ফেলনা

মৌমিতা বিশ্বাস


দারুন জ্বরে কাঁপছে ওর ছোট্ট শরীরটা। গুটিয়ে-শুটিয়ে এত্তটুকু হয়ে রান্নাঘরে ওর জন্যে বরাদ্দ তিন ফুট জায়গাটুকুতে নিজের মাদুরের ওপর শুয়ে আছে। রাত বাড়ছে, ওই মামা খেতে বসলো সবার শেষে। খাবার ঘর থেকে টুং-টাং আওয়াজ ভেসে আসছে বাসনপত্তরের । দিদা আগেই শুয়ে পড়েছে। মামাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে মামী আর মাসি। এইবার দিদা পানের পিক ফেলবে, শুয়ে শুয়ে চেঁচাচ্ছে দেখো, "মনা, মনা, কোথায় গেলি রে? ডিবে টা নিয়ে আয়। এই ছেলে ফাঁক পেলেই গিয়ে শুয়ে পড়বে, কোনো কাজ যদি হয় একে দিয়ে। কাল ই দূর করে দেব।" ভাগ্যিস এই বাড়ীতে অনেকগুলো ঘর। তাই খাবার ঘর থেকে ওই চেঁচানী শোনা যাচ্ছে না। নাহলে এক্ষুনি মাসি এসে কান ধরে তুলে দিত বিছানা থেকে - "শোয়া বের করছি, হতভাগা ছেলে, সন্ধে হতে না হতেই নাক ডাকিয়ে ঘুম?"
হাতের চেটো দিয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মুছে নিয়ে মনা দিদার গলা আর শুনতে পেল না। পিক ফেলার ডিবেটা হাতড়ে হাতড়ে পেয়েছে নিশ্চই। টানা বারান্দার গ্রীল এ আওয়াজ হলো, এখন আবার কে এলো, এত রাতে? আরে, বড়দির গলা, টিউশন থেকে ফেরার পথে ঢুঁ মেরে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আসে এরকম। এসেই হই হই করতে শুরু করেছে কলেজ এ পড়া বড়দি - "দিদা, দিদা এই নাও মা তোমার জন্যে এই কাঁঠাল পাঠিয়েছে, কাল বাবা এনেছিল। মনা, মনা কোথায় রে? একদান লুডো খেলবি?" বলতে বলতে রান্নাঘরে - "আরে, এরকম করে শুয়ে আছিস কেন রে? কুট্টি, কুট্টি দেখো তো, কি হয়েছে রে মনা? এমা তোর গা তো জ্বরে পুরে যাচ্ছে রে, কি অবস্থা!" এইবার মাসি এসেছে দৌড়ে, "ইশ তাই তো। কি করে বাধালি? যতসব ঝামেলা। নে, হাত তল, কত জ্বর দেখতে হবে এখন। ইশ এতো দেখছি ১০৩ রে ! এত রাত্রে এখন কি করব, পরের ছেলে নিয়ে যত ভোগান্তি। দেখ তো প্যারাসিটামল আছে নাকি।"
এইবার মনা আস্তে আস্তে জ্ঞান হারাচ্ছে। আচ্ছন্ন অবস্থায় টের পেলো ও হাউ হাউ করে কাঁদছে - "বাড়ি যাব, মার কাছে দিয়ে এস আমাকে।মার কাছে যাব, মার কাছে যাব আমি।" মাসি - "মায়া-দি কে আগেই বলেছিলাম, এত ছোট ছেলে, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে তো? কাজ তো ভালই করে, ঐজন্যেই রাখা। এখন ঠেলা সামলাও।"
দেশে শিশু-শ্রম নিষিদ্ধ ? সরকার-বাড়ীর অন্দর মহলের ছায়া-ছায়া স্যাঁত স্যাঁতে দেয়ালগুলো পেরিয়ে সরকার-বাহাদুর এর হুকুম পৌঁছায় না আজ ও।

আপনার মতামত জানান