খেলা খেলা

অর্ণব মজুমদার


উনিশ বছরের জীবনে এর চেয়ে নিরীহ কোনও মানুষ দেখেনি শ্রেয়া।
ইদানীং লোকটাকে একটু বেশি মন দিয়ে লক্ষ্য করছে সে। ইদানীং অর্থাৎ দিন পাঁচেক হবে, মায়ের থেকে ব্যাপারটা জানতে পারার পর থেকেই।
লোকটার নাম মানিক। টাইটেল জানা নেই শ্রেয়ার। স্বাস্থ্য খারাপ, তার চাইতেও খারাপ বোধহয় ফিনান্সিয়াল কনডিশান। রাত আটটা অবধি ঘুপচি দোকানটায় মনমরা হয়ে বসে থাকে কতগুলো প্যাঁতপ্যাঁতে আউট অফ ফ্যাশন চশমার ফ্রেম সাজিয়ে। তার মনে পড়ে না, যেতে আসতে কখনও ওই দোকানে কোনো খদ্দের দেখেছে কিনা।
অথচ এই লোকটাই কিনা... কী দুঃসাহস ওর ! নিজের জেনারেল ম্যানেজার বাবার পাশে এই লোকটাকে বসিয়ে ভেবে দেখেছে সে। বয়স আর একই পাড়ায় বাস—এই দুটো ছাড়া আকাশ আর পাতাল।
আর মা কিনা এতদিন কথাটা চেপে ছিল। সেদিন কথায় কথায় মায়ের বয়ফ্রেন্ড ছিল কি না জানতে না চাইলে জানাই যেত না যে এই ননএনটিটিটা একবার মা’কে চিঠি দিয়েছিল !
কথাটা শুনে সত্যি বলতে কি প্রথমটায় মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল। সারা রাত ঘুম আসেনি। ভোরের দিকে মনে হ’ল, ফালতু রাগ। তখন তো মা আর তার মা ছিল না, বাবাও তখন বাবা হয়নি। আর মা যেমন দেখতে ছিল তাতে ব্যাপারটা যে খুবই স্বাভাবিক, তা তো সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে।
তারপর থেকেই লোকটাকে একটু খুঁটিয়ে দেখা। একটু ভাবা। আর যতই ভাবছে ততই মাথার মধ্যে অদ্ভুত সব কথা কিলবিলিয়ে উঠছে।
আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে এই মানিক হয়ত গরিব ঘরের মেধাবি ছাত্র ছিল। হয়ত নিজের চেষ্টায় পাঁচজনের একজন হলেও হতে পারত, আর কে বলতে পারে, হয়ত বাপির থেকেও সফল কেউকেটা গোছের কেউ হ’ত। কিন্তু এমন সময় পাড়ার ছন্দাকে ভালো লেগে গেল। পাগল-পাগল অবস্থা। ছন্দা কিন্তু মোটেও তার ডাকে সাড়া দিল না। --‘একে তো অসবর্ণ, তার ওপর ওই চেহারাছিরি। বাড়ির হাল—তা যত কম বলা যায় ততই ভাল।’ তাছাড়া সে তখন তিনটে বাড়ি পরের কানাডাফেরত স্বপ্ননীলদার স্বপ্নে বিভোর। ব্যাস। অমনি মানুষটা জীবনের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। ঝকঝকে জীবনের হাতছানিকে টা-টা বাই-বাই করে পানসে পৈতৃক ব্যবসায় নামল।
গল্পটা গোটাটাই মনগড়া। শুধু “গরিব মেধাবির” ফান্ডাটা বাদে। ওটা মাথায় এসেছিল ভাস্করের জন্য। নাকি পুরো কনসেপ্টটাই ভাস্করকে সামনে রেখে ভাবা। ও-ও তো তার জন্য পাগল। তফাৎ শুধু মায়ের মতো সে ওকে উড়িয়ে দেয়নি, বরং প্রশয়ই দিয়েছে।
মা’কে জিগ্যেস করা যায়, কিন্তু ইচ্ছা করেনি। আজকাল মা’কে একটু হিংসে হয়। না একটু নয়, বড্ড। কী অসামান্য শক্তি মায়ের। শুধু তার জন্য, তাকে পায়নি বলে একটা মানুষের জীবন বিষিয়ে গেল। মরে বেঁচে রইল লোকটা। আহা, এমন দু-একটা ছেলের জীবন নষ্ট করতে না পারলে নারীত্ব, যৌবন—সবই যে বৃথা।
গাড়িতে বসে বসে এই সবই বুনছিল শ্রেয়া। ভাস্করের ফোনে জাল ছিড়ে গেল। জাস্ট আধ ঘন্টা আগে কলেজের গেটে সি অফ করেছে, এরই মধ্যে আবার...
ফোনটা ধরতে গিয়েও কি মনে করে ধরল না সে। কেটে দিল। তারপর আবার। আবার। আরো একবার। মনে তখন একটা হিংস্র ইচ্ছে ছটফট করছে, ঘাঁই মারছে একটা নিষ্ঠুর পুলক।
শুভ্রজিতটাকে দেখতে বেশ। একটু বোকা বোকা, মাথামোটা টাইপের কিন্তু ওর বাবা সিএ। সব থেকে বড় কথা ওর চোখে নানান কথা খেলা করতে দেখেছে সে। সে’সবের চাঁদমারি যে কে তা বুঝতে অসুবিধা হয়না।
ভাস্কর আবার ফোন করছিল। রিজেক্ট।
***
মাস ছয়েক বাদে কলেজ থেকে ফিরে মা’কে পিছন থেকে জাপটে ধরে একটা চুমু খেয়ে কানে কানে বলল—‘মা গো, আপাতত ওয়ান-ওয়ান।’
--‘মানে? কি বলছিস রে ?’ ছন্দা নিজেকে ছাড়িয়ে মেয়ের দিকে ফিরে জিগ্যেস করল।
কোনো জবাব না দিয়ে মায়ের অবাক হওয়া মুখটার দিকে চেয়ে হা হা করে হাসতে থাকল শ্রেয়া।

আপনার মতামত জানান