চাচা চৌধুরী আর জুপিটার গ্রহের প্রাণী সাবু!

অভীক দত্ত

 


ছবি- তৌসিফ হক


-কম্পিউটারের থেকেও তেজ কার ব্রেন বলত?
বাবাই চোখ মিটমিট করে প্রশ্নটা করল। আমি চাপটাপ খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটু আগে খেলে এসেছি মাঠ থেকে। কাদা মাঠে খেলে গোটা শরীরে চোরকাঁটার আদরের দাগ। কোনমতে স্নান সেরে জামাকাপড় পাল্টে বসতেই ওর এই প্রশ্নবাণ। আমি বুঝলাম না কি বলা যায়।
শেষ মেষ বললাম “জানি না”। আর কিছুই বলার ছিল না।
বাবাই বিজয়ীর হাসি হেসে বলল “চাচা চৌধুরী”।
আমি অবাক। সে আবার কে? তারপর বাবাই একটা কমিক্সের বই বের করল। জুপিটার গ্রহে যে প্রাণী আছে আর সেটাই ইয়া লম্বা আর তার গুরু যে চাচা চৌধুরীর মত কম্পিউটারের চেয়েও দ্রুতগামী চিন্তাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি সেটা প্রথম জানলাম।
আর যাও বা জানলাম, তারপর থেকে বাবাইয়ের উপর হেব্বি হিংসা হল। কি চকচকে বই, ব্যাটা আমাকে পড়তেও দিচ্ছে না। ক্লাস থ্রি তখন। মামীর কাছে পড়তে গেছি, আর ওখানে এই লোভ দেখাচ্ছে বাবাই।
কোনমতে বাড়িতে এসেই বায়না শুরু। আমার ছোটবেলায় ধারণা ছিল বাবার অফিসে সব খেলনা সাজানো থাকে আর বাবা বাড়িতে ফেরার সময় ওখান থেকে একটা খেলনা বেছে বুছে নিয়ে আসে।
আমাদের ওখানে পেপার মার্ট বলে একটা দোকান ছিল। ওখানে এই হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল সহ লোভনীয় বইগুলি একটা পাতলা দড়িতে ঝোলানো থাকত, ওগুলির দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে থাকতাম যখনই রাস্তা দিয়ে যেতাম। তখন হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল, নন্টে ফন্টের মার্কেটে চাচা চৌধুরী ঢুকে পড়েছে প্রবল গতিবেগে, ডায়মন্ড কমিক্স হিন্দি বইগুলির তেড়ে বাংলা অনুবাদ করছে (যদিও সে অনুবাদ ছিল অতীব ভুলভাল)।
বাবাই বলল ওর নাকি পাঁচটা চাচা চৌধুরী, দুটো বিল্লু আর একটা পিঙ্কি কেনা হয়ে গেছে। এদিকে বাবা বলছে একটা করে কিনে দেবে প্রতি রবিবার। বইটা আসতেই গোগ্রাসে গিলে ফেলছি। একদিকে চাচা চৌধুরীর ব্রেন, আরেকদিকে জুপিটারবাসী সাবুর শক্তি। কোন কমিক্সে সাবু পাঁচ হাত বাড়ির সমান লম্বা, আবার কোনটায় চাচা জীর থেকে দু তিন হাত বেশি। ডাকু গব্বর সিং আর ঝর্ঝর সিংয়ের সমস্ত শয়তানি আটকে যারা অপ্রতিরোধ্য।আর ছিল রাকা। যে ভয়ংকর এক শক্তিশালী দস্যু। ওর সাথে সাবুর লড়াইয়ের সময় শ্বাস রোধ হয়ে আসত। মাঝে মাঝে আবার ভেল্কি দেখাত চাচা চৌধুরীর কুকুর রকেট। ডগডগ ছিল চাচাজীর লরি যেটা করে তারা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন আর অভিযানে যেতেন।

সুপারম্যানেরা প্যান্টের ওপর জাঙ্গিয়া পরে আর আমাদের সাবুর পোশাক শুধু জাঙ্গিয়াই।কখনও কখনও প্যান্টও পরে, জামা খুব কম। আর চাচাজীর পাগড়ি তো বিখ্যাত। ওর নীচেই সেই বুদ্ধি লুকানো আছে। পনেরো থেকে পঁচিশের মধ্যে দাম ছিল বইগুলির।
ছোটমামা চিত্তরঞ্জনে চাকরি করে। হাওড়া স্টেশনে গেলেই শুরু হয়ে যেত আমার বায়না। মোটা বইগুলির জন্য। মা বিরক্ত, মামা বিরক্ত। আমি অপ্রতিরোধ্য। কিনে দিতেই হবে। ওর লোভ সাংঘাতিক। যত বইই পড়ি না কেন এই বইগুলি কিছুতেই ছাড়া যাবে না। কিনে দিতেই রাস্তায় বেরলে ট্রেনের দুলুনিতে কমিক্স পড়ার মজাই যে অন্য! এদিকে বন্ধুদের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু, কার বেশি কমিক্স জমেছে, কার কম। বইগুলির শুরুর দিকে থাকত প্রাণের জীবনী। হঠাৎ করে প্রাণের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সেদিনগুলো চোখের সামনে সিনেমার মত ভেসে উঠল যেন।
ক্লাস ফাইভে উঠতে অবশ্য চাচা চৌধুরীর আকর্ষণ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছিল। সবই প্রায় এক ধরণের ছাঁচে ফেলা গল্প খুব একটা টানত না আর আমাকে। তখন আবার একটা বইয়ের আবির্ভাব হয়েছে বাড়িতে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কিশোর সমগ্র প্রথম খন্ড। টেনিদা কাবু করে ফেলল আমাকে। ফেলুদা, হেমেন রায় এসে পড়েছে। “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি” দিয়েছে স্কুল লাইব্রেরী থেকে।
গোঁসাইবাগানের “বুরুন তুমি অঙ্কে তেরো”, “বক্সার রতন”, “হেতমগড়ের গুপ্তধন”, অর্জুন, গোগোল,ঋজুদা, কাকাবাবুরা ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। কোথায় পড়ে থাকল চাচা চৌধুরী আর জুপিটার গ্রহের প্রাণী সাবু!

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান