তরঙ্গিণী

অভীক দত্ত

 

বৃষ্টি ব্যাপারটা আমার পোষায় না। তাও আবার যখন পড়ানোগুলো থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই যে বাড়িতে ব্যাচ শুরু করি, রাতে তিন চার মাইল দূরের কোন না কোন বাড়ির ছাত্র পড়িয়ে তারপর ফিরি। চাকরি বাকরির যা হাল, তাতে আশা ছেড়েই দিয়েছি। আমিও ছেড়েছি, বাবা মাও ছেড়ে দিয়েছে। যা বুঝছি টিউশনি করেই খেতে হবে।
আর আমাদের মত প্রাইভেট টিউটরদের জন্য পড়ানোটা এখন দিনে দিনে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষকেরাই স্কুলে পড়ানোর পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনিও চুটিয়ে করেন। তাদের কাছেই ছাত্র ছাত্রীরা বেশি পড়তে যায়। তাই জান প্রাণ লাগিয়ে পড়াতে হয় আমাদের। কারও কারও কাছে যেটা সেকেন্ডারি ইনকাম, আমাদের কাছে সেটাই প্রাইমারি।
আর বৃষ্টি হলে আমি দেখেছি, হয় পড়াতে যাবার সময়টায় হবে, নইলে পড়িয়ে বেরোনোর পরে হবে। আমি ইতিহাস পড়াই। বাবরের শাসনকাল পড়ানোর পরে সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যদি দেখি বাবার নাম ভুলিয়ে দেবার মত বৃষ্টি হচ্ছে তাহলে খুব একটা ভাল লাগার কথা না।
তিন দিন আগে এরকমই বৃষ্টি শুরু হল। এক বিরাট বড়লোকের বাড়িতে পড়ানো ছিল। সপ্তাহে একদিন পরে সে ছেলে, মাথায় আর কিছু থাকুক না থাকুক, এক গুচ্ছ গ্যাজেটের চিন্তা গোঁজা আছে ছেলেটার। আকবরের ছেলের নাম জানতে চাইলে বলে “স্যার পি এস ফোরটা কেমন হবে?”
কিছু বলাও যায় না, সকালে পাঁচ জনের একটা ব্যাচ থেকে যে টাকা পাই, এই ছেলের বাড়িতে একদিন পড়ালে তার দ্বিগুণ টাকা পাওয়া যায়। ওর কথা শুনে আমি হাসব না কাঁদব বুঝে পাই না। কোন মতে কনফিউজড হাসি হেসে নিজেই কনফিউজড হয়ে যাই।
সাড়ে ন’টায় সেদিন পড়ানোটা শেষ হল। ছাতাও নিই নি। বিকেলের দিকে মেঘ দেখি নি আকাশে। সেটাই ভুল হয়ে গেছিল। এই বর্ষার বাজারে মেঘ না থাকলেও যে কোত্থেকে এসে বৃষ্টি হয়ে যায় তা বোধ হয় একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন।
আলালের ঘরের দুলালের বাড়ি থেকে খানিকটা এগোতেই নামল তেড়ে বৃষ্টি। গায়ে বড় বড় দু ফোঁটা পড়তেই বুঝলাম আজ আর রক্ষা নেই। তাড়াতাড়ি সাইকেলটা একটা বাড়িতে ভিড়িয়ে দিলাম। বাড়ির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
বৃষ্টি হলেও লোডশেডিং হয় নি। আমাদের মফস্বলে একটু বাজ পড়লেই লোডশেডিং হয়ে যায়। ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে ভেবে যাচ্ছি বৃষ্টিটা থামবে কখন আর কখন বাড়ি গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে আবার পরের দিনের থোড় বড়ি খাড়া জীবনটা শুরু করব এই সময় বাড়িটার দরজা খুলে গেল। এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। যদিও এখানে আমি জন্ম থেকেই আছি তবে এই পাড়ায় আমি খুব কম এসছি এর আগে, মহিলাকে চিনতে পারলাম না। বয়স খুব বেশি হলে আঠাশ থেকে ঊনত্রিশ হবে, বেশ মন দিয়ে সিঁদুর পরা। আমাকে দেখে বললেন “আপনি পড়ান না? আমার ভাইপো আপনার কাছে পড়ে”।
আমি ওনার হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে একটু অবাকই হলাম। মাথা নাড়লাম। উনি বললেন “ভিতরে আসুন”।
আমি প্রথমে ভাবলাম না বলি, তারপর বাইরের দিকে তাকালাম, বারান্দায় দাঁড়ালেও বৃষ্টির ছাট ভালই আসছে। অগত্যা ওনার কথা শুনতে বাধ্য হলাম।
একেবারেই মধ্যবিত্ত বাড়ি। একটা সোফা, তার উল্টোদিকে টিভিতে বাংলা সিরিয়াল চলছে। আমি সোফায় গিয়ে বসলাম। ঘর মোটামুটি গোছানোই। দেওয়ালে একটা ছবি শোভা পাচ্ছে, বিদেশের কোন এক জায়গার ল্যান্ডস্কেপ।
বাইরে যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম সিরিয়ালের শব্দ শুনে ভেবেছিলাম বাড়ির ভিতর বোধ হয় লোক আছে, তাই উনি ঢোকার কথা বলতে দুবার ভাবিনি। কিন্তু এখন ঢোকার পরে হঠাৎ মনে হল এই বাড়িতে এই ভদ্রমহিলা ছাড়া আর কেউ নেই। আমি সেই প্রশ্নটা করেই বসলাম “বাড়িতে আর কেউ নেই” ?
ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে সিরিয়াল দেখছিলেন, আমার প্রশ্ন শুনে বললেন “না, আসলে আমার হাজব্যান্ড কলকাতায় চাকরি করে। ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। আজ ফোন করে বলল আসতে পারবে না”।
আমার একটু চাপ হয়ে গেল কথাটা শুনে। বাইরে এরকম বৃষ্টি আর ঘরে এরকম বয়সের একটা মহিলা, কেমন অনায়াসে সামনের দরজাটা খুলেও দিলেন, সব মিলিয়ে অস্বস্তি তৈরি হল একটা।
বললাম “তাহলে বোধ হয় আমার ভেতরে আসাটা ঠিক হল না”।
মহিলা টিভিতে ঢুকে পড়েছেন, আমার কথার উত্তর দিলেন না। টিভিতে বাড়ির ছেলে চুরি হয়েছে, তা নিয়ে বাড়ির সবার রি অ্যাকশান দেখানো হচ্ছে। বেশ টেন্সড সিচুয়েশন বোঝাই যাচ্ছে। আমি কী করব বুঝতে না পেরে টিভিতেই কনসেন্ট্রেট করলাম। মিনিট পাঁচেক পরে ব্রেক হল। মহিলাটি আমাকে বললেন “আপনি চা খাবেন?”
আমি মাথা নাড়লাম “নাহ”।
মহিলা বললেন “আপনাকে আমার বেশ ভাল লাগে জানেন? পাপ্পুর মুখে আপনার গল্পও শুনেছি। আপনি মারেন না। বেশ গল্পের মত করে ইতিহাস পড়ান। আমারও ইতিহাস গল্পের মত পড়তে বেশ ভাল লাগত। বাড়ির সামনে দিয়ে যখন সাইকেল নিয়ে যান, মাঝে মাঝে মনে হয় ডেকে কথা বলি। তারপর ভাবি কী না কী ভাববেন”।
আমি প্রমাদ গুণলাম। এই ধরণের কথা খুব একটা সুবিধার না। কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলাম “বৃষ্টি কি একটু কমেছে?”
মহিলা বললেন “এত তাড়াতাড়ি কমবে না। আচ্ছা আপনি কি অস্বস্তিতে পড়ছেন? আমি তো খুব সাধারন একটা কথা বললাম। একজন মেয়ের একজন ছেলেকে ভাল লাগতেই পারে। তাতে অসুবিধা আছে কি?”।
আমি বুঝলাম না কী বলব। ক্যাবলা হাসি হাসলাম একটা। বললাম “হ্যাঁ সে তো হতেই পারে”।
“আমার নাম তরঙ্গিণী। আপনার?”
আমি এরকম কাব্যিক নাম আশা করিনি। তবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। বললাম “আমার নাম জয়”।
“আমার ডাক নাম তরু। আপনি তরু ডাকতে পারেন”।
আমি বললাম “আচ্ছা”।
“আপনার ডাকনাম?”
“এটাই ভাল নাম, এটাই ডাকনাম”।
“আচ্ছা”।
তরঙ্গিণী টিভি বন্ধ করলেন। আমি অবাক হলাম “দেখবেন না?”
মাথা নাড়লেন “নাহ। সারাদিন একা একা থাকতে থাকতে পাগল পাগল লাগে। কেউ কথা বলার নেই। পাশের বাড়ির কাকীমারা ছেলের কাছে চলে গেছেন বাইরে। আপনার সাথে একটু কথা বলি”।
আমি বুঝলাম না কী চাইছেন ভদ্রমহিলা। প্রাইভেট টিউশনি করতে গিয়ে একেবারেই যে কোন অভিজ্ঞতা হয় নি আমার সেটা বললে ভুল হবে।
এক বাড়িতে পড়াতে গিয়ে এক ছাত্রের বিধবা মা হঠাৎ করে একদিন হাত ধরে অনেক কিছু বুঝিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম যখন টিউশনি শুরু করি এক ছাত্রী একদিন হঠাৎ করেই অনেকটা বুক উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। খুব ভয়ঙ্কর সে সব পরিস্থিতি। এখন যদিও ততটা মারাত্মক জায়গায় যায় নি, তবু প্রমাদ গুণলাম। কথা বলতে চাইছেন যখন ঠিক করলাম ওনার স্বামীর কথাই বারবার জিজ্ঞেস করি। তাতে যদি যদিও ওনার কোন কু ইচ্ছা থাকে সেটা চাপা পড়ে যায়!
বললাম “আপনার স্বামী কী করেন?”
তরঙ্গিণী একটা মোড়া এনে বসলেন আমার সামনে। বললেন “বেসরকারি অফিসে চাকরি। কলকাতা থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে সেটা বলেছি। অবশ্য আজকাল অন্য সন্দেহ হয়। বউ পুরনো হয়ে গেলে পুরুষদের একটু অন্য দিকে মন তো যায় তাই না?”
আমি বুঝলাম না উনি ঠিক কী মীন করলেন। পি এস ফোর কেমন গ্যাজেটের উত্তরে যেমন হাসি সেরকম একটা হাসি দিলাম। বললাম “আমার কোন ধারণা নেই এ সম্পর্কে”।
“কোনদিন প্রেম করেন নি?”
“নাহ। সত্যি বলতে কী, সে সময়টুকুও হয় নি। বাবা খুব একটা রোজগার করতেন না, ক্লাস টেন থেকেই টিউশনি শুরু করি। তারপর আর কিছু হয়ে ওঠে নি আসলে”।
“সে কী! কোন ছাত্রী? এতো প্রায়ই হয়, কত ছাত্রীর সাথে শিক্ষকের প্রেম, বিয়ে...”
“নাহ। আসলে পকেটে টাকা থাকলে বোধ হয় এই প্রেম ট্রেম ইত্যাদি আসে। মাথায় যদি সারাক্ষণ টাকার চিন্তা ঘোরে তাহলে মানুষ কেমন রোবটের মত হয়ে যায়। আমিও অনেকটা সেরকম হয়ে গেছি”।
তরঙ্গিণী আমার এই কথা শুনে হাসলেন। তারপর বললেন “আচ্ছা আমি আর আপনি তো প্রেম করতে পারি?”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম “মানে?”
তরঙ্গিণী এবার হাসলেন না। বললেন “একটা নারী পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক অনেকরকম হতে পারে। তারা বন্ধু হতে পারে, প্রেমিক প্রেমিকা হতে পারে। আজকে যে মেয়েটাকে একটা ছেলে ভালবেসে বিয়ে করছে, ক’দিন পরস্পরের শরীর আবিস্কারের পরে ধীরে ধীরে পরস্পরের সম্পর্কে তারা আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। সম্পর্কটা যান্ত্রিক হয়ে যায়। তারা তখন যদি মনে করে সম্পর্কে থেকেও অন্য কোন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে, তাতে কি কোন সমস্যা হতে পারে?”
আমি একটু ভাবলাম। তারপরে বললাম “সেটা হতে পারে। অত জটিলতায় আমি ঢুকছি না। কিন্তু আমি এই মুহূর্তে প্রেম করার কথা ভাবছি না”।
তরঙ্গিণী বললেন “তার কারণ কী হতে পারে? ”
“হতে পারে আমি আপনাকে চিনি না তাই”।
“একটা ছেলে একটা মেয়েকে কী দেখে ভালবাসে?”
আমি বুঝলাম না কী উত্তর দেব। তারপর বললাম “কোন ধারণা নেই। এসব লাইনে আমি ভাবি নি কোনদিন। দেখতে ভাল হতে হবে নিশ্চয়ই”।
তরঙ্গিণী আমার চোখে চোখ রেখে বললেন “আমি দেখতে ভাল না? আমাকে কেমন লাগছে?”
আমি তরঙ্গিণীকে দেখলাম। সুন্দরী বলা চলে। রং শ্যামলা, চোখদুটিও বেশ টানা টানা। বললাম “আপনি সুন্দরী”।
“তবে? তাও প্রেম করতে ইচ্ছা করছে না? কী ভাবছেন? আমি বিবাহিত তাই? সমাজ কী বলবে, লোক কী বলবে ভাবছেন?”
“তাও না। আসলে আমার প্রেম ঠিক পাচ্ছে না আর কী”।
আমার কথাটা শুনে তরঙ্গিণী হেসে দিলেন। বললেন “একটা গান শুনবেন?”
আমি বললাম “অন্য কোনদিন? বৃষ্টি কমল নাকি একটু দেখি”।
তরঙ্গিণী জানলা খুললেন। হাত বাড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ হাতটা বাইরে রাখলেন। তারপর হাতটা ভেতরে নিয়ে আমাকে দেখালেন। পুরো ভিজে গেছে হাতটা। বিস্মিত হলাম। আচ্ছা পাগল তো!
বললাম “ভিজে গেলেন তো!”
তরঙ্গিণী বললেন “গান গাই? অনেকদিন গাই না”।
আমি হাল ছাড়লাম। “বেশ”।
তরঙ্গিণী গাইলেন “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার”। আমি গানটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এত অসাধারন গাইলেন! ইনি এখানে একজন সামান্য গৃহবধূ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন! স্তব্ধ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। গান শেষ করে তরঙ্গিণীও কিছু বললেন না।
মিনিট তিনেক চুপ থাকার পরে বললাম “আপনি এত ভাল গান?”
তরঙ্গিণী বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন “আমার গান শুনেই পছন্দ করেছিল ও। বিয়ের পরে একদিনও শোনে নি”।
চুপচাপ বসে রইলাম বেশ খানিকক্ষণ। তরঙ্গিণী বললেন “এখন ভোরে উঠি, ওর জন্য রান্না চাপাই, তাড়াহুড়ো করে স্নান করে খেয়েদেয়ে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যায়। সারাদিন একা একা থাকি।সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট দেখি সকালে। সন্ধ্যেতে আবার সিরিয়াল দেখতে বসি। এইভাবেই কেটে যাচ্ছে”।
আমি বললাম “বাচ্চা নেবার কথা ভাবেননি আপনারা?”
তরঙ্গিণী বলল “ভেবেছি। আমিই ভেবেছি। ওকে যতবার বলেছি, বলেছে এখন না, আরও সময় চাই। আচ্ছা আমি কী করব এত সময় নিয়ে বলতে পারেন?”
আমি কী বলব বুঝলাম না। একটু ভেবে বললাম “কিন্তু পরকীয়াই এর একমাত্র সলিউশন হতে পারে এটাই বা আপনি ভাবছেন কেন?”
তরঙ্গিণী হাসলেন “জানি না। আবার আমি এটাও জানি না বিয়ের পরে কেন মেয়েরাই আরেকটা প্রেম করতে পারবে না। কেন ছেলেটা যেদিন খুশি বাড়ি আসবে, যা ইচ্ছা করতে পারবে অথচ একটা মেয়ে করলেই সেটাকে খারাপ নজরে দেখা হবে”।
আমি কিছু বললাম না। তরঙ্গিণী বললেন “আচ্ছা, আপনার নিশ্চয়ই আমাকে খারাপ মেয়ে মনে হচ্ছে?”
আমি বললাম “না,না, একেবারেইন না”।
তরঙ্গিণী চুপ করে গেলেন। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা এসে ঘিরে ধরল আমাদের। হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মত একটা কথা মাথায় এল আমার। আর একইসাথে এই ভেবে নিজেকে থাপ্পড় মারতেও ইচ্ছা করল যে এই কথাটা আমি আগে কেন ভাবিনি। বললাম “আচ্ছা, আপনি আমাকে একটা ছাতা দিতে পারবেন? মনে হচ্ছে এইরকম বৃষ্টি সারারাত ধরেই হবে। আমি কাল ফেরত দিয়ে যাব”।
তরঙ্গিণী একটা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। হাসিটার অর্থ অনেকটা এরকম “ভয় পেয়ে গেলেন?” তারপর বললেন “বেশ। তাই হোক। একটু অপেক্ষা করুন”।
ভিতরের ঘরে গেলেন। একটা ছাতা নিয়ে এলেন। বললেন “ভাল থাকবেন”।
আমি আর অপেক্ষা করলাম না। সাইকেল নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম। পিছনে ফিরে দেখলাম না। যদি সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে যাই!
সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। সেই রহস্যময় হাসিটা বারবার মনে পড়ে যেতে লাগল।
পাপ চিন্তা গ্রাস করতে লাগল ধীরে ধীরে। কী হত... যদি... কেউ ছিল না, বয়স বাড়ছে, বিয়ে কবে হবে, আদৌ হবে কি না জানি না... যদি ভালবাসার নামে শরীরটা পেতাম তাতে ক্ষতি কী ছিল? বার বার মাথার মধ্যে তরঙ্গিণীর মুখটা ভাসতে লাগল।
#
পরের দিন সকালের ব্যাচটা কোনমতে পড়িয়ে ছাতাটা দিতে গেলাম। নিজে গেলাম না, আমার পা দুটোই যেন কোন চুম্বকের আকর্ষণে ওদিকে আমাকে নিয়ে গেল।
সকালে এলাকাটা অন্যরকম লাগছে। যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটাও হল না। আশেপাশের বাড়ির কৌতূহলী মুখ উঁকি ঝুঁকি মারল না। বেশ কয়েকবার কলিংবেল দেবার পরে দরজা খুলল সম্ভবত ওদের বাড়ির কাজের মেয়ে। বলল “কী চাই?”
বললাম “বৌদি আছেন?”
কাজের মেয়েটা কেমন একটা বিরক্তি মেশানো গলায় বলল “ছাতা দিতে এসছেন?”
আমি বললাম “হ্যাঁ”।
“দিয়ে যান, বৌদি দেখা করবে না”।
আমি আর কিছু বললাম না। যদিও অবাক হয়েছিলাম। ছাতাটা দিয়ে চলে এলাম।
তারপর থেকে পড়াতে গেলে ওই রাস্তাটা আর নিই না। অন্য রাস্তা দিয়ে পড়াতে যাই।
কে জানে, যদি আবার দেখা হয়ে যায়!

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান