রিনির গুপ্তকথা/বিশ্বজিৎ রায়

তৃতীয় পর্ব


তিন
এমনিতে রিনিকে বাইরে থেকে দেখলে যতটা টানটান মনে হয় আসলে রিনি ঠিক ততটা ছিলা টান নয় । আফটার অল সে বর্ন অ্যান্ড ব্রট আপ ইন অ্যা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি । সেখানে শরীর খারাপ মানে পিরিয়ড হলে মা ঠাকুর ছুঁতো না, তখন রিনিকে দরজার চৌকাঠে গঙ্গাজল ছিটিয়ে তিন-চার দিন সন্ধে দিতে হত । ঠাকুরের খাবার নকুলদানা । সেই নকুলদানা খানিক বাদে পিঁপড়েরা খেত । নকুলদানাগুলোকে তখন আর চেনা যেত না । পুরোটাই একটা কালো গোল । মা, ‘এই যা’ বলে রিনিকে ফের অর্ডার করত । রিনি তখন বলত, ‘আমি এখন আর তোমার ঠাকুরের কাপড় আবার পরতে পারব না।’ আনলায় ঠাকুরের ঘিয়ে রঙা শুদ্ধ কাপড় আলাদা করে রাখা থাকত । রিনি আলগোছে ঠাকুরের তাক থেকে ছোট্ট স্টিলের থালা গ্লাস তুলে নিত । ঠুকে ঠুকে পিঁপড়েদের জোট ভেঙে চ্যাটচ্যাটে নকুলদানা ঢেলে রাখত খালি হরলিক্‌সের শিশিতে । মাসের শেষে যখন চিনি ফুরিয়ে যেত তখন এই সঞ্চয় ভাঙত মা । চিনির বদলে নকুলদানা গোলা চা । বাবার তখনও ডায়াবিটিস ধরেনি । বাবা লুঙ্গি পরত ও ডায়রিতে প্রত্যেকদিন লাইন টেনে টেনে হিসেব লিখত । গোটা পরিবারের মধ্যে একটা সেন্স অফ ইন্‌সিকিউরিটি কাজ করে যেত । কী হবে কী হবে ভাব ! এই বুঝি গেল । এরই মধ্যে খানিক আনন্দ খেলত যা এমনিতে পাওয়ার কথা নয় তা পেলে। খুবই ছোটো ছোটো জিনিস । যেমন এক সপ্তাহে হয়তো রেশানে ভালো চাল এল । এমনিতে তারা রেশনের চাল খেত না । তবে লম্বা লম্বা চালের বস্তা খোলা হলে রেশনকাকু চুপি চুপি খবর দিত । আর মা তখনই বাবাকে রেশন দোকানে পাঠিয়ে দিত । তারা জানত জীবনের সব বেদনার মূলে আছে এক ও অদ্বিতীয় অম্বল । বুক-ব্যথা করলে, মাথা ঘুরলে, জ্বর এলে প্রথমেই অম্বলের ওষুধ খেতে হয় । এমনকী অম্বল না হলেও দুবেলা ভাত খাওয়ার পর অম্বলের ওষুধ খাওয়া ভালো । অম্বল হল অনেকটা ব্রহ্মের মতো । সব রোগের কেন্দ্রে থাকে সে । বাবার বুড়ো বয়সে সোডিয়াম-পটাসিয়াম ইমব্যালেন্স হলেও প্রথম প্রথম মা অম্বলের ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করত । তা এমন বাড়িতে যে মেয়ে বড়ো হয়েছে সে দুহাজার সালের পর যতই অন্যরকম কিছু শিখুক না কেন কত আর ক্যাট ম্যাট গ্যাট হবে ? সেই আদি অম্বল যাবে কোথায় ! রিনিরও যায়নি । সেসব নিয়ে অবশ্য ও খুব একটা কিছু ভাবে না । ছিলা টান জীবনের পাশাপাশি সে জীবনও রিনি দিব্যি যাপন করে ।
সিগারেট হাফপ্যান্ট জীবনের পাশাপাশি , ইচ্ছে প্রেম জীবনের পাশাপাশি, বাওয়াল-হুল্লাট জীবনের পাশাপাশি স্বরচিত ব্যায়াম ও স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীত জীবন । তখন রিনিকে দেখে খানিক মায়া হবে, খানিক হাসিও পাবে । বিশেষ করে যে রবিবার সন্ধেবেলা একটু ক্যাট-ম্যাট-গ্যাট হওয়ার কথা সে রবিবার সকালে রিনি তার কলকাতার এই একচিলতে ভাড়া নেওয়া বাসায় ওয়ার্কআউট নয়, স্বরচিত ব্যায়াম করে । যেমন শুয়ে শুয়ে একটু পা নাচালো । পা-নাচানোসন । বার চারেক হাই তুলল । হাই-তোলাসন । খাট থেকে লাফ দিয়ে মেঝেতে আবার মেঝে থেকে লাফ দিয়ে খাটে । লাফ-লাফায়াসন । আসনের মতোই আসনের নামগুলোও স্বরচিত । ব্যাকরণের নিয়ম না মেনে করা ও দেওয়া । আসনের শেষে একটি স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া রীতি । ‘ওগো খেয়ো না, খেয়ো না তুমি বেশি তরল / খাক তারা খায় যারা এলোকেশী গরল/ ওগো খেয়ো না, তুমি খেয়ো না / বারেক ফিরাও মোরে গেলাসের পারাবারে / আমি রয়েছি বসিয়া তবো বেদনারও দ্বারে / তুমি ভেবো না ওগো ভেবো না নিয়ে আমারে / এ জীবন নহে কিছু, নহে যে গো সরল / খাক তারা খায় যারা এলোকেশী গরল’ গানটা গুন গুন করতে করতেই রিনি রবিবারের ইংরেজি কাগজের রাশিফল আর লাইফস্টাইল সংক্রান্ত গ্লসি পেপারগুলো পড়ে ফেলে ।
আসলে রিনি অনেকটা তার রান্নাঘরের মতো । রিনির রান্নাঘরটা আবার কলকাতা শহরের মতো । মানে নানা বিপরীতের সহাবস্থান । অসমাঞ্জস্যময় । একটা বিশাল শপিং মল । তার পাশেই ছোটো গলি । গলির এদিক-ওদিক নানা ট্র্যাশ, আবর্জনা । এই একটা এ.সি বাস গেল । তার পেছনে একটা মুড়ির টিনের মতো সাবেকি বাস । সব আছে । এদিকে স্লিভলেশ অথচ হাতে লালসুতো মাথায় দগদগে সিঁদুর । রিনির অতটা নয় তবে খানিকটা । রান্নাঘরে এখনও মায়ের দেওয়া একটা হিন্ডালিয়ামের চায়ের বাটি, পেছন কালো তাওয়া, অ্যালুমিনিয়ামের খান তিনেক নানা সাইজের ভাতের হাঁড়ি, স্টিলের তেলচিটে তরকারি রাখার বাসন আছে । রিনি যখন যাদবপুরে পড়তে এসে কয়েকজন বন্ধু মিলে মেস করে থাকবে ঠিক করল তখন মা দিয়েছিল । মায়ের সংসারের উদ্বৃত্ত । বাবা তখন বেঁচে । যাদবপুর পর্ব মিটে গেছে । বাবা চলে গেছে । রিনি এখন ফ্রি-লান্সার । টুকটাক প্রোজেক্ট, কাগজে কলাম এসব করে চালাচ্ছে । স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিলে স্কুল মাস্টারি একটা হয়তো জুটে যেত । মায়ের সেরকমই বাসনা ছিল । কিন্তু বাসনায় বাসনায় কি সব সময় মিলমিশ হয় ! হয় না । হলে সংসারটা হেভি বোরিংও হয়ে যেত । দিদিমনি রিনি । চোখে চশমা । একখানা বর । জামাতা বাবাজীবন । বাবাহীন মায়ের জীবনের ভরসা ।
রিনি এক মেয়ে । বাবা মায়ের বেশি বয়সের মেয়ে, হবে না হবে না ভাবতে ভাবতে হাল ছেড়ে দেওয়া দশায় হয়ে যাওয়া মেয়ে । বাবার আদরের মেয়ে । সে মায়ের এই বাসনা মেনে নিতে পারেনি । বাবা রিটায়ারমেন্টের টাকায় বাড়িটা করে যেতে পেরছিল । একতলা । ব্যাঙ্কলোন পর্বের আগে বাঙলি মধ্যবিত্তের বাড়ি যেমন হত তেমন । রিটায়ারমেন্টের পর আর বেশিদিন থাকেনি । রিনি যাদবপুরের ইতিহাস – তখন এম. এ পাশ করে সবে একটু দম নিচ্ছে । বাবা চলে গেল । রিনির পক্ষে কলকাতা ছাড়া সম্ভব হল না , মায়ের পক্ষেও বাবার করে দেওয়া বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় আসা হল না । সুতরাং মা আর মেয়ের বাসনায় বাসনায় দূরত্ব থেকেই গেল । দুজনের বাসনার মাঝে একটা দড়ির ব্রিজ আছে । সে ব্রিজে উঠলে ব্রিজটা দোলে । তবু রিনি সেই দুলুনি ব্রিজ ধরে নিজের বাসনাগুলিকে মাঝে মাঝে কৌটোবন্দী করে মায়ের কাছে যায় । দু-তিন দিন থেকে আসে । ওষুধ-বাজার করে দেয় । চেনা পাড়া, কলকাতা থেকে খুব দূরে নয় । চলে যাচ্ছে । রান্নাঘরে মায়ের দেওয়া বাসনগুলোর পাশেই শৌখিন কাটগ্লাস , নানা মাপের । একটা শেষ হয়ে যাওয় ওল্ড মঙ্কের বোতল ।
সন্ধে রাতে সেদিন তার ভবানীপুরের স্ট্যাগ পার্টি । বিকেলের পর থেকে রিনি আবার ছিলা টান । কে বলবে সে এইট্টিজ দেখা বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে । হালকা পুলকা জামাকাপড়ই বর্ণার স্ট্যাগ পার্টিতে ভালো । সিম্পল ঢিলে-ঢালা । যেখানে খুশি যেমন খুশি বসা শোয়া যায় । আর থাকবে তো ওরা পঞ্চরত্না, পাঁচ বন্ধু । বর্ণার বাবা-মা দিন তিন চারেকের জন্য বাড়ি নেই । দুজনেই বর্ণার ঠাকুমার কাছে গেছেন । বর্ণা যায়নি, অফিস দেখিয়ে থেকে গেছে । সুতরাং হুল্লাট জাগ্রত দ্বারে , সন্ধের অন্ধকারে । বসিবেন পঞ্চরত্না । বলিবেন যার যাহা যাতনা । সখী যাতনা কাহারে কয় ! সে কি কেবল হুল্লাটময় ।
এমনিতে স্ট্যাগ পার্টি ব্যাপারটা তো ছেলেদের একচেটিয়া । ব্যাচেলার্স পার্টি । কোনও একজন ছেলের বিয়ের আগে একজোট হয়ে পুরুষালি হুল্লাট । আহা রে বিয়ে করে একগামী হতে হচ্ছে তার আগে নিজেদের মধ্যে এই শেষ ফস্টি-নষ্টির পার্টি । রিনিরা এই আদি ডেফিনেশানের মুখে কবে গোলি মেরেছে । তাদের পাঁচজনের কেউই এখন বিয়ে করতে চায় না । তবে একটু, আধটু, অনেকটুকু অ্যালাউড । পাঁচজনের কেউ এই সবের মধ্যে গেলে পার্টি দেয় । তারপর ব্যাপারটা নিয়ে হ্যা হ্যা খ্যা খ্যা । ছেলেদের নিয়ে চাটনি । যুবতীগণের অংশকালীন বয়ফ্রেন্ড নিন্দা । সে উপসর্গ যদি নাও থাকে তবুও পার্টি দেওয়া চলে । বাড়ি ফাঁকা থাকলেই হল । রিনির ফ্ল্যাটটা একানে । এখানে দেওয়া যেত । তবে বেশি হুল্লাট হলে একা থাকা মেয়েদের ভাড়া বাড়ি থেকে তুলে দেয় এখনও কলকাতায় । বর্ণার বাড়িটা অনেক সেফ । বাবা-মায়ের বাড়ি – বর্ণাকে কেউ তুলে দেবে না । বর্ণার পুরো নাম বর্ণিনী সেখান থেকে বর্ণি না হয়ে বর্ণা হয়েছে । ই-এর থেকে আ-এর উচ্চারণ বোধহয় জিভের পক্ষে সহজ ।
অল উইমেন’স পার্টি মাঝে মাঝে একটু একঘেয়ে । যতই ঝাল-ঝোল-চাটনির ব্যবস্থা থাক না কেন একটু পানসে লাগে । ঠিক হ্যায় ভাই । চালিয়ে দাও, মানিয়ে নাও । তুমি তেমন ছেলেই বা পাচ্ছ কোথায় ! ‘গার্লফ্রেন্ড মার্কা’ ছেলে । কথাটা রিনি হাসতে হাসতে ব্যবহার করে । এ খানিকটা সোনার পাথরবাটির মতো । মেয়েদের শরীর মন মেয়েরাই বুঝতে পারে – ছেলেরা নয় । পারত যদি তেমন মন থাকত । সে মন পুরুষ পুরুষ হলে চলবে না । মেয়েদের মতো হতে হবে । ওই যে রাধাভাবদ্যুতিসুবলিত না কি একটা বলত না যাদবপুরের বাংলার ছেলে মেয়েগুলো । শরীরটা পুরুষের কিন্তু মনটা রাধার । তবে হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ করে কেটে পড়লে হবে না । চৈতন্যে রাধার মতো হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ করে কেটে পড়লেন । তাঁর সেকেন্ড ওয়াইফ বিষ্ণুপ্রিয়ার কি শরীর মনে কম কষ্ট ছিল ? গার্লফ্রেন্ড মার্কা ছেলে তাই পুরোটা রাধাভাবদ্যুতিসুবলিত কৃষ্ণ নয় । আরও অন্যরকম । কেয়ারিং, সিনসিয়ার। তা এ রকম ছেলে পাওয়া যাবে কোথায় ! ভূত বর্তমান কোথাও দেখা যাচ্ছে না । অগত্যা সখীসমিতি ।
রিনির একটা স্কুটি আছে । ওর তখন সাত-আট হবে । চোখ গোলগোল করে ও সাদা-কালো টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন দেখত । সুরটা কানে ছিল, পরে ইউ টিউব-এ দেখেছে টু-হুইলারের বিজ্ঞাপন সেটা । বুলন্দ ভারত কি বুলন্দ তসবির । একটা স্কুটারের বিজ্ঞাপন – গোটা পরিবার সেই স্কুটারটাকে ঘিরে হাসি খুশি । রিনির বাবার স্কুটার কেনার শখ ছিল কি না রিনি মনে করতে পারে না । তবে তার কাছে এই স্কুটিটা এসেনশিয়াল । বুলন্দ মানে রাজকীয় ,ম্যাগনিফিশিয়েন্ট – হলুদ রঙা এই স্কুটিটা খুবই ক্যাট । কলকাতা শহরে রবিবার সন্ধে আটটার পর কোনও মেয়ে স্কুটি চালিয়ে টই টই করে যাচ্ছে এ খুব পরিচিত দৃশ্য নয়, অন্তত এখনও । কিন্তু রিনি এই বুলন্দ তসবিরখানি ও ক্যালকাটাকে উপহার দিতে চায় । সে এমনিতে আকবর বাদশার হেভি ফ্যান – টেবিল নয় শিলিং । আকবর দ্য গ্রেট যিনি হিন্দু-মুসলমানকে সমান অধিকার দিতেন, লেখাপড়া জানতেন না বলে রামায়ণ মহাভারতের অনুবাদ করিয়ে তার সঙ্গে নানা ছবি আঁকাতেন, চমৎকার গো-শালার মালিক ছিলেন সেই আকবর বাদশা গুজরাট জয় করে বুলন্দ দরোজা বানিয়েছিলেন – ফতেপুর সিক্রির মুখ্য প্রবেশ দ্বার । এখনকার গুজরাট আকবরের মতো সব ধর্মের প্রতি সহনশীল কেউ দখল করে নিলেই বুঝি ভালো । রিনি তো আর কলকাতায় বুলন্দ দরোজা বানাতে পারবে না । তবে বুলন্দ তসবির উপহার দেবে । একটা স্বাধীন মুক্ত মেয়ের ছবি । চাইলে সে রাতের বেলা পার্কস্ট্রিট যাবে, পার্ক সার্কাসে দাপাবে, নিউ টাউনে লাফাবে । একটা মেয়ে রাত্রি নটা দশটা এগারোটার সময় তিরবেগে কলকাতা শহরের বুকে স্কুটি চালাবে । মাঝে মধ্যে মনের সুখে শিস দেবে । এঁকে বেঁকে ওভারটেক করবে । স্কুটিটা ময়দানে রাখবে – তারপর ডাবল স্ট্যান্ড করে স্কুটির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে একটা সিগারেট ধরাবে । ওপরে উদার আকাশ । সপ্তর্ষি মণ্ডল । আচ্ছা বাবা আকাশের ঠিক কোথায় আছে ! বাবাকে কি তাকে সিগারেট খেতে দেখল ! তাহলে বুলন্দ তসবির থেকে সিগারেটখানা আপাতত বাদ দেওয়াই যাক । স্মোকিং ইজ্‌ ইনজুরিয়াস টু হেলথ । স্মোকিং কজেস ক্যানসার ।
হালকা পুলকা একটা ঢোলা পাজামা আর রঙ চঙে একটা স্লিভলেস কুর্তা পরে রিনি রবিবারের সন্ধেবেলা তার স্কুটিতে অটো স্টার্ট দিল । রবিবারের কলকাতার সন্ধের একটা অলস মৌতাত আছে । রাস্তাগুলো অন্যদিনের তুলনায় ফাঁকা । অন্যদিন যে গাছটা চোখেই পড়ে না সেটা রবিবার ফাঁকা বলে দেখা যায় । তখন মনে হয় ওমা এখানে এই বকুল গাছটা ছিল বুঝি ! রিনির স্কুটি এগোচ্ছে । স্কুটিতে গিয়ার নেই । রিনির অবশ্য অবশ্য গিয়ারওয়ালা গাড়ি চালানোর খুব শখ । গাড়ি মানে চার চাকা সে এখন কিনতে পারবে না । তবে একটা পালসার হলে মন্দ হত না । পায়ের কাজ হাতের কাজ সব মিলিয়ে জমজমাট । পায়ে করে কিক দেওয়া । বড়ো চাকা । রবিবারের বিকেলবেলায় লোক কম থাকে কিন্তু লোকের আড়চোখ কিছু কম থাকে না । বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের , ওই যাদের গিন্নি-বান্নি বলে তাদের আড়চোখ রিনিকে দেখে নিল । সন্ধেবেলা মেয়েটা ট্যাঙস ট্যাঙস করে স্কুটি করে কোথায় যায় ! লুকিয়ে নয় – বুক ফুলিয়ে অভিসারে ।
রিনি খানিকটা এগিয়েই দেখে আয়রনম্যান । আজ ইস্ত্রি চালাচ্ছে না । বাক্স দোকানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । মাছওয়ালা ছেলেটার সঙ্গে গল্প করছে । রেডিওতে গান বাজছে । মাছওয়ালা ছেলেটাকে রিনি চেনে । বাজারে দেখেছে । মাছও কিনেছে ওর কাছ থেকে । যাদবপুর এইট বি বাজারে সিমেন্টের বাঁধানো ধাপের তলায় বসে । সকাল সকাল একদিন বাজার গিয়েছিল রিনি । এমনিতে খুব নিয়মিত সে বাজার করে না । টুকটাক সবজি কিনে চালিয়ে দেয় – ফ্রোজেন মুরগি । সেদিন মাছ খাওয়ার শখ হয়েছিল । ছেলেটা তখন দোকাআন সাজাচ্ছে । প্লাস্টিকের বরফ দেওয়া ক্রেট থেকে মাছগুলো বের করে জলে ধুয়ে নীল মোটা প্ল্যাস্টিকের ওপর সাজিয়ে রাখছিল । রিনি যেতে বলল, ‘কি কিনবেন দিদিভাই ? দাঁড়ান । সাজিয়ে নিই । লোকাল কাতল আছে । পাবদা, চিংড়ি, পমফ্রেট।’ রিনি মাছ দেখছিল । সাজাতে সাজাতেই কথা বলছিল ছেলেটা । খান দুই মস্ত সিলভার কাপও রয়েছে । এতো বড়ো সিলভার কাপ রিনি আগে দেখেনি । তার ছোটোবেলায় সিলভার কাপের খুব একটা খদ্দের ছিল না । রুই কাতলার থেকে এ মাছ কম দামি । মাসের মাঝমাঝি বাবা অনেক সময় কিনত । তবে সেগুলো এত বড়ো হত না । সিলভার কাপের দিকে রিনির চোখ আটকে আছে দেখে ছেলেটা বলল, ‘দিদিভাই সিলভার খাবেন । খাসিকেও লজ্জা দেবে । এ মাছের টক যা হয় না । আমি একবার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম । বৌদি টক রান্না করেছিল।’ বঁটির ফলাটা কাঠে লাগিয়ে ইঁট দিয়ে ঠুকে ঠুকে সেট করতে করতে কথাগুলো ছুঁড়ে দিল । ‘না থাক । তুমি বরং বড়ো কাতলাটা থেকে পাঁচশো মতো দাগা-পেটি মিশিয়ে দাও।’ ঘচাৎ করে কাতলার মুণ্ডু কেটে ফেলল ছেলেটা । ডান হাতের মুঠোয় এই মুড়োটা ধরে একটু চিপে টপটপ করে ঝরে পড়া রক্ত লাগিয়ে দিল অন্য মাছেদের গায় । সংসারে তাজা রক্তের ডিম্যান্ড আছে । টাটকা রক্ত হলেই হল কার রক্ত তা জেনে কী হবে ! অন্য মাছগুলোর গায়ে রক্ত লাগাতে লাগাতেই বলল, ‘পাঁচশোয় হবে তো দিদিভাই ? মাসিমা মেসো আপনি।’ মাছওয়ালা মোটেই রিনিকে চেনে না । চেনা একটা ছকে ফেলতে চাইছে । কাস্টমার লক্ষ্মী । কথাগুলো লেগে গেলে সকাল সকাল আর একটু বেশি মাছ বিক্রি হয়ে যেতে পারে । আগে পাড়ায় কে আসছে কে যাচ্ছে বাজারওয়ালাদের মোটামুটি একটা হিসেব থাকত । এখন কোন ফ্ল্যাটে কবে কে আসছে কে যাচ্ছে তা আর খেয়াল রাখার উপায় নেই । তাই মুখ না চিনলে বাজারওয়ালারা একটা চেনা ছকে ফেলে দিতে চায় । বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে । কলকাতার বাইরে চাকরি । এসেছে, বাপ-মায়ের জন্য বাজার করছে এমন একটা গল্পে রিনিকে সেদিন সকালবেলায় ঢুকিয়ে দিতে চাইছিল ছেলেটা । ছোকরা ব্রাইট। ইতিহাস থেকে কর্পোরেট সেক্টার সবাই তো মানুষকে কোনও না কোনও খোপেই ঢোকাতে চায় । প্রতিটি মানুষই এক্কেবারে আলাদা এটা ভাবলে ইতিহাস লেখাও যায় না বাজারে কোনও প্রোডাক্টও বেচা যায় না । কেবল দুজনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুজনেই দুজনের কাছে ইউনিক । কিন্তু তাও আর হচ্ছে কই । তাই তো রিনির মাঝে মাঝে প্রেম পায় কিন্তু একটাও প্রেম হয় না । ঝিনুক, ঝিনুক সব ঝিনুক, মুক্ত নেই । আশ্চর্য অদ্বিতীয় মুক্ত কোথায় !
খুব কায়দা করে আয়রনম্যান আর মাছওয়ালা ছেলেটার পাশ দিয়ে স্কুটিটা নিয়ে বর্ণার বাড়ির দিকে চলল রিনি ।

আপনার মতামত জানান