বাঁধন

মধুমিতা ভট্টাচার্য্য


কলেজে নবীন-বরণের দিনটা যতই এগিয়ে আসছে ততই ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে উত্সাহ উদ্দীপনা বেড়ে চলেছে। সেপ্টেম্বরের তেইশে, বুধবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান।

এবারের নবীন-বরণ কবিগুরুর গানের ডালি দিয়ে সাজানো হয়েছে। ওদের প্রয়াস এবারে কিছুটা নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনা। সবাই জান-প্রাণ দিয়ে খাটছে। রিহার্স্যাল ছাড়াও হাজারটা কাজ। বিশিষ্ট অভ্যাগতদের বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ চিঠি পৌঁছনো ও তাঁদের যথাযথ অভ্যর্থনার আয়োজন, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা, মঞ্চসজ্জা, আরও কতকি! ব্যবস্থাপনার হাজারো চাপে সময়ের চরম অভাব। প্রদোষ, শুভব্রত, সিঞ্চন, শর্মী, প্রীতা, শিঞ্জিনী, সব্বাই ভীষণ ব্যস্ত।

মূল অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধান করছে সিঞ্চন। ভারী ভাল গান গায়। ছুটির দিনে যখন চাঁদনী মাখা সন্ধেবেলায় বন্ধুদের সাথে খোলা মাঠে বসে গান ধরে “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে”..., তখন সত্যি যেন আলো উছলে পড়ে চাঁদের গা বেয়ে। সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে আর শিঞ্জিনীর হৃদয়ে অজস্র রজনীগন্ধা তাদের আকুল গন্ধসুধা ঢালতে থাকে। কস্তুরী হরিণের মত আগল-ছাড়া হয় তার মন।

অনুষ্ঠানের দিন এগোয়, বাড়ে ব্যস্ততা। আর সিঞ্চনকে দেখলেই শিঞ্জিনীর বুকের ভেতর মাদল বেজে ওঠে। সিঞ্চন অবশ্য নির্বিকার। এসবে মাথা ঘামানোর সময় নেই। আগ্রহও নেই বোধহয়।

অবশেষে দিনটা এসেই পড়ে। সকালের অনুষ্ঠানে নতুন ছেলেমেয়েদের মঞ্চে ডেকে পরিচয়ের পালা, সাথে কপালে চন্দন-টিপ আর ঝাউপাতা বাঁধা গোলাপের উপহার।

মিষ্টিমুখ সেরে দিনের অনুষ্ঠান শেষ। সবার সাথে শিঞ্জিনীও হস্টেলে ফেরার উদ্যোগ নিতে সিঞ্চন ওকে অপেক্ষা করতে বলে। বিরাট অডিটোরিয়ামটা তখন শূণ্য আর মঞ্চের ওপর ওরা দুজন। শিঞ্জিনীর মনে ঝড়-তুফান। কি বলবে সিঞ্চন! তবে কি...!

অভ্যর্থনার থালায় রাখা ছোট্ট বাটিতে তখনও চন্দন পড়ে আছে। আর আছে কয়েকটা গোলাপ। হঠাত সিঞ্চন আঙ্গুলে চন্দন নিয়ে শিঞ্জিনীর কপালে টিপ পরিয়ে দেয় আর হাতে দেয় একটা গোলাপ-গুছি। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। শিঞ্জিনী তখন ডুবতে থাকে এক অমোঘ চোরাবালির গর্ভে।

সময় যেন স্থানুবৎ। নিস্তব্ধ চরাচর। কেবল দুটি প্রাণ অনন্ত অস্তিত্ব নিয়ে জেগে থাকে অন্যতর জগতের সন্ধানে। ব্যাকুল হয় এক শারদ-মধ্যাহ্ন।

সন্ধ্যায় শিঞ্জিনী গায় ‘চিরসখা হে, ছেড়োনা মোরে, ছেড়োনা...’। আর সিঞ্চনের ভরাট গলায় ঢেউ ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে...’!

সে বাঁধন চিরদিনের হয়ে ওঠে ক্রমশঃ, তিল তিল করে।

আপনার মতামত জানান