সেতু

কেয়া মুখোপাধ্যায়


‘এবার উঠে পড়ুন বাবা, আজকেই তো যাওয়া আমাদের।’তিস্তার ডাক শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসেন সুধাময়বাবু।সারারাত উত্তেজনায় ঘুম আসেনি। ভোরের দিকটায় একটু চোখ লেগে গিয়েছিল।
কত বছর হয়ে গেল সেই উঠোন, ধানক্ষেত,নদী, সেতু, আরতাদেরছুঁয়ে বয়ে চলা হাওয়া ছেড়ে, দেশ ছেড়েচলে এসেছেন। এখন সুধাময় থাকেন কলকাতায় তাঁর ছেলের দামী ফ্ল্যাটে। তবু নদী আর সেতু আজও তাঁকে ডাকে, চুপি-চুপি। আর সেই ডাকের অপ্রতিরোধ্য টানেই বছর-তিনেক আগে জমানো টাকায় একটা জমি আর বাড়ি কিনে ফেলা। অনেকটা দূরে এই শহর থেকে। ছেলে বারণ করেছিল। কিন্তু তাঁকে প্রশ্রয় দেবারও একটি মানুষ আছে,তিস্তা- তাঁর বৌমা।
সেবার যখন শহিদুল মন্ডল এসে ধরে পড়ল, টাকার প্রয়োজনে তার ভিটে বিক্রি করতে চাইল সুধাময়ের কাছে- নদী যেন আবার টানল। শহিদুলের বাড়ি ধুলিয়ান থেকে বেশ খানিকটা দূরে, গ্রামে। একসময় রঘুনাথগঞ্জে সুধাময়ের এক মামার কাছে কাজ করত শহিদুলের বাবা। সেখান থেকেই খোঁজ পেয়েছিল শহিদুল। মনস্থির করতে পারছিলেন না। বৌমাই মনের জোর দিল। কেনার আগে একবার ঘুরে দেখে এসেছিলেন। তারপর থেকে যাচ্ছি-যাব করেও যাওয়া হয়নি আর। এবারে স্কুলে ছুটি পড়াতে বৌমাই উদ্যোগ নিয়েছে, সঙ্গে নাতিও। সব দেখে-শুনে, একটু গুছিয়ে আসা- যাতে পরে সবাই মিলে গিয়ে থাকা যায়।

ট্রেনের পর গাড়ি। গ্রামের নাম মিঠেপুর। ড্রাইভার এই এলাকায় খুব পুরোনো নয়। জিজ্ঞেস করে করে এগোতে হচ্ছিল। ক্রমশ ফাকাঁ হয়ে আসছে। জায়গায় জায়গায় ছোট-ছোট কুঁড়েঘর্। খুব অচেনা লাগে সুধাময়ের। ঘন্টাখানেক ধরে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মিলল না। লোকজন শহুরে মানুষ দেখে কেমন যেন এড়িয়ে যায়। জমি-বাড়ির কাগজপত্র নিয়ে ব্লক-অফিসে যায় তিস্তা। অবাক হয়ে একবার কাগজ আর একবার তিস্তাকে দেখেন অফিসার। ‘কাগজপত্র ঠিক নেই বুঝি?’জিজ্ঞেস করে তিস্তা। ‘তা নয়। অনেকদিন পরে এলেন…আসুন,’- বলে বেরিয়ে আসেন তিনি।গাড়িতে এসে বসে ড্রাইভারকে রাস্তা বুঝিয়ে দিলেন।
একটা সময় গাড়ি থামাতে বলে নেমে গিয়ে ডেকে নেন ওদেরকে।'সাবধানে, অনেকটা উচুঁ হয়ে গেছে এখান থেকে।' মাটিটা কেমন যেন পাল্টে গেছে। চিকচিক করছে। একটু দূরে সার বাঁধা কুঁড়েগুলো।
'আর কতোটা? গাড়ি যেত না?' জিজ্ঞেস করে তিস্তা।‘এসে গেছি;’হাত ধরে সামনের চড়াইটায় সুধাময়কে উঠতে সাহায্য করেন অফিসার। নীচ থেকে যা দেখা যাচ্ছিল না- এবারস্পষ্ট হয় চোখের সামনে। আদিগন্ত ঢেউ তুলে বয়ে চলেছেগঙ্গা।আর সব শূন্য।
'দু’বছর ধরে পাড় ভাঙছিল। গতবছর তলিয়ে গেছে সব।সব-হারানো মানুষগুলো এখন কুঁড়েগুলোতে। দক্ষিণ-পশ্চিমে সরে আসছে গঙ্গা। বর্ডারের কাছে ইসলামপুর, বাজিতপুরও হয়তোহারিয়ে যাবেযেকোনওদিন....’

সুধাময়েরদু’চোখ ভেজা। নদীর কাছে থাকা হল না এবারেও। এগিয়ে আসে তিস্তা। 'নদী তো আমাদের বুকের ভেতরে বাবা- ভালবাসার নদী। আর সম্পর্কগুলো এক- একটা সেতু। আপনার নদী-সেতু কিচ্ছু হারায়নি বাবা..।’
বুকের ভেতর অনেক পাড় ভাঙার শব্দকে উপেক্ষা করে তিস্তার হাতটা চেপে ধরেন সুধাময়।

আপনার মতামত জানান