মাসকাওয়াথ আহসান

পূর্বের রবি পশ্চিমে উদিত না হইলে!



বেহেশতে আনন্দঘন পরিবেশ।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। দেবুদা বেশ সক্রিয়। দেবুদা আজকাল আর রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে ঢের বুঝে গেছে এই নামে মাত্র সাম্যবাদী আর অতিশয় কাম্যবাদী দলের ফাঁদের বাইরে লোকজন নতুন কোন রাজনৈতিক দলে আগ্রহী নয়। ফলে অযথা পাথরে মাথা ঠুকে লাভ কী!লোকজন নিজের ভালো না বুঝলে দেবুদার কী! তার আরামের জীবন। ছিমছাম এপার্টমেন্ট,গাড়ী, শৌখিন হবার মত যতটুকু প্রয়োজন সবই আছে। নিজের খেয়ে আর এই রাজনীতির জঙ্গলের মোষ তাড়ানোর দরকার কী! বরং বাকী কটা দিন একটু সামাজিক-সাংস্কৃতিক ‘সফট মুভমেন্ট’ করে কাটিয়ে দেয়া যাক।
আনা এসে জিজ্ঞেস করে, কী ভাবছো দেবুদা!
--কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন নিয়ে ভাবছি! ভেন্যু কোথায় হবে?
আনা বলে, প্রত্যেক বছর শান্তি নিকেতনে হয়; সেখানেই হোক।
---সমস্যা আছে আনা।শান্তি নিকেতনে যাবার পথেই গড়ে উঠেছে গোবরডাঙ্গার সাধুবাবার আশ্রম আর শিয়ালনগরের পীরের মাজার। এরা উভয়পক্ষই প্রবল রবীন্দ্র বিরোধী। গত বছর তো এই মোল্লা-পুরুতের ঝামেলাটা ছিলো না।
আনা চিন্তায় পড়ে যায়। সে ভারতীয় উপমহাদেশের এই মানুষগুলোর জটিল মন বুঝতে পারে না। শুধু অবাক হয়; যে উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথের মত মানুষ জন্মান, নজরুলের মত মানুষ জন্মান; সেখানে এরকম মোল্লা-পুরুত জন্মায় কী করে; ভীড়ের মধ্যে মেয়েদের গায়ে চট করে হাত দিয়ে দেয়া টাইপের উপ-পুরুষ জন্মায় কেমন করে! আবার এই লাজুক দেবুদাটাকে সব সময় আনারই ধাক্কা দিয়ে বোঝাতে হয়; হ্যালো একটু কাঁধে হাত দিয়ে বসে টিভি দেখলে অসুবিধা নেই; রাস্তায় একটু হাত ধরে হাঁটলে বিরাট কোন বাজ ভেঙ্গে পড়বে না মাথায়!বিচিত্র এই উপমহাদেশের মানুষ। আনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
--আচ্ছা দেবু তোমাদের উপমহাদেশে সূর্য কী পশ্চিম দিকে ওঠে!
--হ্যা আনা; এই যে ধরো কবিগুরু রবি উনি পশ্চিমা জগতে উদিত না হলে; উপমহাদেশের মানুষ তাকে ভুলে যেত, তিনি পূর্বেই অস্ত যেতেন।
--তাহলে তো কবি গুরুর বার্থ ডে শেক্সপীয়ারের বাড়ীতেই করা উচিত।
--আইডিয়া খারাপ না। এতো বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাও কেমন করে আনা!
আনা ফট করে ক্ষেপে যায়।চোখ মুখ লাল হয়ে যায়।
--করো জন্মদিন, তুমি একাই আয়োজন করো। আনার কোন হেলপ এক্সপেক্ট কোরোনা।
দেবুদার মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে। সব্বোনেশে ব্যাপার। নাহ মুখের লাগাম দিতে শিখতে হবে। সুইপিং কমেন্ট করে এমন বিপদে কী কেউ পড়ে!
কিন্তু নারীমন রীতিমত ঝুঁকিপূর্ণ ল্যান্ড মাইন পাতা নয়নাভিরাম বাগানের মত। সেখানে খুব বুঝে শুনে ধাপ ফেলতে হয়।
দেবুদা গম্ভীর হয়ে বলে, হয়তো আমারই কোন সমস্যা আছে। আমার সঙ্গে মিশলেই তাদের সেন্স হিউমার কমে যায়। দ্যাখোনা আজকাল পার্বতী বসে বসে শুধু প্যানপ্যানানি হিন্দী টিভি সোপ দেখে। আর চন্দ্রমুখী প্রায় হিজাব পরে সাধুবাবার আশ্রমে ভক্তিগীতি শুনে হাপুস নয়নে কাঁদে। তোমার ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন ঘটে কে জানে!
আনা চট করে ফোন করে শেক্সপীয়ার মহাশয়কে। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের হোস্ট হতে পেরে তিনি খুবই খুশী।
--সব কিছু আমার ওপর ছেড়ে দাও; ডব্লিউ বি ইয়েটস টেগোরের খুবই ভক্ত। ওকে বললেই ভালো লেখক-কবিদের জড়ো করবে।
আনা ফোনে কথা বলে দেবুদাকে জানায়, প্রবলেম সলভড। ভেন্যু শেক্সপীয়ারের বাড়ী। আর কী করতে হবে বলো!
দেবুদা আনাকে বলে, মে আই হোল্ড ইওর হ্যান্ড!
আনা দুষ্টুমি করে বলে,ভারতীয় উপমহাদেশের ছেলেরা বেশ নাটক জানে যাই বলো।
দেবুদা ফোন করে গান্ধীজী, বঙ্গবন্ধুকে দাওয়াত দেয়।
কবিগুরুকে ফোন করে বলে, গুরু এবার আপনার জন্মদিন হচ্ছে শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে।
কবিগুরু অবাক হন। এমনিতে এই জন্মদিন করার কোন কারণ দেখিনা; তবু তোমরা শান্তি নিকেতনে একটা দিন হৈ হুল্লোড় করলে ভালোই লাগে।
দেবুদা খুলেই বলে মোল্লার মাজার এবং সাধুর আশ্রমের কথা। একসঙ্গে এতো অতিথি যেতে দেখলে এরা চাপাতি বা ত্রিশূল নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশে খুন হওয়া অভিজিত রায় বা পাকিস্তানে খুন হওয়া সাবীন মাহমুদ আবার এখানে খুন হোক সে ঝুঁকি তো নেয়া যায়না। আবার মেয়েদের শান্তি নিকেতনের দিকে আসতে দেখলে তাদের নিগ্রহের চেষ্টাও এরা করতে পারে।কারণ এই মোল্লা-পুরুত মনে করে মেয়েদের পোশাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী। বর্বর ধর্ষক নয়।
কবিগুরু তো অবাক, কী বলছো এসব! কিন্তু এটা তো নিয়মিত একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেবুদা বলে, নেপালের ভূমিকম্পের খবর শুনে এই মোল্লা ঘোষণা দিলো, বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কের কারণেই ভূমিকম্প হয়।
রবিদা হেসে বলেন, তাহলে তো বেহেশতে সারাক্ষণ ভুমিকম্প হবার কথা!
দেবুদা বলে, এখানেই শেষ নয়, পুরুত ঘোষণা দিয়েছে, হিন্দুদের কেউ কেউ গো-মাংস খাওয়ায় ভূমিকম্প হয়েছে।
রবিদা বিষণ্ণ হয়ে বলেন,নাহ বেহেশতের পরিবেশটাও উপমহাদেশের মতো বিষাক্ত হয়ে গেলো দেখছি।
--এতো ভাববেন না গুরু।এসব ঝামেলা থাকবেই। তাই বলে জন্মদিন উদ্যাপন থেমে থাকবে না।
রবিদা বলেন, ঠিক আছে যা ভালো বোঝো করো।
--আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাবো গুরু। মন প্রফুল্ল করুন। মনে হিংসা নিয়ে মুখে প্রশংসা করা বেশ কিছু স্যুডো ইন্টেলেকচুয়াল এসে ‘শান্তি নিকেতন’কে মাজার ভেবে অতিভক্তিতে গদগদ হতো। ভালোই হল;ওগুলো এবার অতিথি তালিকা থেকে বাদ।
--সে কী দেবু; তা কী করে হয়!
--গুরু অনেক হয়েছে; এদের মনোজগত ঐ মোল্লা-পুরুতের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। এরা মোল্লা-পুরুতের একটা বাজে পরামর্শকে সমর্থন করেছে। বাঙ্গালীদের এই পূব-পাড়ার লোকজন যাতে যেখানে সেখানে মূত্র বিসর্জন না করে;সেজন্য নানা জায়গায় দেয়ালে ‘আরবী’ লিখছে অথবা ‘দেব-দেবীর’ ছবি এঁকে দিচ্ছে। এইসব কথিত রবীন্দ্র প্রেমী বুদ্ধিজীবিরা জাস্টিফিকেশান মামু হয়েছে আজকাল; বলছে, আরবী লিখে-দেবদেবীর ছবি দিয়ে যদি দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; ক্ষতি কী!
কবিগুরু বলেন, বুঝেছি অবস্থাটা। শোন নজরুলকে অবশ্যই ডেকো; আর সৈয়দ মুজতবা যেন বাদ না পড়ে। সুনীল-হুমায়ূন ওরাও যেন আসে।
--সাদা তালিকা করা আছে গুরু। আপনার পছন্দের মানুষ সবাইকেই পাবেন।
হঠাত কাম্যবাদী দলের জেনারেল জিয়া ফোন করেন, স্যার, আপনি ‘নৌকাডুবি’ লেখার কারণে আমরা আপনাকে কাম্যবাদী দলের পক্ষ থেকে সম্মানিত করতে চাই আপনার জন্মদিনে।
কবিগুরু বলেন, ধন্যবাদ জিয়া। কিন্তু মনে রেখো আমি ‘সোনার তরী’-ও লিখেছি; কাজেই আমাকে তোমাদের এসব দলীয় পারপাসের বাইরেই রাখো। আমি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সুশীল থাকতে চাই। ভারতীয় উপমহাদেশে কবি-সাহিত্যিকদের দলীয়করণ শুরুর অনেক আগেই আমি কেটে পড়েছি। আশা করছি আমার কথায় কিছু মনে করোনি।
--না স্যার কিছু মনে করিনি স্যার। ভালো থাকবেন।
শেক্সপিয়ারের বাড়ীর বাগানে আজ তারার মেলা বসেছে যেন। গোটা পৃথিবীর ডাকসাইটে সব লেখক কবি চিত্রকর ফিল্মমেকার জড়ো হয়েছে। দেবুদা ফুরফুরে মেজাজে অতিথিদের কার কী বিষ লাগবে তা জিজ্ঞেস করে আতিথেয়তা করছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যথারীতি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে রামসেবা করছেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শেক্সপীয়ারের সঙ্গে গল্পে মত্ত। শেক্সপীয়ার আক্ষেপ করছেন ডেসডিমোনা আর ওফেলিয়ার জন্য; এই চরিত্রগুলোর প্রতি সুবিচার করা হয়নি। তবে লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রটা ঠিকই আছে; আজকের যুগে বেশ প্রাসঙ্গিক; এরকম এম্বিশাস সোশ্যালাইটস সংখ্যায় অনেক।রবীন্দ্রনাথ বলেন, শেষের কবিতার লাবণ্যর জন্য উনার বেশ মন খারাপ লাগে। ‘একরাত্রি’ ছোটগল্পটাও খুব কষ্ট দেয়। নারীর নিয়তি আজো বদলালো না।
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এসে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসেন। কবিগুরু মার্কেজকে বলেন, তুমি বাপু উপন্যাস ব্যাপারটা জমিয়ে দিয়েছো।
মার্কেজ বলেন, আস্তে বলুন গুরু, ঐ যে জেমস জয়েস ভাইয়া বসে; উনি শুনলে রেগে যাবেন।
কবিগুরু আর শেক্সপীয়ার দুজন প্রাণখুলে বেশ খানিকটা সময় ধরে হাসেন।
দেবুদা এসে একটু খোঁজ নিয়ে যায়; কেমন লাগছে সন্ধ্যাটা।
কবিগুরু বলেন, চমতকার দেবু; বক্তৃতা নেই; বিশেষণ নেই; অতিশয়োক্তি নেই; শুধুই আড্ডা।
আনা ঘোষণা দেয়, এবার টেগোরের গীতাঞ্জলী থেকে পাঠ করবেন, ডব্লিউ বি ইয়েটস। গীতাঞ্জলীর অনুবাদক।
শেক্সপীয়ার মুগ্ধ হয়ে শোনেন। এতোক্ষণের হুল্লোড় থেমে যায়।
এরপর রুমানিয়ার একদল গাইয়ে অপূর্ব সুর আর উচ্চারণে গেয়ে দেয়,
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন॥
নয়ন আমার রূপের পুরে সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন॥
তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার, বাজাই আমি বাঁশি--
গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণের কান্নাহাসি।
এখন সময় হয়েছে কি? সভায় গিয়ে তোমায় দেখি
জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব এ মোর নিবেদন॥

আপনার মতামত জানান