রিনির গুপ্তকথা/বিশ্বজিৎ রায়

দ্বিতীয় পর্ব


প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিঙ্কে

(২)
মোহিত কুমার মনে মনেই শুধু অনেকরকম মানুষ সাজতে ভালোবাসে না , কথাতে লেখাতেও অনেকরকম মানুষ সাজতে ভালোবাসে । এম.কে-র পক্ষে কাজটা এখন সহজ হয়েছে । সোশ্যাল নেটওয়ার্কে একাধিক নাম পরিচয়ে প্রোফাইল খুললেই হল । ইদানীং সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আবার নানারকম নজরদারি শুরু হয়েছে । বেশ কয়েকট পর্ন- সাইট বন্ধ করে দিয়েছে দেশের নতুন সরকার । কদ্দিন এমন নানা লোক সাজা যাবে কে জানে ! হয়তো হিন্দুত্ববাদী সরকার বলল, হিন্দু সন্ন্যাসী রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, মন মুখ এক করতে । যার অনেক কটা মুখ তার আর মন মুখ কী করে এক হবে! অমনি হয়তো দিল্লির জরুরি অর্ডার এল । নজর রাখো – এ রাজ্যে কারা ফেক প্রোফাইল খুলছে । টের পেলেই ধরে পাঠাও হাজতে – রাষ্ট্রীয় শত্রুর কোনও শেষ রাখতে নেই । হিন্দুধর্মের শত্রুরা নিপাত যাক ।
এম.কে-র অবশ্য ব্রহ্মার কথা মনে পড়ে গেল । পুরাণে আছে কি নেই তা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না । তবে শুনেছিল দেবতাদের ঠাকুরদা ব্রহ্মা নাকি একদিন দু-চোখ ভরে অপ্সরার নাচ দেখছিল । সে সেক্সি-বেটি ঘুরে ঘুরে নাচছে । পিতামহ ব্রহ্মা দু-চোখে এক-মুখে সেই নাচের সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না , এদিকে দেখার ইচ্ছেও ষোলো আনা । অমনি নাকি সেই ইচ্ছে পূর্ণ করার জন্য তার আরও তিনখানা মুখ হল । চারমুখো ব্রহ্মা যে মন মুখ কী করে এক করে ? অবশ্য রেজিমেন্টেশানে সবই হয়, হতে পারে । চারমুখ সেখানে এককথা বলে । পার্টির সত্যই তখন পরম সত্য । ব্রহ্মার সবমুখ সমস্বরে বলে ওঠে, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ কিম্বা ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রেসিডেন্ট।’
এম. কে-র এই চব্বিশ তলা থেকে কলকাতাটাকে বেশ লাগে । বিশেষ করে সকালবেলা । চমৎকার ক্যানভাস যেন । তার ওপর সবুজ আর নীল রঙের খেলা । ওপর থেকে শুধু ভূগোলই দেখা যায়, ইতিহাস চোখে পড়ে না । এখন সয়ে গেছে, কিছুদিন আগে কলকাতা দক্ষিণের রাস্তায় যেতে গেলেই এম. কে-র মনটা ইতিহাসের ভাঙা-বন্ধ ছায়া দেখে খচ খচ করত । বন্ধ হয়ে যাওয়া কালির কারখানা, ল্যাম্পের । ক্রমে ক্রমে পুরনো গড়গুলো ভেঙে পড়ল । আজাদগড়, বিক্রমগড়, বিজয়গড় – বংলাদেশ থেকে চলে আসা ছিন্নমূল মানুষের কলোনি সব । জায়গাগুলো সমূলে বদলে যেতে লাগল । এদিক-সেদিক দিয়ে ফ্লাইওভার খুলে যায় আর বদলে যায় এক-একটা পাড়া । এই তো সেদিন লেক-গার্ডেন্স ফ্লাইওভার হল । ছোটো হয়ে গেল দেশের খাবারের মতো পুরনো বড়ো দোকান । পঙ্কজিনী চ্যাটার্জি রোডের মুখ মিশে গেল ফ্লাইওভারের শরীরে । পাড়ার ভেতরের একতলা দোতলা বাড়িগুলো ভাঙা পড়ল । ফ্ল্যাট হল । এমনকী যে দেববাবুর কাছ থেকে জমি কিনে উদ্বাস্তু ভদ্রলোকেরা একসময় পাড়া বসিয়েছিলেন সেই দেববাবুর শরিকেরা পর্যন্ত তাদের বাগানের জমি ছেড়ে দিল নামি কন্সট্রাকশন কোম্পানিকে । ছিমছাম সুদৃশ্য ফ্ল্যাট হল সেখানে – তাতে আর বাঙালিরা ফিরে আসতে পারল না । বাঙালিদের অত দামি ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ নেই । কলকাতার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে বাঙালিরা । ইতিহাস, ইতিহাস – বাঙালির হেরে যাওয়ার ইতিহাস ।
আচ্ছা এম.কে কী একটু বাঙালি বাঁচাও, বাঙালি বাঁচাও হয়ে যাচ্ছে ? নিজেকে প্রশ্ন করে সে । তারপর ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় । পায়ের তলায় তার কৃত্রিম ঘাস । সকালের হাওয়া ঝাপটা মেরে গেল । এই ব্যালকনির সামনে কোনাকুনি বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা, বদলে যাওয়া গড় । আর তাদের টাওয়ারের পিছন দিকে কোনাকুনি কিছু দূরে কিহুদিন আগের লেকগার্ডেন্স ফ্লাইওভার । সেদিকটা দেখা যায় না । সামনেটা সকালে আশ্চর্য সুন্দর লাগে । সবুজ, নীল ক্যানভাস – লালচে হয়ে সূর্য উঠবে । পূর্ণিমা থাকলে এই খোলা সুউচ্চ ব্যালকনি বড়ো মায়াময় লাগে । চাঁদ চলে লুটিয়ে কাপড় । তখন হাতে হুইস্কির গ্লাস নিয়ে তার মনে হয় ইতিহাস মরেছে বেশ হয়েছে । আজকাল কোনও মেয়ের নাম কেউ সুলেখা রাখে ? রাখে না । কালিতে কেউ লেখে ? লেখে না । সুলেখা কালির কারখানা তো বন্ধ হবেই । চাঁদের ওপর মেঘ খেলে যায় । মেঘের ছায়া মেখে চাঁদের আশ্চর্য লুকোচুরি । এম.কে-র তখন সব আবার গণ্ডগোল হয়ে যায় । এই আকাশ ছোঁয়া উঁচু বাড়িতে সুন্দর ভূগোল ছাড়া ইতিহাস জেগে ওঠার কথা নয় তবু হঠাৎ করে অতীত, ইতিহাস জেগে উঠতে চায় । তখন ব্যালকনি থেকে দৌড়ে চলে আসে এম. কে । হুইস্কির নিঃশেষিত গ্লাসখানা টেবিলের ওপর রাখে । একদৌড়ে বিছানায় । উপুড় হয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু তবু ইতিহাসকে চেপে রাখতে পারে না । সে তো শুধু মোহিত কুমার নয় । কুমারের পরে তো আরেকটু ছিল । কুমার মধ্যপদ । পদবী আর কিছু । কেন কেন সেই পদবী কেটে ফেলল সে ! কেন ? কী তার কারণ ? সেই আরেকটু জেগে ওঠার মুহূর্তে এম.কে বিছানা থেকে ওঠে । টলতে টলতে এগিয়ে যায় । লাগোয়া ওয়াশরুম । কমোডে ফ্লাশের জলের নীল ঘূর্ণি দেখে । নিজেকে তখন অনেকটা খালি খালি লাগে, ক্লান্ত । তারপর আবার বিছানায় এসে শোয় ।
গত একবছর ধরে খুব বুড়ো সাজতে ইচ্ছে করছিল এম.কে-র। একটা লোক, ধরা যাক তার জন্ম ১৯৪১ সালে । রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকাল । নেতাজী ছদ্মবেশে কলকাতা ছাড়লেন । জাপানি বোমার ভয়ে লোকজন কলকাতা থেকে দেশের বাড়িতে । তখন হাওড়াব্রিজ তৈরি হচ্ছে । ক্লিভল্যান্ড ব্রিজ নাম । রবীন্দ্রসেতু নামটা তো পরে হল । হাওড়া স্টেশন যাওয়ার জন্য পল্টুন ব্রিজ সম্বল । পাশাপাশি অনেককটা গাধাবোট সাজিয়ে তৈরি এই পল্টুন ব্রিজ ।
সেই নবজাতক এখন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, পঁচাত্তরের কাছাকাছি । স্বাধীনতা আর দেশভাগের স্মৃতি খুব প্রবল নয়, ছয়-সাত বছরের স্মৃতি তো খুব প্রবল হয় না । তবে অনেক কিছুই তিনি দেখেছেন । ধরা যাক তিনি এখন মোটামুটি সুস্থ, ছেলে মেয়ে দুজনেই বিদেশে । একজন ইউ কে, একজন স্টেটস । বউ মারা গেছে । দক্ষিণ কলকাতায় রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে নিজের বাড়িতে একাই থাকেন – বাড়িটা ঠিক রাসবিহারীর ওপর নয়, সমান্তরাল মহানির্বাণ রোডে । বাড়িটা তিনি তৈরি করেননি । তাঁর বাবা করেছিলেন । এই বাড়িতেই জন্মাবধি আছেন । বাড়ির সামনে দিয়ে বাস চলে না; ট্যাক্সি চলে, চলে প্রাইভেট কার – অলটো, ওয়াগনর । নাম পরিমল বসু । সঙ্গে কেউ থাকে না বলে ছেলে-মেয়ের টেনশান । বাবা একা একা থাকে । কিন্তু পরিমলবাবু কলকাতাতেই থাকতে চান । রান্নার লোক আছে, অনেকদিনের । পরিমলবাবুর স্ত্রী নিজের হাতে এই আরতিকে রান্না শিখিয়েছিলেন । আলুপোস্তে হলুদ দিতে নেই । নামাবার সময় কাঁচা সর্ষের তেল ওপরে ছড়িয়ে দেবে । ঝোলের আলু চাঁদের মতো করে কাটতে হয়, ডানলার আলু ডুমোডুমো । ঠিকে কাজের লোকটা আরতির মতো অতটা পুরনো না হলেও, বেশ সাত আট বছর হয়ে গেল । পরিমলবাবুর স্ত্রী শেফালি তখন অসুস্থ, তবে শয্যাশায়ী নন । এর কয়েক বছর বাদেই শেফালি পড়ে গিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন, আর উঠলেন না । আরতিই এই ঠিকে লোকটাকে এনে দিয়েছিল ।
একা একা লাগলে পরিমলবাবু ছেলে-মেয়ের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলেন । লেখার অভ্যেস ছিল । ডায়রি লিখতেন । শেফালিকে পড়ে শোনাতেন । মা মারা যাওয়ার পর ছেলে একবছর উইন্টারে এসে ল্যাপটপের ব্যবহার ও প্রয়োগ সংক্রান্ত ওয়ান উইকের কোর্স দিল । ছেলের সঙ্গে নাতি । নাতিরই দাদুকে কম্পিউটার শেখানোর ব্যাপারে উৎসাহ বেশি । স্কাইপ ,অভ্র ডাউনলোড করে দিল । সোশ্যাল নেটওয়ার্ক কী তা বুঝিয়ে দিল । সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বিপদ-আপদের কথাও বলতে কসুর করল না । পরিমলবাবু শুনলেন মন দিয়ে, বুঝলেন । তারপর একহাতে খুট-খুট করে টাইপ করতে শুরু করলেন । প্রথম প্রথম খুব স্লো । যখন নিচু হয়ে কিগুলো খুঁজতেন তখন চশমাটা নাকের ওপর নেমে আসত । নাতি মজা পেত ।
মহানির্বাণ রোডে সন্ধে নামছে – নাতি স্কাইপে বরফ দেখাচ্ছে । বিলেতে বরফ পড়ছে – ল্যাপটপটা তুলে নাতি বিলেতে ওদের বাড়ির জানলার কাছে নিয়ে গেল । কাচ দিয়ে বিলেতের বাইরেটা দেখা যাচ্ছে । রাস্তায় বরফ । আহা ! পরিমলবাবুর বাবার খুব শখ ছিল পরিমলবাবুকে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে পাঠাবেন । তাদের দেশ ফরিদপুর । কলকাতার এই বাড়িটা দেশ ভাগের আগেই করেছিলেন বাবা । রাসবিহারী তখন ছিমছাম রাস্তা । পরিমলবাবুর ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যাওয়া আর হয়নি ।
অভ্রতে বাংলা লেখাটা পরিমলবাবু একহপ্তার মধ্যে তুলে ফেললেন । নাতি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল । পরিমলবাবু সেখানেই লেখেন । যা মনে হয় লেখেন । লেখার ভাষাটা চলিত নয়, সাধু। সাধু চালটাই এখনও ভালো লাগে পরিমলবাবুর । আপন মনে হয় ।
সকাল পাঁচটা নাগাদ মাঝে মাঝে মোহিত কুমার, এম.কে পরিমলবাবু হয়ে যায় ।
পরিমলবাবু লেখেন ‘আমার অন্তিম বাসনা’ ।
‘হাসপাতালের কথা আর কী বলিব ! হাসপাতাল যত দামি হইবে তত নানা কার্যে মোহন রমণীদের আনাগোনা দৃষ্টিগোচর হইবে । স্বর্গ কোথায় জানা নাই । শুনিয়াছি স্বর্গে অপরূপা অপ্সরাগণ নৃত্য করেন । ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রমুখ দেবতারা তাহা অবলোকন করেন । স্বর্গে যাইব কি না জানা নাই । স্বর্গ আছে কি না তাহাও বলিতে পারি না । তবে বেসরকারি দামি হাসপাতালে যেন মরিতে পারি । যখন ঢুকিব তখন রোগ গভীর হইবে না । বাৎসরিক চেক-আপের নিমিত্ত যাইব । তথায় তন্বী সুশ্রী রূপটানে অসামান্যা রমণীদের অবলোকন করিব । চেক-আপ কালে হৃদয়ে বেদনা হইবে । রমণীয় স্মৃতি লইয়া সহসা মরিব।’
শুধু হাসপাতাল নয় পরিমলবাবু সব কিছু নিয়েই লেখেন ।
‘কতকাল বাটা মশলার রান্না খাই নাই । গৃহিণী বাটনা বাটিতেছেন দেখিলেও ভালো লাগিত। পশ্চাত হইতে দেখিতাম । গৃহিণী আমার দিকে মুখ ফিরাইল । কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । কেশলতা কপালে নামিয়াছে।’
‘আমার ইস্কুল ছিল আদি গঙ্গার নিকটবর্তী । চেতলা বয়েজ । আদি গঙ্গার হাওয়া গায়ে লাগিত । আদি গঙ্গায় তখন নৌকার আনাগোনা । ঘাটে নৌকা লাগাইয়া মাঝিরা কালীঘাটে দেবী দর্শন করিত।’
এম. কে এই খেলাটার একটা নাম দিয়েছে, ‘সংবদল’ । সং মানে রূপ । রূপবদল – একরূপের বদলে অন্যরূপ হিসেবে নিজেকে সাজানো, অন্যের রোল প্লে করা । এমনিতে ভাঁড়দেরও সং বলে । আগে কলকাতায় নানা পাড়া ছিল – জেলে পাড়া, কাঁসারি পাড়া । এই সব পাড়ার সং – লম্বা প্রশেসন । গান গাইত – শরীরী গান, কেচ্ছামূলক গান । সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি । কাঁসারি, জেলে এই সব মানুষগুলোর আমোদ হত । তখন তো মোবাইলের চায়না সেটের আমোদ-প্রমোদ ছিল না । এখন আর ওসবের চল নেই । তাতে কী ? অনেক মানুষেরই তো রূপবদল করতে ইচ্ছে করে । সব সময় শরীরের রূপ নয় , মনে মনে রূপবদল । সেক্সচেঞ্জ করা নয় । সেটা তো অন্য ক্রাইসিস । এটা হল মনে মনে অন্য একটা লোক হয়ে ওঠা । তার মতো করে কথা বলা, ভাবা । যেমন এম.কে লেখায় ভাবনায় ভোরবেলায় মাঝে মাঝেই পরিমলবাবু ।
অন্যসময় অবশ্য সে এক ও অদ্বিতীয় এম.কে । স্মার্ট অ্যাডগুরু । বিজ্ঞাপন জগতে এম.কে বিগ বস। কোন মডেলকে যে কীভাবে কাজে লাগাবে তা এম.কে-র মতো জাস্ট কেউ ইমাজিন করতে পারে না । এম.কে ইজ অ্যা ভিসনারি অ্যান্ড মিশনারি টু । এম.কে- র স্পর্শ পাওয়ার জন্য হট-সেক্সি মডেলরা একটা সময় হা-পিত্যেশ করে থাকত । এম.কে-র এমনিতে শরীর নিয়ে ইনিহিবিশান নেই । তবে কেমন যেন উদাসীন সন্ন্যাসী টাইপের । হয়তো কারোর সঙ্গে শুয়েছে, চূড়ান্ত মুহূর্তে হঠাৎ উঠে গেল । কিছু একটা ভাবনা মাথায় ক্লিক করেছে । আর বিছানায় ফিরবে না এম.কে-র শরীর । নগ্ন নির্মেদ উদাসীন এম.কে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় । তার মন আর চোখ তখন শরীরে নেই যেন । বিদেশি ভাস্কর্যের মতো লাগে ও শরীর । শয্যাসঙ্গিনী অবশ্য সেই পুরুষ-ভাস্কর্য উপভোগ করতে পারে না । বরং তখন উল্টোদিকের শরীরটার চূড়ান্ত ফ্রাস্ট্রেশন হয় । মন ভেঙে যায় । নিটোল নগ্ন শরীর পুরোটা দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে মেয়েটি । শোয়ার কথা তো উদগ্র হয়ে এম.কে বলেনি । ঘটনাচক্রে শোয়াটা হয়ে গিয়েছিল । অ্যাড ওয়ার্ল্ডে মেয়েরা এই অভিজ্ঞতা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে । এমনিতে এম.কে মানবিক, মুডি, ছোঁকছোঁকে নয় । বিছানায় গেলে কাজ দেবে এমনও নয় সে । মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছেয় যেত । এখন ইচ্ছে হলেও তারা সাহস করে যায় না । এম.কে-র এই হঠাৎ উদাসীনতার মধ্যে অসম্ভব রূঢ়তা আছে । সেটা এম. কে টের পায় না, মেয়েরা পায় । এই প্রত্যাখ্যান মেয়েদের সমস্ত কনফিডেন্সকে ভেঙে খানখান করে দেয় । এম.কে ইমপোটেন্ট নয় – সর্বাঙ্গ সুস্থ । হি ক্যান । তার সঙ্গে অর্গ্যাজম হয়েছে কারও কারও । সেই মুহূর্তটাকে মনে আর শরীরে বহন করেনি এম.কে । চাইলে এই বিগ বসকে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের চার্জে প্রতিহিংসাকামী কেউ ফাঁসাতেই পারত । পারেনি, কারণ চায়নি । সবাই তো এম.কে-র বিছানার অংশীদার হওয়ার যোগ্য নয় । যে কারও কারও সঙ্গে হয়েছে তারা বোধহয় এই উদাসী রাজকুমারকে ভালোই বেসে ফেলেছে । কখনও কখনও ভাঙা গড়ার চেয়েও মূল্যবান । বারান্দায় নগ্ন স্থির এম.কে । অথবা একবার অর্গ্যাজমের পর সব ভুলে যাওয়া এম.কে । তার দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ‘তুমি তো আমাদের পৃথিবীর লোক নও।’
এই অ্যাড গুরুর শরীর ও মন আজও যেন তাই অ্যাড ওয়ার্ল্ডের মানুষজনের কাছে ব্রহ্মের মতোই অনুচ্ছিষ্ট । তার কাছে প্রফেশনালিজমটাই সব – এক একজনের চাহনি, শরীরকে এক একটা প্রোডাক্টের জন্য ঠিক কেটে-ছেঁটে অপরূপ করে তুলবেন এম.কে । আনডাউটেডলি হি ইস অ্যা জিনিয়াস ।
রবিবার বিকেল থেকেই পরের দিনের কাজটা এগিয়ে রাখে এম.কে । তার ঘরময় অজস্র নানা পোজের মেয়েদের ফটোগ্রাফ । এই সারি সারি মুখের মধ্যে থেকে তাকে বেছে নিতে হবে তিরিশ সেকেন্ডের মেয়েটিকে । ফটোগ্রাফগুলোকে নানা ভাবে বিচার করছিল এম. কে । শুধু সুন্দর ও আকর্ষণীয় হলেই তো হবে না । প্রতিটি প্রোডাক্টের ক্রেতা নির্দিষ্ট । তাদের সামাজিক অবস্থান এক এক রকম । এই সব বিচার করে সং মানে রূপ ঠিক করা চাই । ঘরের ঠিক মাঝখানে এম.কে । চারদিকে মেঝেতে অজস্র মেয়ে সং । আর এম.কে নিজের ছন্দে নেচে চলেছে । একটা ছবি হাতে তুলল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল । ফেলে দিল । আবার একটা । এটাও না । এইভাবে চলতে থাকে , চলতেই থাকে । অ্যাড গুরু এম.কে আকাশের দেবতা ব্রহ্মার থেকেও যেন অন্যরকম । সে অক্লান্ত দৃষ্টিতে নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখে ব্রহ্মা সৃষ্ট এই রমণী শরীরগুলিকে । তারপর সেখান থেকে কাউকে বেছে নিয়ে তার ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসে অন্যদৃষ্টি অন্য পদবিক্ষেপ । সেই দৃষ্টি আর পদবিক্ষেপ, শরীরের আবরণ-উন্মোচন-আভরণ উজ্জ্বল করে তুলবে একটি ক্রয়যোগ্য দ্রব্যকে । মনে হবে সাধারণ মানুষের এই টা কিনলে কাজ উসুল, পয়সা উসুল ।
রবিবারের বিকেল সন্ধের দিকে এগোচ্ছে । আলো জ্বালতে হবে । দূরে টেবিলের ওপর শুয়ে আছে এম.কে-র মোবাইল ।


(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান