একটি ল্যাপটপ এবং...

অভীক দত্ত

 

মধ্যবয়সে পৌঁছে হঠাৎ একদিন অরূপ হালদার বুঝতে পারলেন আসলে তিনি একা। মা, বাবা দু বছর হলে পর পর চলে গেছেন, বিয়ে করেন নি, অফিসের চাপে সেসব মাথাতেও আসে নি।
যেদিন তিনি কথাটা বুঝতে পারলেন সেদিন রবিবার ছিল। ছুটির দিন। অন্যান্য রবিবার সকাল দশটার আগে ঘুম থেকে ওঠেন না। সেই রবিবার পারলেন না। ভোর পাঁচটাতেই ঘুম ভেঙে গেল। জানলা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল তিনি আসলে ভীষণ একা। বিশ্বচরাচরে কেউ নেই তার। ভাই বোন কেউ নেই। জন্মে কারও সাথে প্রেমও করেন নি যার জন্য বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠবে।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনা ছাড়া কিছুই বোঝেন নি। অফিসে ঢোকার পরে অফিসের কাজ। চাকরি পাওয়ার কিছুদিন পরে বাবা মা বিয়ের জন্য জোর দিয়েছিল। দু চারজনকে দেখাও হয়েছিল। কিন্তু অরূপ হালদারের কাউকেই পছন্দ হয় নি। উল্টোটাও ভীষণভাবে সত্যি। তাকেও কোন মেয়েরই পছন্দ হয় নি।
কী করেই বা হবে? বিয়ের কথা বলার সময় যদি বেয়াড়াভাবে মেয়েকে পাত্র জিজ্ঞেস করে বসে “বলুন তো হুকস ল টা?” কিংবা “থারমোডিনামিক্সের ফার্স্ট ল টা বলুন তো? আচ্ছা বলুন তো এনথ্যালপি কাকে বলে”?
প্রথম দু জন ভিরমি খেয়েছিল। তৃতীয়জন বলেও দিয়েছিল। উত্তর শুনে তিনি ব্যাজার হয়ে গিয়েছিলেন। আশা করেন নি উত্তর পাবেন।
এইসব কারণে মেয়েবাড়ির লোকজন তাকে আর মেয়ে দেখাত না। মার্কেটে রটে গিয়েছিল অরূপ হালদার লোকটা ভাল তবে স্ক্রু একটু ঢিলা আছে।
মা মারা যাবার সময় খুব কান্নাকাটি করে মারা গেলেন। অরূপ নির্বিকার মুখে শুনলেন। কিন্তু কিছুই করলেন না। দু বছর নিয়ম করে অফিস গেলেন। অফিস থেকে ফিরলেন। কোনদিন নিজে রান্না করে খেলেন কোনদিন বাইরে থেকে রান্না এনে খেলেন।
তারপরে হঠাৎ করে একদিন ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করলেন তিনি আসলে ভীষণ একা।
সারাদিন একা একা বসে থাকলেন। খাওয়া দাওয়াও সেরকম করলেন না।
সন্ধ্যে হলে একটু মুড়ি খেলেন। তারপর ল্যাপটপটা নিয়ে বসলেন।
পরের দিন অফিসে একটা প্রেজেন্টেশন দিতে হবে।
একটা মন মত দরকারি ছবি খুঁজছিলেন প্রেজেন্টেশনের জন্য। বেশ খানিকক্ষণ খোঁজার পর একটা সাইট খুলল। তিনি সাইটটা দেখে অবাক হলেন। কেমন অদ্ভুত টাইপের একটা সাইট। ছবি আছে অনেকরকম কিন্তু কোন ছবির সাথে এই পৃথিবীর কোন বস্তুর মত দেখতে বলে মনে করতে পারলেন না। অরূপ হালদার চিন্তিত হলেন। এ আবার কী?
হঠাৎ চোখ আটকে গেল সাইটের একটা লিঙ্কে, সেটায় লেখা “মৃতজনেদের সাথে কথা বলুন এই লিঙ্কে ক্লিক করে”।
অরূপ হালদার বেশ খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন লেখাটার দিকে। এও হয় নাকি? নিজে না চাইতেই অবাক হয়ে দেখলেন কারসরটা চলে গেল লিঙ্কটার দিকে। ক্লিকও হয়ে গেল।
একটা পেজ খুলে গেল। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদায় লেখা। অরূপ অবাক হয়ে দেখলেন তার ছবি নাম সব দেওয়া। লেখা আছে “এখানে টাইপ করুন কার সাথে কথা বলতে চান”।
অরূপ বেশি কিছু ভাবলেন না। লিখে দিলেন “মা”।
লেখার সাথে সাথে একটা চ্যাট উইন্ডো খুলে গেল। লেখা ভেসে এল “কেমন আছিস ভুটু?”
অরূপের মাথাটা ঘুরিয়ে উঠল। মা তাকে এই নামেই ডাকত।
জলের বোতল টেবিলের ওপরেই থাকে। সেখান থেকে বোতলটা নিয়ে বেশ খানিকটা জল গলায় ঢেলে দিলেন। মা আবার লিখেছে “ভয় পাস না। শোন আলমারির লুকনো একটা লকার আছে। সেটা তোকে বলে যেতে পারি নি। নিচের দিকে ডানদিকের কোণায় হাত বাড়ালে পাবি। ওখানে আমার বেশ কিছু সোনা আছে। বউমার জন্য রেখেছিলাম। তুই দেখ কী করবি সেটা নিয়ে”।
অরূপ মেসেজটা বড় বড় চোখ করে পড়লেন। তারপর লিখলেন “এখন কোথায় আছ?”
লেখা ভেসে এল “এখানেই আছি। তোকে রোজই দেখি। কথা বলতে চাই পারি না। যাই হোক, বিয়েটা করে নে তাড়াতাড়ি”।
অরূপ সাথে সাথে মায়ের সাথে চ্যাটটা বন্ধ করে দিলেন। সেই বিয়ে নিয়ে শুরু হয়ে গেল। এবার টাইপ করলেন “বাবা”।
সাথে সাথে একটা চ্যাট বক্স খুলে গেল, আর অরূপ দেখলেন তাতে লেখা “তোর মা তোর বিয়ের জন্য...”
এটুকু পড়েই চ্যাট বক্স বন্ধ করে দিলেন অরূপ। দুজনেই সমান।
মাথা কাজ করছিল না তার। অনেকক্ষণ ভেবে টাইপ করলেন “বীরেন”।
বীরেন তার ছোটবেলার বন্ধু। ক’দিন আগে খুন হয় এলাকার গুন্ডাদের রেষারেষির মাঝখানে পড়ে গিয়ে।
টাইপ করার সাথে সাথেই মনে হল ঘরে কেউ আছে। চমকে ডান দিকে তাকিয়ে দেখেন বীরেন বসে আছে।
হঠাৎই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল তার। বীরেনকে তিনি নিজের হাতে পুড়তে দেখেছেন। সেই বীরেন এখন...
অরূপ দেখলেন মণিটরে লেখা “কী বে, ভুলে গেলি?”
অরূপ কোনমতে ডানদিকে তাকালেন। দেখলেন বীরেনের মুখটা হাসি হাসি।
ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলেন তিনি। কোনমতে উইন্ডোটা বন্ধ করে দিলেন।
ঘরের বাইরে বেরলেন। কান মাথা সব গরম হয়ে যাচ্ছে। এটা কী ধরণের চ্যাট সেটাই বুঝতে পারছিলেন না।
বাথরুমে গেলেন। চোখে মুখে জল দিয়ে আবার নিজে ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন বীরেন তখনও বসে আছে। মুখে সেই একই রকম হাসি।
মনিটরে চ্যাট বক্সটা নিজে থেকেই পপ আপ করল, বীরেন লিখছে “তুই একা আছিস বলে চলে এলাম। দু ভাই মিলে এখন একসাথে থাকব। কোন সমস্যা নেই, কি বলিস?”
চ্যাট উইন্ডোটা বন্ধ করতে গেলেন, হল না। ল্যাপটপটা রিস্টার্ট করতে গেলেন। দেখলেন হ্যাং করে গেছে। বীরেন লিখেছে “আমার অনেক বন্ধু হয়েছে জানিস এখানে? সবাইকেই নিয়ে এসেছি। দাঁড়া পরিচয় করিয়ে দি। তুই আর একা নোস আজ থেকে”।
অরূপ ঘরের দিকে চমকে তাকালেন। ঘর ভর্তি হয়ে গেল নিমেষের মধ্যে। পরিষ্কার বুঝতে পারলেন সবাই মানুষের মতই দেখতে, তাদের মতই পোশাক পরে আছে অথচ, সবার চোখই পাথরের মত। অরূপ তড়িঘড়ি ল্যাপটপের ব্যাটারিটা খুলে ফেললেন।
তারপরেই দেখতে পেলেন ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। বুকটা ধড়ফড় করছিল। সে রাতে আর ঘুম এল না তার।

২।
অফিসে অরূপ হালদারকে কেউ পছন্দ করেন না। খিটখিটে টাইপের লোক। কারও সাথে কথা বলেন না। পি এন পিসি করেন না। তার ওপর এক ফোঁটাও কাম চোর না। সবার আগে অফিসে যান। সবার পরে অফিস থেকে বেরোন। ছুটি ছাটা একেবারেই নেন না। বাড়িতে থেকে কাজ নেই বলে অফিসে বেশিক্ষণ কাটান। এরকম লোক বসের প্রিয় পাত্র হন। অরূপ ব্যতিক্রম। এর কারণ তার মেজাজ। বসও ভয় পান তাকে। বেশি ঘাটান না।
বস হয়ত কোন ডিজাইন করতে দিয়েছেন, হঠাৎ বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসেন অরূপ “বলুন তো, এক্স অ্যাক্সিসে লেংথ না রেখে ওয়াই অ্যাক্সিসে কেন রাখলাম এই ডায়াগ্রামে?”
বস ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। কিছু বলতেও পারেন না। অরূপের মত কাউকে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। সমস্ত প্রোজেক্ট রিপোর্ট একা দায়িত্ব নিয়ে সামলান। এইসব লোককে বসও হাতে রাখতে চান।
আগের রাতে ঘুম হয় নি। অরূপ অফিসে এসে চুপচাপ বসে ছিলেন। কালকের ঘটনা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। এক গাদা ডিজাইন বাকি। অরূপ কাজ শুরু করতেই ইন্টারকমে ফোন এল। বস ডাকছেন।
অরূপ রওনা দিলেন।
সান্যালবাবু পঞ্চাশ পেরিয়েছেন কিছুদিন আগে। অরূপক ঢুকতে বেশ খানিকক্ষণ তাকে মেপে বললেন “বসুন”।
অরূপ বসলেন “হ্যাঁ স্যার”।
“এস আর জির ডিজাইনটা হল? আপনি তো মশাই বহু দেরী করছেন”!!!
অরূপ বললেন “স্যার হয়ে গেছে। আপনাকে মেইল করে দিলাম এসেই”।
বস মেইল খুললেন। ডিজাইনটা দেখলেন। একদম নিখুঁত। এক ফোঁটাও কোন ভুল নেই। ব্যাজার হলেন। সকালে বউয়ের কাছে ভীষণ ঝাড় খেয়ে এসছিলেন। ভেবেছিলেন অফিসে কাউকে ঝেড়ে মুডটা ঠিক করবেন। সেটা হল না।
বললেন “অরূপ। আপনি ছুটি নেন না কেন?”
অরূপ বললেন “কী করব?”
বস বললেন “ঘুরতে যেতে পারেন তো!”
-একা একা কোথায় যাব স্যার।
-আমার সাথে যাবেন? পরের উইকে বেঙ্গালুরু যাচ্ছি। চলুন। ভাল লাগবে।
-না স্যার।
বস আরও মুষড়ে পড়লেন। এই এক লোক হয়েছে। কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না। নিজেই ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যান আজকাল অরূপকে দেখলে।
সান্যালবাবু আবার বললেন “আপনি এবার একটু ঘুরে আসুন বুঝলেন?”
অরূপ বললেন “না না স্যার। আরও কত ডিজাইন বাকি। এখন ঘুরলে চলবে কেন?”
তারপর সুড়সুড় করে নিজের ঘরে এসে বসলেন।
ল্যাপটপটা নিয়েই এসেছিলেন। অন করলেন। অন করে বুটিং হবার সাথে কালকের উইন্ডোটা খুলে গেল।
অফিসের ঘরটা নিমেষে ভর্তি হয়ে গেল। অরূপ চারদিকে তাকালেন। এখন আর ভয় লাগছিল না তেমন। বীরেন বসে আছে দিব্যি আনন্দের সাথেই। আরও অনেকে আছে যাদের তিনি চেনেন না।
ল্যাপটপে একের পর এক চ্যাট পপ আপ করতে লাগল। একটা মেসেজ দেখলেন “অপু কর্মকারকে বল আমি ওর মা। বৃদ্ধাশ্রমে শেষ দিন অবধি যায় নি। এদিকে আমি মারা যাবার পর ন্যাকার মত অফিসে ভীষণ কান্না কাটি করেছে। আমার বোনের মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে জানতে পারলাম মারা যাবার পর। এক্ষুণি সতর্ক কর বাবা”।
অরূপ প্রমাদ গুণলেন। কাজ করতে এসে কেচ্ছা ঘাটা হয়ে যাবে। আবার ব্যাটারি খুলে রেখে দিলেন ল্যাপটপটা। মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল অপু কর্মকারের জন্য। তারপর ঠিক করলেন মেসেজটা দিয়েই দেবেন।
গত ছমাসে অপু কর্মকারের সাথে তার এক ফোঁটাও কথা হয় নি। এখন আর কিছু করার নেই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে অপুর কিউবিকলের সামনে গিয়েই বললেন “আপনার কি আপনার মাসতুতো বোনের সাথে সম্পর্ক আছে?”
কথাটা একটু জোরেই হয়ে গেছিল। গোটা অফিস তাকাল। অপু কর্মকার কাজ করছিলেন। অরূপের প্রশ্ন শুনে হাসবেন না কাঁদবেন না ক্যালাবেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। পাঁচ সেকেন্ড পর বললেন “গো টু হেল”।
অরূপ আবার নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। নিজের ওপর লজ্জা হতে লাগল। এটা না করলেই হত বুঝতে পারলেন।
হঠাৎ কৌতূহল বাড়ল তার। অফিসে তো আরও অনেকে আছে। সবার সম্পর্কে কখনোই খোঁজ রাখেন নি। এখন হঠাৎ তীব্র পি এন পি সি করতে ইচ্ছা করল।
ল্যাপটপটা খুললেন। আবার মেসেজের পাহাড় জমতে শুরু করে দিল। দেখলেন একজন মেসেজ করেছে “আপনার কলিগ অর্পিতার ফুটেজ খাবার ভীষণ রোগ আছে। আমি ওর বর। ও প্রেম করে আপনাদের অফিসের মিত্রবাবুর সাথে। এদিকে আমি বিনা চিকিতসায় মারা গেলাম। দায়সারা ভাবে মৃত্যু হল আমার। প্লিজ ওনাকে বলুন মিত্রর পাল্লায় না পড়তে। মিত্র ওকে নিয়ে মজা করছে খালি, বিয়ে করবে না কোনদিনও। কোটিপতির মেয়ে অজন্তাকে বিয়ে করবে মিত্র। সব প্ল্যান রেডি”।
অরূপ মেসেজটা পড়েই উঠে পড়লেন। নিজে উঠলেন না কেউ জোর করে তাকে ঠেলে তুলে দিল বুঝলেন না। সোজা অর্পিতার ডেস্কে পৌছে গেলেন। ওখানে মিত্রবাবুই ছিল। দুজনে টুক টুক হেসে হেসে গল্প চলছে। অরূপ ওদের সামনে পৌছেই বোমা ফাটালেন “মিত্রবাবু আপনি তো অজন্তাকেই বিয়ে করবেন তাহলে খামোখা অর্পিতাকে ঝুলাচ্ছেন কেন? বেচারির বর তো বিনা চিকিৎসায় মারা পড়ল আপনাদের প্রেমের জ্বালায়”।
এদের সাথেও তার কোনদিন কথা হয় না। এহেন আপাত অপরিচিত লোকের মুখে এই কথা শুনে দুজনেই আকাশ থেকে পড়লেন। অর্পিতা ন্যাকা শিরোমণি বরাবরই। ঝগড়া করতে চলে এলেন “আপনি কে আমাদের মধ্যে কথা বলার? আর জানেন মিত্রদাকে আমি ওসব না, নিজের দাদার মত দেখি”।
অরূপ ছাড়লেন না, বললেন “ওই সব আই ওয়াশ করে লাভ নেই। যাই হোক। যা পারেন করুন”।
নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। সবাই তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
দুপুরের মধ্যেই অফিসে অরূপ হালদারকে নিয়ে হইচই পড়ে গেল। সবার ঢপেরই পর্দাফাঁস করে দিয়েছেন ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। পাপড়ি সেন এতদিন বলে আসতেন তার ছেলে দারুণ পড়াশুনায়। ডাক্তারি পড়ে। তাকে গিয়ে অরূপ বলে এসেছেন বরের ঘুষের টাকা জমানো কুড়ি লাখ টাকা ডোনেশনের গল্পটা অফিসে বলেন নি কেন?”
অ্যাকাউন্টসের বিশ্বজিৎকে বলে দিয়েছেন কন্ট্রাকটারদের থেকে ঘুষ নেওয়া বন্ধ করতে। এক কন্ট্রাক্টার তো মরেই গেলে ঘুষ দিতে না পেরে, বিল আটকে গেছিল।
তুহিনা নামের রিসেপশনিস্টকে বলে বসলেন পরের বার বসের সাথে মন্দারমণি গেলে প্রোটেকশন ইউজ করতে। কুমারী অবস্থায় বুড়ো বসের বাচ্চার মা হওয়াটা কি ভাল দেখায়?
একটা নাগাদ বসের চেম্বারে আবার ডাক পড়ল তার। অরূপ ঢুকেই বললেন “স্যার আপনার বাবা তো আপনাদের বাড়িটা আপনার দাদার নামে লিখেছিল, আপনি জালিয়াতি করে নিজের নামে করে নিলেন?”
বস রাগলেন না। খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন “বসুন”।
অরূপ বসলেন। বস বললেন “লোকের নামে কুৎসা রটানো সোজা। শুনুন, আমার দাদা ছিল চরম বেলেল্লা। এদিকে ওদিকে মেয়েবাজী মদবাজী করে বেড়াত। আপনি জানিনা কার কাছে শুনেছেন, কিন্তু আমি আমার বাবাকে কিছু জোর করি নি। বাবাই বাড়িটা আমার নামে লিখে দিয়ে যান”।
অরূপ একটু ঘোঁত ঘোঁত করে চুপ করলেন। বস বললেন “আপনি কী করে জানছেন লোকের সম্পর্কে? অবশ্য তুহিনার ব্যাপারটা জানাতে পারি নি। পরে জানাতাম সবাইকেই। আমার বউ মারা গেছে। আমি তো আরেকটা বিয়ে করতেই পারি তাই না?”
অরূপ বসের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন “মন্দারমণিতে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাবার পরে, বউকে মেরে অনেকেই অ্যাক্সিডেন্টের অজুহাত দেয় স্যার”।
বস খানিকক্ষণ হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে গেলেন হঠাৎ, বললেন “আগামী চারমাস আপনি লিভে থাকবেন। ছুটির অ্যাপ্লাই করুন”।
অরূপ নির্বিকার মুঝে ছুটির আবেদন করে দিলেন।

৩।
-অরূপ।
-বলুন।
-আমাদের আপনি ভয় পান না তো? মেসেজ বক্সে মেসেজ পেলে উত্তর করুন। দূরে দূরে থাকবেন না।
-আচ্ছা, আমার কিন্তু হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা বলুন, এত লোক থাকতে আমাকেই কেন মেসেজ করেন আপনারা?
-দুয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। অন্য লোক খোঁজার। কিন্তু পারলাম না। দেখলাম আপনার মত একা লোকই আমাদের দরকার। যাকে পাবলিক পিটিয়ে মেরে ফেললেও সে পিছুটান হীন থাকবে। মার্কেট মাঝে মাঝে খুব ডাল যায়। তখন আমরা আপনাদের মত কিছু লোককে নির্বাচন করে রাখি, শান্ত দীঘিতে মাঝে মাঝে একটু ঢেউ তোলা দরকার তাই না অরূপ বাবু?
-আমার কাজ কী হবে?
-সেটা পরে বলছি।আপনি মার সাথে কথা বলেন না কেন?
-মা খালি বিয়ে বিয়ে করেন।
-ঠিকই করেন।
-আসলে মেয়েগুলো কোনটাই ঠিক জুতের না।
-তাই? আচ্ছা এই যে একে দেখুন তো!
-... অসাধারন। উনি বার্নোলিস ইকুয়েশন জানেন?
-জলের মত। বিয়ে করবেন?
-করতে পারি।
-তাহলে আমাদের সাথে মিশে যান। আসুন।

৪।
সাতদিন পরেও অরূপ হালদারের ঘর থেকে কেউ বেরোচ্ছে না দেখে এলাকার লোক দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখলেন বেডরুমে ল্যাপটপটা অন রেখে মরে পড়ে আছেন, আর মুখে তার একটা অপার্থিব আনন্দ। যেন নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান