সব খেলার সেরা

অভীক দত্ত

 

সৌপ্তিক আর অনির্বাণ যে প্রাণপ্রিয় বন্ধু সেটা গোটা স্কুল জেনে গেছে। দুজনেই সেকেন্ড বেঞ্চে বসবে, একই স্যারের কাছে পড়বে, একই সাথে ক্যুইজে যাবে, এবং একই মেয়ের প্রেমে পড়বে। দুজনের মধ্যেই কৈশোর আর শৈশবের একটা মিশেল রয়েছে, এখনও দুজনেই জানে না ঠিক কী কী ভাবে মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়।
ক্লাস ফোর অবধি দুজনেই কো এডে পড়ত, তারপরে ফাইভে ওঠার পরে বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়। কো এডে যখন পড়ত মেয়েদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কই ছিল। বয়েজ স্কুলে আসার পরে ধীরে ধীরে মেয়েরা দূর গ্রহের প্রাণী হতে শুরু করল।
সৌপ্তিক ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অনির্বাণকে বলে কাল বাড়ি ফেরার পথে একটা মেয়ে ওর দিকে তাকিয়েছে। অনির্বাণ মনে মনে সেই মেয়েটাকে কল্পনা করে প্রেমে পড়ে যায়।
এইভাবেই দিনগুলো চলছিল ভালই, কিন্তু সমস্যা বাঁধল একদিন দুজনেই তাদের বাবা মার সাথে একটা রেস্তোরাঁয় খেতে যাবার দিন। সৌপ্তিক আর অনির্বাণ দুজনের বাবাই তাদের মতই পরস্পরকে তুই করে বলেন। সৌপ্তিকের বাবা তাপসবাবু আর অনির্বাণের বাবা নির্ঝরবাবু দুজনেই ভাল চাকরি করেন। দুই পরিবার আলোচনা করে ঠিক করেছিল এক রবিবার একটা ছোট গেট টুগেদার হবে কোন রেস্তোরাঁয়। সেই মত দুই পরিবার এক হয়েছিল। সৌপ্তিকের মা আর অনির্বাণের মা নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করে দিলেন। তাপস আর নির্ঝরবাবু কথাই শুরু করলেন খেলা নিয়ে। তাপসবাবু বললেন “এবারে তোদের শেষ করে দেব। এটা টিম হয়েছে তোদের?”
নির্ঝর বললেন “টিম যাই হোক, ইস্টবেঙ্গল খোঁচা খাওয়া বাঘ। দেখবি কেমন খেল দেখাবে। আর ইয়ে, পাঁচ গোলটা ভুলিস না বুঝলি? ওটা একটা ছবি করে পকেটে রেখে দিস”।
তাপসবাবু ফিক ফিক করে হেসে বললেন “একটা কাজ করিস ভাই, একটা মাদুলি করে গলায় ঝুলিয়ে রাখ পাঁচ গোল লিখে। কবে সেই ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিস, সেটা এখনও ভুলতে পারছিস না। আই লীগের কথা ভাব। ইস্টবেঙ্গল যতবার আইলীগ পেয়েছে, ততবার কে আর কে অস্কার পেয়েছে বুঝলি?”
নির্ঝরবাবু টেবিলে চাপড় দিলেন “সামনা সামনি বিচার কর। সামনা সামনি বুঝলি? কতবার পুতেছি তোদের ভুলে গেছিস?”
তাপসবাবু ছাড়নেওয়ালা নন “সে তোদের ছেড়ে দিয়েছি ম্যাচ”।
একটুতেই পরিস্থিতি উত্যক্ত হয়ে গেল, সৌপ্তিকের মা রুমি তাপসবাবুকে ধমক দিলেন “থামবে? বাচ্চাগুলো কী শিখছে?”
অনির্বাণের মাও কটমট করে নির্ঝরবাবুর দিকে তাকালেন। সৌপ্তিক আর অনির্বাণ এসব ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছিল। অত চাপ নিচ্ছিল না।
গোল বাঁধল খাবার অর্ডার করার সময়। তাপসবাবু বললেন “চিংড়ি খাব, মরা মাছ খাই না”।
আর নির্ঝরবাবু গোঁ ধরে রইলেন “ইলিশ। ওসব পোকা মাকড় আমি খাই না”।
রুমি শান্ত করার চেষ্টা করলেন “এনাফ, দুটোই আসুক। যে যেটা খাক। উফ। তোমরা না পারোও বটে”।
দু পক্ষই তারপরে গোমড়া হয়ে গেল। অনির্বাণ আর সৌপ্তিক ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে খেতে লাগল।
বাড়ি যাবার পরে অনির্বাণ মাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মা, এই ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান নিয়ে এত ঝামেলা করার কী আছে? আর তার সাথে চিংড়ি ইলিশই বা আসছে কী করে?”
অনির্বাণের মা তিস্তা স্কুলে পড়ান। একগাদা খাতা দেখতে ব্যস্ত ছিলেন। অনির্বাণের প্রশ্ন শুনে বিরক্ত গলায় বলল “তুই এসব জেনে কী করবি বাবান?”
অনির্বাণ বলল “না। যখনই তাপসকাকু আর বাবার দেখা হয়, দুজনের সিভিল ওয়্যার শুরু হয়ে যায়। এত ঝামেলার কী আছে সেটা আগে বল তো?”
তিস্তা খাতা রাখলেন। তারপরে বললেন “স্বাধীনতার আগে যারা ওই পারে থাকতেন, তাদের বাঙাল বলে। আর যারা এই পারে, তাদের ঘটি বলে। ওই পারে যারা থাকেন, তারা ইস্টবেঙ্গল। মানে পূর্ব বঙ্গের লোক বলে এই কথা বলা হয়। এই পারে যারা থাকেন তারা মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গলের লোক ইলিশ খেতে বেশি ভালোবাসেন। আর মোহনবাগানের লোক চিংড়ি। এই তো। আর কিছু না”।
অনির্বাণ বলল “ব্যস? এই নিয়ে এত ঝামেলা?”
তিস্তা বললেন “হ্যাঁ। আসলে যখন দেশভাগ হল তখন অনেককেই ওপার থেকে এপারে চলে আসতে হল। ওপার থেকে যারা এল তাদের এপারের লোক মেনে নেবে কেন? আবার ওপারের লোকেরাই বা কোথায় যাবেন? তারা তো নিজের দেশ থেকেই উচ্ছেদ হয়ে চলে এসেছেন। মরিয়া হয়ে তারা এদেশে থাকার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। স্বার্থের সংঘাত লেগে গেল। ঝামেলা সব দিকেই বাঁধতে শুরু করল। এপারের লোকেরা ওপারের লোকেদের খাওয়া দাওয়া উচ্চারণ নিয়ে মজা করতে লাগল। আর ওপারের লোকেরা এপারের। আর এর সব থেকে বেশি ঝামেলা বাঁধল খেলার মাঠে। খেলার সময় প্রায় দাঙ্গা বেঁধে যায়। আগে তো ভাবতে পারবি না কী হত। তোর বাবা কতবার মারপিট করে এসেছে মোহনবাগানের লোকেদের সাথে। এই গলায় গলায় ভাব। অথচ খেলার সময় এলে এই মারে কী সেই মারে”।
অনির্বাণ বলল “তাহলে আমরা বাঙাল? বাবা তো ইস্টবেঙ্গলকে সাপোর্ট করে”।
তিস্তা বললেন “হ্যাঁ। আমাদের পূর্ব পুরুষ ঢাকায় থাকতেন। তারা চলে আসেন দেশভাগের সময়”।
অনির্বাণ বলল “আর সৌপ্তিকরা ঘটি?”
তিস্তা মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ। এবার যা তো বাবান, হয় ঘুমা নয় অঙ্ক কর। আর জ্বালাস না। অনেক খাতা দেখা বাকি”।
অনির্বাণ মার কথা শুনে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কথাই ঘুরতে লাগল। আর মনও তার সাথে ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। যে সৌপ্তিক তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু সে আসলে তার মত এক না? এতটা আলাদা?
২।
দুজনেই স্কুল শুরু হবার আধঘণ্টা আগে স্কুল চলে আসে। জমিয়ে আড্ডা হয় তাদের মধ্যে। কিন্তু আজ দুজনেই গম্ভীর হয়ে গেল। বাড়িতে দুজনেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান সম্পর্কে সব কিছু জেনে এসেছে।
দুজনে পাশাপাশি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর সৌপ্তিক বলল “তুই তাহলে বাঙাল”।
অনির্বাণ বলল “আর তুই ঘটি”।
সৌপ্তিক বলল “তুই ইলিশ মাছ খাবি”।
অনির্বাণ বলল “আর তুই চিংড়ি”।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকল। খানিকক্ষণ পরে অনির্বাণ বলল “কিন্তু আমার ইলিশ একদম ভাল লাগে না। আমার চিংড়ি পছন্দ”।
সৌপ্তিক বলল “আমার উল্টোটা। ইলিশ দারুণ লাগে, চিংড়িতে আমার অ্যালার্জি আছে”।
দুজনে খানিকক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর দুজনের মুখেই একটা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
৩।
পরের রবিবার আবার একই রেস্তোরাঁয় দুই ফ্যামিলি এক সাথে খেতে গেল। বলা ভাল যেতে বাধ্য হল। সৌপ্তিক আর অনির্বাণ দুজনে বাড়িতে জ্বালিয়ে খেয়েছে আবার গেট টুগেদার করতে হবে। মায়েদের কোন আপত্তি ছিল না, তারা তো চানই গল্প করতে। তাপসবাবু আর নির্ঝরবাবু প্রথমে বারণ করে দিয়েছিলেন আগের রবিবারের কথা ভেবে কিন্তু ছেলেদের জ্বালাতনে যেতে বাধ্য হলেন।
তাদের গিন্নিরা তাদের বরেদের একদম থ্রেট করে নিয়ে গেছেন যদি খেলা সংক্রান্ত কোন রকম কথা ওঠে তাহলে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে। তাপসবাবু আর নির্ঝরবাবু নিস্তেজভাবে দেশের দুরবস্থা নিয়ে আলাপ করছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তাদের এটা করতে হচ্ছে।
ওয়েটার এসে খাবার অর্ডার নিয়ে গেল। আজ আর ইলিশ চিংড়ির ঝামেলা উভয় পক্ষ থেকে কেউই করে নি। শুরুতেই ঠিক হয়ে গেছে আজ চাইনিজ হবে। যদিও মিক্সড ফ্রাইড রাইস অর্ডার করার সময় তাপসবাবুর মুখে একটা পৈশাচিক হাসি চলে এসেছিল কারণ ওতে চিংড়ি আছে আর ইলিশ কিছুতেই দেওয়া যাবে না, তবে তিনি চেপে গেলেন। বউয়ের ভয় যে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের থেকে অনেক উপরে সেটা ঘটি বাঙাল উভয়পক্ষই ভাল মতই জানেন।
খাবার অর্ডারের পর বেশ খানিকটা ফাঁকা সময় থাকে। এই সময় সৌপ্তিক বলল, বাবা, মা , আঙ্কেল, আন্টি। আমি আর অনির্বাণ একটা জিনিস ঠিক করেছি। তোমাদের সেটা জানাতে চাই”।
রুমি অবাক হলেন, “তুই আবার কী বলবি?”
সৌপ্তিক মার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপরে বলল “আমি আর অনির্বাণ মিলে ঠিক করেছি আমি ইস্টবেঙ্গলকে সাপোর্ট করব, আর অনির্বাণ মোহনবাগানকে”।
মনে হল একটা ছোটখাট বোম পড়ল। তাপসবাবু আর নির্ঝরবাবু হা করে তাদের ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন “তা কী করে হয়? এটা ওভাবে হয় নাকি? বাঙাল বাড়ির ছেলে ইস্টবেঙ্গল হবে আর ঘটি বাড়ির ছেলে মোহনবাগান এটা তো জন্ম থেকে ঠিক হয়ে থাকে। যত সব বাচ্চাদের মত কথা”।
অনির্বাণ বলল “না। বাচ্চাদের মত কথা না। দেখো না, আমি তো বাঙাল, আমার তো ইলিশ মাছ একদম খেতে ভালো লাগে না। সেটা তো আর জন্ম থেকে ঠিক হয়ে আসে না”।
সৌপ্তিক বলল “আর যদি জন্ম থেকেই সব ঠিক হয়ে যেত তাহলে চিংড়ি খেলে আমার অ্যালার্জি হয় কেন বাবা? কিছুদিন আগে যখন ডাক্তার দেখালে ডাক্তারবাবু বললেন না চিংড়ি অ্যাভয়েড করতে হবে আমাকে? তাহলে?”
তাপসবাবু আর নির্ঝরবাবু দুজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন। তারপরে নির্ঝরবাবু বললেন “তোরাও যেমন। আরে খেলা ইজ খেলা। ওতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটাই আসল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান একটা ঐতিহ্যের নাম এই খেলা নিয়ে মারপিট তো হবেই। সেটারও একটা ভাল দিক আছে”।
অনির্বাণ বলল “তাইজন্যই তো। ঐতিহ্যটা বজায় তো থাকবেই। কিন্তু জন্ম অনুযায়ী সমর্থনের দলটা শুধু বদলে যাবে। শুধু একটা খেলাকে কেন্দ্র করে কারও খাদ্যাভাস নিয়ে ব্যঙ্গ করা, অতীতের কষ্টকে টেনে হিঁচড়ে ব্যথা বাড়িয়ে দেওয়া, কারও উচ্চারণকে নিয়ে মজা করা কোনদিন কারও পক্ষে ভাল হতে পারে বাবা? আমরা শুধু দলটাকেই না হয় সমর্থন করি। জন্ম কার কিভাবে হয়েছে, কে কোথা থেকে এসেছে সেটা নাই বা টানলাম?”
সৌপ্তিক বলল “আর বাকি স্টেটগুলোর সাথে বাঙালি এই কারণেই পিছিয়ে থাকে যে তারা কখনও এক হতে পারে না। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা থাকল তো, কিন্তু তার সাথে অতীত নিয়ে কেন টানাটানি করব?”
নির্ঝর, তাপস, রুমি আর তিস্তা হাঁ করে সৌপ্তিক আর অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
নির্ঝরবাবু কয়েক সেকেন্ড পরে নীরবতা ভঙ্গ করলেন “তোরা সারা সপ্তাহ ধরে এটা ভেবেছিস?”
সৌপ্তিক আর অনির্বাণ দুজনে একসাথে মাথা নাড়ল।
তাপসবাবু বললেন “ছেলেগুলো বড় হয়ে গেল কবে না? এই সেদিন...” তাপসবাবু কথা শেষ করতে পারলেন না।
নির্ঝরবাবু বললেন “আমাকেই কত কিছু শিখিয়ে দিলি তুই বাবান। আসলে ছেলে কার দেখতে হবে তো”।
তিস্তা রাগলেন “হ্যাঁ সবই তো তোমার। আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি”।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
৪।
সপ্তাহ চারেক পরে কোন এক রবিবার। ডার্বি ছিল সন্ধ্যেবেলা। মোহনবাগান জিতেছে।
খাওয়ার টেবিলে বসতেই অনির্বাণ শুরু করে দিল “কীরে সৌপ্তিক, কত বড় বড় কথা, দেখলি তো? এর নাম প্রশান্ত পাঁজা। গোলটা দেখলি? ফ্রি কিক শেখ”।
সৌপ্তিক ফোঁস করে উঠল “হ্যাঁ হ্যাঁ অনেক জানা আছে, একটা শিওর পেনাল্টি দিল না। রেফারি ম্যানেজ করেছে আবার বড় বড় কথা”।
অনির্বাণ বলল “সেসব আমরা করি না। তোদের কপিরাইট ওটা বুঝলি?”
দুজনে তুমুল লেগে গেল। মায়েরা মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।
নির্ঝর আর তাপসবাবু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসতে লাগলেন।
এটা ফুটবল।
সব খেলার সেরা।
এত সহজে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানকে মুছে দেওয়া যাবে না...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান