ফুটবল এবং ইত্যাদি ইত্যাদি

অভীক দত্ত

 

ফুটবল আমি খেলতে পারি না। একেবারেই খেলতে পারি না। ক্রিকেট যতটা ভাল খেলি ফুটবল ততটাই খারাপ খেলি। গরম কাল পড়লে যখন পাড়ার মাঠে ফুটবল শুরু হয়ে যায় তখন খারাপ সময় শুরু হয় আমার।
পায়ে পা গুণে পাঁচ পায়ের মাপে চটি দিয়ে গোল বানিয়ে খেলা হয়। আমাকে কোথাও লুকোবার জায়গা পাওয়া যায় না। ফরোয়ার্ডে খেললে কেউ চার্জ করতে এলেই বল ছেড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ি। ডিফেন্সে খেললে আগুয়ান গতিতে ছুটে আসা স্ট্রাইকারকে দেখলে এয়ার ইন্ডিয়ার পাগড়ি পরা ভদ্রলোকটার মত “সুস্বাগতম” বলে নিজেদের গোল দেখিয়ে দি। আমাকে দেখলে লাল্টুদার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মাঠের নিয়ম হল সবাই খেলবে। কোন কোনদিন দুই টিমে তেরো তেরো ছাব্বিশ জনও খেলে। পায়ের জঙ্গলে বল খুঁজে পাওয়া যায় না। খেলা শেষে সবাই জামা টামা খুলে গোল হয়ে বসি। ঘাম শুকাতে শুকাতে গল্প চলে। সাড়ে ছটার সময় ঘামে ভেজা জামাটা প্যান্টের সাথে বেঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরি। গা হাত পা মুখ ধুয়ে পড়তে বসি।
যাই হোক, যে কথাটা হচ্ছিল সেই কথাটা বলি, মোদ্দা কথা হল, আমার জঘন্য ফুটবল খেলায় খচে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন লাল্টুদা আমাকে গোলে দাঁড় করিয়ে দেয়। বলে “যেখান দিয়েই বল আসুক, পা এগিয়ে দিবি। আর কিছু করতে হবে না। সত্যি বিল্টা এত ভাল ব্যাটসম্যানটা ফুটবল খেলতে নামলে এমন ল্যাটামাছ হয়ে যাস কী রে জানব বল”। আক্ষেপে লাল্টুদা দুদিকে মাথা নাড়ায়। কিন্তু ঘটনা হল গোলেও আমি বিশেষ সুবিধা করতে পারি না। টিম হবার সময় দুই দলের মধ্যে মারপিট হয় আমাকে কোন দল নেবে তাই নিয়ে। কেউই নিতে চায় না।
আমি ভাবি লাল্টুদার কথাটা। ব্যাটসম্যান কি ভাল ফুটবলার হতে পারে না? না হবার কী আছে? এই তো আমাদের দাদা তো ফুটবলও শুনেছি দারুণ খেলে। ফুটবলার হতে চেয়েছিল শেষ মুহূর্তে ক্রিকেটার হয়ে যায়।
কিন্তু আমি তো কোনদিনই ফুটবলার হতে চাই নি। কিন্তু এই সময়টা ফুটবল না খেলে যাবই বা কোথায়? মাঠে খেলা হবে আর মাঠের বাইরে আমি বসে থাকব এটা তো চরম দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারব না।
যাই হোক, এবার আসল গল্পে আসি। ধান ভানতে শিবের গান করে লাভ নেই। আমি যে ফুটবল খেলতে পারি না সেটা সবাই বুঝে গেছে।
ঘটনা হল, এই ফুটবল খেলা আর গোলে দাঁড়িয়ে ক্যাবলার মত গোল খেতে খেতেই কখনও নজরেই আসে নি পাড়ায় একটা নতুন ফ্যামিলি এসেছে।
যার মধ্যে একটা আমার সাইজের মেয়েও আছে। আসলে আমি এতটাই খেলা পাগলা, মেয়ে টেয়ে কোনকালেই দেখা হয়ে ওঠে নি। ঘুম থেকে উঠে মাঠের খেলা নিয়ে ভাবি আর খেলা হয়ে গেলে রাতে সেই খেলার স্বপ্নই দেখি।
এই খেলতে খেলতেই একদিন গাধার মত তিন চারটে গোল খেয়ে গেছি, একটা তো একেবারে দু পায়ের ফাঁক দিয়ে ঠেলেই ন্যাড়া মদন গোল দিয়ে দিয়েছে, আমি ভয়ে ভয়ে লাল্টুদার দিকে তাকাচ্ছি হঠাৎ শুনি গোলের পেছনে দুটো মেয়ের সে কী হাসি! রেগে মেগে তাকাতেই দেখি আমাদের পাড়ার পিঙ্কি আর অচেনা একটা মেয়ে। বলটা ওদের দিকেই গেছিল, সেটা আনতে আনতে আমি দু চোখ দিয়ে পিঙ্কিকে ভস্ম করে দিতে দিতে বললাম “এত হাসার কী আছে তোদের?”
পিঙ্কি হাসতে হাসতেই বলল “বিল্টুদা পিউদি জানতে চাইছে তুমি মাঠের মধ্যে এরকম কত্থক নাচছ কেন?”
আমি কটমট করে পিউ নামের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম “এটাকে কত্থক বলে না, ফুটবল বলে। এটা নিয়ে এত হাসাহাসির কিছু নেই। যারা খেলা বোঝে না তারাই এটা নিয়ে হাসে”।
পিউর হাসি থামছিল না। পিঙ্কি বলল “না বোঝার কী আছে, ফুটবল কী এমন না বোঝার জিনিস?”
আমি রেগে মেগে ওই জায়গা ছেড়ে আবার গোলে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাচ্চা বাচ্চাদের কথায় কান দিতে নেই বেশি।
সব মিলিয়ে সাতটা গোল খেলাম। লাল্টুদা খেলার পরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল “পরের উইকে নর্থ স্টারের সাথে ম্যাচ আছে বিল্টু। সেটা আবার তেকাঠির খেলা। পাঁচ পায়ের গোল না। তোকে কোথায় খেলাব ভাবতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার”।
বাপি মৃদুস্বরে বলার চেষ্টা করল “বিল্টুকে কেন নিতে হবে? ফুটবলে সেরা এগারোর মধ্যে বিল্টু কবে আসে?”
লাল্টুদা এক ধমকে বাপিকে চুপ করিয়ে দিল “থাম তুই, ক্রিকেটে যখন কুড়ি বলে লাড্ডু পেয়ে ফিরিস তখন বিল্টু যখন জেতায় মনে থাকে না?”
ক্রিকেটে জেতাই বলে ফুটবলেও নিতে হবে! লাল্টুদার এই অদ্ভুত যুক্তিতে সবাই চেপে যায়। আমি কিছু বলি না। কারণ বললেই আবার ধমক খেতে হবে। লাল্টুদাই আমাদের বস। তিরিশ বছর বয়স, চুল একদম গুড়ি গুড়ি করে কাটে, মিউনিসিপ্যালিটিতে কাজ করে আর খেলা ছাড়া কিছু বোঝে না। লাল্টুদার মা ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছে এককালে, কিন্তু লাল্টুদা সেসব কথা এক কান দিয়ে শোনে আরেককান দিয়ে বের করে দেয়। অফিস থেকে এসেই খেলতে নেমে পড়বে, সারাক্ষণ ক্রিকেট ফুটবল ভলি ব্যাডমিন্টন যেই খেলাই হোক সবেতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এহেন অলিখিত স্পোর্টস মিনিস্টারের কথার ওপর কথা বলার সাহস আমাদের কারও নেই। তাই সবাই চুপ করে যায়।
আমি একা একা ঘামি। হয়ে গেল। নর্থ স্টারের স্ট্রাইকার বলাই ডেঞ্জারাস প্লেয়ার। ব্যাটার পা তো না, যেন কাটা দিয়ে বানিয়েছে কেউ। লাগলেই মনে হয় ইলেক্ট্রিক শক লেগেছে।
পাপাই বলল “লাল্টুদা তাহলে বিল্টুকে গোলেই খেলাও”।
লাল্টুদা বলল “আলবাত। বিল্টু ভাল উইকেট কিপিং করিস তো, সেভাবেই গোল বাঁচাবি। কী এমন কঠিন কাজ?”
আমি ভ্যাবলার মত বসে থাকলাম। সত্যিই তো কী এমন কঠিন কাজ। শুধু ওই ফুটবলটা দেখলেই আমার কেমন ভয় লাগে সেটা যদি বলে বোঝাতে পারতাম লাল্টুদাকে!

২।
সমস্যা হল এই নতুন আমদানী পিউকে নিয়ে। পাড়ার অভ্রদার কাছে অঙ্ক করতে যাই। এদ্দিন একাই পড়তাম। ভোর ছ’টায় অভ্রদা পড়ায়। পৌনে ছটায় উঠে বাথরুম করেই দৌড় লাগাই। প্রায়ই দশ পনেরো মিনিট দেরী হয়। অভ্রদা বসে থাকত। এদিন গিয়ে দেখি পড়ানো শুরু করে দিয়েছে পিউকে।
আমি বসতেই অভ্রদা গম্ভীর গলায় বলল “বিল্টু এখন লেট করলে তোর বিপদ। পিউ কিন্তু ডট ছ’টায় চলে আসে”।
অভ্রদার কথা শুনে পিউ ফিক করে হেসে দিল। আমার রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল কিন্তু কিছু বললাম না। অভ্রদাকে খচিয়ে লাভ নেই। ফাইভ থেকে অঙ্কের আকাশগঙ্গা পার করিয়ে আসছে।
অঙ্ক আর ফুটবলে বরাবরই আমার ভীতি, অভ্রদা তাও অঙ্কের ভীতি অনেকটাই কাটাতে পেরেছে। ফুটবলটা আর এজন্মে হল না বোধহয়...
আটটায় ছাড়ল অভ্রদা। বাজারে বেরবে, বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে নিজে অফিস দৌড়বে। আটটার বেশি পড়াতে পারে না।
পড়ে বেরোচ্ছিলাম পিউ বলল “তুই এত নোংরা কেন রে?”
আমি বুঝলাম না কী বলতে চাইছে, বললাম “কেন, নোংরার কী করলাম?”
পিউ আবার সেই গা জ্বালানি হাসিটা দিয়ে বলল “এই যে, চোখের কোণে এখনও বালিকণা লেগে আছে”।
আমি বুঝলাম তাড়াতাড়িতে আসতে গিয়ে চোখ ধোঁয়া হয় নি। কোনকালেই ধোঁয়া হয় না। এই বিচ্ছুটা আসবে জানলে না হয় ধুয়েই আসা যেত। মুখে বললাম “ঠিক আছে ঠিক আছে, তাড়াতাড়িতে একটু থেকেই যায়। অত সকালে এত কিছু মনে থাকে নাকি?”
পিউ ফিকফিক করে হাসতে হাসতে চলে গেল। আমি অক্ষম রাগে পা ছুড়তে লাগলাম।
বিকেলে একটু কমের মধ্যে দিয়েই গেল। ছ’টা খেলাম। একটা কম। লাল্টুদা অধিক শোকে পাথর টাইপ হয়ে গেছে। কিছু আর বলতেই পারল না।
আজকেও পিউ আর পিঙ্কি মাঠের বাইরে আমাদের খেলা দেখছিল। আমি ওদের যথাসম্ভব পাত্তা না দেবার চেষ্টা করেছি। তবু হাসির শব্দটা আসছিল।
ক্রিকেটের সময় হলে দেখিয়ে দেওয়া যেত, এখন এইসব সহ্য করে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ও দেখছি না।
বাড়ি ফিরে দেখি এমন কপাল পিউ আর এক মহিলা সম্ভবত ওর মা বসে আছে, আর মার সাথে খুব গল্প করছে। আমি খালি গায়ে ছিলাম। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে চেঞ্জ করে এলাম।

মা বলল “আরে বিল্টু পিউ নাকি অভ্রর ব্যাচে তোর সাথে পড়া শুরু করেছে? শোন না, ইংরেজি আর ইতিহাসটা সিদ্ধিকে একটু বলে তোদের ব্যাচে পিউকে একটু নিয়ে নে না। বেচারী কাউকে চেনে না। দেখ একটু বলে”।
পিউর মা বলল “মেয়ে আমাদের খুব লাজুক, ওকে বলেছিলাম বিল্টুর সাথে কথা বলে নিতে। বলে কীনা, অত পারবে না”।
কথাটা শুনে আমার এত হাসি পেল যে কী বলব। বলে কীনা লাজুক। কেমন লাজুক তো দুদিনেই বুঝে গেছি। মুখে কিছু বললাম না, গম্ভীর হয়ে বললাম “ঠিক আছে বলে দেব”।
পিউর মা বলল “নোটস গুলো কিছু দিতে পারবে ইতিহাসের?”
ভাবছিলাম বলি না, পিউ চাইলে না-ই বলতাম, ওর মাকে সেটা বলতে পারলাম না। বললাম “দিচ্ছি”।
পিউর মা পিউকে বলল “যা তাহলে বিল্টুর থেকে নোটসগুলো নিয়ে নে”।
আমি আর কী বলব, বসার ঘরের পাশেই আমার ঘর সে ঘরে গেলাম। পিছন পিছন পিউ এল। ঘর আমার অসাধারন অগোছালো থাকে। মা রোজ চ্যাঁচামেচি করে। আমি একদিন অনেক চেষ্টা করেছিলাম পরিষ্কার করতে, শেষমেশ অকৃতকার্য হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম।
পিউ আমার ঘরে এসেই বলে “ঈশ, এটা কী ঘর? কী নোংরা”!
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম “দেখ, নোটস নিতে এসছিস, নিবি। আমার ঘর বেশি দেখার দরকার নেই”।
পিউ হাসতে হাসতে বলল “সে তো বোঝাই যাচ্ছে নেই। তাও যদি বুঝতাম কিছু একটা পারিস, ঘর নোংরা, চোখে নোংরা, গোলের মালা পড়িস মাঠে গেলে, আর কী বলব”।
আমি কিছু বললাম না। হাসলে হাসুক। বেশি পাত্তা দিলে মাথায় চড়ে বসবে। এমনিতেই বসেছে বোঝাই যাচ্ছে। আর কী করার আছে আমার!
চুপচাপ নোটসগুলো দিয়ে দিলাম। ফিকফিক করে হাসতে হাসতে চলে গেল। ওর কানটা মুলে দেবার প্রবল ইচ্ছাটা দমন করে ঘরে গোঁজ হয়ে বসে রইলাম।
৩।
পরের দিন ঠিক সময়েই পড়তে গেলাম। চোখ টোখ ভাল করে ধুয়ে। যদি আবার আওয়াজ দেয়! বলা যায় না। পড়ার মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসছিল, আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুই বলি নি। পড়ার পরে এক মিনিট না দাঁড়িয়েই পালিয়েছি। উল্টো পালটা কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে দেখি না।
মাঠে লাল্টুদা আধ ঘণ্টা স্পেশাল কিপিং করাল। সোজা সোজা বলও কয়েকটা মিস করলাম। লাল্টুদা কাচু মাচু মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপরের বাকি দিনগুলো এভাবেই পিউকে কাটিয়ে গেলাম। পড়তে অবশ্য সময়েই গেছি। পিউ গা জ্বালানো হাসিটা ঠিকই রাখল।
আর তারপরে ম্যাচ ডে চলে এল। আমার কাছে যেটা বিশ্বকাপের ফাইনালের থেকে কম কিছু নয়। রবিবার বিকেল চারটে থেকে খেলা। মাঠে নতুন করে চুণ দেওয়া হয়েছে, চারটে ফ্ল্যাগ কোত্থেকে জোগাড় করে মাঠের চারপাশে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খেলা শুরুর আগে লাল্টুদা ভোকাল টনিক দিল “দেখ, নর্থ স্টার হল এলাকার সেরা টিম। এই টিমে কলকাতার সেকেন্ড ডিভিশনে খেলা তপন পালিত, আর বিল্বেশ্বর হাজরা খেলে গেছে, উঠতি স্টার বলাই আছে, আজকেও খেলবে। আমাদের আজকে সুযোগ এদের ধুয়ে দেবার। নিজেদের নাম এলাকায় উজ্জ্বল করতে হবে”।
লাল্টুদার ভোকাল টনিকে বিশেষ কাজ হল না ভালই বুঝলাম। পাপাই একটা হাই তুলল। আমিও হাই তুলতে যাচ্ছিলাম দেখি পিউ হাঁটতে বেরিয়েছে। ভোকাল টনিকে কাজ হল না, কিন্তু ওকে দেখে হেবি রাগ হল। ঠিক করলাম আজ ফাটিয়ে দেব। কভার ড্রাইভ মারার সময় যে ক্রিকেট বলকে ফুটবলের মত দেখি, আজ সেই ফুটবলকেই ক্রিকেট বল বানিয়ে একটা বলও গোলে ঢুকতে দেব না। আমাকে নিয়ে হাসা বের করে দেব। মাথার মধ্যে ভিসুভিয়াস ভর করল আমার।
খেলা শুরু হল। নর্থ স্টারের জার্মানির মত জবর দস্ত প্লেয়ারদের সামনে আমাদের জীবনেও বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই না করা হনোলুলু টাইপ দলের মত প্লেয়ারগুলো দিশেহারা হয়ে এগারো জনে ডিফেন্স করতে লাগল। বলাই বল নিয়ে চার পাঁচ জনকে কাটিয়ে একটা আগুনের গোলার মত শট নিল গোলে। আমার উপর কী ভর করেছিল জানি না, বলটা ডানদিকের নেট বরাবর জড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, আমি এক্কেবারে লেভ ইয়াসিনের মত ডানদিকে ঝাঁপ দিয়ে ফিস্ট করে বলটা কর্নার করে দিলাম।
বলাই মাথায় হাত দিল। তারপর স্পোর্টসম্যান স্পিরিট দেখিয়ে হাততালি দিয়ে বলল ব্রিলিয়ান্ট সেভ। আর সব থেকে অবাক হল লাল্টুদা। আমার দিকে হাঁ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। আমাদের বাকি ছেলেগুলোর হালও তথৈবচ।
সে হাফে আর বেশি কিছু ঘটল না। লাল্টুদার সাথে বলাইয়ের একটা হালকা কলিশন টাইপ হয়েছিল। লাল্টুদা খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাফ টাইম হয়ে গেল।
হাফ টাইমে লাল্টুদা পায়ে বরফ ঘষতে ঘষতে আমাকে বলল “বিল্টু, ম্যাচটা বাঁচে যদি আজ, মিষ্টিমুখে যত মিষ্টি আছে আজ তোকে খাইয়ে দেব আমি। ভাই বাঁচাস যে করেই হোক। তুই যা খেলছিস এভাবেই খেলে যা”।
বাকিরা সবাই আমার প্রশংসা করে গেল। আমি হাসলাম না। দাঁতে দাঁত চিপে থাকলাম। পিউ আর পিঙ্কি মাঠের বাইরের বেঞ্চিতে বসে আছে। খুব ভাল করে জানি আজ হারলে কাল অভ্রদার ব্যাচে আবার সেই প্যাঁক খেতে হবে।
পরের হাফে সাইড চেঞ্জ হল। বলাই এতক্ষণ একা ফরোয়ার্ডে ছিল, অফিস থেকে ফিরে তপন পালিতও যোগ দিল। আর বারের নীচে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস কোত্থেকে আমার উপর ভর করল। যে আমি গড়ানো বলও ধরতে পারতাম না, সেই কিনা কঠিন কঠিন বলগুলো অবলীলায় ধরে ফেলতে লাগলাম। আমাদের প্লেয়ারগুলো মাঝে মাঝেই নিজেদের চিমটি কেটে দেখা শুরু করল ওরা জেগে আছে না স্বপ্ন দেখছে। আর ঠিক এই সময়েই খেলার গতির বিপরীতে আমরা একটা গোল পেয়ে গেলাম।
নর্থ স্টার ধরেই নিয়েছিল আমরা আর আক্রমণে যাব না। একটা কর্নারের সময় ন’টা প্লেয়ারই এগিয়ে চলে এসছিল। ডিফেন্ডার আর গোলকিপার গুলতানি করছিল ওদের হাফে। কর্নারের বলটা চিপ করতে গেছিল বলাই তপন পালিতের উদ্দেশ্যে। মিস করে আমার হাতে চলে এল। বলটা আসতেই নজর করলাম পাপাই অনেকটা এগিয়ে আছে।যতটা জোরে পারলাম কিক করে দিলাম ওর দিকে।
সকালে কাকে দেখে উঠেছিলাম জানি না, পারফেক্ট কিক হল সেটা। পাপাইয়ের একদম পায়ে গিয়ে পড়ল বলটা। পাপাই বলটা পেয়েই যা দম ছিল তা নিয়ে ছুট লাগাল ওদের গোলের দিকে। এদিক থেকে এরা হারে রে রে করেও পৌঁছতে পারল না। ডিফেন্ডার আর গোলকিপারটা কিছু বোঝার আগেই বলটা ওদের গোলে জড়িয়ে গেল।
গোলটা খেয়ে যতটা ভ্যাবাচ্যাকা খেল নর্থ স্টারের প্লেয়ার, আরও বেশি খেল আমাদের লোকেরা। লাল্টুদা বলল “আজ কী হচ্ছে বলত, যে পাপাই নড়তে চড়তে দু বছর কাটিয়ে দেয়, সে গিয়ে গোল করে আসছে, যে বিল্টু কুড়ি নম্বরী ফুটবল হলেও ধরতে পারবে না, সে কী সব সেভ করে দিচ্ছে। আজ সূর্যটা কোনদিকে উঠেছিল বলত?”
গোল হজম করে তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে উঠল নর্থ স্টার। ষাট মিনিটের খেলা। তিরিশ মিনিট করে দুই অর্ধ। সেকেন্ড হাফের তিরিশ মিনিট হয়ে গেল, আমরা ১-০ গোলেই এগিয়ে, আত্মতুষ্ট হয়ে লাল্টুদাও দৌড় কমিয়ে দিয়েছে এমন সময় পালিত আর বলাই মিলে উইং থেকে ওয়ান টু ওয়ান করতে করতে মারাত্মক ভাবে উঠে এল। পাপাই, লাল্টু দা, নন্তু, পলাশ সব ক’টাকে বিট করে বলাই মুহূর্তের মধ্যে উঠে এল আমাদের গোলে।
কী বুঝলাম কে জানে, আমি এগিয়ে গেলাম, বলাই আমার বা পাশ দিয়ে বলটা গোলে জোরে শট করল, ঝাঁপ দিয়ে কোন মতে তর্জনীটা বলটাকে ছুঁয়ে দিল, আর ঠিক সেই সময়, এতক্ষ্ণের স্পোর্টসম্যান বলাই আমার ডান হাঁটুতে ওর বুটটা বসিয়ে দিল।
যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠে পড়ে যেতে যেতে দেখলাম ফটো ফিনিশে বলটা বারের বাইরের দিকে লেগে মাঠের বাইরে চলে গেল।
সবাই যখন ছুটে এল আমি আর যন্ত্রণায় কথা বলতে পারছিলাম না। ততক্ষণে জেতার আনন্দে বাকিরা লাফালাফি শুরু করতেই লাল্টুদার জোরে ধমকের কাছে সবাই চুপ হয়ে গেল “চুপ কর, একটা কেউ চ্যাচাবি না, ছেলেটার কী হয়েছে আগে দেখবি তারপরে কথা বলবি”।

৪।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে বুঝলাম ব্যাথাটা আরও বেড়েছে। পড়তে কিছুতেই যেতে পারব না। পায়ে মলম টলম দিয়ে একটা ব্যান্ডেজ মত করে দিয়েছে পাড়ার ডাক্তার বিশুকাকু।
আমার বাবা ফুটবলার ছিল। আমার ব্যান্ডেজ দেখে গজগজ করে উঠল “আমার ছেলে হয়ে একটা ইয়ে তৈরি হয়েছিস। বুট লেগেছে! আবার গোলে খেলিস! লজ্জা লাগে না?”
আমি আর কী বলব। লজ্জা লাগারই ব্যাপার। বাবা নাকি দুর্দান্ত স্ট্রাইকার ছিল। কলকাতায় আই এফ এ শিল্ডে বালি প্রতিভা বলে একটা টিমে এককালে খেলেওছে। তার ছেলে হয়ে অকালকুষ্মাণ্ড তৈরি হয়েছি প্রায়ই বলে। ক্রিকেট সুখীদের খেলা। ফুটবল হল আসল খেলা। সেই বাবার ছেলে হয়ে গোলকিপার হয়েছি এর থেকে লজ্জার ব্যাপার আর কী হতে পারে! ম্যাচ জিতিয়েছি সেটা বললে তো আর শুনবে না। মা অবশ্য অত শত কথা বলে নি, শুধু বলেছে, খেললে তো লাগবেই, আরও সতর্ক হয়ে খেলা উচিত ছিল।
আরামেই সকালটা কাটল। বিকেলে “চাঁদে টিনটিন” পড়ছি আর রসিয়ে রসিয়ে ঝাল ঝাল চানাচুর সাটাচ্ছি এমন সময় দেখি কলিং বেলটা বেজে উঠল।
মা দরজা খুলে বলল “বিল্টু দেখ পিউ এসছে”।
আমার ভাল মুডটা নষ্ট হয়ে গেল। গুম হয়ে বসে থাকলাম। পিউ ঘরে ঢুকে চারদিকটা দেখে বলল “এই এটা কী হল? এই ক’দিনে এত পরিষ্কার হয়ে গেল কী করে?”
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম “কত নাক উঁচু পরিষ্কার লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের জন্যই করতে হল পরিষ্কার আর কী করব”!
পিউ ফিক করে হেসে বলল “কালকেও কী নাক উঁচু লোকজনের জন্যই ওরকম কিপিং করা হল?”
আমি গোঁজ হয়ে বসে বললাম “আমি তার কী জানি! এদ্দিন ইচ্ছা করেই এরকম খেলেছি। ম্যাচের দিন সবাইকে চমকে দেব বলে”।
পিউ হঠাৎ রেগে গেল, “বেশি পাকা না? কী দরকার ছিল ওরকম পাগলের মত খেলার? লাগল তো? এবার পড়াশুনার কী হবে? সকাল সকাল কে উঠবে এখন একা একা পড়তে যাবার জন্য?”
বলেই জিভ কাটল। তারপর বলল “আমি আসছি। তুই যা খুশি কর”।
প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে পালিয়ে গেল মেয়েটা। আমি বেশ খানিকক্ষণ ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর আমার মোটা মাথায় যোগ করতে বসলাম,
১) ঘর পরিষ্কারটা আমি কেন করেছিলাম সেদিন পিউ যাবার পরে?
২) ম্যাচেই বা ওরকম অমানুষিক ভাল খেললাম কী করে?
৩) পিউ যাবার সময় কী বলে গেল? একা একা পড়তে যাবে? মানে... মানে...
অঙ্কে আমি বরাবরই কাঁচা... যোগটা আমার হয়েই করে দেবেন প্লিজ বন্ধুরা?


(পুনশ্চ- এই গল্পের সময়কাল মোবাইল আসার আগে... আজকালকার পটভূমিতে এই গল্প আর লেখা যাবে কী? সব মাঠেই তো দেখা যায় বারো থেকে পঁয়ত্রিশ, ছেলেপিলে মাঠে খেলার বদলে মোবাইলে ফিফা খেলে যাচ্ছে। যাই হোক, আমার কাজ গল্প বলা, সমাজ সংস্কার নয়। তাই এখানেই থামলাম)।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান