অনিন্দনীয়া

মৌমিতা বিশ্বাস
"ছি ছি, বড়ঘরের কেচ্ছা আমরা কি বুঝব বল দিদি !"
"এত নামকরা দিদিমনি, ওই বড় ইশকুলে বিজ্ঞান পড়ায়।"
"লাহাবাড়ীর ছেলেরই বা কি আক্কেল বল? অত বড় বংশের বড় ছেলে তুই, প্রজারা বলে এখনও ফসল তুলে খাজনা দিয়ে যায়। আশেপাশের সাতটা গাঁয়ে অমন পাকা বাড়ি আর একটাও নেই।"
"জমিদার গিন্নীর মুখটা যদি দেখতে গো। এই তো সেদিন ওদের বুধি গাইয়ের দুধ দুইতে গিয়ে দেখলাম সোনার বন্ন যেন কালি হয়ে গেছে। চোখের তলায় এক পোঁচ কালো। বুড়ো বয়েসে ছেলের উপযুক্ত কাজই করলে বটে একখানা।"
"সবই কপাল গো গয়লা-বউ, বলতে নেই আমার শিবে তো এইবছর জলপানি পেয়েছে। বিজ্ঞানে। দিদিমনির নাম বলতে অজ্ঞান।"
"দেখো কতদিন চাকরিটা রাখতে পারে। আমি যাই গো গোয়ালে নিড়েন দিতে বাকি।"
"হ্যাঁ, আমিও পা চালাই , হাট হয়তো বসে গেল।"

প্রতিদিনের মতন আজ ও তৈরী হচ্ছে অপা স্কুল এ যাবার জন্যে।
অপা, অর্থাৎ অপরাজিতা। বাবা নামটা রেখেছিলেন। বলতেন "মেয়ে আমার দশটা ছেলের সমান"।
স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফল শুনে ছেলেমানুষের মতন হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন বাবা। পুরো ইউনিভার্সিটি তে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিল অপা। ছোট তিন ভাইবোন কে বলেছিলেন ডেকে ডেকে "দেখ দেখ তোরা যা খাস ওকেও তাই খেতে দিই, একটু ওর মতন হওয়ার চেষ্টা কর।" সবচেয়ে ছোট ভাই বলার চেষ্টা করলো "বাবা আমিও তো এইবছর ক্লাস এ ফার্স্ট হয়েছি।" বাবা এক দাবড়ানি দিয়ে থামিয়ে দিলেন "ওই ক্লাস নাইন এর পরীক্ষা আর ইউনিভার্সিটি র পরীক্ষা এক হলো?"
বাবা এখন কি করছেন? কার্তিক মাসের হিমে কাশিটা নিশ্চই বেড়েছে আবার। গার্গল করে টানা বারান্দায় রোদে কাগজটা নিয়ে বসেছেন হয়তো।
অপার শেষ চিঠির কোনো জবাব আসেনি বাড়ী থেকে। সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বাবাকে চিঠি লিখেছিল অপা। মা কে লেখার সাহস হয়নি, মা বরাবরের অবুঝ। কানা-ঘুষােয় আগেই নিশ্চই জানতে পেরেছিলেন ওঁরা। তাই হয়ত গত মাসে হঠাৎ ভাই কোয়ার্টারে এসে হাজির। ভাই এখন বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ার। জয়েন্ট এ খুব ভালো ফল করে খড়গপুর থেকে পাস করেছে। অফিস ছুটি নিয়ে চারদিন থেকে গেল। অলকেশ সেইকদিন জেলা সদরে গেছিল কাজে। ভাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছিলো অলোক-দা কোথায়, এখানে কি রোজই আসে, এইসব কথা। সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করেনি অবশ্য। ভাই-বোনের মধ্যে আট বছরের তফাত, খুব একটা হলায় -গলায় সম্পর্ক নয়, দিদির সাথে যেমন। অপা ওকে কিছু বলতে পারেনি।
প্রথম ক্লাসটাই টুয়েলভ এর বিজ্ঞান, রোজ যেমন থাকে। জেনেটিক ডিসর্ডার পড়াচ্ছে অপা। সেকেন্ড বেঞ্চ এর প্রাঞ্জল উঠে জিজ্ঞেস করলো "আচ্ছা দিদি, তার মানে কি কাছের সম্পর্কের দুজনের সন্তানের মধ্যে রিসেসিভ ডিজিজ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি?" হয়ত স্বাভাবিক কৌতুহলেই জিজ্ঞেস করেছিল, মেধাবী ছেলে। কিন্তু অপার কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। কোনরকমে দায়সারা একটা উত্তর দিয়ে বাকি সময়টুকু টেস্ট এর আলোচনা করে কাটিয়ে দিল অপা।
আজকাল যে যাই বলুক মনে হচ্ছে যেন ওকেই উদ্দেশ্য করে বলা। তথাকথিত সামাজিক নিয়মগুলো কে বানিয়েছিল জানা নেই, তবে তার পাহারাদার হতে সকলেই রাজি। মানুষের অভ্যস্ত চোখে যা খাপ খায়না সেটাকে আগেই 'খারাপ' ধরে নিয়ে তারপর ভাবতে শুরু করে তারা। কারুর সাহসী সিদ্ধান্ত কে 'পদস্খলন' আখ্যা দিয়ে নিশ্চিন্ত নিয়মের ঘেরাটোপে থেকে যেতে সকলেই পছন্দ করে। তলিয়ে দেখতে যায় না |
অপা ক্লাস থেকে বেরিয়েই অলকেশ কে ফোন করলো একটা।
"কবে ফিরছো তুমি? বাড়ীর কি অবস্থা?"
"আমি কাল ফিরব, তোমার ওখানেই সোজা উঠব। বলব সব। "

ফোন ছেড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো অপা। বিকেল হয়ে আসছে, পশ্চিমে পদ্মার দিক থেকে একটা হাওয়া আসছে। হালকা আঁশটের সাথে কেমন মাটি-মাটি গন্ধ। বহু বছরের চেনা এই গন্ধটা অপার কেমন অজানা মনে হলো। সত্যিই কি এখানকার সবকিছুকে চিনে উঠতে পেরেছে ও? সেই বারো বছর আগে বাবার সাথে এখানকার হাই স্কুল এ বিজ্ঞান শিক্ষিকার চাকরিটা পেয়ে এসেছিল অপা। যদিও তল্লাটের একমাত্র হাই স্কুল এটা, তবু প্রতি বছর একজন দুজন রাজ্যে প্রথম কুড়িজনের মধ্যে থাকেই। সাথে ছিল থাকার জন্যে ছিমছাম, ছোট্ট কোয়ার্টার। উঠোনে একটা কুঁয়ো, দুটো জবা গাছ, একটা কাগজি লেবু গাছ আর টানা বারান্দা। কাজের জন্যে পাশের গ্রামের কলি কে ঠিক করে দিয়েছিলেন প্রিন্সিপাল নিজেই।
"এখানে একা থাকতে পারবে তো? শহুরে মেয়ে তোমরা, বিজলি বাতির আলো ছাড়া ভাতের রং চিনতে পারবে না। তোমার বাবা এই স্কুল এর খুব কৃতী ছাত্র ছিলেন। তুমি নিজেও তাই, তোমার শংসাপত্র গুলো বলে দিচ্ছে। কিন্তু এই চাষী, হাটুরে মানুষজনের ছেলে-মেয়েদের পড়াতে পারবে তো?" বলেছিলেন সৌম্য দর্শন বছর পঞ্চান্নর দীর্ঘকায় মানুষটি।
"নিশ্চই পারব স্যার। প্রকৃতির মধ্যে থাকতে আমার ভালই লাগবে।অবসর সময়ে একটু লেখালিখির কাজও করতে পারব।"
"দেখো, তোমার কোয়ার্টার এর চাবি পিয়ন দিয়ে দেবে। আজ প্রথমদিন আমার বাড়ীতে খেয়ে নিও, কাল থেকে যা ব্যবস্থা হয় কোরো।"
দুটো সুটকেস আর একটা হোল্ডঅল তুলে নিয়ে বাবাকে নিয়ে অপা কোয়ার্টারের দিকে এগোলো। স্কুল গেট এর সামনে বড় রাস্তা, তার লাগোয়া একটা ছোট মাঠ এর মাঝামাঝি জায়গায় ওর বাসা।
সবচেয়ে বড় পাওনা ছিল, কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে দু মিনিট হাঁটলেই ভরা পদ্মা। ঘোলাটে মেটে রঙের জল, পাড়ের একধারে পোড়ো জমিদারবাড়ি। সেই সত্যজিত রায় এর 'জলসাঘর' ছবির বিশ্বম্ভর রায় এর বনেদী নিবাস। শুটিং এর পর শরিকি অবহেলায়, অযত্নে ভেঙ্গে পড়েছে বেশির ভাগটাই। নাটমন্দির আর দোতলার কিছু কিছু ঘর এখনো রয়ে গেছে।
একটু গুছিয়ে নিয়ে তারপর সেদিন ওরা গেছিল মাস্টারমশাই এর বাড়ি। ওঁর স্ত্রীর জন্যে অপা কলকাতা থেকে একটা ভালো কাশ্মীরি শাল নিয়ে গেছিল। খুব খুশি হলেন ভদ্রমহিলা।
"খুব সুন্দর হয়েছে। এখানে সিল্ক এর শাড়ির তো দেশজোড়া নাম, কিন্তু গরম জিনিসের কোনো কোয়ালিটি নেই। ভাগ্যিস তুমি এটা আনলে, আমি কিন্তু 'তুমি' করেই বলব। কিছু মনে কোরোনা বাপু ।"
"নিশ্চই বলবেন মাসীমা। আপনি বয়েসে, সম্মানে অনেক বড়।"
"ভাগ্যি এই শালটা পেলাম, নইলে শীতকালে বিয়েবাড়ি গেলেই হিম লেগে গলা বসে যায়, গায়ে কিছু দেবার থাকেনা যে।"
দরাজ গলায় হেসে উঠলেন প্রিন্সিপাল স্যার, "যা বলেছ, এর চেয়ে এক শিশি ভালো কফ্ সিরাপ ও আনতে পারতে, সস্তায় হয়ে যেতো, ওটাও এখানে সহজে পাওয়া যায়না।" সকলেই হাসলেন এইবার।
খুব যত্ন করে খাইয়েছিলেন ওদের মাসীমা। ঝিরি-ঝিরি আলুভাজা, নদীর টাটকা ইলিশ আর ঘরে পাতা গাওয়া ঘি দিয়ে সাদা ফিনফিনে তুলায়পাঞ্জি চালের ভাত। আজও মুখে লেগে আছে যেন অপার। খুব প্রশংসা করলেন ওর।
"এত ভালো মেয়ে তুমি, এমন চমৎকার রেজাল্ট করে এখান কেন যে মরতে এলে। আরো কত ভালো জায়গায় চাকরি পেয়ে যেতে।"
জবাবে শুধু হেসেছিল ও। জীবনের আদর্শ, দেশের-দশের জন্যে কিছু করার আবেগের বাড়াবাড়ির বয়েস উনি অনেকদিন পেরিয়ে এসেছেন। ওনাকে কিছু বললেও বুঝতেন না। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করেছিল।

সেদিন শুনলো এই ভারতী-মাসীমা তপন স্যার এর স্ত্রীর সাথে গল্প করতে গিয়ে বলেছেন "একদম বেয়াড়া মেয়েছেলে। আমার গোড়াতেই ওকে একটুও ভালো লাগেনি। মাসীর বাড়ি অত ঘনঘন যাতায়াতই বা কেন? যতসব শহুরে ঢং এখানে আমদানি করলো এসে। মাসতুতো ভাইটিও তেমন। এতবড়ো জমিদার বংশ তোরা, এখানে সাত পুরুষের ভিটে , বিধবা মা, ছোট আরো পাঁচটা ভাই এর কথা ভাবলি না? এত বড় চাকরি করিস নিজে, এই কি শিক্ষার পরিচয়?"
তপন স্যার এর স্ত্রী মহুয়া বলে "বিয়ের কার্ডও তো নাকি ছাপানো হয়ে গেছিল মাসীমা। ছি ছি কি কেলেঙ্কারী বলুন দেখি।"
" মেয়েটার বাড়ি থেকে তো শুনছি মামলা করবে। করুক, বুঝবে কত ধানে কত চাল। ওসব শহুরে নাটক-নকশা এখানে চলে না।"
প্রিন্সিপাল স্যার এর বড় ছেলে, অধিরাজ, ক্লাস ইলেভেন এ পড়ে। ওর পড়ার ঘর থেকে এই আলাপচারিতার অনেকটাই শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎ শব্দ করে চেয়ারটা পা দিয়ে রুক্ষভাবে ঠেলে ঝট করে উঠে এসে দাঁড়ালো। মহুয়া আর ভারতী একটু থতমত খেয়ে গেল। সোজা এসে মায়ের সামনে দাঁড়ালো অধিরাজ, "মা তোমাকে না কতবার বলেছি এই সব উল্টো-পাল্টা গুজব ছড়িও না। দিদিমনির দূর সম্পর্কের মাসতুতো ভাই হন অলকেশ-দা। এতে আইনের কোনো বাধা নেই। ঘরের মধ্যে বসে থেকে আর পান চিবিয়ে-চিবিয়ে তোমাদের বুদ্ধি গুলোও ছিবড়ে হয়ে গেছে।" যেমন এসেছিল, তেমন দুমদুম করে পা ফেলে ঝড়ের মতন চলে গেল ছেলে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোড়ের দিকে কয়েক পা এগিয়েই অধিরাজ দেখতে পেল বিমল আসছে। বিমল অপা-দিদিমনির বাড়ীতে চব্বিশ ঘন্টা থাকে। ওর তিন বছর বয়েসে ওর বাবার সাথে মাছ নিয়ে দিদিমনির বাড়ী গেছিল। ওর বাবা অপার বাঁধা জেলে, মাছ দিয়ে যায় বাড়িতে এসে। ওকে দেখে অপা নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল,"বসন্ত, তোমার ছেলেকে আমায় দাও, আমি মানুষ করব। পড়াশোনা করবে আমার কাছে থেকে।" সেই থেকে আছে। এখন টেন এর টেস্ট পরীক্ষার জন্যে তৈরী হচ্ছে।
কাছাকাছি আসতেই বিমল বলল,"দাদা তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম। তোমার ক্যালকুলেটর তা একদিনের জন্যে একটু দেবে? খুব দরকার।"
"হ্যাঁ নিস। বাড়ীতে যাস, দেব। আমিও তোদের ওখানেই যাব ভাবছিলাম। দিদির কাছে আমার প্রাকটিক্যালের খাতা টা রয়ে গেছে, নিয়ে আসব আর একটা চ্যাপ্টার একটু বোঝার আছে।"
মাথা নীচু করে ফেলে বিমল। একটু থেমে বলে,"দিদি তো এখন অলোক-দার ঐখানে গেছে। কাল মাসীমা ডেকে পাঠিয়েছিল। এখনো ফেরেনি। জানিনা কি দরকারে।"
"সেকি! একা গেলেন, তুই যাসনি সঙ্গে?"
"আমাকে তো নিয়ে গেলেন না। যাওয়ার আগে খুব কান্নাকাটি করলেন, বললেন 'তুই নিজের বাড়ী ফিরে যা বিমল, আমার পক্ষে আর তোকে পড়ানো সম্ভব হবে না হয়ত'। আমি কি বলব দাদা, দিদি না থাকলে আমার এতদূর পড়াশোনাই হত না। হয়ত বাবার সাথে গাঙে মাছ ধরে বেড়াতাম এদ্দিনে। দিদি আমার সব। জানিনা কি হবে।"
"আরে দূর, এত ভাবিস না। দিদি কোনো ভুল করেননি। সব ঠিক হয়ে যাবে। চল বকশীর দোকানে একটু চা খেয়ে আসি।"
...............
পুরনো দিনের উঁচু পালঙ্কটায় বসেছিলেন নিভাননী, ভূতপূর্ব জমিদার-গিন্নী, অলকেশের মা। সামনে দাঁড়িয়ে অপরাজিতা। মাথা নীচু করে না, চোখে চোখ রেখেই দাঁড়িয়েছিল সে।
"দেখো, তোমরা যখন ঠিক করেই নিয়েছ লোক হাসাবে, তাই করো। আমাকে আর এর মধ্যে জড়িও না। নিজেরা যেভাবে যা ব্যবস্থা করতে পারো করো। বংশের মুখে কালি যা পড়ল সে আমার অদৃষ্ট, তোমার মাকে আমি কি মুখ দেখাবো তাই ভাবছি। আমার হাতে দিয়ে গেছিলেন তোমাকে জামাইবাবু। বলেছিলেন, নতুন জায়গায় একলা থাকবে, আপনার ভরসাতেই ছেড়ে গেলাম দিদি। পিঠোপিঠি দুই খুড়তুতো বোন আমরা, তোমার মা আর আমি, একসঙ্গে মানুষ হয়েছি। নাহ, আমি আর ভাবতে পারছিনা। একটু শান্তিতে মরতে দাও আমাকে তোমরা। যাও, যাও যা পারো করো। হরি...হরি...আর কতদিন হে আর কতদিন।"
"মাসী, আমি কথা দিচ্ছি মাকে আমি নিজে বোঝাব। কোনো অসুবিধা হবে না দেখো। রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করব আমরা, যদি বলো লোক হাসানো , সেটা হতে দেব না, কথা দিলাম।"

তিন মাস পর।

কলকাতার বাড়ী থেকে আর কোনো জবাব আসেনি কোনো চিঠির। নিজের সুটকেসটা নিয়ে অপা এসে দাঁড়ালো গেট এর বাইরে। কড়া নাড়ল গ্রিল এর ভেতর হাত বাড়িয়ে। একটু পর মা বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে। ওকে দেখেই স্থানু হয়ে গেল এক মুহুর্তের জন্যে। মায়ের চোখ অনুসরণ করে অপা নিজের মাথায় হাত দিয়ে বুঝলো যে কালকের রেজিস্ট্রি অফিস এ অলোকের দেওয়া সিঁদুরের অনেকটাই রয়ে গেছে তখনও। কিছু বলার আগেই ভাই নেমে এলো দোতলা থেকে। "কে মা?" বলেই দিদিকে দেখতে পেল।
"অপু, তুই !! " অনেকটা বড় দিদিকে নাম ধরেই ডাকে বিদ্যুৎ। চেঁচিয়ে উঠলো সে,"বাহ, হয়ে গেছে? এরপরেও তোর এবাড়ীতে আসার সাহস হলো কি করে? বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা এক্ষুনি। মা, তুমি ভেতরে যাও বলছি। ওর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দাও।"
সুবচনী বলার চেষ্টা করলেন,"এতটা রাস্তা এসেছে, খোকা, ও ভেতরে আসুক, বসে বলুক যা বলার। তুইও বল কি বলবি। ঢুকতে দে আগে।"
"না, ভেতরে ও ঢুকবে না। আর কোনদিন ও এই চৌকাঠ মাড়াবে না। হয় ও থাকবে এখানে, নয় আমি থাকব। যে ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় সেও যেন বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। সারা পাড়া জানে অলোক আমাদের মাসতুতো দাদা, এতবার এসেছে এখানে। কি করে মুখ দেখাবো লোকজন কে? ওকে বলে দাও ভালো চায় তো এক্ষুনি যেন ফিরে যায়, আর কোনদিন এখানে আসার সাহস না করে। আর ওই অলকেশকে আমি দেখে নেবো, পাড়ায় সব তৈরী আছে, একবার বললেই ছেলেরা হকি স্টিক দিয়ে হাড়গুলো গুঁড়ো করে দেবে ওর। " বিকৃত গলায় চিৎকার করলো বিদ্যুৎ। আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে একটা দুটো কৌতুহলী মুখ উঁকি দিতে শুরু করেছে ততক্ষণে।
কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকে গেলেন সুবচনী, হয়ত নিজেকে সামলাতে। ঘরে বসে তখন অপরাজিতার বাবা, শক্তিনাথ, মাথা নাড়ছেন আর নিজের মনে বিড়বিড় করছেন,"ওকে চলে যেতে বলো সুবি, চলেই যাক ও। এখানে ওকে বাঁচাতে পারব না আমি। এই খ্যাপা ষাঁড়কে কে থামাবে বল !" অশীতিপর হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলেন সুবচনির হাত,"কাল যে সরস্বতী পুজো সুবি, অপা ঐজন্যেই এসেছে। প্রতিবার যেমন আসে। আমি ওর মুখোমুখি হতে পারব না, আমার ঘরের মা সরস্বতীকে নিজের হাতে ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে পারব না আমি, আমাকে ক্ষমা কর তোমরা।" জরাকীর্ণ গালদুটো দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরছিল শক্তিনাথের, অপা তখন ধীরে ধীরে পিছন ফিরে সুটকেসটা তুলে নিয়ে পা টেনে টেনে চলে যাচ্ছে।
------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ --------------------------------
বছর পাঁচেক পর।
সুবচনী কে নিয়ে অপরাজিতা এক ডাক্তারের চেম্বার এ বসে আছে। শহরের নামকরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, কুমার মল্লিক। পরীক্ষা করে স্টেথোটা নামিয়ে চশমার ভেতর দিয়ে তাকালেন ডক্টর মল্লিক,"মনে হচ্ছে গ্যাস এর ট্রাবল, তবু আরেকটা ই.সী.জী. করিয়ে আনবেন মাসীমা, এইটা অনেকদিন আগেকার তো। দিদিকে ফোন করে আমি জেনে নেবো, কাউকে পাঠিয়ে আনিয়ে নেব, আপনাকে আর আসতে হবে না। একটু হালকা খাওয়া-দাওয়া করবেন এই আর কি।"
অনাথ কুমার অপরাজিতার ছাত্র ছিলো। বরাবরের মেধাবী ছাত্রকে অপা নিজের খরচে ডাক্তারি পরিয়েছিল দিল্লির এইমস এ। পাশ করে বেড়িয়ে কুমার কলকাতাতেই প্রাক্টিস করে, বিদেশ যাওয়ার সুযোগ ফিরিয়ে দেয়, নিজে একটা দাতব্য চিকিৎসালয় চালায়। দুস্থ রোগীর বড় সার্জারি নিজে হাতে করে, বিনা পারিশ্রমিকে।
বেরিয়ে এসে মার হাতে একটা প্যাকেট দেয় অপা।
"এতে তোমার হরলিক্স আছে মা, আগেরবারেরটা নিশ্চই শেষ হয়ে গেছে, নিয়ম করে খাচ্ছ তো? আর একটা গরদের সাড়ি, দুমাস পরই তো মহালয়া, আমার নাম করে পুজোয় একদিন পোরো । তোমার জন্যে অর্ডার দিয়ে বানানো তাঁতির বাড়ি থেকে, বাদামী পাড়। তোমার আর ওবাড়ির মায়ের জন্যে এক ই রকম আনিয়েছি, মা ই বলে দিয়েছেন। পরতে পারবে, একটুও লাল নেই। " বাবা মারা গেছেন ব্রংকাইটিস এ, বছর দুয়েক আগে।নাহ, অপাকে কেউ খবর দেয়নি। লোকমুখে যখন খবরটা পেয়েছে সে, ততদিনে শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে গেছে !!
"কেন আবার এত সব আনতে গেলি অপা, সবসময়েই তো কিছু না কিছু দিচ্ছিস তুই। বাকিরা তো যে যার নিজের জগতেই ব্যস্ত। বিদ্যুৎ এর কথা ছেড়েই দিলাম, বাকি দুজনও নিজেদের সংসারে জড়িয়ে আছে, তুই ই যা মনে করে এসব করিস। দে, আমাকে একটা ট্যাক্সি তে তুলে দে এবার, বিদ্যুৎ এর ফেরার সময় হলো। কোনওভাবে যদি টের পায় তাহলে তো জানিসই কি কান্ডখানা করবে। আমি আসি রে। অলোক ভালো আছে তো?"
"হ্যাঁ, আছে একরকম। কদিন থেকে ওর বুকের তলার দিকে একটা চিনচিনে ব্যথা মতন হচ্ছে। খেতে খুব ভালবাসে তো, হয়ত বদহজম হয়ে থাকবে, একবার দেখিয়ে নেব। কুসুম কে বোলো পারলে যেন চিঠি দেয়, আমার স্কুল এর ঠিকানায়। আসি মা, সাবধানে যেও তুমি।"
...........................
মহালয়া ।
লাহাদের বিশাল আমবাগানে থম ধরে আছে পাতলা সরের মতন সাদা কুয়াশা। বহু দূর থেকে কোনো বাড়ীর থেকে ভেসে আসছে বীরেন ভদ্রর চন্ডীপাঠ ।লাহাবাড়ীতে এই বছর কাঙ্গালী-ভোজনের আয়োজন করা হয়নি। সমস্ত বাড়ীতে একটি মানুষজনেরও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
দুদিন আগেই এবাড়ির বড় ছেলের অকালমৃত্যু হয়েছে, মাত্র বেয়াল্লিশ বছর বয়েসে। ম্যাসিভ হার্ট-এট্যাক। চিকিৎসার কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি। মা কেঁদে কেঁদে বড়-বউ কে শাপ-শাপান্ত করে শয্যা নিয়েছেন।
নিজের দোতলার ঘরে অপরাজিতা খাটের ওপর বসে রয়েছে, বাইরের দিকে তাকিয়ে, চোখ দুটো জবা ফুলের মতন টকটকে লাল। চুলে চিরুনি পড়েনি প্রায় তিন চারদিন। দুজন ডাক্তারের দেওয়া কড়া ঘুমের অসুধ কোনো কাজই করতে পারছে না। একটুক্ষণ ক্লান্তিতে চোখ লেগে আসে, তারপরেই আবার ঠায় বসে থাকে এইরকম। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ, পুরনো দাসী মধুর মা খাবার নিয়ে এসে সেধে যায়, সাড়া শব্দ পায়না কোনো।
সারা বাড়ীতে কারোরই মন মেজাজ ভালো নেই। পাঁচ ভাইয়ের ওপর বড় দাদা, বাবার মতন মাথার ওপর একটা আচ্ছাদন দিয়ে সকলকে আগলে-বেঁধে রেখেছিল, এবার কি হবে সেই চিন্তা সকলের মনে।
কাছের বিল থেকে একটা ডাহুক ডেকে উঠলো 'হুক হুক' করে। পূব আকাশে লালচে রং ধরছে। আমবাগানের ভেতর দিয়ে কেউ একটা হেঁটে আসছে লাহাবাড়ির দিকে। মধুর মা দরজা খুলে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো তাকে দেখে। দোতলায় উঠে এলো সে।
অপরাজিতার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,"অপু, আমি তোকে নিতে এসেছি রে, বাড়ী চল।"
ঘুরে তাকালো অপরাজিতা। ভাই ওর মুখের দিকে তাকালো আর সঙ্গে সঙ্গেই চোখ চলে গেল ওর সিঁথির দিকে।
না, সেই নিষেধাজ্ঞার লাল আর নেই। নিজের বাড়িতে ঢোকার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে আবার অপরাজিতা।

আপনার মতামত জানান