নিঃশেষে আনন্দ যে করেছে দান

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
হঠাৎ করেই যদি আমার ছোটবেলার কোনও ঘটনা বলতে বেশি, সে তো খুব বেশি পুরনো হবে না, বড় জোর দু’দশক আগের কথা। এই নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের ক’টা বছর হ’ল শৈশব, আর তারপরটা কৈশোর। সেই সময়, মানে যখন আমি ছোট... বইমেলায় গেলে দেখতাম আমার সব সমবয়সীদের হাতে প্লাস্টিকের প্যাকেটে কি বই রয়েছে। নিজে কি বই কিনি না কিনি, সে একদম পৃথক চিন্তা। কিন্তু এই লোকজনের হাতে দুলন্ত-ঝুলন্ত অর্ধস্বচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যাগে কি কি বইয়ের নামের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দেখার কৌতূহলটা থাকতই। একটা প্যাটার্ণ স্পষ্ট মনে পড়ে... দশ জনের মধ্যে ছ’জনের প্যাকেটে আভাস পেতাম ‘আবোল তাবোল’-এর, অথবা ‘হ য ব র ল’, অথবা ‘টুনটুনির গল্প’ অথবা ‘আবার বারো’, এরকম। এমন কোনও বইমেলা নেই যেখানে ছোটদের হাতে অথবা তাদের অভিভাবকদের হাতের ওই প্লাস্টিক ব্যাগে এই নামগুলো ফুটে উঠতে দেখিনি। একেবারে স্ট্যাটিস্টিক্স দিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া যায়, শিশু ও কিশোর সাহিত্যের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে যা আছে, অথবা যা জাজ্বল্যমান, তার জন্য ওই রায় (অথবা রায়চৌধুরী) পরিবারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ না থেকে উপায় নেই। তবে প্রসঙ্গ তা নয়। হঠাৎ সেই বইমেলার দিনগুলো মনে পড়ল, কারণ এখনও বইমেলায় যাই... দু’টো দশক কেটে গেছে, বইমেলার প্রাঙ্গন স্থানান্তরিত হয়েছে... পরিবর্তন তো অনেক ক্ষেত্রেই হয়, হয়েওছে। কিন্তু কেমন অদ্ভুত ভাবেই, সেই ছোট ছোট মুখগুলোকে আর বইমেলার ভিড়ে দেখতে পাই না। আমি সচেতন ভাবেই জানি, সমবয়সীদের ভিড়ে থেকেও সেই ছোটদের হাতের প্লাস্টিকগুলো আমার আজও দেখতে ভাল লাগে। তাদের সেই প্লাস্টিকে কোন নতুন বইয়ের আভাস, তা জানার কৌতূহল এখনও মরেনি। একটি বিশেষ প্রকাশনা সংস্থার বাইরে দূর্গাপুজোর মণ্ডপের মত লাইন পড়ে, সেইখানে কিছু অল্পবয়স্ক মুখ দেখি... তবে তাদের ঠিক শিশু, কিংবা বালক-বালিকা বলা চলে না, রীতিমত গোঁফ গজিয়ে গেছে। বইমেলা যেন ক্রমে একদিকে বিদ্বদ্‌জন, ভারী ভাব-গম্ভীর মুখ, গভীর চিন্তার ভাঁজ পড়া মুখ... আর একদিকে যুবক যুবতীদেরই বিচরণ ক্ষেত্র। একে কী বলব? ছোটদের দেওয়ার মত বাংলা সাহিত্যে আর কি নতুন কিছুই নেই? অথবা এত কিছু যে অমূল্য সম্পদ বাংলা শিশু ও কিশোরসাহিত্যে রয়েছে, তাও কি আর সেভাবে ছোটদের মাঝে পৌঁছবে না? জানি, একটা বইমেলা দিয়ে সামগ্রীকভাবে সবটা বিচার করা যায় না... কিন্তু ট্রেণ্ড, এতো আমাদেরই আনা শব্দ... এই ট্রেণ্ড অস্বীকার করি কি করে! বাংলা সাহিত্যের ছোট্ট পাঠক-পাঠিকাদের ভিড় কোথায় যেন আবার ম্লান হয়ে যেতে বসেছে... ঠিক সেই সময়ের মত, যখন দূর্গেশ নন্দিনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, মেঘনাদ বধ, ভানুসিংহের পদাবলী, প্রভৃতির মত উৎকৃষ্টতম রচনা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণ যুগ... কিন্তু ছোটদের (যদি তারা ইংরাজী জানে) বাবা-কাকাদের কাছ থেকে চেয়ে অলিভার টুইস্ট পড়তে হয়। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ধাত্রীদেবতাতেই দেখেছি, মুখ্যচরিত্র শিবনাথকে (যখন সে নিতান্তই বালক) তার মা পড়তে দিয়েছেন ‘আনন্দমঠ’ আর ‘আঙ্কল টম্‌স কেবিন’। আজকেও, যখন আমরা সাহিত্যে ‘গ্লোবালাইজেশন’-এর কথা বলি, মুক্তচিন্তা, বিবর্তন, ইজ্‌ম আর নিও-ইজ্‌ম তত্ত্বের প্রভাব... এত আলোচনা, এত যুক্তি-পালটা যুক্তি... বিশ্লেষণ। এসব কিছুর মাঝে, একটা বিশাল বড় একটা বিভাজন হাঁ করে রয়েছে... যার এক পারে আমরা সবাই প্রাপ্ত বয়স্করা। আর অন্য পারে ছোট্ট মুখগুলো অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ঠিক এমনই একটা পরিস্থিতিতে কেউ কেউ এই ক্রাইসিসটা আন্তরিক ভাবে অনুভব করেছিলেন... তাঁদের সীমিত শক্তি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, প্রচেষ্টার ত্রুটি ছিল না, আর ছিল না বলেই সেদিন যে বীজ বপন হয়েছিল, তা বেড়ে মহীরূহ হয়েছে। পরবর্তী একশ বছর (কিংবা তারও বেশি) সেই মহীরূহর ছায়া, ফুল, ফল সব পেয়েছে... সেই গাছের ডালে লাফালাফি করে, সেই ডালে দোলনা ঝুলিয়ে দোল খেয়ে কেটেছে এত এত বাঙালির শৈশব... সদ্য ফোটা চোখগুলো স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, চিনতে শিখেছে জগৎ তাদের মতন করে। বর্তমানে, এই বিভাজনের বড় হাঁ-টাই আরও বেশি করে তাঁদের অভাববোধটা জাগিয়ে তোলে। অনুভব করি, ওনাদের প্রয়োজন এখনও আছে, ভীষণ ভাবে আছে। তাঁদের মত আবার কেউ যদি নাও আসেন, অন্ততঃ তাদের সেই চেষ্টার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের সব কিছু এই ছোট্ট সবুজ মনগুলোর সামনে এই দুর্দিনে আবার করে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নেওয়া খুব প্রয়োজন।

যদি সেই সময়ে আরও একবার ফিরে যাই, যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, শুধু সমাজ নয় বাংলা সাহিত্যের একটা নবজাগরণ ঘটছে, এক একজন নক্ষত্রসম সাহিত্যিক এক এক করে আত্মপ্রকাশ করছেন। একাধিক সাহিত্য-পত্রিকা কলকাতা এবং কলকাতার বাইরেও বাঙালি পাঠকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করছে – তাহ’লে দেখতে পাবো সেই সময়ের মধ্যেও কেউ কেউ এমনই একটা ক্রাইসিস অনুভব করেছিলেন। সে ক্রাইসিস কেবলমাত্র শিশুসাহিত্যের নয়, ছোটছোট ছেলে মেয়েদের আনন্দ দিতে পারে, মুখে হাসি ফোটাতে পারে এমন পত্রিকারও অভাব। শিশুসাহিত্যই যদি সেই ভাবে চর্চিত না হয়, তাহ’লে পত্রিকাই বা চলবে কি করে? সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে কেশবচন্দ্র সেন প্রকাশ করলেন ‘বালক বন্ধু’, এবং পরবর্তীকালে এলো প্রমদাচরণ সেন সম্পাদিত ‘সখা’ (এ ছাড়াও সমসাময়িক আরও কিছু পত্রিকা প্রকাশ হয়ে থাকতেই পারে, কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি)। এই ‘বালক বন্ধু’ এবং ‘সখা’ নামের পত্রিকা দু’টি শিশু এবং কিশোর পাঠকদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিল। সেই সময় ছোট ছিলেন, এমন অনেকেই পরবর্তীকালে এই দুই পত্রিকার প্রতি নিজেদের ভাললাগা এবং ভালবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। এই ‘সখা’ পত্রিকার জন্য প্রমদাচরণ সেন প্রায় একাই হাল ধরে সব কিছু করতেন। সেই সময়, যাকে বাংলা বই সম্পাদনা এবং প্রকাশনার বাল্যকালও বলা যায়, একাই এণ্টারপ্রাইজ গড়ে তুলেছেন। একাধিক বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের থেকে লেখা জোগাড়-এর চেষ্টাই শুধু নয়, নিজেই পত্রিকার জন্য আঁকা, লেখা, বিপনন সব সামলাতেন। এরপর ওনারই প্রয়াশে একে একে প্রকাশিত হতে থাকে ‘সাথী’, ‘সখা ও সাথী’, ‘মুকুল’, এমন কিছু মাসিক পত্রিকা। তার অনেক পরে ঠাকুর বাড়ি থেকে বেশ কিছু ছোটদের সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা মধ্যে ‘দেয়ালা’-র নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ঠাকুর বাড়ির পত্রিকা সাধারণ পাঠক-পাঠিকার কতটা নাগালের মধ্যে থাকত, তা নিয়ে একটু সন্দেহ প্রকাশ না করে পারছি না। তার সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও, জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় (কারণে ঠাকুরবাড়ি মানেই ছিল হাই-সোসাইটি)। এখানে একটা জিনিস নজর এড়ায় না, তা হ’ল কেশব সেন এবং প্রমদাচরণ দু’জনেই ব্রাহ্ম। বঙ্গীয় সমাজ সংস্কারে ব্রতী ব্রাহ্ম বিদ্বদ্‌জনেরা যে সেই সময় না না বিষয়ে একটা নতুন কিছুর সূত্রপাত ঘটানোর গুরু দায়িত্ব পালন করতেন, এ সত্য অনস্বীকার্য। নবজাগরণের অনেকটাই এই স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর হাত ধরে। আর প্রমদাচরণ প্রকাশিত ‘সখা’ এবং অন্যান্য মাসিক পত্রিকারগুলির সঙ্গেই আরও একজন নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, যিনি পরবর্তীকালে স্বয়ং শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন। এবং আজও আমাদের সকলের কাছে নমঃস্ব, তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কারণে। তাঁর নিজের সম্পাদিত ছোটদের সাহিত্য পত্রিকাটি জনপ্রিয়তা এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমন লেগাসি সৃষ্টি করেছিল, যে অন্য সব শিশু পত্রিকার থেকে বেশি আপন হয়ে উঠেছিল ছোটদের কাছে। তাঁর নিজের জীবন ছোটবেলা থেকেই, তারই রচিত গল্পগুলোর মত আকর্ষনীয় কিংবা বলা চলে কৌতূহলোদ্দীপক। ঠিক সেইরকমই সাহিত্যজগতে আসার পর তাঁর শিল্প এবং বিজ্ঞান চর্চায় বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। আর অদ্ভুত ভাবেই বাঙালির সাংস্কৃতিক গৌরবের একটি কালজয়ী প্রজন্মের উনিই জনক, আক্ষরিক অর্থে... যাকে বলে ‘ফাদার ফিগার’। শিশু সাহিত্য অথবা সাংস্কৃতিক চিন্তার বিকাশ, যাই বলি, সেই ‘ফাদার ফিগার’-এর উল্লেখ না করলে বা তাঁকে স্মরণ না করলে সব কিছুই অধরা থেকে যায়। যার উল্লেখ করতে গিয়ে ওনার একাধিক গুণগ্রাহীর মুখে দু’টি বিশেষণ বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে – ‘উজ্জ্বল চক্ষু’, ‘প্রফুল্ল হাস্যমুখ’। আর একটি বৈশিষ্ট বোধহয় ট্রেডমার্ক – “দীর্ঘ শ্মশ্রু”। ইনি শ্রী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছাড়া আর কেই বা হ’তে পারেন?! গত বছর এই বিশিষ্ট ব্যক্তিটিরও সার্ধশতবর্ষ ছিল। প্রতিমুহূর্তে মানুষকে নিজের কাজে তাক লাগিয়ে দেওয়া মানুষ্টি, নীরবে সাধনা করার মত নিজের কাজ করে গেছিলেন। এমন কি দেড়শোতম জন্মদিনের বছরটাও সে অর্থে আড়ম্বরহীনই কেটে গেল। ভাগ্যিস... না হ’লে দেড়শো জন দাড়িওয়ালা উপেন্দ্রকিশোরকে দেখে ওনার রচিত কোনও চরিত্রের মতই হয়ত সূক্ষ্ম শরীরে হো হো করে হেসে উঠে বলতেন ‘রাজা তোর নাক কাটা!’

প্রকৃতপক্ষে, একজন শিশু যখন বড় হয়, সেই সময় তার অভিভাবকদের, তার আশেপাশের অন্য বয়জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের বলা কথা, কাজ... এই সব কিছু থেকেই চেতন-অবচেতনে শিখতে শিখতে বড় হয়। তার পরিবারে, তার আশেপাশে যা কিছু ক্রমাগত ঘটে চলছে, তার একটা ছাপ তার মস্তিষ্কে থাকবেই। আগে এইটি, তারপর বয়সের সাথে ক্রমে ঠিল-ভুল বিবেচনার নিজেস্ব ক্ষমতা। আর সে ক্ষমতাও বহুক্ষেত্রেই ওই যে অবচেতনে থাকা আশেপাশের সব কিছু থেকে শেখা, সেই বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে, ওটাই স্বাভাবিক। ঠিক সেইরকম, আমাদের আশেপাশে যা কিছু বহুচর্চিত, সশ্রদ্ধ-অর্চিত সেই সবই আমাদের মনে বিশেষ করে জায়গা করে নেয়। রবি ঠাকুর, স্বামীজী, নেতাজী... এই নামগুলো শুনলে আমরা চটপট পাঁচটা লাইন বলে দিতে পারব... ক্লাস ওয়ানের হাফ-পেণ্টুল ছেলেটি থেকে শুরু করে আশি বছরের কাশীনাথ, বাজারের গৌর মুদি থেকে অ্যাকাডেমিতে সেমিনার করা বিদ্বদ্‌জনেরা... এ এক বিস্তৃত মনঃসামাজিক সাম্রাজ্যের মত। অথচ এরপরে যখন আরও কিছু নাম আসতে শুরু করবে, দেখা যাবে অনেকেরই নামটা চেনা লাগলেও বিশেষ কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁদের জীবদ্দশায় বেশ কিছু বলার মত কীর্তি রেখে গেছেন, রীতিমত সম্মানীয়... অথচ কেমন যেন বিস্মৃত। নাম জানি, ঠিক কী কারণে নামটা মনে আছে তাও জানি... কিন্তু পাঁচটা লাইন চট করে কিছুতেই বলতে পারছি না সে ভাবে। বাজি ধরে বলতে পারি, এই প্রজন্মের সাধারণ বাঙালিদের সামনে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ঠিক সেই ভাবেই বিস্মৃত একটি নাম। এমন এক ক্ষণজন্মা বহুমুখী প্রতিভা সম্বন্ধে বিস্তারে কতটুকুই বা জানতে পেরেছি আমরা? পথচলতি কাউকে হঠাৎ করে ওনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে ঠিক কী বলবেন সেই মানুষটি? –
ছোটদের জন্য লিখতেন। ছোটবেলা ওনার লেখা টুনটুনির গল্প, আরও কিছু পড়েছি।
সুকুমার রায়ের পিতা, সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ।
আর খুব যদি ওয়াকিবহাল হন, তা হ’লে বলতে পারেন ওনার প্রিন্টিং প্রেস এবং সন্দেশ পত্রিকার কথা। কিন্ত এর বাইরেও যে অনেক অনেক কিছু থেকে যায়! যারা সময় করে উপেন্দ্রকিশোর সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেছেন, আগ্রহী তাঁরা নিশ্চয় জানবেন। কিন্তু তাঁরা সমাজের শতকরা কতজন? উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর নামে তো আর ঘটা করে উপেন্দ্রকিশোর জয়ন্তী পালন হয় না, উপেন্দ্রসন্ধ্যা করে কবিতা-গান-নাটক হয় না, তাঁর সৃষ্ট সব কিছু নিয়ে শীততাপ নিয়োন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহে আলোচনা সভাও হয় না। প্রতিষ্ঠানগত অথবা সংস্থাগত ভাবে ওনার নামের ব্যানার তুলে ওনার নাম জিইয়ে রাখারও কেউ নেই। খুবই সাধারণ সস্তা উদাহরণ, কারও গালে একটু বেশি দাড়ী গজিয়ে উঠলে, বক্রোক্তিটা আসে রবীন্দ্রনাথ বা রামকৃষ্ণ-র নামে; নিদেনপক্ষে “কি র‍্যা, উপেন্দ্রকিশোরের মত দাড়ী রেকে চললি কোতায়?’, এমন আওয়াজও কেউ দেয় না! আলোচিত নন, সেই অর্থে চর্চিতও নন... শুধু প্রতিভাবান তো নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং অসামান্য ব্যক্তিত্বর এই মানুষটি তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পরে যে বিস্মৃতই এ কথা, খুব ভারী মন নিয়েও, স্বীকার না করে উপায় নেই। লেখক উপেন্দ্রকিশোর, কবি উপেন্দ্রকিশোর, চিত্রকর উপেন্দ্রকিশোর, ইলাস্ট্রেটর উপেন্দ্রকিশোর, অনুবাদক উপেন্দ্রকিশোর, সমাজ-সংস্কারক উপেন্দ্রকিশোর, সঙ্গীতকার উপেন্দ্রকিশোর, বেহালা-বাদক উপেন্দ্রকিশোর, ব্যবসায়ী উপেন্দ্রকিশোর, প্রিন্টিং টেকনোলজির পাইওনিয়ার এবং হাফটোন প্রিন্টিং-এর জনক উপেন্দ্রকিশোর এবং সব কিছুর ঊর্দ্ধে স্বর্ণ-হৃদয় মানুষ উপেন্দ্রকিশোর... এই তালিকা যে আরও কত লম্বা হতে পারত তা ওনার রেখে যাওয়া কাজ থেক অনুমান করতে পারি, কিন্তু সেই সম্বন্ধে রেখে যাওয়া তথ্য আর পাই কোথায়? ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোর এবং তাঁর বিবিধ দিক চেনার আর উপায় কি? কবি জন কিট্‌সের পঁচিশ বছর এবং কয়েক মাসের স্বল্প পরিশরের জীবনেও, ওনার লেখা কবিতার বাইরে, কিছু পত্র, ব্যক্তিগত লেখা এবং সেই ব্যক্তি জন কিট্‌সকে যাতে পরবর্তী প্রজন্ম চিনতে পারে, তার জন্য কিট্‌স সম্বন্ধীয় বেশ কিছু তথ্য সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অথচ উপেন্দ্রকিশোর রচনাবলী (যার সিংহভাগ ছোটদের জন্য রচিত ওনার লেখার সংকলন) ছাড়া ওনাকে নিয়ে ক’টা বই চাইলেই পাওয়া যায়? ওনার লেখা পত্রের সংকলন পত্রাবলী আকারে কি পাওয়া যায়? ...যার থেকে ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোর আর ওনার সমকালকে চেনার চেষ্টা করা যায়? যায় না। সেই অর্থে ওনার সম্বন্ধে সবিস্তারে কিছুই সাধারণের কাছে পৌঁছয়নি। ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোর কে চেনার উপায় হয়ে রয়েছে কেবল ওনার পরিবারের আপনজনদের স্মৃতিচারণা এবং বিশিষ্ট পরিচিতদের রোমন্থন কিংবা শ্রদ্ধাঞ্জলি। এর বাইরে বিশেষ কিছুই সাধারণের হাতে নেই, তাই ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরকে চেনাও কেবল ওনার সন্তান-সন্ততি এবং পরিচিতদের চোখ দিয়েই।


কোনও এক কালে, ময়মনসিংহতে

উপেন্দ্রকিশোরের গোড়ার কথা যে ভাবে জানতে পারি, সেও বেশ আগ্রহ উদ্দীপক, ঠিক ওনার লেখার ‘সেকালের কথা’-র মতই। একদিকে যেমন বলা চলে রায়চৌধুরীদের আদি নিবাস পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত মসূয়া গ্রাম। সেরকম আর একদিকে বলা যেতে পারে ওনারা রায় বা রায়চৌধুরী অনেক পরে, সত্যি বলতে প্রকৃত পক্ষে আদিতে হয়ত বাঙালিই ছিলেন না! তথ্যসূত্রে জানা যায় এই রায়চৌধুরী পরিবারের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বিহার রাজ্যে। তাঁদের পদবী ছিল দেও (বাঙালিকরণে দেব)। তারপর সেই অস্থির সময়ে, মুঘোল-মারাঠা-নবাবদের অন্তর্দ্বন্দ, সাম্রাজ্যের ওঠা পড়ার মাঝে সেই দেও পরিবার ভাগ্যের সন্ধানে নদীয়া জেলার চাকদহতে চলে আসেন। এবং পরবর্তীকালে সেখান থেকে তাঁরা ময়মনসিংহে স্থানান্তরিত হ’ন। ময়মনসিংহের শেরপুরে জমিদারের সেরেস্তায় কাজ নেন সেই পরিবারেরই রামসুন্দর দেব। তারপর সেই জমিদারীতে কাজ করতে করতেই কালক্রমে একের পর এক উপাধী লাভ- খাসনবীশ, মজুমদার, রায়, রায়চৌধুরী। উপেন্দ্রকিশোরকেও রায়চৌধুরী পদবীতে চিনেছি আমরা। এই রায়চৌধুরী পদবী বেশ কয়েক প্রজন্মের জন্য থাকলেও, উপেন্দ্রকিশোরের পরবর্তী প্রজন্ম (একদম ওনার পুত্রদের সময় থেকেই) রায় পদবীটাই রেখে দিলেন। সমস্ত পরিবারটিই যেন একটা কিংবদন্তী, এক একটি নামের সঙ্গে এক একটি গল্প জুড়ে আছে। যাঁরা সুকুমার রায় এবং সত্যজিৎ রায়ের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিভার কথা বহুমুখে শুনেছেন, তাঁদের জন্য উপেন্দ্রকিশোরের পূর্বজদের কিছু টুকরো কাহিনী রাখাই যেতে পারে। উপেন্দ্র-পুত্র সুবিমল রায়ের স্মৃতিচারণা থেকে পাই “উপেন্দ্রকিশোরের প্রপিতামহ (অর্থাৎ ঠাকুরদাদার বাবা) রামকান্ত রায় বা রামকান্ত মজুমদার বাংলা, সংস্কৃত, আরবী আর পারসী ভাষায় খুব পণ্ডিত ছিলেন... শোনা যায়, ইনি সকালে স্নানের পরে জলযোগে ধামা-ভরা খই একটা আস্ত কাঁঠাল খেতেন। গান গাইতে আর খোল বাজিয়ে কীর্তন করতে ভালবাসতেন।” এই রামকান্ত রায়ের দ্বিতীয় পুত্র লোকনাথ রায়, ছিলেন বাবার মতই নানা ভাষায় পারদর্শী, এমন কি গণিতশাস্ত্রেও তুখর। বাবার মতই এনাকেও খোল বাজিয়ে গান করতে শোনা যেত দরাজ কণ্ঠে। কিন্তু এনার মধ্যে একটা সময়ের পর থেকে আধ্যাত্মিক দিকে আকর্ষিত হওয়ার মনোভাব দেখা যায়। শ্মশানে গিয়ে জপ করতেন, যোগ সাধনা করতেন। ওনার সংসার ছিল, এক পুত্রও ছিল। কিন্তু পুত্র জন্মানোর পর উনি আরও বেশি ভাবে সংসার বিমুখ হয়ে পড়েন। এবং অবশেষে এই জপ-তপ উপোস করতে করতে শরীর ক্ষয় করে দেগত্যাগ করেন। লোকনাথ রায়ের সেই সবেধন নীলমণি একটি মাত্র পুত্র কালীনাথ রায় না থাকলে আজ এই গৌরবময় হেরিটেজ আমরা কি পেতাম? অবশ্য এই কালীনাথ রায় ‘শ্যামসুন্দর মুন্সী’ নামেই বেশি পরিচিত। কালীনাথ রায় ওরফে শ্যামসুন্দর মুন্সী সম্বন্ধে ওনার পৌত্র সুকুমার রায়ের জবানীতে জানা যায় – “সংস্কৃত ও পারশীভাষায় তাঁহার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল। প্রাত্যহিক দেবার্চ্চনাদিতে তিনি স্বরচিত স্তোত্রাদি ব্যবহার করিতেন। তাঁহার কাব্যকুশলতার যে সকল পরিচয় তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন, দৈব দুর্ব্বিপাকে তাহার সমস্থ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। কায়স্থ হইয়াও তিনি ব্রাহ্মণের বিচার-সভায় মধ্যস্থের আসন লাভ করিতেন।” মসূয়ার এই প্রভাবশালী শ্যামসুন্দর মুন্সীর পাঁচ পুত্রের মধ্যে যিনি দ্বিতীয়, সেই কামদারঞ্জন রায়কেই (বা মজুমদারও বলা চলে) আমরা পরবর্তীকালে চিনেছি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী নামে। এই কামদারঞ্জনের উপেন্দ্রকিশোর হয়ে ওঠাও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা! সেই সময় রাজবংশে অথবা জমিদার বংশে নিঃসন্তান রাজা বা জমিদার বংশ রক্ষার্থে দত্তক পুত্র গ্রহণ করতেন। কোনও নিকট আত্মীয়ের ছেলেই পরবর্তীকালে সেই বংশের একজন হয়ে উত্তরধিকার লাভ করত। শোভাবাজার রাজবাড়ীর দেব পরিবারেই এমন ঘটনার নজির আছে। ঠিক সেরকমই শ্যামসুন্দর মুন্সীর মেজো ছেলেটিকে দত্তক নিয়েছিলেন ওনাদের নিকট আত্মীয় হরিকিশোর রায়চৌধুরী। হরিকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন মসূয়ার প্রসিদ্ধ জমিদার, বেশ কেউকেটা ব্যক্তি, রীতিমত প্রভাবশালী মানুষ। একাধিক কন্যা সন্তান থাকলেও, কোনও ছেলে ছিলনা জমিদারের। এত বড় সম্পত্তি কার হাতে রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুঁজবেন, এই চিন্তায় চিন্তায় শেষে জ্ঞাতি শ্যামসুন্দর রায়ের মেজো ছেলেটিকে চেয়ে নিলেন; নিজের পুত্র এবং উত্তরধিকার হিসেবেই তাকে বড় করবেন বলে। নিজের নামের সঙ্গেই নাম মিলিয়ে কামদারঞ্জনের নাম পালটে নাম রাখলে উপেন্দ্রকিশোর। জমিদার হরিকিশোরের দত্তকপুত্র, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী! অথচ, মজার কথা এই দত্তক নেওয়ার সাত বছর পরেই জমিদার গিন্নীর ফুটফুটে একটি ছেলে হ’ল। জমিদার হরিকিশোরের নিজের ছেলে নরেন্দ্রকিশোর। অবশ্য জমিদার কোনওদিনও দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ রাখতেন না। আর পরবর্তীকালে এই দুই ভাইয়ের মধ্যেও বেশ সদ্ভাব ছিল বলেই জানা যায়। মসূয়া জমিদারীর উত্তরাধিকারী উপেন্দ্রকিশোরের হওয়া হয়নি, জমিদার ছিলেন নরেন্দ্রকিশোরই। এমন কি উপেন্দ্রকিশোরের ভাগের সম্পত্তিরও তিনিই দেখাশুনো করতেন। ভাইদের মধ্যে সদ্ভাব থাকার জন্যে হোক, অথবা উপেন্দ্রকিশোরের নিজের পরিবার থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দরাজ মানসিকতাই হোক, নিজের অংশের জমিদারী দেখার দায়িত্ব নরেন্দ্রকিশোরের হাতে নিশ্চিন্ত ভাবে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিয়ে তিনি কোনওদিনই অনুশোচনা করেননি।


ব্রাহ্ম সমাজ করে আহ্বান, নবজাগরণ

ব্রাহ্ম হওয়া মানেই এক বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। গোঁড়া হিন্দুত্ববাদ, ব্রাহ্মণ-উচ্চবর্ণের অন্ধসংস্কার বা মোড়লগিড়ির বিরুদ্ধে একটা দৃপ্ত প্রতিবাদ করে নিজের একটা সোশ্যাল স্ট্যান্ড নেওয়ার পদক্ষেপ – “ঈশ্বরে বিশ্বাসী আমিও, কিন্তু তোমাদের মত অন্ধকারে পড়ে থাকতে চাই না।” সেই বিদ্রোহ বীজ উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যেও ছিল, আর তাও উত্তরাধিকারসূত্রেই পাওয়া। উপেন্দ্রকিশোরের পিতা কালীনাথ রায় ছিলেন কিশোরগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছারিতে সেরেস্তাদারের পদে। সেই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছারিতে কাজ করা মানে এমনিতেই বেশ সম্মানের জীবিকা। হয়ত সেই জীবিকা থেকেই মুন্সী শব্দটা নামের সঙ্গে জুড়ে গেছিল। তার ওপর নিজের পাণ্ডিত্য এবং ব্যক্তিত্বের কারণে হিন্দু-মুসোলমান নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। একদিকে শাস্ত্র তর্কের মাঝেও বিচার-সভায় ওনার ডাক পড়ত, অন্যদিকে আরবী-পারসী দলিল-ফরমানের মর্মোদ্ধার করতে মুসলমান সমাজেরও অনেকে ওনার দ্বারস্থ হতেন। বোঝাই যায়, রীতিমত প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন এই শ্যামসুন্দর মুন্সী। সুকুমার রায় একটি ঘটনার উল্লেখ করে ওনার ‘ডোণ্ট-কেয়ার’ চরিত্রের নমুনা এই ভাবে রেখে গেছেন – “একবার বিধবাবিবাহ সম্পর্কে - জাতিচ্যুত কোন দরিদ্রের গৃহে তিনি নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার আত্মীয়স্বজন ও সমাজহিতৈষীগণ কর্তৃক নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করিবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ হইয়াও তিনি সমাজের বাধা নিষেধ ও শাসন অনুশাসনাদি উপেক্ষা করিয়া নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। বলা বাহুল্য “মুন্সী শ্যামসুন্দর”কে জাতিচ্যুত করিতে কাহারও সাহসে কুলায় নাই।” এইখান থেকেই বোঝা যায়, যারা এমন মুক্তচিন্তার মানুষের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছে, তাদের মনেও সেই প্রভাব পড়বে বই কি? তারাও সমাজের গোঁড়ামি প্রতিবাদ কোনও না কোনও সময় না করে কি থাকতে পারবে? পারেন নি? পাঁচ জন পুত্রের সকলেই ছিলেন কোনও না কোনও ভাবের স্বমহিমায় মৌলিক চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয় পুত্র কামদারঞ্জন ওরফে উপেন্দ্রকিশোর ময়মনসিংহতে থাকা কালীনই ব্রাহ্মধর্মীয়দের সান্নিধ্য লাভ করেন। শরৎচন্দ্র রায় ময়মনসিংহের প্রধাণ ব্রাহ্মদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, ওনার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল হিন্দুসমাজের নেতা হরিকিশোর রায়ের পুত্র উপেন্দ্রকিশোরকে ব্রাহ্মসমাজে অন্তর্ভুক্ত করা। এই সময়ের উল্লেখ করে সুকুমার রায় সরাসরি বলেছেন, এই উপেন্দ্রকিশোরকে ব্রাহ্মসমাজে নিয়ে আসার জন্যই শরৎচন্দ্র আরও বেশি করে উপেন্দ্রকে নিজের প্রিয় ছাত্র হিসেবে কাছে টেনে নেন। আর এক ব্রাহ্ম ছাত্র গগনচন্দ্র হোমকে উপেন্দ্রকিশোরের সাথে সাথে থাকতে বলেন। সুকুমার রায় যখন এই কথা বলছেন, নিঃসন্দেহে এ উপেন্দ্রকিশোরেরই নিজস্ব উপলব্ধি যা তিনি কোনও সময় ছেলেকে জানিয়েছিলেন। আর অপর পুত্র সুবিমল রায় তো আরও সরাসরি বলেছেন, “হরিকিশোর প্রাচীন ধরনের নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। গগনচন্দ্র হোমের সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের মেশা তিনি পছন্দ করতেন না। তাই তিনি তাঁর ছেলের উপরে সতর্ক দৃষ্টি রাখলেন। উপেন্দ্রকিশোর কিন্তু ব্রাহ্মধর্মের মধ্যে এমন একটা আলো দেখেছিলেন, যার কথা তিনি ভুলতে পারলেন না। তিনি হরিকিশোরকে না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গগনচন্দ্রের সঙ্গে মিশতে লাগলেন।” স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই সময় তো আর সুবিমল রায় উপস্থিত ছিলেন না, এ উপেন্দ্রকিশোরের নিজের স্মৃতির রোমন্থন, যা পরিবারের সঙ্গে উনি আলোচনা করতেন, পিতা-পুত্র আন্তরিক মুহূর্তে। ভিতটা ওই মসূয়াতেই স্থাপন হয়ে গেছিল; পরবর্তীকালে কলকাতায় পড়তে এসেই উপেন্দ্রকিশোর ব্রাহ্মধর্মীয়দের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন।

১৮৮৩ সালে যখন তিনি সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে বসবাস করেন, সেই সময় তাঁর আলাপ হয় হেমেন্দ্রমোহন বসু, প্রমদাচরণ সেন, প্রমুখের সঙ্গে। উত্তর কলকাতার সে অঞ্চল তখন ব্রাহ্মদের গড়। কেশব সেনের মত স্টলওয়ার্টের নিত্য যাতায়াত। উপেন্দ্রকিশোরের পরিচয় হ’ল দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে, ইনিও এক প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক এবং অবশ্যই... ব্রাহ্ম। হরিকিশোর এবং শ্যামসুন্দরের অবর্তমানে এই দ্বারকানাথবাবুই উপেন্দ্রকিশোরের অন্যতম অভিভাবক হয়ে ওঠেন। আর ওনার বড়দাদা সারদারঞ্জন যে তা খুব একটা ভাল ভাবে গ্রহণ করতেন না, এ কথা আন্দাজ করতে খুব একটা অসুবিধে হওয়ারও কারণ নেই। এই দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী ওরফে দ্বারিকবাবু ভীষণ প্রভাবশালী এবং প্রবল ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। ব্রাহ্ম সমাজে এবং পুরনো কলকাতায় ওনার গল্পও কম ছড়িয়ে নেই। নারীশিক্ষা এবং সমাজে নারীর ভূমিকাকে আরও উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বকে উনি নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এবং তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ ওনার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কাদম্বিনী দেবীর প্রথম বাঙালি ডাক্তার হয়ে ওঠা। তাই মেজো ভাইটির মাথা যে এই ব্যক্তি খেয়েই ছাড়বে, রক্ষণশীল সারদারঞ্জনের এই ভীতির কারণ বোঝা কষ্টকর নয়। দাদার এই ভীতি উপেক্ষা করেই উপেন্দ্রকিশোর তাঁর আদর্শদের সান্নিধ্যে এলেন... দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, শিবনাথ শাস্ত্রী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর... একের পর এক। এবং অবশেষে ১৮৮৫ সালে এই দ্বারকানাথেরই প্রথম পক্ষের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের বিয়ে হয়। উপেন্দ্রকিশোর ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন, সম্পূর্ণ ব্রাহ্মমতে, এবং নিজেও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হ’লেন। এর পর কি হ’ল তা লীলা মজুমদার বেশ গুছিয়ে বলেছেন – “উপেন্দ্রকিশোর ব্রাহ্মকন্যাকে বিয়ে করেছেন এবং নিজেও ব্রাহ্মমতে দীক্ষা নিয়েছেন শুনে সারদারঞ্জন খুবই রুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, ‘ওর বাড়ি থেকে একটুকরো কাগজও যেন কখনো এ বাড়িতে না আসে।’ তাঁর মা জয়তারা কী ভেবেছিলেন তা জানা যায়নি। তবে শ্যামসুন্দর বেঁচে থাকলে তিনি যে তাঁর উদার হৃদয়ে এটা মেনে নিতেন না সে সম্পর্কে অন্যান্য আত্মীয়রা নিশ্চিত ছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে হরিকিশোর খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি উপেন্দ্রকিশোরকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন নি। যা সেসময় খুবই সাধারণ ঘটনা ছিল। নরেন্দ্রকিশোর কোনদিন তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাননি, এটাই হরিকিশোরের সান্ত্বনা ছিল। এরপর তিনি বাঁচেনও নি বেশিদিন।”
যদিও এক জায়গায় সুবিমল রায় বলছেন, ১৮৮৪ সালে উপেন্দ্রকিশোর বিএ পাশ করার আগেই হরিকিশোর এবং শ্যামসুন্দর ইহলোক ত্যাগ করেন; সেখানে ১৮৮৫ তে উপেন্দ্রকিশোরের বিবাহের পর হরিকিশোরের হতাশার উল্লেখ শুনে কেমন একটা তথ্যগত সংঘাত মনে হয়। তবে এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না যে দু’টি পরিবার থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের এই ব্রাহ্মধর্মীয় হয়ে ওঠার বিদ্রোহকে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল। এবং রীতিমত ফাঁপরে পড়া জামাতা উপেন্দ্রকিশোরের কাছে সেই সময় প্রভাবশালী শ্বশুর দ্বারকানাথই ছিলেন ত্রাতা।

তবে এই ব্রাহ্মসমাজের সান্নিধ্যই উপেন্দ্রকিশোরের বহুমুখী প্রতিভার এক একটি পাপড়ি একে একে প্রস্ফুটিত হ’তে সাহায্য করে। প্রমদাচরণ সেন দ্বারা সম্পাদিত ‘সখা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতেই শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোরের প্রথম আত্মপ্রকাশ। আগেই বলেছি প্রমদাচরণ সেন একজন বিশিষ্ঠ ব্রাহ্ম ছিলেন সেই সময়। ক্রমে এই শিশু-কিশোরদের জন্যই তিনি পত্রিকাগুলিতে ইলাস্ট্রেশনও করতে শুরু করেন। ব্রাহ্মসমাজের অধিবেশনে ব্রাহ্ম সংগীতের সময় তিনি বেহালার সঙ্গত করতেন। এমন কি তাঁর রচিত ব্রাহ্ম সংগীতও গাওয়া হ’ত। এবং কিছু পরে ব্রাহ্ম ধর্মের জন্য লিখিত বিভিন্ন সাহিত্যিকের পুস্তক মূদ্রণের দায়িত্ব গ্রহন করেন। লীলা মজুমদারের লেখা থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তৎকালীন অন্যান্য বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মাঝে, প্রায় সকলেই উপলব্ধি করেছিলেন, যুবক উপেন্দ্রকিশোর নিজেও এমন একজন বুদ্ধিজীবী যার মধ্যে যুবক রবীন্দ্রনাথ (নরেন্দ্রনাথও নয় কি?) সহ সমস্ত সৃষ্টিশীল শিল্পীর মত একটা বাস্তবতা এবং মননশীলতার দিক ভীষণ ভাবে চোখে পড়ে। তার সঙ্গে ফুটে উঠেছে সমাজচিন্তায় আত্মনিয়োজিত উপেন্দ্রকিশোরের আরও একটা দিক – “তিনি বিশ্বাস করতেন যে মেয়েদের শিক্ষার দরকার। এই কারণে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। বিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েদের জন্য তিনি নাটিকা ও গান রচনা করেছেন এবং নিজে তাদের নিয়ে মহড়া দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে চরিত্রগঠনের জন্য নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিহার্য, তাই ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত রবিবারের স্কুলকে নানাভাবে সাহায্য করতেন।” অতএব বোঝাই যায়, ১৮৮০-র গোড়ার দিকে, এক দিকে কেশবচন্দ্র সেন নামক ব্রাহ্ম কেশরীর প্রতাপ আর একদিক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিত্বর জন্য হঠাৎ করেই যে একই সঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম এবং নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল, তাতে উপেন্দ্রকিশোর শুধু ভীষণভাবে প্রভাবিতই হননি, স্বক্রিয় ভাবে অংশগ্রহনও করেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার এক একটি দিক এই ব্রাহ্মসমাজের ভেতরেই সবার আগে বিচ্ছুরিত হ’তে থাকে।


জগৎ শুধু বিচিত্রই নয় সংগীতময়ও বটে

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শিল্পী সত্তার বিকাশ ছোটবেলা থেকেই। সুকুমার রায় ওনার শৈশবের প্রতিভার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলছেন - “একবার সার এস্‌লি ইডেন স্কুল পরিদর্শনের কালে তাঁহার খাতায় দৈবাৎ আপনার প্রতিকৃতি দেখিয়া তরুণ শিল্পীকে বিশেষ উৎসাহিত করিয়া বলেন, “তুমি ইহারই চর্চ্চায় আপনাকে নিযুক্ত রাখিও।” এর পরবর্তীকালে তিনি যে এই চিত্রশিল্প অধ্যায়ন কে সাধনার পর্যায় নিয়ে গেছিলেন, চিত্রশিল্পের একাধিক আঙ্গিকে তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তিই সেই অধ্যাবসায়ের শাক্ষ হয়ে আছে। কলকাতায় প্লেগ মহামারির সময়ে সপরিবারে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী চুনারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেই সময় আঁকা চুনার দূর্গের একটি চিত্র তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপহার দেন। যতীন্দ্রনাথ বসুও উল্লেখ করে গেছেন জমিদার রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের বাড়িতে উপেন্দ্রকিশোরের সাক্ষরযুক্ত সেই চিত্র তিনি দেখেছিলেন। পুত্র সুবিমল রায় পিতার শিল্পচর্চার কথা স্মরণ করে বলেছেন, “বাবা তখন কী ছবি আঁকতেন তা অত অল্প বয়সে বুঝতাম না, কিন্তু ছবি আঁকার রঙগুলোর কথা আমার আজ পর্যন্ত মনে পড়ে। লাল, নীল, হলদে, সবুজ, নানারকম রঙ দেখে বড় খুশী হতাম... বাবা যখন সুন্দর সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যেতেন, ছবি আঁকার জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে যেতেন। দার্জিলিঙের পাহাড়, পুরীর সমুদ্র, গিরিডির শালবন, এইরকম কত ভাল ভাল দৃশ্যের অদ্ভুত সুন্দর সব ছবি তিনি এঁকে গিয়েছেন।” এই সেন্স অফ আর্ট এর প্রয়োগ সাহিত্যপত্রিকা গুলিতে এবং ওনার সম্পাদিত পত্রিকা সন্দেশের পাতায় পাতায় একাধিক ইলাস্ট্রেশনস্‌-এর মধ্যে ফুটে উঠত। তাঁর কাজ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, উনিই সেই সকল সম্পাদকদের মধ্যে অগ্রণী যিনি অনুভব করেছিলেন, হাজার ভালো লেখা হলেও, উপযুক্ত ছবি ও ইলাস্ট্রেশন্‌স-এর মাধ্যমে পাঠকের মনে তা ছাপ না ফেললে, কোনও দিনও কৌতূহলী সবুজ মনগুলোর আগ্রহ জয় করা যাবে না। ওনার চিত্রশিল্প প্রসঙ্গের শেষ প্রতিফলন হিসেবে হয়ত এই অংশটিকে তুলে ধরা যেতে পারে – “ঠাকুরদাদার আঁকা সেসব ছবি বৈঠকখানার দেওয়ালে টাঙানো থাকত তার প্রতিটি তুলির টান আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। রামায়ণ মহাভারতের প্রধান চরিত্রগুলিকে ঠাকুরদাদা যে-রূপ দিয়েছিলেন, এখনও সেইরূপেই তাদের কল্পনা করতে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে... তাঁর কাঠের রঙের বাক্সে সযত্নে রক্ষিত রঙ ও তুলিগুলো ব্যবহার করার দুর্মতি আমার ছেলেবেলায় হয়েছিল।” এই প্রতিফলন কার মনে? তিনি ওনার পৌত্র শ্রী সত্যজিৎ রায়।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সঙ্গে সংগীত বা সুর শব্দটা জোড়া হলেই, সঙ্গে সঙ্গে ওনার একটি চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে... উপেন্দ্রকিশোর গায়ে একটি শাল জড়িয়ে, হাতে বেহালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন (উনি বেহালা বাজাচ্ছেন এমন সময় হয়ত তাঁর খুব ঘনিষ্ট কেউ এই আলোকচিত্রটি তুলেছিলেন)। রায়চৌধুরী পরিবারে গান-বাজনার প্রচলন আগেই ছিল। উপেন্দ্রকিশোরের পূর্বজরা যে গান গাইতে ভালবাসতেন তার কথা একাধিক সূত্রে জানা যায়। সুতরাং, পরিবারে সংগীতচর্চা হচ্ছে, এমন পরিবেশে উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যেও যে সংগীতপ্রেমের সঞ্চার ঘটবে, তা বলাই বাহুল্য। বেহালা নামক বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি ওনার টান একদম ছোটবেলা থেকেই; তার সাথে বাঁশিও বাজাতে পারতেন। এই বেহালা বাজিয়ে সংগীতচর্চা, গান, ছবি আঁকার প্রতি আকর্ষণ এমন বেশি মাত্রায় চলে যায়, যে শিক্ষকরাও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান লেখাপড়ার প্রতি উপেন্দ্রকিশোরের আপাত অমনযোগীতা দেখে। শেষে স্কুলে রীতিমত প্রধান শিক্ষকের ধমক খেয়ে অনুতপ্ত হয়ে নিজের সখের বেহালা ভেঙেই ফেলেছিলেন। তবে সেই সংগীত-বিয়োগ সাময়িক। পরবর্তীকালে ভীষণভাবেই উনি সংগীত চর্চার জগতে ফিরে আসেন। নিজের পরিবারে ছোটদের সংগীত শিক্ষা প্রদান করতেন, নিজেও গান করতেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রদের অভিনীত নাটকের জন্য সংগীত রচনা করতেন। ছোটদের জন্য অনেক গান রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেই সব সৃষ্টি সেই ভাবে এখন আর প্রচলিত বা আলোচিত নয় কেন, কেনই বা তা ছোটদের মধ্যে নতুন করে ফিরিয়ে আনা হয় না? এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর ভেবে পাই না। সেই সকল গানের সংরক্ষণ কি ভাবে হয়েছে, আদৌ তার সবটা উদ্ধার করা সম্ভব কি না, এই চিন্তাও উদ্বিগ্ন করে। এর পাশাপাশি, সংগীতশাস্ত্রে জ্ঞানী অনেকেই উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে গানের চর্চা করতেন। অনেকে গান শিখতেও আসতেন, এ উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রাহ্মসমাজে ওনার বেহালা বাজানোর পারদর্শীতা খুবই প্রসংশিত ছিল। একই ভাবে সমাদর পেয়েছিল ওনার রচিত ব্রহ্ম সংগীত। সুবিমল রায়ের স্মৃতিচারণায় দেখতে পাই, “এই বাড়িতে (২২নং সুকিয়া স্ট্রিট) একদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাবার কাছে আসতে দেখলাম। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪০/৪১ বছর হবে। বাবা তাঁকে আগে থেকেই চিনতেন। রবীন্দ্রনাথের তখন কালো চুল, কালো দাড়ি। তিনি বাবার সঙ্গে কথা বলছিলেন, আর আমি অনেক দূরে দাঁড়িয়ে একটু দেখছিলাম। তিনি বাবার বেহালা শুনতে বড় ভালবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক গান শুনে বাবা সেগুলোর স্বরলিপি লিখে নিয়েছিলেন। আদি ব্রাহ্ম সমাজের উৎসবে গানের সঙ্গে বাবা বেহালা বাজাতেন, তাই জোড়া সাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অনেকের সঙ্গেই তাঁর জানাশোনা হয়েছিল।” ‘হারমোনিয়াম শিক্ষা’ এবং ‘বেহালা শিক্ষা’ নামে দু’টি বইও লিখেছিলেন। আর সুবিমল রায়ের স্মৃতিচারণায় এও ধরা পড়ে যে তিনি বেহালা বা হারমোনিয়ামের পাশপাশি সেতার আর পাখোয়াজও বাজাতেন! সেই সময় রীতিমত সম্মানিত এই সংগীত প্রতিভার দ্বারা রচিত গান ‘জাগো পুরবাসী, ভারতপ্রেমপিয়াসী’ প্রতি বছর ১১ই মাঘ, মাঘোৎসবের সময় গাওয়া হ’ত। ব্রাহ্মধর্ম অন্তর্ভুক্ত যাঁরা এখনও বর্তমান এবং এই মাঘোৎসব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাঁরা নিশ্চয়ই তা ভোলেন নি।


ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স - এক কিংবদন্তীর সূচনা

‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স’, এই প্রতিষ্ঠান খানি হয়ত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জীবনে একটা মিশন-এর মত ছিল। তাঁর একাধিক স্বপ্নের ইঁট দিয়ে গেঁথে গেঁথে স্থাপিত এই ‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স’, যা কেবল মাত্র এক মুদ্রণ সংস্থা নয়। তার থেকে অনেক বেশি কিছু! নাম থেকেই লক্ষ্য করা যায়, এবং হয়ত বলতেই পারি... এই প্রথম রায়চৌধুরী বংশের সেই পদবী থেকে স্বতন্ত্র হয় রায় কিংবা ‘Ray’-দের জয়যাত্রার সূচনা, যা পরবর্তী কালে শুধু এই ‘Ray’ নাম-মাহাত্মেই কিংবদন্তী হয়ে উঠবে। সেই ‘Ray’ সাম্রাজ্যের প্রথম ছোট স্বতন্ত্র রাজ্যটির রাজধানী ছিল এই ‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স’। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী উপেন্দ্রকিশোর যতই অমায়িক ‘ডাউন টু আর্থ’ হোন... তিনি নিজে তো বুঝতেন যে নিজে একাই একটা এন্টারপ্রাইজ হয়ে উঠেছেন। তাই একটা স্বতন্ত্র কিছু করার চেষ্টা; ভাই, পুত্রগণ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে এক সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎকৃষ্ট মানের কিছু করার স্বপ্ন উনি দেখেছিলেন। এমন কিছু যা সমকালীন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও একটা উদাহরণ স্বরূপ হয়ে থাকবে। অনেক দিন ধরে পড়াশুনো করে নিজেকে প্রস্তুত করে, সঞ্চিত পুঁজি খরচ করে বিদেশ থেকে প্রকাশনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনিয়ে, নিজেকে এবং প্রিয় পুত্র সুকুমার রায়কে এই কাজের জন্য স্বশিক্ষিত করে তুলে... এক সাধনার পর্যায় প্রস্তুতি পর্ব চলে। অবশেষে ১৮৯৫ সালে আলোর মুখ দেখল ইয়ু রে অ্যাণ্ড সন্স। ছোট সংস্থা হলেও, বাধা মাইনের চাকুরীবৃত্তিতে সন্তুষ্ট বাঙালি মানসিকতার বাইরে এসে স্বাধীন ব্যবসার দিকে এগিয়ে যাওয়ারও এ এক দৃঢ় পদক্ষেপ। এর পর, উপেন্দ্রকিশোর পুরো সময়টাই অতিবাহিত করতেন এই প্রতিষ্ঠানকে কি করে আরও বেশি বড় করে তোলা যায়, সেই প্রচেষ্ঠায়। এর থেকে সরাসরি দু’টো লাভ তৎকালীন পুস্তক এবং প্রকাশনা জগৎ পেয়েছিল। প্রথমতঃ শিশুসাহিত্যের জন্য একটি নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানমনস্ক পদ্ধতিতে মূদ্রণ প্রযুক্তির বিবর্তন, যার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান – হাফটোন প্রিণ্টিং।

উপেন্দ্রকিশোর প্রথমে ‘সেকালের কথা’ এবং তারপর একে একে ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘ছোটোদের মহাভারত’, ‘টুনটুনির বই’, প্রভৃতি প্রকাশ করতে থাকেন। একের পর এক পাঠকদের হাতে আসতে থাকে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর চমৎকার কথ্য ভাষায় লেখা কথা-সাহিত্য, এবং ইলাস্ট্রেশন। এই প্রকাশনা সংস্থার হাত ধরেই ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় ছোটদের জন্য সন্দেশ পত্রিকা। সেকালের কথা অথবা ছোটদের জন্য লেখা রামায়ণ এবং মহাভারত পড়েন নি এমন বাঙালি বোধহয় পাওয়া যাবে না (অন্ততঃ আমাদের প্রজন্ম অবধি)। সেই সময়ও এই বই তিনটি ভীষণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের অমন মনগ্রাহী আখ্যান, অথবা রামায়ণ-মহাভারতের অধ্যায় গুলো এমন আন্তরিক গল্প বলার ছলে বর্ণনা যা পড়তে শুধু ছোটদের নয়, বড়দেরও ভাল লেগেছিল। উপেন্দ্রকিশোরের ওই প্রয়াশ বাংলা সাহিত্যে প্রথম। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার আর যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সমাদৃত ছোটদের গল্প ও ছড়াগুলির মতই উপেন্দ্রকিশোরের ‘টুনটুনির বই’ বাংলার ঘরে ঘরে ছোটদের মন জয় করে নিয়েছিল। এই বইয়ের কথা বলতে গিয়ে লীলা মজুমদারের কলমেও এই বইয়ের প্রতি এক বিশেষ আবেগপূর্ণ দুর্বলতা চোখে পড়ে, যখন উনি বলছেন – “ময়মনসিংহের মা ও ঠাকুমারা একসময় এইসব গল্প শোনাতেন – রাতের খাবার তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই গল্প শুনিয়ে তাদের জাগিয়ে রাখা হতো। গ্রন্থটি সত্যিই এক অসাধারণ কৃতিত্ত্বের নিদর্শন। গল্পগুলি মৌলিক নয়, কিন্তু কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে – স্নেহে কোমল, রসে টইটুম্বুর। এগুলির মধ্যে দিয়ে বাংলার গ্রামজীবনকে উঁকি মেরে দেখা যায়, এ দেখা অনন্তকালের।” প্রবাদপ্রতীম ওয়ার্নার ব্রাদার্স, কিংবা হ্যানা-বারবারাদের তৈরী অ্যানিমেশন চরিত্রগুলি দেখার সময় ভীষন ভাবে মনে হয়, এই কালো হাঁসটি ঠিক হাঁস নয়, খরগোশটা যেন খরগোশের থেকেও বেশি কিছু... আসলে এগুলো সবই আমাদের সমাজের মানুষদেরই এক একটি চারিত্রিক দিক ফুটিয়ে তোলে খুব চালাকি করে ঢাকা একটা অর্ধস্বচ্ছ কৌতুকময় পর্দার আড়ালে। এই অ্যানিমেশনগুলো যখন দেখেছি, তখন মনে হয়েছে, উপেন্দ্রকিশোরের রচনায় ফুটে ওঠা বাঘ, বেড়াল, টুনটুনি, শেয়াল, প্রভৃতি চরিত্রগুলোও ঠিক সেইরকমই আমাদের সমাজের কেউ না কেউ। অবশ্য এ আমার ব্যক্তিগত মনে হওয়া। ছোটদের এই মনে হওয়া মেনে নিয়েই সেই সব গল্প পড়ে মজা পেতে হবে এর কোনও মানে নেই। যে লেখা এত আন্তরিক, এত সরল ভাষায় মন কে খুশি করে দেয় তা শুধু শোনার জন্যই শোনা যায়, পড়ার জন্যই পড়া যায়... সে এক ভিন্ন ভাল লাগার স্বাদ।
আর ছোটদের এই ভাল লাগার স্বাদগুলো পূরণ করার জন্যই ১৯১৩ সালে সন্দেশ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। তখন রেডিওর বিনোদন ছিল না, টেলিভিশনের প্রশ্নই ওঠে না। কলের গান কিছু কিছু বাড়িতে থাকলেও, তা ছোটদের আয়ত্তের বাইরেই থাকত। সুতরাং মাঠে-ঘাটে খেলা আর পড়া ছাড়া বিশেষ কিছুই করার সুযোগ ছিল না ছোটদের। আর এই বই পড়ার ভূমিকাটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক বই পড়ে পাশ শিক্ষা লাভ করা... অন্যদিকে তেমন ঠিকমত কিছু বিশেষ বই তাদের দিকে এগিয়ে দেওয়া ছিল অভিভাবকদের কর্তব্য, যা থেকে মানসিক বিকাশ হয়, চরিত্র গঠন হয়। সেই বই পড়েও যদি আনন্দ না পাওয়া গেল, পাতার পর পাতা সাদাকালো ভারী ভারী জ্ঞানের কথা পড়েই যদি অবসর সময় যায়, তো কার ভাল লাগে? উপেন্দ্রকিশোরও ঠিক এই চিন্তার জায়গাটা থেকেই শিশু ও কিশোরদের রুচিবোধ, চিন্তাপ্রবাহ, মানসিক বিকাশের কথা ভেবে নানারকম চিত্তাকর্ষক বিষয় এবং ইলাস্ট্রেশনের সাহায্যে ছোটদের মনের মতন করে সন্দেশ পত্রিকাকে সাজাতেন। সেই পত্রিকা ছোট-বড় নির্বিশেষে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই সময়ের বহু সাহিত্যিক এই পত্রিকায় ছোটদের জন্য লিখে মানসিক তৃপ্তি লাভ করতেন। এবং পরবর্তীকালেও যত শিশুদের সাহিত্য পত্রিকা হয়, তার কাছে ‘সন্দেশ’ ছিল একটা আদর্শের মত – যার প্রেজেণ্টেশন, লেখার ধরণ, প্রচ্ছদ, অলংকরণ এইসব অনুসরণ করলে ছোটদের মন পাওয়া যায় এমন ভাল পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব। অথচ এমন জনপ্রিয় একটি সাহিত্য পত্রিকা, মাত্র ১০ বছরের মাথায়, ১৯২৩ সালে সুকুমার রায় চলে যাওয়ার সাথে সাথে অনাথ হয়ে যায়। এর বহু বছর, ১৯৬১ সালে মা সুপ্রভা দেবীর অনুরোধে সত্যজিৎ রায় আবার সন্দেশ পত্রিকা ফিরিয়ে আনেন। যারা একদিন ছোট্ট পাঠক ছিলেন সন্দেশ পত্রিকার, তাঁরা তখন সকলেই বড় হয়ে গেছেন, কিন্তু নিজেদের ছোটবেলার একটা ভাল লাগাকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া কি কম আনন্দের? সন্দেশের এই ফিরে আসাই সেই ঝুপ করে নিভে যাওয়া ‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স’-এর প্রত্যাবর্তন। সেই সংস্থার পুনরজ্জীবন বা স্বমহীমায় ফিরে আসা হয়ত নানা কারণে হয়নি। কিন্তু সত্যজিৎ রায় ‘সন্দেশ’কে অন্ততঃ ফিরিয়ে এনেছিলেন সেই ছোট ছোট মনগুলোর কাছে, যারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে বসে থাকে।

আর মূদ্রণের প্রসঙ্গে যদি বলা হয়, তা হ’লে এক কথায় ইউ রে অ্যান্ড সন্স-এর হাত ধরে বাংলা পুস্তক প্রকাশণার জগতে একটা বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। রামায়ণ মহাভারতের বই ছাপাতে গিয়ে উপেন্দ্রকিশোর দেখেন, অভিনব প্রযুক্তিতে ভাল হরফে ছাপানোর প্রচেষ্টা চললেও, কাঠের ব্লকে খোদাই করে ছাপানোর পদ্ধতিতে ওনার অত সাধের ইলাস্ট্রেশন ও আঁকা ছবিগুলির বারোটা বেজে যাচ্ছে। কিছুতেই তার গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু হালছাড়ার সংস্থা তো ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স নয়! এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্যই উঠে পড়ে লাগলেন ‘ইউ রে’ স্বয়ং এবং ‘সন’ সুকুমার (সুবিনয় রায়েরও সঙ্গে থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে মূল কাণ্ডারী এঁরা দু’জনই ছিলেন)। যে নতুন প্রযুক্তি এ দেশে উপস্থাপিত হ’ল তাকে বলে ‘হাফ-টোন প্রিন্টিং টেকনোলজি’। হাফটোন ব্যাপারটা ঠিক কি, কেনই বা তা এমন শোরগোল সৃষ্টি করেছিল, তার বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ খুব জটিল, এবং তার বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। শুধু একটু সংক্ষেপে পার্থক্যটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি – বছর কুরি-পঁচিশ আগে, খবরের কাগজে ছাপা ছবিগুলো ভাল করে আতশ কাঁচের নীচে দেখলে, পর্যবেক্ষণ করা যায়, তা আসলে অনেকগুলো কালো বিন্দু দিয়ে তৈরী। যেখানে রঙের ভাগ গাঢ় সেখানে বিন্দুগুলো খুব কাছাকাছি, আর যেখানে যত হালকা রঙ, বিন্দুগুলো তত দূরে চলে গেছে। এই ধরণের ছবি দক্ষতার সঙ্গে সৃষ্টি করাই হাফ-টোন পদ্ধতির অবদান। আগে ব্যবহৃত কণ্টিনিউয়াস টোনের যে ব্লক, তা এমন সূক্ষ ছবি ছাপাতে পারত না, একটানা এবং একই ঘনত্বে রঙ ছড়িয়ে ছবি বিগড়ে যেতো। ভাল ছবির আসল রূপ কোনও দিনও ফুটে উঠত না। কিন্তু হাফ-টোন পদ্ধতি সেই প্রতিবন্ধক কাটিয়ে ফটোগ্রাফি এবং স্ক্রিনিং ব্যবহার করে অদ্ভুত ভাবেই ছবির গুণগত মান ধরে রেখে ছবি ছাপাতে সাহায্য করত। হাফটোন ব্লকের চাহিদাও তাই অপরীহার্য হয়ে পড়ে। মূদ্রণ জগতে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল এই পদ্ধতি। কিন্তু সেকথায় আশার আগে উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন যে এই মূদ্রণ সম্পর্কিত নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা এবং তার প্রয়োগে পিতা-পুত্র কীরূপ মুন্সীয়ানা এবং দক্ষতার পরিচয় রেখে গেছেন। উপেন্দ্রকিশোরের এই বিষয় পাণ্ডিত্য এতটাই ছিল, যে ব্রিটেনে তাঁকে এই মুদ্রণ প্রযুক্তির জগতে রীতিমত একজন গবেষকের আসন দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অবদান জনে জনে কুর্ণিশ করে স্বীকার করেছেন সেখানে, পাঠিয়েছেন নিজেদের শুভেচ্ছাবার্তা। বিখ্যাত প্রিমরোজেস পত্রিকায় এই মুদ্রণ প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর একের পর এক উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, সেই সব প্রবন্ধের নাম দেখেই বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যায় – ‘দি হাফ-টোন থিয়োরি গ্রাফিক্যালি এক্সপ্লেইন্‌ডঃ মালটিপ্‌ল স্টপ্‌স’, ‘ফোকাসিং দি স্ক্রীন’, ‘দি সিক্সটি ডিগ্রি ক্রসলাইন সেকশন’, ‘মোর এক্সপেরিমেন্টস উইথ স্টপ্‌স’, প্রভৃতি। একের পর এক প্রবন্ধ এই ভাবে প্রকাশিত এবং বিদেশে সমাদৃত হ’তে থাকে। ১৯১১ সালে জ্যেষ্ঠপুত্র সুকুমার রায়কে (যিনি পিতার মতই প্রতিভাবান ছিলেন) বিলেতে পাঠানোর ব্যবস্থান করেন ফটোগ্রাফি, ছবি ছাপা এবং মুদ্রণ প্রযুক্তি সম্বন্ধে আরো বেশি কৌশলগত শিক্ষালাভের জন্য। সেখানে গিয়ে উনি চমকে জান একদম উপেন্দ্রকিশোর দ্বারা বর্ণিত নিয়মে হাফ-টোনের কাজ হ’তে। উপেন্দ্রকিশোর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি কী ভাবে বিলেতের ছাপাখানাগুলি আপন করে নিয়েছে তাদের নিজেস্ব প্রযুক্তি বলে। পিতা-পুত্র মিলে ২২নং সুকিয়া স্ট্রিট অথবা ১০০ নং গড়পার রোডের ডার্করুম আর প্রেস-এ যে ভেলকিটি দেখাতেন তার সামান্য আন্দাজ করা যায় সিদ্ধার্থ ঘোষের ‘প্রতিচ্ছবি মুদ্রণে অনন্য শিল্পী’ প্রবন্ধের এই অংশটি থেকে– “১৮৯৭-এ ইংলিশম্যান পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় উপেন্দ্রকিশোর তখন ইঞ্চি পিছু ৭৫, ৮৫, ১২০, ১৩৩, ১৭০, ২৪০ এমনকী ২৬৬ ডট বিশিষ্ট হাফটোন ব্লক প্রস্তুত করছেন। আগেও বলেছি এ যুগেও ১৫০ ডটের বেশি ছবি বিরল। আরও বিস্ময়কর সে যুগে ১৭০, ২৪০ বা ২৬৬ লাইনের স্ক্রিন তৈরিই হত না। তাহলে তিনি ১৭০, ২৪০ বা ২৬৬ ডট পেলেন কী করে?” সত্যিই বিস্ময়কর, আর কতটা ক্যারিস্ম্যাটিক কাজ, তা এই বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত গুণীজনেরাই বুঝতেন। সেই সকল প্রযুক্তির ব্যবহার পদ্ধতি, এবং গবেষণাগত বিশ্লেষণ উপেন্দ্রকিশোর রীতিমত গবেষণাপত্র প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন। ১৯০৬-৭ সালের কলকাতার শিল্প প্রদর্শনীতে তাঁর স্ক্রিন ইন্ডিকেটর যন্ত্রের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন উপেন্দ্রকিশোর। গ্রাফিক এবং কমার্শিয়াল ডিজাইনের জন্য স্বর্ণপদক সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর এই হাফটোন ব্লকের দৌলতে অবন ঠাকুর, নন্দলাল বসুর মত শিল্পীদের শিল্পকর্মের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় হয় প্রবাশী, মডার্ণ রিভিউ পত্রিকার পাতায়। এমন কি ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ প্রকাশিত হওয়ার আগে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা চিত্রগুলির ব্লকও উপেন্দ্রকিশোরের তত্ত্বাবধানেই প্রস্তুত হয়। তবুও ইউ অ্যাণ্ড সন্স্‌ এর এই কর্মকাণ্ড, পিতা-পুত্রের গবেষণা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তাদের একাধিক বার প্রতারিতও হ’তে হয়। ইংল্যাণ্ডে জনৈক ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরের প্রকাশিত গবেষণাপত্রর তথ্য নিজের কাজে লাগিয়ে নিজের নামে পেটেণ্ট বার করে নেন সেই দেশে। আর স্বদেশেও মুদ্রণ ব্যবসায় সঠতার সম্মুখীন হ’তে হয়েছে। উপেন্দ্রকিশোরের এই প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং উদার চিত্তে মানুষকে ক্ষমা করার প্রসঙ্গে সুকুমার রায় বলেছেন – “সংসারে স্বার্থব্যবসায়ী প্রবঞ্চক তিনি কম দেখেন নাই, নিজে ব্যবসায় সম্পর্কে ও সংসারের নানাক্ষেত্রে শতবার প্রতারিত হইয়াছেন – কিন্তু তবু মানুষের উপর তাঁহার কি গভীর বিশ্বাস! মানুষের স্বভাবসিদ্ধ মনুষ্যত্বের প্রতি কি আশ্চর্য্য শ্রদ্ধা! অপাত্রে বিশ্বাস স্থাপন করিয়া সাংসারিক ক্ষতি অকুন্ঠিত চিত্তে বহন করিয়াছেন, কিন্তু এক দিনের জন্যও অকারণ সন্দেহকে হৃদয়ে ধারণ করিয়া মনের প্রসন্নতা নষ্ট করিতে সম্মত হয়েন নাই।”

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই ‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স্‌’ প্রতিষ্ঠান আমাদের যে আশার আলো দেখিয়েছিল, যে দৃপ্ততার সাথে তার জয়যাত্রার সূচনা হয়েছিল তা হঠাৎ করেই থমকে যায়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর দেহাবসানের পর ওনার সুযোগ্য পুত্র সুকুমার রায় প্রায় একাই হাল সামলেছিলেন (অবশ্যই কিছু নিকটাত্মীয়ের সহযোগিতা ছিল)। কিন্তু ১৯২৩ সালে সুকুমার রায়ের অকালে জীবনাবসান হওয়ায় সব আশা শেষ হয়ে যায়। দুঃসময়ের সূচনা বোধহয় এই ভাবেই হয়। প্রথমে দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী সুকুমার রায়ের এমন আকস্মিক জীবনাবসান, এবং তারপর নিলামে অতি সাধারণ মূল্যে ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স-এর মালিকানা হস্তান্তর। নতুন মালিক হ’লেন সেই কোম্পানিরই প্রাক্তন ম্যানেজার করুণাবিন্দু বিশ্বাস। সিদ্ধার্থ ঘোষ সরাসরি উল্লেখ করেছেন এই করুণাবিন্দু বিশ্বাসকে একদিন কাজে গাফিলতির জন্য অপসারিত করেছিলেন সুকুমার এবং সুবিনয় রায়। ভাগ্যের কি ফের! কেন এই একদা অপসারিত মানুষটির হাতেই ফিরে এলো ইউ রে অ্যাণ্ড সন্সের মালিকানা? এ কি তবে সেই অপসারিত মানুষটির প্রতিহিংসাপূরণের অভিসন্ধি? রায় পরিবার কি খুব আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, যার ফলে এমন পদক্ষেপ নিতে হ’ল? প্রশ্নগুলো থেকেই যায়, একটা বর্ধিষ্ণু প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ থেমে যাওয়া খুবই বেদনাদায়ক। শুধু কোম্পানীর মালিকানা বদলই নয়, ইউ রে অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায়, সুখলতা রাও, কুলদারঞ্জন, প্রমুখ সকলের বইয়ের সত্ত্বাধিকারও চলে করুণাবিন্দু মহাশয়ের হাতে। ১০০ নং গড়পার থেকে ঠিকানা পালটে ১১৭/১ বৌবাজার স্ট্রিটে রম রম করে চলতে লাগল করুণাবিন্দুর ‘ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স্‌’ (হয়ৎ গুড-উইলের কথা ভেবেই নামটা পালটানো হয়নি)। ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স-এর লেগাসি হয়ত এইখানেই শেষ, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর - সুকুমারের গবেষণা এবং মুদ্রণে প্রযুক্তিগত উন্নতির পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতায়। খোদাইকারদের পদ্ধতি এমনিতেই ব্যাক-ডেটেড হয়ে পড়ছিল, এই হাফ-টোন পদ্ধতি জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথে মুদ্রণ জগতে এলো নতুন জীবিকা। অমর হয়ে রইল পিতা-পুত্রের এত পরিশ্রম, এত সাধনা।


পাখী কী বলে গেল?

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বিস্তৃত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশদে বেশ কিছু কথা বলা গেলেও, সেই ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরকে ঠিক ভাবে চিনতে না পারলে, মননের সব প্রচেষ্টাই যেন মাটি হয়ে যায়। ওনার লেখা পত্র, সমসাময়িক আলোচনাভিত্তিক প্রবন্ধ, প্রভৃতি, যদি থেকেও থাকে, সাধারণ পাঠকের হাতে সে ভাবে পৌঁছয়নি। আর ওনাকে কে নিয়ে সাহিত্য জগতে খুব বেশি চর্চা, ওনার জীবনের এক একটি সময়, এক একটা ফেজ্‌ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতেও কাউকে দেখি না। কোনও সনামধন্য সাহিত্যিকের ঘনিষ্ঠ নারী কতজন ছিলেন, কেবল এই নিয়ে পুস্তকের পর পুস্তক প্রকাশিত করে জনৈক ইন্টেলেকচুয়াল জীবন অতিবাহিত করতে পারেন, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মত একজন ক্ষণজন্মা মানুষকে নিয়ে একটা গবেষণামূলক কাজ করার জন্য তার সিকিভাগ ডেডিকেশনও খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ, এই কর্মযোগী মানুষটির ব্যস্ততম জীবনের এত কর্মকাণ্ডের বাইরে, ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরকেও আরও ভাল করে চেনার ভীষণ দরকার আছে। প্রজন্ম মানুষ চিনতে না পারলে, তার প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন কোনওদিনও করতে পারে না। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছাত্রাবস্থায় আনুমানিক ১৮৮২ তে কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে চলে আসা, ব্রাহ্ম সান্নিধ্যে প্রভাবিত হওয়া থেকে শুরু করে একেবারে ১৮৯৫ সালে ইউ রে অ্যাণ্ড সন্স-এর গোরা পত্তন এবং ১৯১৩ তে ছোটদের সন্দেশ পত্রিকা প্রকাশনা – ১৮৮২ থেকে একেবারে ১৯১৫, এই তেত্রিশ বছরে কোথাও এতটুকু কর্মবিমূখতা বা আলস্যের রেখা নেই, থাকতেই পারে না। বরং পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক একাধিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে যেন একের পর এক ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে ওনার সাধনার অর্জিত ফলগুলো রেখে যাওয়া। কিন্তু জীবনের এই এক একটা ফেজ্‌-কেবিস্তারিত ভাবে তুলে ধরবার এখন আর উপায় কি! এই ১৮৮২ থেকে ১৯১৫ সময়টা যে সমগ্র বাংলা তথা পৃথিবীর কাছেও ভীষণ ঘটনাবহুল। এমন সমাজসচেতন মানুষের একাধিক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ার কথা, কিছু না কিছু অবদান থাকা স্বাভাবিক। সেই ইনভলভ্‌মেণ্ট, আর অবদানকে অন্বেষণ করার এখনও প্রয়োজন আছে। তাঁর পরিচিতদের লেখা, স্মৃতির রোমন্থনে এই ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন সত্ত্বার কিছু আভাস পাওয়া যায় মাত্র, সম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না।
আমরা এই স্বল্প পরিশরে সেই স্মৃতিকথা হাঁতরেই কিছু ছোট ছোট অংশকে দেখার চেষ্টা করতে পারি, যার থেকে সেই স্বর্ণহৃদয় মানুষটার একটা অবয়ব ফুটে ওঠে।
যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে ওনার প্রথম সাক্ষাতের কথা খুব চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন – “আমাকে লইয়া সেই বড় ঘরটির পর্দা সরাইয়া রেবতীবাবু (রেবতীমোহন সেন, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয়ের মামা) মুখ বাড়াইয়া বলিলেন, ‘আসতে পারি কি?’ উপেন্দ্রবাবু আনন্দের সহিত বলিলেন, ‘এ আবার কি কথা! আসুন! আসুন!’ মামা বলিলেন, ‘আমার সঙ্গে এক ভাগ্নে আছে। সে আপনার একজন ভক্ত। আপনাকে দেখবার জন্য সে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।’ উপেন্দ্রবাবুর মুখে প্রসন্ন হাসি ফুটিয়া উঠিল। আমি তাঁহাকে প্রণাম করিতেই দুই হাত দিয়া আমাকে বক্ষে টানিয়া লইলেন। তখন তাঁহাকে প্রাণ ভরিয়া দেখিলাম। ...তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি আমার কী কী গল্প পড়েছ?’ আমি তখন বিনা সংকোচে তাঁহার ‘সেকালের কথা’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘অন্ধজনের কথা’ প্রভৃতির নাম বলিলাম। আমার মনে হইল তিনি প্রসন্ন হইয়াছেন। হাসিমুখে বলিলেন, ‘বেশ বেশ, আশীর্বাদ করি তুমি ভাল ছেলে হও।’ ”

মানুষ উপেন্দ্রকিশোরকে আরও কাছ থেকে দেখতে হ’লে সেই সুকুমার রায়ের চোখ দিয়েই দেখতে হবে –
“তাঁহার অন্তরের সংস্পর্শে যে আসে নাই, সে জানে না তাঁহার জীবনের প্রত্যেক সাধনার মধ্যে তিনি কি আনন্দরস সংগ্রহ করিয়া গিয়াছেন। যখন যাহাতে হাত দিতেন তদর্পিতপ্রাণ হইয়া তাহাতেই ডুবিয়া যাইতেন। শিশুদের জন্য লিখিতে বসিয়াছেন, চিত্ররচনার জন্য হস্তে তুলিকা লইয়াছেন – মনে হইত সংসারে তাঁহার অন্য কোন চিন্তা নাই, ক্ষোভ নাই, দুঃখ নাই; উপস্থিত কর্ত্তব্যের আনন্দে তিনি আর-সমস্ত ভুলিয়া গিয়াছেন। রোগযন্ত্রণা ও সাংসারিক সকল দুর্ভাবনার মধ্যে যেমন বেহালাখানি হাতে লইয়াছেন – অমনি তন্ময়! আর কোথায় দুঃখ, কোথায় বিপদ – মনে হয় এমন শান্তি এমন সান্ত্বনা বুঝি আর কিছুতে মিলে না।”

শিল্পী উপেন্দ্রকিশোর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে সুবিমল রায় একটি অংশে খুব সুন্দর ভাবে ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরের একটা দিক ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এই অংশটি পড়লে বোঝা যায় –
“ছেলেবেলায় বোধ হয় ১৯০৪ সনে আমরা তাঁর সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম যে বাবা ছবি আঁকতে আঁকতে মধ্যে মধ্যে পেছিয়ে এসে শান্তভাবে ছবিটার দোষ-গুণ দেখছেন, আবার এগিয়ে ছবির কাছে গিয়ে দরকার বুঝে কয়েকটা দাগ বা টান বা একটু তুলির কারুকার্য জুড়ে দিয়ে ছবিটাকে আরো সুন্দর করে তুলছেন। ছবির চেয়ে বাবার সেই চেহারাটাই বেশী মনে পড়ে; কী শান্ত, সজীব আনন্দময় সে চেহারা। গিরিডিতে শালবনের দিকে তাকিয়ে তিনি যখন ছবি আঁকতেন তখন তাঁকে দেখে অনেকের মনে হ’ত যেন এ দেশের তপোবনের একজন মুনি।”

তাঁর জীবনীর দিকে তাকালে বার বার দেখা যায় বসত বাড়ি পরিবর্তনের কথা... ১৩ নং কর্নোয়ালিস স্ট্রিট থেকে ৭নং শিবনারায়ণ দাস লেন, সেখান থেকে ২২নং সুকিয়া স্ট্রিট, তারপর অবশেষে ১০০ নং গড়পার রোডের বাড়ি (বাড়ি তো নয় তীর্থস্থান!)। এই বার বার ঠিকানা পরিবর্তন (তাও এত বড় পরিবার নিয়ে) তো মুখের কথা নয়! এর দু’টি বিশেষ কারণ অনুমান করা যায় – এক, কাজের জন্য উপযুক্ত জায়গার প্রয়োজন। ফটোগ্রাফির জন্য ডার্করুম লাগে, ছবি আঁকা এবং মুদ্রণের জন্যও সঠিক সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি রাখার ব্যবস্থা আবশ্যক হয়ে পড়ত। আর দুই, তাঁর বৃহৎ সংসার! শুধু তিনি এবং তাঁর পরিবার তো নয়, ওনার ভাই কুলদারঞ্জন এবং তাঁর সন্তানেরা, রামকুমার বিদ্যারত্ন-র মেজো মেয়ে সুরমা দেবী (যাকে উপেন্দ্রকিশোর নিজের মেয়ের মত মানুষ করেন, পরবর্তীকালে ওনার সঙ্গে প্রমদারঞ্জন রায়ের বিয়ে হয়), এমন আরও অনেকেই সময়ে-অসময়ে ওনার পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে এসে থেকেছেন। ওনাকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের কথা থেকেই প্রকাশ পায়, নিজের পরিবারের বাইরে এই বিশাল জ্ঞাতিকূলকে একসাথেই তিনি একটি পরিবার জ্ঞান করতেন। সকলকে নিয়েই কখনও গিরিডি, কখনও ময়মন সিংহ, কখনও দার্জিলিং বেড়াতে যেতেন, মোটরগাড়ি করে ঘুরতেন। পরিবারের সব ছোট ছেলেমেয়েদের একসাথে জড় করে গান শেখাতেন, তাদের সঙ্গে গান করতেন, বেহালা বাজিয়ে শোনাতেন। এত ঘনিষ্ঠ ভাবে ছোট ছেলেমেয়েদের মাঝে মিশে যাওয়ার মত চিরহরিৎ মন খুব কম মানুষের হয়, আর এই ভাবে মিশে যেতে পারতেন বলেই বোধহয় উনি বুঝতেন ঠিক কী ভাবে পরিবেশন করলে লেখাগুলো ছোটদের আরও বেশি আনন্দ দেবে, তারা মনে রাখবে। তিনি যখন যে পাড়াতেই থাকুন, সেখানকার ছোটছোট ছেলে-মেয়েরা যেন ঠিক টের পেয়ে যেতো, তাদের আবদার করার মত একজন কেউ এসেছে। অনেকগুলো ছোটছোট হাত জানলার বাইরে থেকে ভেতর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া, আর একজন শান্ত চেহারার মানুষ মুখে একটা হালকা বিরক্তির ভাব নিয়েও একে একে রঙিন ছাপা ছবি তাদের হাতে বিলিয়ে দিচ্ছেন। তারপর সেই ছবি হাতে পেয়েই এক একজন এক রাশ আনন্দ নিয়ে ছুট্টে চলে যাচ্ছে। আহা! কল্পনা করলেও কেমন মনটা ভরে যায়। সেই সাদাকালো ছাপার যুগে দুর্লভ রঙিন ছবি তুলে দেওয়া হ’ত ছোটদের হাতে (লীলা মজুমদারের স্মৃতিচারণাতেই এর উল্লেখ আছে)। আর সেই সময় যারা ছোট ছিলেন, তারাই দেখেছি অনেক বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরকে মনে রেখেছেন, তাদের লেখাতেই এই মানুষটির পর্বতসম উঁচু মনটা বেশি করে ধরা পড়ে।
গগনচন্দ্র হোমের কণ্যা বীনা বসু একটি ছোটবেলার ঘটনা বলেছেন তার থেকে ব্যক্তি উপেন্দ্রকিশোরের আর একটি দিক চেনার চেষ্টা করা যেতে পারে, ২২ নং সুকিয়া স্ট্রিটের ঘটনা... সাল খুব সম্ভবতঃ ১৯০৫ –
“বাড়ির ছোট মেয়েদের স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরিয়ে রাস্তার দিকের উপরের বারান্দায় বসানো হয়েছে এবং বারবার নিষেধ করা হয়েছে তাদের কথা না বলতে। নিঃশব্দে তারা বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে অপেক্ষা করছে। শীঘ্রই বাতাসে গানের সুর ভেসে এলো। তারপর দেখা গেল একদল লোক রাস্তার মাঝখান দিয়ে গান গাইতে গাইতে আসছেন। লম্বা ও সুদর্শন চেহারার এক ব্যক্তি, মাথায় লম্বা চুল, গালে সোনালী দাড়ি, লম্বা সাদা ঝোলানো পোশাক পরা, গায়কদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন; তাঁর কণ্ঠস্বর সবার কণ্ঠস্বরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। তাঁর পরেই ছিলেন এক মোটাসোটা ব্যক্তি- গলা থেকে তাঁর একটা হারমোনিয়াম ঝুলছিল, তাঁর গলার স্বরও উচ্চ।... সে সময় উপেন্দ্রকিশোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁর হাতে বেহালা। তিনি এই লম্বা লোক সুন্দর চেহারার মানুষটির পাশে গেলেন এবং দলটি গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চললো। কিছুক্ষণ ধরে বাতাসে তাঁদের কথা ভেসে বেড়ালো – ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল... ’ ইত্যাদি। তারপর যারা বাড়ির বাইরে এসেছিলেন, তাঁরাও ফিরে গেছেন নিজের ঘরে।”
যে মোটাসোটা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, উনি দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর সেই দেবপ্রতিম গায়ক, যিনি সবার আগে আগে হাঁটছিলেন, তিনি আর কেই বা হতে পারেন... রবীন্দ্রনাথ ছাড়া?

অথচ এই কর্মপ্রাণ, সকলের প্রিয় মানুষটির চলে যাওয়াটাও কেমন অসময়ে! একেবারে আকস্মিক না হ’লেও, অনেক কাজ, অনেক স্বপ্ন অধরা রেখেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল। ওনার পরিচিতরাও বলেছেন, ওনার অসুস্থতা এবং ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া শরীরেও উনি যতটা পারতেন নিজেকে সক্ষম রাখার চেষ্টা করতেন, যতটা কাজ করা যায় করে নিতে চাইতেন, যেন উনি বুঝতে পেরেছিলেন – হাতে সময় আর বেশি অবশিষ্ট নেই। ডায়েবেটিস (Diabetes) বা রক্তে শর্করা বৃদ্ধির অসুখ এমনই এক ব্যাধি, যার এযুগেও কোনও পাকাপাকি নিরাময় নেই। নানারকম ওষুধ আর তার মাত্রার রকম ফের করে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় মাত্র। আর সেই সময় তো এত ওষুধও আবিষ্কার হয়নি। আর যা একটি দু’টি ওষুধ পাওয়া যেতো, তা রপ্তানী বন্ধ হয়ে গেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই। জার্মানীতে তৈরী ওষুধ ব্রিটিশ কলোনীতে আসা অসম্ভব। ফলে, শেষ সময় তাঁর রোগের উপযুক্ত প্রতিশেধকও ওনার কপালে জুটল না। দাদা সারদারঞ্জন (যিনি একদিন ব্রাহ্ম ভাইয়ের মুখদর্শন করবেন না বলেছিলেন) অনেক যত্ন করেছিলেন গিরিডির বাড়িতে। ওনার দেওয়া হোমিওপ্যাথিক ওষুধই পথ্য ছিল। পরিবারের পরিজনের মানুষও অনেক শুশ্রূষা করেছিলেন, যতটা করা যায়। তবে এতে অবস্থার উন্নতি আর হয়নি।

যখন মৃত্যু শয্যায়, তখন কলকাতায় গিয়ে চিকিৎসা করাতেও অসম্মত হ’ন। জীবনাবসানের আগের কিছু ঘটনা, কিছু কথা যেন একেবারে সেই অন্তরের দার্শনিকটির, যার নাগাল বাইরের কেউ খুব একটা পায়নি। হয়ত বাবার খুব কাছের মানুষ এবং ছেলেদের মধ্যে সব থেকে প্রিয় ছিলেন বলেই, সুকুমার রায়ের কলমে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শেষ কদিনের কথা একটু অন্যরকম ভাবে ফুটে উঠেছে। খুব বেশি কথা নয়, নির্বাচিত কিছু স্মৃতি, কিছু মুহূর্ত... কিন্তু এর মধ্যে দিয়েও সুকুমার রায় তাঁর বাবা এবং গুরু উপেন্দ্রকিশোরের খাঁটি সোনার মত মনটা সকলকে চিনিয়ে দিয়ে গেছেন। একেবারে অন্তিমশয্যার একটি মুহূর্ত –
“মৃত্যুর দুই দিন পূর্ব্বে ভক্তিভাজন দাদামহাশয় নবদ্বীপচন্দ্র দাস মহাশয়কে তিনি প্রার্থনা করিতে বলেন। দাদামহাশয় প্রার্থনায় সময় বলেন ‘তুমি ইহার জীবনের অপরাদ সমুদয় মার্জ্জনা কর।’ এ প্রার্থনায় তৃপ্ত হইলেন না। আবার তিনি নিজেই আকুলভাবে প্রার্থনা আরম্ভ করিলেন ‘আমার অপরাধ মার্জ্জনা কর, এ প্রার্থনা আমি করি না। যদি দণ্ডদান আবশ্যক হয়, দণ্ডই দাও। কিন্তু, আমায় পরিত্যাগ করিও না।’ ”
বেশ বোঝা যায় উপেন্দ্রকিশোরের পাশে শেষের ক’দিন একটানা ছিলেন সুকুমার রায়। অসুস্থ মানুষটির স্বগতোক্তি বা প্রলাপ ও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। এমন কি সব অসংলগ্ন কথাও তিনি এমন ভাবে তুলে ধরেছেন... যার মধ্যে সত্যিই যেন এক অন্তর্নিহিত মানে ফুটে ওঠে।
তেমনই এক অদ্ভুত ছবি সুকুমার রায়ের স্মৃতিচারণায় ফুটে ওঠে, মৃত্যুর ঠিক আগের দিন... উপেন্দ্রকিশোরের (হয়ত অসুস্থতার ঘোরেই, কিংবা সজ্ঞানে) কিছু অদ্ভুত কথা –
“মৃত্যুর পূর্ব্বদিন, রবিবার উষার প্রাক্কালে পাখীর কাকলী শুনিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন ‘পাখীরা এমন করিয়া ডাকে কেন?’ বলা হইল, এখন সকাল হইয়া আসিতেছে। ইহাতে অত্যন্ত মৃদুভাবে যেন আপনমনে তিনি কি বলিলেন, ভাল বোঝা গেল না; কেবল শোনা গেল, ‘পাখীরা কি জানে? তারা বুঝতে পারে?’ দু’টি ছোট পাখী জানলার কাছে আসিয়া কিচিরমিচির করিয়া উড়িয়ে গেল। তিনি বিস্মিত ভাবে তাকাইয়া বলিলেন “ও কী পাখী! ও কী বলিয়া গেল, শুনিলে না? পাখী বলিল ‘পথ পা!’ ‘পথ পা!’ ”।”


জ্যোতিষ্কের আলোকে এই সময়

এত কথা বলতে বলতে একটা পুরনো ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। ১৯৯২ সালের ২রা মে সত্যজিৎ রায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বিশ্ববরেণ্য চিত্রপরিচালক, ওনার মৃত্যুর কিছুদিন পরেই ওনা পরিচালিত বেশ খুব ছবি নিয়ে একটা রেট্রোস্পকেটিভ শুরু হয় দূরদর্শনে। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ও ছিল তাদের মধ্যে একটি। ছ’বছর বয়স হয়নি তখনও, ‘সত্যজিৎ রায়’ নাম শিখেছি... দেখছি ওনার মৃত্যুতে কত লোক হায় হায় করছে, শোক প্রকাশ করছে। বাড়িতে বড়রাও কেমন থম মেরে বসেছিল যখন নন্দনে একে একে সকলের শ্রদ্ধা নিবেদন দেখানো চলছে। জানলাম যার লেখা আবোল তাবোল-এর কবিতা গুলো পড়েছি, ইনি সেই সুকুমার রায়ের ছেলে। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ দেখলাম সত্যজিৎ রায়ের ছবি। তো ওনার ছবির লিস্টে আমার দেখা সিনেমা এটি। এর ঠিক কয়েকদিন পরেই গরমের ছুটি, দূরদর্শনে ‘ছুটি ছুটি’ অনুষ্ঠানে ফের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’। কোনও এক প্রতিবেশীর বাড়িতে বসে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ সেই বাড়ির একজন বয়স্ক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “ ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ যে দেখছ? আসল গল্পটা কার লেখা জানো?” আমি ফস করে বলে দিলাম সত্যজিৎ রায়, শুনে উনি হেসে বললেন “নাহ্‌... ওনার ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।” আমি বাবার নাম অবধি জানতাম, ঠাকুর্দার নাম সিলেবাসে ছিল না। তাও বললাম, “রায়চৌধুরী? রায় নয়?” উনি ঘাড় নেড়ে বললেন “না... রায়চৌধুরী... সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুর্দার নাম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। বিখ্যাত ব্যক্তি। আমরা সবাই ওনার লেখা পড়ে বড় হয়েছি... তুমি পড়নি?” সেদিন বাড়িতে ফিরে এসে মা’কে বললাম যে একটা নতুন নাম শিখেছি। কিন্তু মা চমকে উঠে বললেন, “সে কি তুই জানতিস না উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কথা? বলিনি সুকুমার রায়ের বাবা?” এই সেকি’র প্রতিধ্বনিটা মামার বাড়ি অবধি চলে গেছিল... মামাও একই ভাবে বললেন ‘সেকি!’ ব্যাস্‌ আর কিছু না... দিন সাতেক-এর মধ্যেই মামার বাড়ি থেকে একটা আস্ত উপেন্দ্রকিশোর রচনাবলী বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল, যাতে দ্বিতীয়বার এই ভুলটা আমার না হয়। সেই গল্পটাও পড়েছিলাম, এবং সে পড়ে বুঝেছিলাম, মূল গল্পটা একরকম, তার আদলটুকু নিয়ে সত্যজিৎ রায় কেমন চমৎকার চিত্রনাট্য সৃষ্টি করেছেন... ঠিক যেন – ‘বুঝলে বোঝ, না বুঝলে না বোঝ’।

আবার যদি ঠিক এই সময়ে ফিরে এসে, সেই প্রবাদপ্রতিম মানুষটিকে খোঁজার চেষ্টা করি, কিছু বই, কিছু স্মৃতি কথা আর কখনও কিছু পত্রিকায় ওনার সম্বন্ধে একটি-দু’টি পাতা ছাড়া আর কি কোথাও খুঁজে পাবো তাঁকে? তাঁর লেখা, কাজ, গবেষণা, জীবন-চেতনা সব কিছু যে আজও কত প্রাসঙ্গিক তা এই অস্থির সময়ের প্রজন্মকে কে চিনিয়ে দেবে? রামায়ণ মহাভারতের মত জটিল মনোস্তত্ত্বের নিদর্শন দুই মহাকাব্যকে ছোটদের কল্পনার জগৎ বানিয়ে দেওয়া, পশু-পাখির রূপকের মধ্যে দিয়ে আমাদের সমাজের আশেপাশে সকলকে নিয়ে সুন্দর গল্প করে নীতিশিক্ষা প্রদান করা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সরল করে শিশুদের সামনে সৃষ্টির এক একটা রহস্যকে তুলে ধরা... এই সব কিছুর কি এখন আর কোনও প্রয়োজন নেই? ভারি ভারি দুর্বোধ্য কাব্য-উপন্যাস পড়ার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে। কিন্তু শুরুতে চারা গাছেই যদি ঠিক মত জল না পড়ে, রোদ না লাগে তাহ’লে সে বাড়বে কি করে? টিভির চ্যানেল থেকে খবরের কাগজ, মোবাইল ফোন থেকে কম্পিউটার সর্বত্রই ক্রমাগত দেখছি শৈশব ছিনিয়ে নেওয়ার একশ রকম ব্যবস্থা। বড়দের সিম্‌প্লিসিটি তো চলে গেছেই, ছোটদের স্বভাবচিত সারল্যও এখন বিলুপ্তির পথে। অথচ যে সব কথা স্কুলে, বাড়িতে গুরুজনেরা জ্ঞান দেওয়ার মত বলতে গিয়ে হিমসিম খান... সেই কথায় কত সরল ভাবে বলে দেওয়া হ’ত সেই সময়ের শিশুসাহিত্যে। সেই কথাগুলো কত সহজে ছোটদের বুঝিয়ে তাদের মন জয় করে নেওয়া যায় সেই মডেল উপেন্দ্রকিশোর আমাদের দিয়ে গেছেন। আমরাই বিস্মৃত, খেই হারিয়ে ফেলেছি। জানি, একশ বছর পর, হঠাৎ করে খুঁজতে শুরু করলে অনেক কিছুই আর চট করে পাওয়া যায় না। যা হাতের কাছে আছে সেই নিয়েই শুরু করতে হয়। যা কিছু সংরক্ষিত আছে তাদের নিয়েই আগে ভাবতে হয়। কিন্তু এই ভাবে শুরু করলেও এখনও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং তাঁর বিস্তৃত কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করে, অথবা সেই মডেল অনুসরণ করে এখনও অনেক কিছু করা যেতে পারে। একদিকে যেমন পূর্ণ একাগ্রতার সাথে সংরক্ষণ প্রয়োজন ওনার স্মৃতি বিজরিত সবকিছুর, তেমনই অন্যদিকে প্রয়োজন গবেষণা, আলোচনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির। দু’তিন জন বিশেষ সাহিত্যিক, বা সামাজিক ব্যক্তিত্বকে নিয়েই শুধু বইয়ের পর বই গবেষণার ফসল না ফলিয়ে... এই মানুষটিকে নিয়েও অনেক কিছু কাজ করা যায়। ধনাঢ্য জন্মজয়ন্তীর প্রয়োজন নেই, কিন্তু ওনার সাধনার ফল থেকে আগামী প্রজন্ম যেন বিস্মৃত না হয়ে যায়। ঠিক যে ভাবে হার্জে, হ্যানা-বারবারা, ডিজ্‌নি ছোট বড় সকলের কাছে প্রিয়, তেমনই সকলের কাছে প্রিয় হয়ে থাকুন সেই সৌম্যদর্শন ভাল মানুষটি, যার নাম শ্রী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তাহ’লে আখেরে সকলের লাভই হবে। কেবল স্কুলের ইউনিফর্ম পড়ে ইঁদুর-দৌড় দৌড়নো প্রজন্মটা আবার অক্সিজেন পেয়ে বাঁচবে। হয়ত আবার একটা বইমেলায় গিয়ে আমি, বা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কেউ দেখতে পাবে ছোটদের হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে আবছা ভাবে সেই পরিচিত নামের আভাস পাওয়া যাচ্ছে – ‘হুরুকবাজ সিং’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘খাই খাই’, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘পাগলা দাশু’...

আপনার মতামত জানান