যেভাবে আমার গলা টিপে দিতে আসতি তুই, যেমন ছিঁচকাঁদুনে ছিলি তুই, যেমন বেলুড় দেখতে যাবো বলতি বারবার, সেম টু সেম। আর ছেলেটা এক্কেবারে আমার মত। ভীতু, লোকে কি ভাববে সেই ভেবে ভ্যাবাগঙ্গারাম।

ওদের খুনসুটি উপভোগ করতে করতেই চোখে পড়লো একদুটো দরজা পেরিয়ে একখানা ত্রিশূল। বম্ ভোলে!

ত্রিশূলটার গলায় লাল চেলি (চেলিই বলে কি বোধহয়?) বাঁধা, আর তার সাথে আদর করে বাঁধা দুতিনটে ছোট ছোট ঘন্টা। আমার মতন আধপাগলা লোকের কৌতুহল হওয়াই স্বাভাবিক। উঠে গেলাম।

অতঃপর, আমার সাক্ষাৎ শিবঠাকুর দর্শন। সঙ্গে পরমপূজ্য পবননন্দন। অহো! অহো! ঠাকুর, মানবজীবন ধন্য!! কি মাছ ধরেছি বঁড়শি দিয়া!!

তারপর, কথোপকথন যা হলো, অতি সাধারণ।
-ঠাকুর, একটু কথা বলা যাবে?
-হ্যাঁ, বলেন দাদা।
-আপনার বাড়ি কোথায় ঠাকুর?
-সাঁইথিয়া।
- (দ্বিগুণ আশ্চর্য হয়ে) বলেন কি ?!

////////////////////


পর্বঃ ঘ

বাবাঠাকুর এর রোজগারপাতি মোটামুটি হয়। চার ভাই আর মায়ের সংসার। বাবা নেই। ইনি দ্বিতীয়। বিয়েশাদি করতে হয়েছে পাকে পড়ে। ন'মাসের একটি কন্যা আছে। বউ খুব ভালবাসেন।

-ঝগড়া হয়না? বাবাঠাকুর তো নেশাভাং করেন, না কি?

-না দাদা, শুধু বিড়িটো খাই। আর সিকারেট চলে, আপনার মুতুন বাবুরা ভালবেসে মধ্যেমাঝে খ'ন (খাওয়ান)। এইটুকুন। আর কুনো নেশা নাই।
-বউ আবদার করেন না, আমার লিপস্টিক, পাউডার, ক্রিম চাই এসব করে?
-তা চায় বইকি, ত্যাবে গরীবের ঘরের বিটি তো উও, জানে যি কুনটো গরীবের জিনিস আর কুনটো বড়লোকের। তাথেই বেশি কিছু চায়-টায় না।

-দাদা, (এবারে পবননন্দন মুখ খুললেন) আপনি কুন চ্যালেনের রিপোটার?
আমার এবার অবাক হবার পালা। তবে কি খালি রিপোর্টার বন্ধুরাই ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন, ওঁদের খোঁজ খবর নেন?

জিজ্ঞেস করলাম,
কেন বলুন তো?
-না, আপনি এইসব ম্যালা কথাবাত্রা শুধাছেন, তাথেই ভাবলাম।
(মনে মনে হাসলাম) - রিপোর্টার একসময় ছিলাম বটে, তা অবশ্য আহামরি কিছু না। এখন আমি নিজেই বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করি, একটা পত্রিকা কে পাঠাই, তাঁদের ভাল লাগলে তাঁরা লেখা বার করেন।
-কি পত্রিকা?
এইবার পড়ি মুশকিলে। এঁদের কিকরে বোঝাই, যে এটা একটা ওয়েবম্যাগাজিন এ পাঠাতে চাইছি? অনেক ভেবে বললাম, -ইন্টারনেট সম্পর্কে কিছু কি জানা আছে ঠাকুর?
ওমা! বলেন, হ্যাঁ, অল্পস্বল্প কিছু জানি।

-ঐ ইন্টারনেটেই পত্রিকা টা বেরোয়। ছাপা কাগজে বেরোয় না। সেখানে দেবো। ওনাদের ভালো লাগলে ওনারা বের করবেন।

সাঁইথিয়া থেকে কতদূর সেই নিমতিতা, সেখানে গেছিলেন। বহরমপুর স্টেশনে নামবেন। ফের বাস ধরে সাঁইথিয়া।

চাঁদে বা মঙ্গলে গিয়েও যদি সাঁইথিয়া বা নিদেনপক্ষে বীরভূমের মানুষ পাই, কথা দিচ্ছি, তার সঙ্গেও দিব্যি জমিয়ে আড্ডা দেবো।

আপনার মতামত জানান