প্যাসেজ টু হেভেন/মাসকাওয়াথ আহসান

এসলামের নবী যখন এসাইলামের নবী
বেহেশতে একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। কতৃপক্ষের একটা নোটিশ এসেছে, মহানবী মুহাম্মদকে কোনভাবেই বেহেশতে এসাইলাম পাবার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অর্ধচন্দ্র দিয়ে এসব ফ্রডকে দোজখে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
ঘুম থেকে উঠে এই নোটিশ পেয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে দেবুদা গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। এসলামের সঙ্গে এসাইলামের সম্পর্ক কী!
--আনা তোমার কী আইডিয়া আছে এ ব্যাপারে!
--তুমি বরং তোমার ইহুদী বান্ধবী শ্যারনকে ফোন করো। সে হয়তো এ ব্যাপারে তোমাকে তথ্য দিতে পারবে।
এরিমাঝে এক নাগাড়ে ফোন। প্রথমে বঙ্গবন্ধু।
--দেবুদা চিঠির একটা কপি আমাকে দেয়া হয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমি আবার কী করলাম!
--শ্রদ্ধেয় বঙ্গবন্ধু, আমি এ চিঠির মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝিনি।
--একটু খোঁজ খবর করেন। আমি খুবই বিব্রত বোধ করছি।
--আপনার বিব্রত হবার কী আছে বঙ্গবন্ধু। আপনার মৃত্যুর পর বাংলাদেশে যদি এসলাম আর এসাইলাম নিয়ে কিছু হয়ে থাকে; আপনি সে দায় নেবেন কেন! আমি চিঠির শানে নাযুল উদ্ধার করে আপনাকে অবহিত করছি।
গান্ধীজী চরম অস্থির হয়ে ফোন করেছেন, দেবু ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হতে চাইছে বলেই কী সেখানকার এসলাম ধর্মাবলম্বীরা এসাইলাম চাইছে! তাই কী এই চিঠির কপি আমাকে দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে! ছি ছি একি কেলেংকারী হয়ে গেলো বলো তো; শরীরটা ভালো ঠেকছে না দেবু। খোঁজ নিয়ে জানাও ভায়া!

দেবুদা আর দেরী না করে শ্যারনকে এসএমএস করে। একটা পানীয়ের দোকানে শ্যারনের সঙ্গে দেখা করে। সেখানে কোণার টেবিলে নেহেরু আর জিন্নাহ স্কটিশ মিল্ক শেক খাচ্ছেন আর হাতে সেই এসলাম ও এসাইলাম বিষয়ক চিঠি নিয়ে চিন্তিত মুখে শলাপরামর্শ করছেন।

শ্যারন দেবুদাকে একটু বোঝাতে চেষ্টা করে এসলাম ও এসাইলাম বিষয়টা।
--দ্যাখো জায়নিস্টদের গড হচ্ছে সোনার বাছুর। সোনার দাম কমে গেছে; বরং প্লাটিনামের বাছুর বলি। এখন এদের যে ব্যবসা বানিজ্য; বিশেষ করে অস্ত্র ব্যবসা সেটা চালু রাখতে তাদের যুদ্ধের নানারকম পান্ডুলিপি লিখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের যে শীতল যুদ্ধ সেটা শেষ হয়ে যাবার পর অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে আবার নতুন যুদ্ধের পান্ডুলিপি লিখতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী আল-কায়েদা আর আই এস-এর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এখন এই যুদ্ধ সৃষ্টির জন্য দুটো পক্ষ লাগে। এর একটা পক্ষ নাস্তিক আর আর একটা পক্ষ কট্টর মুসলমানরা।
নাস্তিকদের কাজ বৈজ্ঞানিকভাবে বিবর্তনবাদকে ব্যাখ্যা করা। এসম্পর্কে গবেষণা করা। কিন্তু তাদের অনেকেই ব্যস্ত থাকে মুহাম্মদের বেডরুমের খবর নিয়ে। নিজেরা কিন্তু লিভ টুগেদার করছে, রংধনু যৌনতার উদ্দাম সমুদ্রে ভাসছে, নাস্তিকতার সুগার মমেরা তৃতীয় বিশ্বের নাস্তিক খেলনা বালকদের নিয়ে ফ্যান্টাসী কুইনডোম বানিয়েছে; অথচ মুহাম্মদকে জাজ করার সময় নিজেরা এক একজন সাধুসন্ত সাজছে।
এদিকে মুসলমানেরা পড়ালেখা বিশেষ কিছু শেখেনি। সৌদী আরবের ওহাবী দর্শন এদের ঠেলতে ঠেলতে অন্ধকার যুগে নিয়ে গেছে। আর ভারতীয় উপমহাদেশে মওদুদী কট্টর ইসলামকে রাজনীতি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। ফলে হাঁটুতে বুদ্ধি নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি গোষ্ঠী। এদের আর কিছুই নাই; আছে শুধু অনুভূতি। নাস্তিকদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ে যাদের তেমন কোন দখল নেই; তারা মুহাম্মদকে গালাগাল করাকেই হাল ফ্যাশন বলে ধরে নিয়েছে। অবশ্য চারটে চড়ুই কি বললো তাতে মুহাম্মদের কিছুই এসে যাবার কথা নয়; কিন্তু ঐ যে মওদুদীর তৈরী করা অনুভূতি সমাজ যারা আই এস-এর সদস্য, তারা অনুভূতিতে আঘাত লাগার জিকির তুলে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারছে নাস্তিকদের। এখন যেহেতু এই মওদুদী ভাইরাসের রোগীরা কোরান শরীফ না বুঝে পড়া ছাড়া আর কিছুই পড়েনা; কারো কোন লেখা না পড়েই নির্দোষ নাস্তিকদের হত্যা করে চলেছে। আর গালিবাজ ফ্রড নাস্তিকগুলো ঠিকই এসাইলাম নিয়ে কেটে পড়েছে। টিনের ঘরে বসে শুকনো আলুভাজি আর শক্ত রুটি খাওয়ার চেয়ে ইউরোপের জার্মানীতে গিয়ে হটডগ খাওয়া অনেক ভালো তাদের জন্য।

আর এই যে যারা চাপাতিবাজ এরাও সরকার কতৃক নিপীড়িত বা নির্যাতিত দেখিয়ে এসাইলাম নিচ্ছে বৃটেনে-সুইডেনে। পর্ণকুটিরে বসে পান্তা খাওয়ার চেয়ে পাকা দালানে পাস্তা খাওয়া শ্রেয়তর তাদের জন্য। অনেকে তাদের ধনাঢ্য কট্টরপন্থী ভাইদের স্পন্সরশীপ নিচ্ছে। মানে দক্ষিণ এশিয়ায় একটা স্প্যানীশ ট্র্যাজেডী ঘটিয়ে দিয়ে নাস্তিক গালিবাজ ও ধর্ম ব্যবসায়ী চাপাতিবাজেরা সবাই এসে জড়ো হচ্ছে ইউরোপে। স্বাভাবিকভাবেই যীশু খ্রীস্ট বিচলিত। জায়নিস্টদের এসব মাংসের কারবার ইউরোপকে আক্রান্ত করুক এটা সুশৃংখল দেশগুলো চাইবে কেন! জায়নিস্টের ব্যাংকের ব্যবসা; টাকা ছেপে দিয়ে দিলেই হলো। সামান্য দুটো টাকা দিয়ে উভয়পক্ষের কাউকে টুনা ফিশ কেনার পয়সা দিয়ে, কাউকে চুল কাটার পয়সা দিয়ে হেট স্পীচ পোস্ট লিখিয়ে নিচ্ছে। আর বলদেশিয়ার বলদগুলো লড়ে যাচ্ছে। ঘৃণা ব্যবসা জমে উঠেছে আর কী!

দেবুদা বিস্মিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় কত সমস্যা আছে। শিশু হত্যা, নারী ধর্ষণ, বিভিন্ন ধর্মের লোকের জমি দখলের লড়াই, রাজনীতিবিদদের অন্তহীন সার্কাস, দুর্নীতির প্লেগ। আপদ হিসেবে এসলাম হেফাজত করা মোল্লা পার্টি আছে। ওদিকে হিন্দুত্ববাদীদেরও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চুলকানি বাড়ছে; এরমধ্যে এই নতুন আপদ জুটেছে এসলামের নবীকে গালি দিয়ে এসাইলামের জন্য প্রয়োজনীয় ডেথ থ্রেট্রের স্ক্রীণশট জোগাড় করা নাস্তিক পার্টি। যদি লাইগা যায়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ফোন করেন, আচ্ছা দেবু আমরাও তো ব্রান্ম আন্দোলন করেছিলাম; কিন্তু এসাইলাম নেয়া লাগেনি কোথাও।
দেবুদা হাসে, কবিগুরু আপনারা এমনি এদেশ-ওদেশ ঘুরতে পারতেন, আপনাদের এসাইলাম লাগবে কেন!
কবিগুরুর সঙ্গে কবি নজরুল বসে ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা কবিতা লিখে সমাজের ইঁট খুলে নিলাম। মোল্লা-পুরুতেরা ক্ষেপে গেলো। কিন্তু এসাইলামের কথা তো ভাবিনি। নতুন যুগের ব্যবসা বানিজ্য বুঝতে পারিনা গুরু।
এখন দোজখে যে মওদুদী গ্যাং আছে এরা বুদ্ধিটা পেয়ে গিয়ে যীশু খ্রীস্টকে নিয়ে যা-তা বলতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার কট্টর খ্রীস্টান যাজকেরা ক্ষেপে যায়। জায়নিস্টদের যুদ্ধ ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতা রথশ্চাইল্ড মওদুদী গ্যাং ও কট্টর যাজক গ্যাং উভয় গ্যাং-কেই টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করে। দোজখে শুরু হয়ে যায় ধর্মযুদ্ধ। উভয় পক্ষের চালাক-চতুর লোকেরা বেহেশতে এসাইলামের জন্য আবেদন করে। ঈশ্বর খুবই বিরক্ত এরকম বিশৃংখলায়।

আবার নোটিশ আসে, ঈশ্বর বুঝে গেছেন পৃথিবী নামক গ্রহটিতে অযথা মনুষ্য প্রজাতির পেছনে সময় নষ্ট হয়েছে অনেক। এরা পৃথিবীতে শান্তি নষ্ট করছে। এমন কী দোজখ-বেহেশত সব জায়গায় তিক্ততা ছড়িয়ে দিয়েছে। তাই এখন 'আর্থ টু পয়েন্ট ও' নামের নতুন গ্রহের সবুজ মানুষদের নিয়ে নতুন সভ্যতা বিকাশের চেষ্টা করা হচ্ছে। অসভ্যদের জন্য কোন সময় ঈশ্বরের দপ্তরের কারো হাতে নেই।
এই নোটিশ দেখে পুলকিত হয় বেহেশতের গোবরডাঙ্গা ও শিয়ালনগরের মোল্লা ও সাধুবাবা। তারা সব সময় বিশৃংখলার খোঁজে থাকে।
বঙ্গবন্ধু গান্ধীজীর আশ্রমে বিশেষ বৈঠক ডাকেন। পরিস্থিতি ভালো মনে হচ্ছে না। এক্ষুণি একটা কিছু করা দরকার।
বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর চাকর মুশতাক আর গান্ধীজীর আশ্রমের চাকর নাত্থুরাম যথারীতি কাউকে কিছু না বলেই দোজখে পালিয়েছে। ওখানে যুদ্ধের বাজারে কিছু টাকা-পয়সা কামানোর ধান্দায়।
গান্ধীজীর আশ্রমে অনেকেই এসেছেন। সবার মুখ থমথমে।
ইন্দিরা গান্ধী আলোচনা শুরু করেন।
--ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি দেশেই সাধারণ শিক্ষা, ইংলিশ মিডিয়াম এডুকেশান আর মাদ্রাসা আশ্রমকেন্দ্রিক তিনটি ধারার শিক্ষা পদ্ধতি চালিয়ে আমরা তিনধরণের মানুষের জন্ম দিয়েছি। চারা যেমন রোপণ হয়েছে; বৃক্ষও তেমনই হবে। এখন আর অনুতাপ করে কী লাভ!
মওলানা আবুল কালাম আজাদ মাথায় হাত দিয়ে বসে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াটা এমন একটা কনফিউজড জনপদ হয়ে গেছে যে এই ভ্রান্তির গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া যে সত্যিই কঠিন।
বঙ্গবন্ধু বলেন, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ ৃস্টান-নাস্তিক সবাই পাশাপাশি থাকুক। একজন আরেকজনের সঙ্গে পায়ে পা বাধিয়ে গন্ডগোল পাকানোর দরকারটা কী!
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা—
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।

আপনার মতামত জানান