রিনির গুপ্তকথা/বিশ্বজিৎ রায়

প্রথম পর্ব


রবিবারের বিকেলবেলা বাড়িতে থাকলে রিনির হেভি প্রেম পায়, মানে পায় না । ছোটো ওয়ান বেডরুম , নিজের নয় ভাড়া । একটা ড্রয়িং কাম ডাইনিং তার লাগোয়া বাথরুম আর ছোটো কিচেন । বেডরুমের সঙ্গে সাঁটা চিলতে ব্যালকনি । ব্যালকনিতে দাঁড়ালে পুকুর দেখা যায় – কী যে আরাম হয় চোখের তা বলার নয় । এই পুকুরটা ফ্ল্যাটের পেছন দিকে, বেশ বড়ো, চারদিক বাঁধানো । পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আপনমনে একটা সিগারেট ধরায় রিনি । ব্যালকনিটা সামনের দিকে হলে আর তলায় রাস্তা থাকলে এভাবে হাফপ্যান্ট পরে ঠ্যাং তুলে ফেলুদার মতো ধোঁয়ার রিং ছাড়া যেত না । যতই হোক রিনি বঙ্গললনা । কথাটা ভেবে সে ফিক করে হেসে ফেলল। নিজের মনে মনে হাসা রিনির একটা রোগই বলা যায় । সামনের জাম গাছে দুটো ভেজা বুলবুলি দোল খেয়ে গেল । বৃষ্টি হয়েছে, এখন থেমেছে । আকাশ মেঘলা । সিগারেটে আরও কয়েকটা টান দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল রিনি ।
দেওয়ালের আয়নার সামনে দাঁড়ালো । নিজের চুলটা পেছন থেকে ঘাড়ের কাছ দিয়ে সামনে এনে ফেলে নরম করে লম্বা আঙুল দিয়ে বিলি কাটল । নিজেকে আদর করতে ওর খুব খুব ভালো লাগে , বিশেষ করে চানের সময় । নিজের লম্বা নির্মেদ চেহারাটা দেখে । সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাস্ট্রেতে গুঁজে দিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল রিনি । তারপর পা-দুটো টানটান করে একটু আলস্য ভাঙল । হাত দুটো ওপরে তুলে শুয়ে শুয়েই একটু স্ট্রেচ করে নিল । এতে রক্ত চলাচল ভালো হয় কিন্তু আলস্যটাও বজায় থাকে । ঘোর লাগা আলসেমি এই রবিবারের বিকেলে । রিনির দীর্ঘ নির্লোম পা-দুটির ওপর ব্যালকনির দিক থেকে ভেসে এল মেঘলা হাওয়া । অ্যান্ড্রয়েড সেটটা হাতে তুলে নিল । সরু আঙুলের স্পর্শে আনলক হল স্ক্রিন । কাকে কল করা যায় ! কোন হাই হ্যান্ডসামকে ? আসলে রিনির প্রেম পেয়েছে – মানে প্রেম পায়নি । তার মনের মধ্যে এক বিষাদবুড়ি আছে । সে যেন কাকে খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না । সেই বুড়ি জানে এগুলোর একটাও প্রেম নয় । গিটারের টুং-টাং মাত্র, গান নয় । ‘হাম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো’ অবধি তাও ঠিক আছে কিন্তু ‘চাবি খো গ্যয়া’ যেন না হয় । জাস্ট টাইম পাস । তবে টাইম পাসটাও যার তার সঙ্গে করা যায় না। ছেলেটাকে দেখে ভেতরে একটা স্পার্ক হওয়া চাই, হওয়া চাই গিটারের টুং-টাং । খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের পাতায় আজকাল ‘ফ্রেন্ডশিপ’ বলে কতগুলো বিজ্ঞাপন থাকে । ‘হাই সোসাইটি স্মার্ট রোমান্টিক দুষ্টুমিষ্টি বন্ধুবান্ধবীর সঙ্গে বোল্ড রিলেশন’ , ‘রাত্রি । যেখানে মন চায় কিছু বেশি। উদার ও সাহসী বন্ধুত্বের সীমাহীন মজা। জেলায় জেলায় সার্ভিস।’ – এই রকম সব বিজ্ঞাপন । প্রস্টিটিউশান লিগাল বোধহয় এদেশে কিছুদিন বাদেই হয়েই যাবে । যাক গে যা হবে হবে । তবে যেখানে মানি সেখানে ব্যাপারটা আর ফানি থাকে না বাবুয়া । এমনিতে রিনির আজকালকার ছেলেগুলোকে একেবারে বোগাস লাগে । কোনও ডেপথ নেই । আগেকারগুলোর ছিল কি না বলা মুশকিল । খানিক কথা এগোলেই সেই শরীর শরীর – তবে একটাও শরীরকে হ্যান্ডেল করতে পারে না , ডিগনিটি নেই, কল্পনা নেই । আর মনের কথা মানে শরীর-মনের কথা একসঙ্গে না বলাই ভালো – সিম্পলি ওদের মাথায় ঢুকবে না । গ্রে ম্যাটার কম, অনুভূতি নেই ।
তবু কাউকে কাউকে রিনি কল করে । তখন রিনির একটা কান থাকে হেডফোনে, অন্য কানটা খোলা । যে তাকে গদ্গদ হয়ে প্রেম বলছে তাকে সে স্টাডি করে । একটা কান ছেলেটার কিছু কিছু কথা এনজয় করে , অন্য কান তখন অ্যানালিসিস করছে । হাই হ্যান্ডসাম তুমি এমন কথা আজ বলছ, দুদিন বাদে অন্য কথা বলবে । তুমি আসলে বাপু অত্যন্ত সেক্সিস্ট । কুটোটি ভেঙে দুটো কাজ করার মুরোদ নেই । ওভার প্রোটেকটিভ মায়ের আঁচলে বড়ো হয়েছিস – শালা । এই এনজয় আর অ্যানালিসিস করার সময় রিনির ডান হাত কাগজের ওপর চলতে থাকে । ছবি আঁকে – নানা অ্যাবস্ট্রাক্ট অবয়ব । কোনোটার নাক টিয়া পাখির মতো লম্বা , কোনোটার গাল ভেঙে ঢুকিয়ে দিয়েছে, কোনোটার লম্বাচুলের ধারা – মুখ বলে বোঝা যায় আবার অন্য কিছুও হতে পারে । মাইরি সে যেন মেয়ে রবীন্দ্রনাথ । এমনিতে রিনি ছোটোবেলায় যে ইস্কুলে পড়েছিল তাতে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখার উপায় ছিল না – শ্যামা, শাপমোচন, কর্ণকুন্তী সংবাদ, আগুনের পরশমণি ওই পর্যন্তই । তবে যাদবপুরে পড়ার সময় শান্তিনিকেতনে বাওয়াল করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখেছিল । সেখানে প্রিন্ট কপি – বিক্রির জন্য । কিনেছিল ।
কনট্যাক্ট লিস্টের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল রিনি । পদবি দিয়ে নয়, অনেকেরই কাজ দিয়ে নাম শেভ করে ও । যেমন মধু ইলেক্ট্রিক , হরি আয়রনম্যান । ইস্ত্রিওয়ালা না লিখে আয়রনম্যান শব্দটা ইচ্ছে করেই লিখেছে রিনি । এ পাড়ার ইস্ত্রিওয়ালার ছেলেটার চরিত্র কেমন সে জানে না তবে চেহারা দেখার মতো । তার বাবার নাম হরি, তার যে কী নাম রিনি জানে না । বাবার বয়স হচ্ছে বলে ছেলে এখন দোকানে হাত লাগায় । উনুন ধরায় । ইস্ত্রি গরম করতে দেয় । আর হরি যখন থাকে না তখন ইস্ত্রি চালায় । শীত গ্রীষ্ম বর্ষা একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর একটা টাইট কালো কমদামি জিন্স । গলায় একটা লাল সুতো ঝুলছে – মাদুলিওয়ালা । ইস্ত্রি করার সময় ডান হাতের গুলি নেচে ওঠে । সেখানে উল্কির নকশা । রিনির মুখে ফের হালকা হাসি খেলে গেল । ইস্ত্রিওয়ালার ছেলের ফোনটা দেখেছে সে – চায়না মাল । যে বাক্সমার্কা দোকানে ইস্ত্রি চালায় তার ওপরে টিনের ছাদের খাঁজে মোবাইলটা গোঁজা থাকে । রিনি নাম মোবাইল নম্বর জানে না । ‘সাব অলটার্ন যুবা-সঙ্গে / ও খেলা খেলোনা তুমি মেয়ে / কলকাতার বুকে তুমি/ অন্য ফস্টি নষ্টি কর তার চেয়ে’ মনে মনে বলে উঠল রিনি । তার এই স্বভাবটার কথা অবশ্য কেউ জানে না । এই পদ্য লেখার স্বভাব । এমন পদ্য সে অনর্গল লিখতে পারে । এই পদ্য হল তার বিবেক, তার চরিত্র, তার সংযম । ঘটনায় গলে যেতে দেয় না । পতন থেকে রক্ষা করে । ‘শালা বাল। ’ নিজের মনে বলে উঠল । কবিদের সে একদম সইতে পারে না । একটা দুটোকে টেস্ট করে দেখেছে । গন কেস ।
এসব ভাবতে ভাবতে বিকেলের আলো নিভে গিয়েছিল । উঠে গিয়ে ল্যাম্প- শেডটাকে আলোকিত করে দিল সে । রবিবার সন্ধেবেলা টিউব জ্বালতে নেই । অমন আলো চোখে লাগে । তার ছোটোবেলায় অবশ্য এত অপশন ছিল না । একশো ওয়াটের হলুদ বাল্‌ব । সাদা চুনকাম করা দেওয়াল । কোথাও কোথাও ড্যাম্প । বাবা সন্ধেবেলা অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াচ্ছে । বাবা অবধি অবশ্য মনে মনে যেতে হল না, তার মোবাইল বাজছে । এখন আবার কে ? মোবাইল স্ক্রিনে নামটা দেখে রিনির চোখ নেচে উঠল । এখন এই সন্ধেবেলা এম.কে । কী ব্যাপার ? বিগ বস কেন কল করে !

(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান