একজন হেরে যাওয়া মানুষের গল্প

অভীক দত্ত

 

ঘুম থেকে উঠেই রুদ্রর মনে হল সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। কেনা হয় নি। দুপুরে কিনবে ভেবেছিল কিন্তু তখন এমন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল আর বেরোতে পারে নি। কী করবে বুঝতে না পেরে ঘুমিয়েই পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠেই একটা সিগারেট ধরানোর অভ্যেস বহুদিনের। বৃষ্টি এখনও থামে নি। ঘুম চোখে উঠে রুদ্র শুভর বালিশের তলায় সার্চ করা শুরু করল। নাহ, এখানেও নেই।
অনেকদিন এরকম বৃষ্টি হয় না। গত কয়েকবছরে তো হয়ই নি। বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। রুদ্র খানিকক্ষণ বসে থাকল। তারপর ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মাথা বাঁচানো ছাড়া ছাতা অবশ্য বিশেষ কোন সুবিধা করল না।
রাস্তায় গোড়ালি ডুবছে। মেস থেকে মোড়ের চায়ের দোকানে যেতে যেতে ভিজে যাওয়ার চান্স ভালই। রুদ্র ভ্রুক্ষেপ করল না। বৃষ্টির থেকে সিগারেটটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে।
দুপুরে ঘুম হলে গা ম্যাজ ম্যাজ করে। রুদ্র সাধারণত ঘুমায় না। গত তিনদিন কোন কাজ নেই। তিনদিনই ঘুম হয়ে গেল। ঘুমের অভ্যাস ভাল না। এর আগে এক ক্লায়েন্টের বাড়ি গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগেই চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে আসছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছিল। তবু মেসে একা থাকলে কাজ বিশেষ কিছু থাকে না। ঘুমটা তাই না চাইতেও চলে আসে। পকেটের মধ্যে মোবাইলটা গো গো করে উঠল।
রুদ্র বিরক্ত হল। এই এক জ্বালা হয়েছে। ঠিক যখন ফোন ধরার মত জায়গায় থাকবে না তখনই ব্যাটাকে বেজে উঠতে হবে।
রুদ্র ফোনটা বের করল। পা ভিজে যাচ্ছে। পা ভিজে যাওয়া মানে জ্বর আসবে। একটু ভিজলেই জ্বর আসে তার।
আননোন নাম্বার। রুদ্র প্রথমে ভাবল ধরবে না। আজকাল আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসা মানেই হয় স্যার ক্রেডিট কার্ড নিন, নয় স্যার গাড়ি কিনুন... হাবভাব এমন যেন বিলটা ওদের বাবা এসে মিটিয়ে দিয়ে যাবে।
সমস্যা হল ফোনটা কাটতে গিয়ে রিসিভ হয়ে গেল।
এটা নিয়ে রুদ্র ভেবেছে। আসলে এটা একটা স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়ার জন্য হয়। সারাক্ষণ ফোন ধরতে অভ্যস্ত হাত ফোন কাটতে গিয়ে রিসিভ করে ফেলে।
-কেমন আছ?
গলাটা একবার শুনেই চিনতে পারল রুদ্র। শাল্মলী। অপ্রস্তুত হল সে। এইসময় সিগারেটটা দরকার ছিল। তার নম্বরটা জোগাড় করল কী করে?
সে শুধু বলল “ভাল”।
-আমি দেশে ফিরলাম কাল।
-ওহ।
-একবার দেখা হবে? আসতে পারবে?
রুদ্র বুঝতে পারল না কী করবে। শাল্মলীর সাথে আবার দেখা? বন্ধ হয়ে যাওয়া বই আবার নতুন করে খোলা যায় নাকি? দোকানে পৌঁছে গেছিল সে। ইশারায় একটা সিগারেট নিয়ে তাড়াতাড়ি ধরাল সে।
বলল “কোথায় যেতে হবে?”
-এখনই আসতে পারবে? যে অবস্থায় আছ?
রুদ্র নিজের পরে থাকা গেঞ্জিটা দেখল আগে। পায়ের জুতোটাও। এককালে শাল্মলীকে পড়াতে যাবার সময় আধঘণ্টা ধরে তৈরি হত সে। এখন সে প্রয়োজনীয়তাটা বোধ করল না। বলল “হ্যাঁ। কোথায় যেতে হবে বল”।
-আমাদের পাড়ার পার্কে চলে আস।
রুদ্র অবাক হল “বৃষ্টি পড়ছে তো”।
-তো? চলে আস।
-ওকে। আসছি।
রুদ্র ফোনটা কাটল। সিগারেটটা মাথাটা সাফ করার জায়গায় আরও গুলিয়ে দিচ্ছে। একটাই ট্যাক্সি ছিল পাড়ার মোড়ে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে। ট্যাক্সিচালক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। এই পাড়ারই লোক। সামনের সিটে শুয়েছিলেন।
রুদ্র পেটে খোঁচা দিল। ধড়মড় করে উঠে বসলেন ভদ্রলোক। “কোথায় যাবেন?”
রুদ্র বলল “স্টার্ট করুন। বলছি”।
২।
ছাতাটায় তাপ্পি আছে একটা । রুদ্র লুকোবার চেষ্টা করল না। আগে হলে লুকোত। তারপর ভিজত। এখন জ্বর এলে সমস্ত দিক দিয়ে সমস্যা।
বৃষ্টি এক ফোঁটাও থামেনি। একই গতিতে হয়ে চলেছে। রুদ্র পার্কের ভিতরে ঢুকল। কাকপক্ষীও নেই। সবাই বাড়িতে পেঁয়াজি ভাঁজছে নির্ঘাত।
শাল্মলী চুপচাপ ছাতা নিয়ে পার্কের কোণে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। রুদ্রর হঠাৎ খুব চুমু পেল। পেঁয়াজি আর চুমু কি একসাথে খাওয়া যায়?
সে খানিকটা চিন্তিত হল। আগে কোনটা খায়? গরম গরম পেঁয়াজি না গরম গরম চুমু? খানিকটা ভেবে হাল ছেড়ে দিল সে। শাল্মলীর সাথে তো চুমু পেলে চলবে না। সে পাট বহুদিন আগেই চুকিয়ে দিয়েছে সে। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শাল্মলীর কাছে পৌঁছল রুদ্র।
তাকে দেখে শাল্মলী হাসল। বলল “এলে তাহলে?”
রুদ্র বলল “হু”।
-বস।
-তোমার পাশে?
-হ্যাঁ অসুবিধা আছে?
-না অসুবিধা কিসের?
শাল্মলী এই প্রশ্নের জবাব দিল না। বলল “আমার মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখছ?”
রুদ্র এতক্ষণ তাকাচ্ছিল না। এবার ভাল করে শাল্মলীর দিকে তাকাল। সেই চুল... কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা... চুলটা দেখলেই এই আবৃত্তিটা করে ফেলত সে।
-কালার করেছ?
-আর?
-লিপস্টিকের কালারটা আননোন। এটা কেমন কালার?
-ফিউশন।
রুদ্র চমৎকৃত হল। লিপস্টিকেও ফিউশন?
এই ফিউশন লিপস্টিকের স্বাদ নেবার ইচ্ছাটা থেকে বহু কষ্টে নিজেকে প্রতিহত করল সে। গলাটা যথাসম্ভব নিস্পৃহ করে বলল “আচ্ছা”।
-ভাল না?
-হু। সুন্দর।
-তুমি কিন্তু সেই একই রকম আছ।
-তাই?
-হ্যাঁ তাই। ডিড ইউ মিস মি?
রুদ্র এই কথার উত্তর দিল না। শুধু বলল “আমেরিকা ভাল জায়গা?”
শাল্মলী হাসল। অনেকক্ষণ ধরে। তারপর বলল “কথা ঘুরাচ্ছ কেন?”
রুদ্র শক্ত হল “আমার কোন ইমোশন নেই শাল্মলী। তোমার জন্য আমার একফোঁটাও ফিলিং কাজ করে না কোন”।
শাল্মলী অন্যদিকে মুখ ফেরাল। বলল “বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। পড়াতে পড়াতে হঠাৎ তুমি এগিয়ে এসে আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁট জুড়ে দিলে... সেদিনও ভালবাস নি?”
রুদ্র শাল্মলীর চোখের দিকে তাকাল। বলল “ভালবাসা ছিল তখন। এখন আর কিছু নেই আসলে। আমাদের মধ্যে এখন আর কিছু নেই তো”।
-তাহলে এলে কেন?
-ভাবলাম অন্য কিছু বলবে হয়ত।
-অন্যকিছু মানে?
-জানি না। নো আইডিয়া। মনে হয়েছিল। বিদেশ থেকে সবাই কত সুন্দর সুন্দর চকলেট আনে। তুমিও আনবে ভেবেছিলাম। সেই লোভেও আসতে পারি।
-ওহ। চকলেট? এনেছি তো।
-দাও।
-নেবে? লজ্জা লাগবে না?
-কিসের লজ্জা? চকলেটের সাথে লজ্জা এক পাতে বসে নাকি? তাছাড়া আমি এখন হাফ বেকার। বেকারদের লজ্জা শরম থাকে না। এই যে ট্যাক্সিতে এলাম দেড়শোটাকা চলে গেল। তুমি রিফান্ড করতে চাইলে আমি বাধা দেব না একদম। বিলিভ মি।
-করব না রিফান্ড। নিশ্চিন্ত থাক।
-আমাকে একজন হেরে যাওয়া মানুষ মনে হচ্ছে না?
-সে কারণেই ভালবাসা দূরে সরে গেছে?
-বেকারত্বের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক নেই। তুমি একটা স্যাম্পেল অ্যানালিসিস কর। দেখবে ৯০% বাঙালি বেকার ছেলে চাকরি খোঁজার থেকে বেশি চাপ নিয়ে প্রেম করে। নিজে খেতে না পাক প্রেমিকাকে নিয়ে ঘুরতে যাবার সময় দরকার হলে জীবন দিয়ে দিতে রাজি এরা।
-সব জানো তুমি না?
-হ্যাঁ একদম। সবজান্তা গামছাওয়ালা।
-তুমি এরকম হলে না কেন?
-হলাম না। কী করব।
-আমি জানি তুমি আমাকে এখনও ভালবাস। ঘর বাঁধতে ইচ্ছা করে না আমার সাথে?
-তুমি একটা বোকা মেয়ে শাল্মলী। একটা হেরে যাওয়া মানুষের পিছনে পড়ে আছ এখনও। একটা নতুন রিলেশনে ঢুকতে পারলে না?
-ঢুকেছিলাম। কিন্তু পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণে ভালবাসতে। তোমাকে ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করতে। হয় নি।
-কেন হয় নি?
-বোঝ না? নাকি বুঝতে চাও না? স্বপ্ন দেখিয়েছিলে কেন অযথা?
রুদ্র পার্কের দিকে তাকাল। বাচ্চাদের দোলনা, সিড়ি দিয়ে উঠে স্লিপ খাওয়ার জায়গাটা একা একা কেমন অসহায় ভাবে ভিজছে। রুদ্রর হাত ব্যথা করছিল। ছাতাটা রাখতেও পারছিল না। শাল্মলী ছাতাটা বন্ধ করল। তার ছাতার নীচে এল।
রুদ্রর হঠাৎ মনে হল শরীরের সংজ্ঞা কী? এমন একটা জিনিস যেটা অনুভূতি না থাকলেও শিহরিত করে?

শাল্মলী ঠান্ডা গলায় বলল “পরের সপ্তাহে আমি চলে যাচ্ছি আবার”।
রুদ্র বলল “আচ্ছা”।
-আমার হাতটা একটু ধরবে?
রুদ্র ধরল। বলল “অনেক কাজ আছে। এবার যেতে হবে”।
শাল্মলী রাগল “কোন কাজ নেই। কিছুই তো করে উঠতে পারলে না। এত কাজ দেখাবার কী আছে?”
রুদ্রর হাতের মধ্যে শাল্মলীর হাতটাও কি রাগল? রুদ্র বুঝে উঠতে পারল না। বলল “হল না শাল্মলী। আমি হেরে গেছি। এভাবেই কাজ দেখিয়ে যেতে হবে আমাকে”।
শাল্মলী রুদ্রর মুখটা টেনে জোর করে চুমু খেল। রুদ্র বাধা দিল না। কয়েক সেকেন্ড পরে ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে শাল্মলী বলল “এত ঠান্ডা হয়ে গেলে কী করে?”
রুদ্র ফিসফিস করে বলল “Since there is no help, come let us kiss and part”  
শাল্মলী হাত ছেড়ে দিল তার। তার থেকে, তার ছাতার থেকে দূরে গিয়ে বসল। ভিজতে লাগল বৃষ্টিতে।
রুদ্র উঠল, “আসি”।
শাল্মলী কিছু বলল না।
রুদ্র যেমন এসেছিল, তেমনই ধীর পায়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। শাল্মলীর দিকে একবারও ফিরে তাকাল না।
পার্কের বাইরে এসে সে ছাতাটা ফেলে দিল।
ভিজতে ভিজতেই হাঁটতে লাগল রাস্তা দিয়ে একজন হেরে যাওয়া মানুষ।
জ্বর আসুক না আসুক, তার কোন যায় আসে না আর...
(কোটেশন courtesy: Michael Drayton
কোটেশন অনুপ্রেরণা- “বাসর”, হুমায়ূন আহমেদ)

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান