অনিন্দ্য সিরিজের গল্প

অভীক দত্ত

 



অনিন্দ্য যে কিভাবে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হল আমি জানি না। শুধু আমার কেন, অনিন্দ্য কারও ফ্রেন্ড হবারই যোগ্য নয়। এত নির্লিপ্তভাবে বড় বড় কেস খাবার কথা বলে যে শুনলে মনে হবে নির্ঘাত ঢপ মারছে। তারপরে দেখা যায় ঠিকই বলেছিল। আবার এর উল্টোটাও হয়।
কলেজে থাকতে একবার ওকে আমার প্রক্সি দিতে বলেছিলাম। ক্যান্টিনে আড্ডা মারছিলাম। অনিন্দ্য এল। এসে বলল “তোর প্রিন্সিপাল কল হয়েছে”।
আমি ভাবলাম ইয়ার্কি মারছে। উড়িয়ে দিয়ে বললাম “খালি ঢপ মারিস নাকি?”
অনিন্দ্য নির্লিপ্ত মুখে বসে বলল “তোর প্রক্সি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছি। তোকে এক্ষুণি ডেকে পাঠিয়েছে”।
আমি চাপ টাপ খেয়ে গেলাম। প্রিন্সিপালের রুমে চলে গেলাম। নক করে ঢুকতেই দেখি স্যার বললেন “কী ব্যাপার?”
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম “স্যার আমি ফিজিক্স অনার্সের পিনাকি। আপনি ডেকেছিলেন?”
প্রিন্সিপাল অবাক হয়ে বললেন “না তো”।
আমি বুঝলাম অনিন্দ্য ঢপ মেরে দিয়েছে। কোনমতে সরি টরি বলে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি দিব্যি বসে চিকেন রোল সাটাচ্ছে। লোকে কেস খাওয়ালে প্যাঁক ট্যাক মারে। ওর সেসব নেই। আমি কিছুক্ষণ গালাগাল করে নিজেই চুপ করে গেলাম।
এরকম লাখ লাখ কেস আছে কলেজ লাইফে। সেসব বলে আর এই কাহিনীকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না।
যাইহোক, মাস্টার্স কমপ্লিট করে অনিন্দ্য কোন একটা ধ্যাদ্ধেরে গোবিন্দপুরে স্কুল শিক্ষকের চাকরি পেয়ে চলে গেল। আমি কলকাতাতেই একটা চাকরি পেলাম। কলেজে যখন পড়তাম, ওর ওই রকম স্বভাব সত্ত্বেও একদম হরিহর আত্মা ছিলাম। ছ’মাস মত দেখা সাক্ষাৎ হয় না দেখে একদিন ওকে ফোন করলাম, কেমন আছে টাছে জিজ্ঞেস করার পর বললাম “একদিন তো ডাকতে পারিস, ঘুরে যেতে পারি”।
অনিন্দ্য কিছুক্ষণ ভেবে বলল “তুই এই বৃহস্পতিবারে চলে আয়”।
আমি একটা ব্যাগ নিয়ে বুধবার রাত্রেই ট্রেনে উঠে পড়লাম। এক রাতের জার্নি। মালদায় নেমে বাসে আরও তিন ঘণ্টা যেতে হয়। জার্নি শেষে যখন ওর এলাকায় বিধ্বস্ত হয়ে পৌঁছলাম দেখলাম একটা বাইক নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাস স্টপেজে।
আমাকে নামতে দেখে বলল “এই তো, এসে গেছিস। তাড়াতাড়ি চ”।
আমি ওর বাইকের পিছনে বসতে ঝড়ের গতিতে বাইক নিয়ে রওনা দিল। যতই বলি “ওরে ভাই ধীরে চালা, কে শোনে কার কথা”।
একটা গ্রামের ভিতরে স্কুল। স্কুলের কাছেই একটা ছোট একতলা বাড়িতে থাকে অনিন্দ্য।
ঘরে ঢুকে ব্যাগ ট্যাগ রাখলাম। অনিন্দ্য বলল “তুই দুপুরে খাবি তো?”
আমি ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বললাম “বালটা! সারারাত ট্রেন জার্নি করে এলাম। খাব না মানে?”
অনিন্দ্য কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আসলে তুই যে খাবি সে ব্যাপারটা ভুলে গেছিলাম। একজনের মত খাবার আনিয়েছি। আচ্ছা দাঁড়া, ভাত বসিয়ে দি একটু। তরকারি আর মাছ ভাগাভাগি করে খাব”।
অন্য কেউ হলে অবাক হত কিংবা রাগ হত। আমি কিছুই হলাম না। এটাও জানি অনিন্দ্য এটা ইচ্ছা করে করে নি। ও এই রকমই। আমি হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে দেখি একটা বছর পনেরোর ছেলে দাঁড়িয়ে। অনিন্দ্য তাকে টাকা দিল। ছেলেটা বেরোতেই এক গাল হেসে বলল “খাবার হয়ে যাবে। আচ্ছা শোন, খেয়ে একটা ঘুম দিস। আমি লাস্ট দুটো পিরিয়ড করিয়ে চলে আসব”।
আমি অবাক হয়ে বললাম “এখন স্কুলে থাকার কথা না তোর?”
অনিন্দ্য বলল “কথা তবে তিনটে পিরিয়ড ম্যানেজ করলাম। তোকে গ্যারাজ করার একটা ব্যাপার আছে তো!”
আমি আর কিছু বললাম না। খানিকক্ষণ পরেই ছেলেটা একটা টিফিনকারি নিয়ে এল। আগে আরেকটা টিফিনকারিতে অনিন্দ্যর খাবার ছিল। দুপুরের খাওয়া হল। কী যে রান্না কিছুই বুঝলাম না। ডাল সব্জি, মাছ সব একইরকম খেতে। আমি অবাক হয়ে বললাম “তুই এটা খাস রোজ?”
অনিন্দ্য অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল “হ্যাঁ তো?”
আমি আর কিছু বললাম না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম অনিন্দ্যর বাবা অত বড় একজন ডাক্তার। অত বড় বাড়ির ছেলে এরকম খ্যাপার মত এত দূরে পড়ে আছে কী করতে! এতদিন এসব নিয়ে ভাবি নি। ওকে দেখার পরে আমার মাথায় এসবই ঘুরতে শুরু করল।
দুপুরে একটু গড়িয়ে নিলাম। পথশ্রম ছিল।
বিকেলে এলাকাটা হেঁটে দেখলাম। ছোট গ্রাম। যত দেখছিলাম, তত অবাক হচ্ছিলাম আর বারবার মাথার মধ্যে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল যে অনিন্দ্য এখানে কী করছে!
সন্ধ্যে হতে বেশ কিছু ছেলে অনিন্দ্যর কাছে পড়তে এল। অনিন্দ্য যতক্ষণ পড়াচ্ছিল ততক্ষণ মোবাইলে গেম খেলে কাটালাম।
ছেলেগুলো বেরিয়ে যাবার দশ মিনিট পরে লোডশেডিং হয়ে গেল। অনিন্দ্য মোমবাতি জ্বালাল। আমার গরম লাগছিল। বললাম “হ্যাঁরে ইনভারটার লাগাবি না?”
অনিন্দ্য বলল “কী দরকার!” তারপর চুপ করে গেল। আমি বুঝলাম ওকে আর ঘাটিয়ে লাভ নেই। আমিও আর কিছু বললাম না।
দুজনে চুপচাপ বসে আছি এই সময় ঘরের মধ্যে ঘটাং ঘটাং শব্দ শুরু হল। আমি বললাম “কীরে এটা আবার কিসের শব্দ”?
অনিন্দ্য তেমনই নির্লিপ্ত গলায় বলল “তেনাদের”।
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। বললাম “তেনাদের মানে? এখানে ভূত আছে?”
অনিন্দ্য বলল “হ্যাঁ।তবে আজ একটু বেশি হবে। নতুন দেখছে তোকে”।
আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম “তুই ভূত নিয়ে থাকিস? তুই মানুষ না মেম বউ”?
অনিন্দ্য বিরক্ত গলায় বলল “মেম বউ হতে যাব কেন? আমি কি মেয়ে নাকি? আর এত ভয় পাচ্ছিস কেন বলত? এতে ভয় পাবার কী আছে? মানুষ থাকলে ভূতও থাকতে পারে। যতসব”।
আমার ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। ঘর ময় মনে হচ্ছে কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রান্না ঘরের বাসন ফেলছে, বাথরুমের কল থেকে জল পড়ে যাচ্ছে নিজের মত করে। মিনিট কুড়ি এইরকম তান্ডব চলার পরে কারেন্ট এল। সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। অনিন্দ্য বলল “দেখলি তো ভয়ের কিছু নেই”।
আমি খানিকক্ষণ চুপ করে বসে বললাম “তাই বটে, রান্নাঘরের বাসন কে তুলবে এখন?”
অনিন্দ্য বলল “দেখে আয়”।
আমি রান্নাঘরে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম সব বাসন কোসন একদম জায়গা মতই আছে। বাথরুমের কলও দেখলাম বন্ধ।
চুপচাপ অনিন্দ্যর কাছে এসে বসলাম।
অনিন্দ্য বলল “বাড়ি থেকে দূরে আছি, সেটার কারণ তুই জানিস না? তানিয়ার জন্য। ওর বিয়ে হবার পর থেকে আমি আর বাড়ি থাকতে পারি না। পাশের বাড়ির মেয়েদের প্রেম করার বড় জ্বালা রে”।
আমি বললাম “তানিয়া তোর থেকে দু বছরের বড় ছিল”।
অনিন্দ্য বলল “তো? ভালবাসাটা তো ছিল। তা না , জোর করে ভাইফোঁটা দেওয়াত প্রতিবার। যাই হোক, আমি আর কলকাতা ফিরছি না”।
আমি হাল ছাড়া গলায় বললাম “এই ভূতের মধ্যে থাকবি? কোনদিন তো গলা টিপে দিয়ে চলে যাবে”।
অনিন্দ্য হাসল। তারপর বুক পকেট থেকে মোবাইল বের করে কী একটা টিপল। দেখি ঘরময় আবার সেই শব্দ শুরু হয়ে গেল। একটু ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলাম সব ঘরের কোণে একটা করে ব্লু টুথ স্পিকার আছে। ওখান থেকেই শব্দগুলো আসছিল।
অনিন্দ্য সেইরকমই নির্বিকার বলল “এদ্দিন পরে এসছিস। তোকে একটু চমকালাম”।
আমি দেখেছি সযত্নে শেখা খিস্তিগুলোও ঠিক সময়ে বিট্রে করে।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান