ভ্রূণ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


যে দেশে পাহাড়ের উচ্চতা গগনচুম্বি নয়, গিরিশৃঙ্গের শিখর হিম-শৈল হয়ে যায় না... সেখানে সবুজ পাঁচিলের মত এক একটা বিনয়ী পাহাড়ের সারিকে এক একটা সবুজ ঢেউ মনে হয়। তার শীর্ষে পৌঁছনয় পর্বত আরোহনের গৌরব নেই। শুধু অনেক ওপর থেকে দেখা যায়... পাহাড়ের ঢেউগুলো একের পর এক স্থির... আর তার ওপরে মেঘেদের ঢেউ, যে মেঘ মাঝে মাঝে পাহাড়ের বুকে নেমে এসে একাকার হয়ে যায়। মেঘেদের ঢেউ এগিয়ে আসে, একদিক থেকে একদিকে। পাহাড়ের ঢেউ স্থবির। তবু একসাথে মিশে গেলে, শুধু সেইটুকু সময়ের জন্যই মনে হয়... আসলে কেউই স্থির নয়। সেই সবুজ ঢেউদেরই মাঝে কোনও এক সবুজ পাহাড়ের কোলে গভীর অরণ্য। ঘন জঙ্গল যেখানে হালকা হয়ে এসেছে সেখানে কোনও এক আরাধ্যাদেবীর উপাসনাক্ষেত্র। মন্দিরের দুন্দুভির শব্দ একই সঙ্গে পাহাড়ে-জঙ্গলে আর অনেক নিচে সমতলে প্রতিধ্বনিত হয়। সমতলের বাসিন্দারা কেউ কেউ বলে জাগ্রত শক্তি-পীঠ। খালি পায়ে কাঁকড়-বিছানো রাস্তায় হেঁটে দেবীকে সন্তুষ্ট করতে যায়। সেই পীড়া-সহিষ্ণুতা, সেই ক্ষয়ের মধ্যেই নাকি প্রায়শ্চিত্ত, মোক্ষ। সমতলের জঙ্গল সাফ হয়ে জন-বসতি হওয়ার অনেক আগে থেকেই চলছে এই দেবী-স্তুতি। পাহাড়ে জঙ্গলে জন্ম নেওয়া বিশ্বাসের অঙ্কুর, এক মহীরুহ হয়ে লতায়-পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে চড়াই-উতরাই বেয়ে সমতলের পথে পথে। সেই উপসনা ক্ষেত্রর সামনেই, ঝোপ-ঝাড়ের ওপারে দেখা যায় সারি সারি ছোট ছোট প্রস্তর-শিলা মাথা তুলে আছে, ঠিক যেন সৌধ। সৌধই বটে। ভ্রূণ হত্যা পাপ, তবে সেই ভ্রূণ দেবীর শ্রীচরণে উৎসর্গ করলে দেবী দোষ নেন না! সেই হত্যায় পাপ নেই, ঠিক যেমন বলি-প্রদত্ত প্রাণ! সমতলের বিশ্বাস, ভ্রূণ ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই দেবীর আশ্রয় লাভ করে, তার মোক্ষ প্রাপ্তি হয়। সমতলের কুণ্ঠিত, বিহ্বল কুমারী গর্ভবতী; অথবা অবাঞ্ছিত গর্ভের অধিকারিনীদের এখানেই নিয়ে আসে তাদের স্বজনরা... কাঁকড়ে ঢাকা পথে পায়ে হেঁটে পাপক্ষয় করতে করতে। অবাঞ্ছিত ভ্রূণ উৎসর্গ করে যায় দেবীর শ্রীচরণে। স্বেদ, শোণিত আর অশ্রু মায়ের পায়ে বিসর্জন দিয়ে যায় মায়েরা। বহু বছর ধরে উৎসর্গ হওয়া ভ্রূণেরাই মাটিতে মিশেছে এই এক একটি পাথরের নিচে... পাথর তো নয়, সৌধ! জাগ্রতা দেবীর ভক্ত-সমাগমের ভিড়ে কেউ লক্ষই করেনি কখন একটা ছেলে ঝোপ ঝাড় টপকে সেই প্রস্তর-খণ্ডদের মাঝে চলে গেছে। ব্যস্ত হয়ে একের পর এক পাথর তুলে, তার নিচের মাটি খুঁড়ে কি যেন খুঁজে চলেছে একা একা। নিশ্চয়ই পাগল, কিংবা আধপাগলা জংলী। জংলা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একটি মলীন-বসনা, শ্যামবর্ণা মেয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। তারও চোখ দু’টো সেই ক্ষ্যাপার মতই খুঁজছে কিছু। নিজের অগোচরেই যেন একটা হাত চেপে ধরেছে তলপেটের কাছটা। সে ছাড়া এই তন্যতন্য করে খুঁজে মরা পাগলটাকে যেন উপাসনা ক্ষেত্রে আর কেউ দেখতেই পেল না।

পার্কের উলটো দিকের ওই আবর্জনা ফেলার জায়গাটায় কাল সকালে হঠাৎ খুব ভিড় জমেছিল। পুলিস এলো। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে একটা কালো প্লাস্টিক নিয়ে চলে গেল। আজকে ঠিক সেই আবর্জনার মাঝেই একটা মাঝবয়সি লোক নোংরা ঘাঁটছে। বোতাম ছেঁড়া বিবর্ণ শার্ট আর ছেঁড়া ফুল-প্যান্টই তার পরিচয় জানিয়ে দেয়। উলটো দিকের ফুটপাথে, ঠিক তারই মত হাতে-পায়ে ধূলো আর লাল জটপড়া চুল নিয়ে একটি মেয়ে সেই আস্তাকুঁড়ের দিকে তাকিয়ে নিস্পলক দৃষ্টিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। পাগলের খোঁজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন তার ছুটি নেই। সে ছাড়া, এই ব্যস্ত মহানগরে, জনস্রোতে ভেসে যাওয়া আর কেউই আস্তাকুঁড়ের দিকে নজর ফেরাবে না।

আপনার মতামত জানান