মুছে যাওয়া দিনগুলি

অভীক দত্ত

 

থার্ড পিরিয়ড শেষ হবার আর ফোর্থ পিরিয়ড শুরু হবার আগে যে সময়টা, সেই সময়টায় হোল্ডার আমার কানে কানে বলল “দিলীপ স্যারের নাম কী জানিস?”
আমি বড় বড় চোখ করে হোল্ডারের দিকে তাকিয়ে বললাম “না তো, কী রে?”
হোল্ডার চোখ মেরে বলল “আলু স্যার”।
আমি মাথা চুলকালাম। দিলীপ স্যার তো খুব একটা মোটা নন। ইনজামাম উল হককে আলু বললে ক্ষেপে যেত, গ্যালারিতে একজনকে ব্যাট নিয়ে পিটিয়েওছিল আলু বলার জন্য এটা দিব্যি মনে আছে, কিন্তু দিলীপস্যার কেন আলু স্যার হতে যাবেন। বললাম “এই নাম কেন দিয়েছে?”
হোল্ডার চোখ টিপে বলল “আবে মালটার আলুর দোষ আছে তাই, পটাটো সিনড্রোম”।
আমি আবার অবাক হলাম। বললাম “আলুর দোষ মানে?”
হোল্ডার খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে অনির্বাণকে ডাকল “এই মোটা, আমাদের গিফট অফ মাগী কী বলছে দেখ। আলুর দোষ মানে জানে না”।
ক্লাস শুদ্ধ ছেলে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল। অনির্বাণ মোটা আমার কাঁধে একটা থাবড়া মেরে বলল “ওরে সন্টা মন্টা ভাল ছেলে আমার, আলুর দোষ মানে জানো না? আলুর দোষ মানে হল ওই যে নীচে যে দুটো আলু আছে তার দোষ। দিলীপ স্যার বাড়িতে একমাত্র মেয়েদের টিউশন দেন। ছেলেদের দেন না। তাই ওনার নাম আলু স্যার। বুঝলি কিছু?”
কিশোর আমাদের ক্লাসের সব থেকে ডেঞ্জার ছেলে। সব রকম জিনিস থাকে ওর কাছে। ব্যাগের ভিতর থেকে একটা ছবি এনে আমার সামনে ধরল “এই দেখ, আলু”

আমি এবার স্পষ্ট বুঝলাম। বুঝে আমিও খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসলাম।
অবশ্য একটু হেসে মনে হচ্ছিল হাসাটা ঠিক না, কিন্তু কী করব, পেটে এমন একটা গুড়গুড়ি শুরু হয় যে সেটাকে কিছুতেই কন্ট্রোল করা যায় না। দিলীপ স্যারের কথায় ক্লাসে যে সেই একবার হাসাহাসি শুরু হল, কেউই আর নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারল না। হেডস্যার দেবব্রত বাবু ক্লাসের মাঝখানে একটা বেত নিয়ে স্কুল ঘুরতে বেরোন। আমাদের ক্লাসের থেকে শব্দ শুনে ক্লাসে ঢুকে পড়লেন। উনি সাম্যবাদে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। ফার্স্ট বয় সেকেন্ড বয় লাস্ট বয় সবাইকে সমান চোখে দেখতেন। মানে পিটাতেন। ক্লাসে ঢুকেই ফার্স্ট বেঞ্চে মণিময়কে পেলেন। মণিময় ফার্স্ট বয়। সব ক্লাসে পড়া পারে। হেডস্যার মণিময়ের চুলের মুঠি ধরে পিঠের মধ্যে দু ঘা দিয়ে দিলেন। মণিময় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল “মারলেন কেন স্যার”?
হেডস্যার বললেন “এটা স্কুল না নিলাম বাজার পাইছ হ্যাঁ? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাইস?”
হেডস্যার রেগে গেলে বাঙাল ভাষায় কথা বলতেন। তার সব চুল সাদা। আর এক দেড় বছর পরেই রিটায়ার করবেন। মণিময় হেডস্যারের কথায় বলল “না স্যার”।
হেডস্যার মণিময়কে ছেড়ে হোল্ডারের দিকে এগোলেন। হোল্ডারের নাম হোল্ডার কে দিয়েছিল জানি না, ওর ভাল নাম বিপ্লব। ক্লাস সেভেন থেকেই বাথরুমে গিয়ে ফুঁক ফুঁক করে বিড়ি টানা শুরু করেছে। বিড়ি টানা মানেই অনেক বৈপ্লবিক ব্যাপার বলে মনে করা হত সে সময়।
হোল্ডার আগে থেকেই আত্মসমর্পণ করে দিল “স্যার এই কান ধরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি আমি”।
বলে বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল।
হেডস্যার বিপ্লবের ঠ্যাঙে কঞ্চি দিয়ে এক বাড়ি মেরে বললেন “তরে কইসি আমি খাড়াইতে? কইসি?”
হোল্ডার নেমে পড়ল বেঞ্চ থেকে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল “না স্যার”।
হেডস্যার এবার হোল্ডারের চুলের মুঠি ধরে বললেন “নামতে কইসি?”
হোল্ডার কাঁদতে কাঁদতে বলল “না স্যার”।
হেডস্যার বললেন “খাড়াইতে চাইলে মাঠের মাঝখানে গিয়া খাড়াইয়া থাক। বেঞ্চি নোংরা করবি না। জানিস কারা কারা পইড়া গেসে ওই বেঞ্চে? তগো মত কুলাঙ্গার ভাবসিস সবাইরে?”
ক্লাসে বাবলু স্যার ঢুকে গেলেন। বাবলু স্যার ভূগোল পড়ান। হেডস্যারকে দেখে তঠস্থ হলেন হেডস্যার হোল্ডারকে ছেড়ে বাবলু স্যারের দিকে ধাবমান হলেন “কী করত্যা সিলা বাবলু? স্কুলে
কি ডিসিপ্লিন বইল্যা আর কিসু থাকব না নাকি?”
বাবলু স্যার অসহায়ের মত বললেন “আপনিই তো বললেন ইলেভেন সি তে খাতা ক’টা দিয়ে আসতে। ভুলে গেলেন?”
হেডস্যার অবাক হয়ে কিছুক্ষণ বাবলু স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন “দ্যাখস ভুইল্যা গেসিলাম। আচ্ছা তুমি পড়া ধর তো বান্দরগুলানরে। দেখি কে কী পারে”।
আমাদের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। হেডস্যার থাকা মানেই যে পারবে না তার কপালে অশেষ দুঃখ। বাবলু স্যার বইটা বের করলেন। হেডস্যার বললেন “সামান্য কয়খান প্রশ্ন করবা তার জন্য বই লাগে নাকি? আমিই করি। ওই লাস্ট বেঞ্চ। স্ট্যান্ড আপ”।
দুই রোতে দুটো লাস্ট বেঞ্চ ক্লাসে। এক একটা বেঞ্চে পাঁচজন করে বসে। দশজনই দাঁড়াল। হেডস্যার বললেন “ক’, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলতে কী বুঝ?”
লাস্ট বেঞ্চের একদম কোণায় কিশোর ছিল। নটোরিয়াসের সাথে কিশোর ক্লাসের মোস্ট ওয়ান্টেড ছেলেও বটে। প্রায় সব ক্লাসেই মার খায়। হেডস্যারের প্রশ্ন শুনে খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলল “স্যার যে হ্রদের অর্শ আছে তাকে বলে বোধ হয়”।
ক্লাসের ছেলেগুলো হো হো করে হেসেই পরমুহূর্তেই চুপ করে গেল। হেডস্যার খানিকক্ষণ হাঁ করে কিশোরের দিকে তাকিয়ে বললেন “এইদিক আয়। তোর অর্শ বাইর করত্যাসি”।
কিশোর চুপ চাপ গিয়ে দাঁড়াল। হেডস্যার পিঠের মধ্যে চার পাঁচটা বেত মেরে বললেন “স্কুলের বাকি সময়টা বাইরে নীল ডাউন হইয়া খাঁড়ায় থাক। হ্রদের অর্শ হইব? সারাদিন পিটাইলেও তরে মানুষ করা যাইব না। শুইন্যা রাখ, কাল থেকে তুই সকালে আমার বাড়ি যাবি। সকাল ছ’টায়। এক মিনিট দেরী হইলেও মাইর্যা পিঠের ছাল ছাড়াইয়া দেব”।
কিশোর মাথা নাড়ল। তারপর চুপচাপ বাইরে নীল ডাউন হয়ে দাঁড়াল। হেডস্যার মণিময়কে দাঁড় করালেন “ক’ অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ কারে কয়”?
মণিময় ঠিক ঠাক বলল। হেডস্যার “গুড” বলে বাবলুস্যারের দিকে ফিরলেন “ফার্স্ট বয় তো জানবই, কিন্তু লাস্ট বয়রেও জানাইতে হইব বুঝছ বাবলু? যে পড়ে না তারে পড়ানোর জন্যও স্কুল খোলা হয়”।
বাবলু স্যার হাসলেন, “আচ্ছা স্যার। মনে রাখব”।
হেডস্যার বেত নিয়ে বাঘের মত ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সম্ভবত বাবলু স্যারও।
পরের দিন স্কুল গেলে সবাই কিশোরকে ঘিরে ধরল। হেড স্যারের বাড়ি কী কী করল সবার জানার কৌতূহল। কিশোর এমনিতে চৌখস ছেলে। শুধু স্যারেদের সামনে একটু চুপচাপ থাকে। আমরা অনেকেই জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম। কিশোর খানিকক্ষণ পরে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “মাইরি বিশ্বাস করবি না, সেই ভোর ছ’টায় গেছি। গিয়ে বলে কী না এবিসিডি লেখ। আমি এবিসিডি লেখার পরে কিছুক্ষণ আমার হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে বলে এডা কী লিখছস? মনে হইত্যাসে পিঁপড়ারে আলকাতরায় চোবাইয়া ছাইড়া দিসে। তারপর একটা খাতা দিল। Man is mortal, শুধু এই লেখাটা সকাল ছ’টা পনেরো থেকে ন’টা পর্যন্ত লিখিয়েছে। আমার হাতে কাঁধে ব্যথা হয়ে গেল। বলল কাল সকালেও যেতে হবে। আমি পাগল হয়ে যাব”।
আমরা ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। কিশোর ব্যাজার মুখে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল। তার পরের প্রতিদিনই কিশোরকে নিয়ে আমরা খিল্লি করতে লাগলাম। কোনদিন কিশোরকে হেডস্যার হয়ত পড়ানই নি, বাড়ির সামনের মাঠটায় আট পাক দৌড়ও করিয়েছেন। বলেছেন “শুধু লেখা পড়া করলেই হইব? তার লগে শরীরও ঠিক রাখতে হইব”। তারপর ধীরে ধীরে আর সব কিছুর মত কিশোরকে নিয়ে আলোচনাও এক সময় স্তিমিত হল।
অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন বেরোল সেদিন সবার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। কিশোর যে কিনা প্রতিবছর একটা দুটো সাব্জেক্টে ফেলে করে যেত, সে সেভেন্থ হয়েছে। রেজাল্ট নিয়ে কিশোর লজ্জা লজ্জা মুখ করে ওই লাস্টবেঞ্চে গিয়েই বসল। কিন্তু আমরা সে দিনটা যে শক পেয়েছিলাম সেটা কোনদিনও ভুলতে পারব না।
মাধ্যমিকে কিশোর স্টার পেল। উচ্চ মাধ্যমিকেও। জয়েন্টে মেডিক্যালে চান্স পেল। এখন সে ডাক্তার। মাঝে মাঝে কথা হয়। কিশোর হাসতে হাসতে বলে ভাইরে কী ছিলাম, এখন ভাবলেও লজ্জা হয়। হেডস্যার না থাকলে হয়ত মাল খেয়ে কোনো নর্দমায় পড়ে থাকতাম আজকে।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান