বিশ্ব মিত্র আখ্যান

অভীক দত্ত

 

ক।
।।যায় যদি দিন।।


অরিত্রি ফোন করেছিল।
বিশ্ব দেখেও দেখল না।
ফোন ধরার সময় নেই এখন, প্লট এসছে মাথায়। অফিস ডুব মেরে ল্যাপটপে টাইপ করে সার সংক্ষেপে লিখে রাখছে। ঘরটা আগোছালো হয়ে পড়ে আছে। টেবিলের ওপর চায়ের কাপ একটা উলটে আছে কাগজ পত্রের ওপর। একটা মাছি ভন ভন করছে। খাটের তলায় খান পঁচিশেক সিগারেটের পশ্চাদ্দেশ পড়ে আছে। আধখাওয়া মুড়ির বাটি তিন চারটে। খাটের ওপরে কাগজ পত্র ছড়ানো ছেটানো। তার ওপর একটা বই। কবি জীবনানন্দ দাশের “সাতটি তারার তিমির”। মাঝে মাঝে একটা টিকটিকি খাটের এপার থেকে অপারে চলে যাচ্ছে বইটার ওপর দিয়েই। সম্ভবত বইটা পড়ার ইচ্ছা হয়েছে টিকটিকিটার। সব মিলিয়ে ভয়াবহ অবস্থা। বিশ্ব ঠিক করে রেখেছে লেখাটা লিখেই সব ঠিক করে রাখবে।
আসলে কিছুই হবে না। সব যে কে সেই থাকবে। কাজের লোক নেই কোন। “এখন আকাশ” নামের একটা লিটল ম্যাগের ছেলে সাত দিন ধরে জ্বালিয়ে খাচ্ছে একটা গল্প দিতেই হবে। বিশ্ব ভেবেছিল বসলেই হয়ে যাবে।
আদতে হচ্ছে না। লিখতে বসলেই উল্টো পালটা ভাবনা মাথায় চলে আসছে। তারপরে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। ফেসবুকে একজন মেয়ে ফোন নাম্বার চাইছে। তার লেখা নাকি মেয়েটার ভাল লাগে। কথা বলতে চায়। বিশ্ব দেব দেব করে দিচ্ছে না। কথা বলতে ইচ্ছা করে না তার। কী বলবে মেয়েটাকে?
ভালবাসার কথা? ভালবাসা আর তার মধ্যে কিছু অবশিষ্ট আছে কি? অথচ আজকাল সবাই শুধু ভালবাসার গল্পই শুনতে চায়। এর কারণ কী? ভালোবাসা কি এত কমে আসছে যে লোকে গল্প কবিতায় সেটাকে খুঁজতে চাইছে?
খানিকটা লেখার পর বিশ্ব দেখল অরিত্রি আবার ফোন করছে। এদিক সেদিক ভেবে ফোনটা ধরল সে, “বল কী বলবে?”
অরিত্রি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল “ও আজকেও আমার সাথে খুব বাজে ব্যবহার করেছে। ওর বাড়ির কারও কথায় হয়ত। কী করব বল?”
বিশ্ব বলল “করেছে করেছে। আবার ভাল ব্যবহারও করবে। একসাথে থাকো। মিটে যাবে”।
অরিত্রি বলল “একসাথে থাকতে তো আমি চাই। ওই তো ওর মার কথায় আমাকে তুলছে না। আমি আর পারছি না বিশ্ব, তুমি প্লিজ বল আমি কী করব?”
বিশ্ব বুঝতে পারছিল তার শুধু একটা হ্যাঁ শোনার জন্য মেয়েটা অপেক্ষা করছে। অন্যান্য সময় হলে সময় নিয়ে বোঝাত, এবারে সেটা করল না, লিখতে হবে। সে বলল “একটু সহ্য কর, আর কী করবে। আচ্ছা, আমি এখন রাখি বুঝলে, পরে কথা বলব”।
অরিত্রি বলল “একটু দেখা কর প্লিজ, আমার কিছু ভাল লাগছে না”।
বিশ্ব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কে যেন বলছিল সেদিন আমাদের সবার আগে না বলাটা শেখা উচিত কিন্তু সেটা আর সে পারল কই?
বলল “ঠিক আছে বিকেলে যাব”।
ফোনটা রেখে বিশ্ব ফেসবুক খুলল। মেয়েটা পিং করেছে “কী করছ?”
বিশ্ব লিখল “লিখছি”।
বাচ্চা মেয়ে। অন্তত এগারো বছর ছোট তার থেকে। বিশ্ব বুঝতে পারে মেয়েটা অনেক কিছু ভেবে তাকে পিং করছে, কিন্তু তার কিছু বলতে ইচ্ছা করছিল না।
আজকাল কিছুই ইচ্ছা করে না।
মেয়েটা লিখেছে “আমাকে পড়াও”।
বিশ্ব উত্তর না দিয়ে ফেসবুক বন্ধ করে দিল।
ভাল লাগছে না। ল্যাপটপটা রেখে খানিকক্ষণ খাটটা পরিষ্কার করল। অনেকক্ষণ প্রাণপাত করেও কিছুই হল না দেখে ঘর তালা দিয়ে বেরোল। দুপুর হয়েছে। খেয়ে টেয়ে স্নান করা যাবে।
২।
অরিত্রিকে দেখে মনে হল না খুব মনঃকষ্টে আছে। বেশ লাল লিপস্টিক মেখে এসেছে। বিশ্ব বেশ খানিকক্ষণ লিপস্টিকের দিকে তাকিয়ে বহু কষ্টে চোখটা অন্যদিকে করল।
অরিত্রি বলল “কী করি বল তো? আমি তো আর পারছি না”।
বিশ্ব বলল “একসাথে থাকো তোমরা, ঠিক হয়ে যাবে”।
অরিত্রি একটা আকাশি রঙের শাড়ি পড়ে এসছে। সেই কালারের টিপ, কানের দুল। ঠোঁটের লিপস্টিকটা কেবল লাল। অরিত্রি চোখ নামিয়ে বলল “আমি আসলে ওকে আর আজকাল ভালবাসতে পারছি না”।
বিশ্ব একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা।
সে বলল “ভালবাস। ভালবাসাটাই তো দরকার। দেখ না আমিও একজন এগারো বছরের ছোট মেয়ের সাথে প্রেম করছি দুদিন ধরে। মাঝরাতে কত কথা। প্রেমের কোন বয়স আছে নাকি?”
বিশ্ব ইচ্ছা করেই কথাটা বানিয়ে বলল।
অরিত্রি একটু থমকাল। বলল “তোমার ফ্যান?”
বিশ্ব বলল “কে জানে, ফ্যান না কি। কথা বলতে ইচ্ছা করে মেয়েটার সাথে”। বেশ কনফিডেন্টলি ঢপ মারল বিশ্ব। বলে দেখল ঢপ মেরে চমৎকার একটা ফিলিং পাওয়া যায়। বেশ মজার ব্যাপার তো! এরকম জানলে আরও ঢপ মারা যাবে।
অরিত্রি মরিয়া হল খানিকটা “তোমার কিন্তু একটু ম্যাচিওর কাউকে দরকার বিশ্ব। যারা সম্পর্কটাকে সম্মান করতে পারে। বাচ্চা মেয়ে সামলাতে পারবে তুমি?”
বিশ্ব বলল “যাও পাখি পড়েছ শীর্ষেন্দুর? স্বামী স্ত্রীর বছরের পার্থক্য যত বেশি হয় তত মঙ্গল, বলছে তো। ”!
অরিত্রি মুখ ব্যাকাল “সেটা ওনার পার্সোনাল অপিনিয়ন”।
বিশ্ব বলল “ওনার ঠাকুরও সেরকমই বলেন তো”।
অরিত্রি রেগে গেল “বলতে পারেন। তুমি কী করবে? এগারো বছরের ছোট মেয়েকে বিয়ে করবে? পাগল নাকি?”
বিশ্ব বলল “ভাবি নি এখনও। ভেবে দেখব বলছি তো”।
অরিত্রি খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। বিশ্ব কিছু না বলে মোবাইলে ফেসবুক খুলল। মেয়েটাকে লিখল “পড়াব। আগে লিখে নি খানিকটা”।
এখন অনলাইন নেই মেয়েটা। বিশ্বর বোর লাগছিল। বলল “ এক কাজ কর, অর্ণবের কাছে চলে যাও। কিছু করতে হবে না। ঘরে ঢুকে বসে থাক। কেউ কিছু বললে বল তোমাদের রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। নইলে আরও বড় কিছু ব্লেম দিয়ে দাও। ঝামেলা কর”।
অরিত্রি আরও রেগে গেল। তবে এবার আর বসে থাকল না। উঠে জোরে জোরে পা ফেলে বেরিয়ে গেল।
বিশ্ব আটকাতে গেল না।
দু মাস আগে দুজনে অর্ণব আর অরিত্রি মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসছিল। এখনও অর্ণব ওকে বাড়িতে তোলে নি। এর মধ্যেই বিশ্বর সাথে অরিত্রির আলাপ ফেসবুকে। এই নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শুনে ওকে মানসিক সাপোর্ট দিতে দিতে কখন যেন একটু বেশিই কথা বলে ফেলেছিল সে। অরিত্রি তার খারাপ অবস্থায় বিশ্বকে সহানুভূতিশীল ভেবে অন্য কিছু ভেবে বসেছে।
দুজনে সম্পর্কে আছে। তাদের মধ্যে ঢুকতে সে চায় নি। চায়ও না কখনও। সে একটু ইন্টারেস্ট দেখালেই ব্যাপারটা শেষমেশ একটা ঘষিপিটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্পে গিয়ে দাঁড়াবে। এর আগে অরিত্রিকে বাজিয়ে দেখেছে সে। মাঝরাতে কথা বলতে গেলে মাঝে মাঝেই “ও এটা বলে ও সেটা বলে করে”। মাথাভর্তি অর্ণবের হ্যাং ওভার নিয়ে তার সাথে সম্পর্কে আসতে চায়।
বিশ্ব ভেবেছে ব্যাপারটা নিয়ে। প্রথমে ভেবেছিল মেয়েটাকে উদ্ধার করলেই হয়। তারপরে বেশ কয়েকবার কথা বলে বুঝেছে অরিত্রি অর্ণবকে আদতে ভালবাসে। তাকে রিলিফ হিসেবে ভাববে প্রথমে। তারপর ব্যাপারটা খুব একটা ঠিক ঠাক জায়গায় যাওয়ার কথা না। বিশ্ব ইচ্ছা করেই অরিত্রির সম্পর্কে নিরুৎসাহ হয়ে উঠছে দিন কে দিন।
অরিত্রি চলে যাওয়ার পরে বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকল বিশ্ব। দুজনের একটা করে ফিশ ফ্রাই অর্ডার করা হয়েছিল।
দুটোই খেল সে।
তারপর বিল দিয়ে রাস্তায় নামল। অনেকদিন পরে সোহিনীর সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করছিল তার।
৩।
সোহিনী অফিসে ছিল। তার ফোনে বেরিয়ে এল।
“কী হয়েছে?আজ ভাগ্য ভাল বি শিফট আছে। তাই অফিসে ছিলাম।”
বিশ্ব সোহিনীর দিকে তাকাল। সোহিনী মোটা হয়েছে। বর ভালই রাখছে তার মানে। বলল “ইচ্ছা হল দেখা করতে”।
সোহিনী বলল “ঠিক আছে, চল”।
দুজনে মিলে একটা রেস্তরাঁয় বসল। সোহিনী বলল “বল কী বলবে?”
বিশ্ব বলল “আমি কিছু লিখতে পারছি না আজকাল সোহিনী। শুধু প্রেমের গল্প আসছে। বাচ্চাদের প্রেমের গল্প। কোন ম্যাচিওরিটি নেই, কিচ্ছু নেই। আর কিচ্ছু আসে না”।
সোহিনী বলল “লিখবে। যেটা ভাল লাগে সেটা লিখবে। প্রেমের গল্প তো তুমি ভাল লেখ। সেটাই লেখ”।
বিশ্ব বলল “ভালো আছ?”
সোহিনী হাসল “হ্যাঁ”।
“ছেলে কেমন আছে?”
“ভাল। স্কুলে ভর্তি করলাম তো। লাখ টাকা ডোনেশন দিয়ে”।
বিশ্ব বলল “বাহ। খুব ভাল। বাংলা মিডিয়ামে পড়ালে না?”
সোহিনী বলল “আমার তো ইচ্ছা ছিল। ও বলল বাংলা শিখে কী করবে? চাকরি পাবে? আমি প্রতিবাদ করি নি”।
বিশ্ব বলল “আমার লেখা তাহলে কে পড়বে সোহিনী?”
সোহিনী বলল “ওসব নিয়ে ভেবো না, লিখতে ইচ্ছা করলে লিখবে। না হলে ছেড়ে দাও লেখা। অফিস কর। বিয়ে কর। গুছিয়ে সংসার কর। বউকে নিয়ে হানিমুনে যাও। ছেলেকে পড়াতে বস। ভাল থাকবে দেখবে। কী হবে লিখে?”
বিশ্ব বলল “এগারো বছরের ছোট মেয়েরা প্রপোজ করবে”।
সোহিনী অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল “রিয়েলি?”
বিশ্ব বলল “হ্যাঁ”।
ওয়েটার এসছিল। সোহিনী বলল “কী খাবে?”
বিশ্ব বলল “চা”।
সোহিনী অর্ডার দিল। বিশ্ব বলল “বি শিফট মানে তোমার ক’টা অবধি অফিস?”
সোহিনী বলল “দশটা, বাড়ি ফিরতে ফিরতে এগারোটা। রোজ হয় না, সপ্তাহে একদিন থাকতে হয় তাও কখনও সখনো”।
“বর কিছু বলে না? ছেলেকে কে সামলায়?”
“কী বলবে? চাকরি করা নিয়ে কোন সমস্যা নেই তো! ছেলেকে সামলাবার লোক আছে”।
বিশ্ব কয়েকসেকেন্ড থমকে বলল “আমি একটা এমন কিছু লিখতে চাই যেটা কেউ লেখেনি”।
সোহিনী তার দিকে তাকিয়ে বলল “লেখো। কী সমস্যা?শুধু নিজের লেখার জন্য আর কাউকে আর হাতের পুতুল বানিও না। প্রপোজ করে দিলে, পরের দিন বলে দিলে আমার রি অ্যাকশান দেখার জন্য, তুমি নাকি আমাকে কেস স্টাডি করছিলে লেখার জন্য যে একটা মেয়েকে প্রপোজ করলে সে কী করে একটা দিন। এসব কোর না বাচ্চা মেয়েদের সাথে”।
বিশ্ব আবার কিছুক্ষণ থমকাল। তারপর বলল “আমি কিন্তু সেদিন তোমাকে প্রপোজ করেছিলাম। তারপর ঘাবড়ে গিয়ে ওইসব এক্সপ্ল্যানেশন দিয়েছিলাম, খালি ভাবতাম একটা মেয়েকে নিয়ে আমি ঠিক কী করব?”
সোহিনী হাসল “এটাও কি সিচুয়েশনে ফেলতে চাইছ?”
বিশ্ব কিছু বলল না।
সোহিনী বলল “তুমি জানো তোমার প্রপোজ করার পর আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। তারপরের দিন তুমি বললে প্রপোজটা করেছ আমার রি অ্যাকশান দেখবে বলে। আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে গেছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম আসলে যা হয়েছে ভালই হয়েছে। তখন কম বয়সে তোমার প্রেমে পড়তে দুবার ভাবি নি, এখন মনে হয় ভাগ্যিস! একজন আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা লেখক, যাকে চিপ জিনিসগুলোকে লোককে খাওয়াতে হয়, বাজারী না হয়েও আসলে যে বাজারী, একজন হিপোক্রিট ননসেন্স কাউকে বিয়ে করার মত ভুল করে ফেলি নি। ভাগ্যিস!”
বিশ্ব বলল “তুমি তো দেখছি আমাকে এখনও ভালবাস!”
সোহিনী বলল “সে তো বাড়ির কুকুরটাকেও লোকে ভালবাসে ভাল পোষ্য বলে। এই যে তুমি মাঝে মাঝে আস, আমাকে দেখাও তুমি কতটা খারাপ আছ, আমার তো ভাল লাগে খুব তোমাকে দেখতে। আই এঞ্জয় ইট। বিলিভ মি”।
বিশ্ব কথা ঘোরাতে চাইল “দেখো কোণার টেবিলে ওই লোকটা একা একা কী গিলছে!”
সোহিনী তাকাল না। বলল “গ্রো আপ বিশ্ব। বড় হও। অনেক তো ছেলেমানুষী হল! আর শোন, দাড়ি রেখ না, কেটে ফেল। দু তিনটে পাকা দাড়ি চোখে পড়ছে”।
বিশ্ব বলল “এই তো বললে বড় হও”।
সোহিনী বলল “বড় হও বলেছি, বুড়ো হও বলি নি”।
বিশ্ব হেসে ফেলল “তোমার বর হলে আমি বি শিফট করতে দিতাম না। ইনফ্যাক্ট চাকরিই করতে দিতাম না”।
সোহিনী বলল “আর সারাদিন ঘর পরিস্কার করতে হত”।
বিশ্ব বলল “করতে, তাতে কী?”
সোহিনী বলল “ভাগ্যিস তুমি আমার বর না! চা শেষ হলে ওঠো। আমার বেশিক্ষণ ছাড় নেই”।
বিশ্ব বলল “আমি কোন অফিসের বস হলে এমপ্লয়িদের প্রেম করার ব্রেক দেব। যতক্ষণ খুশি প্রেম করে আসতে পারো। পরকীয়া হলে আরও এক ঘন্টা বেশি”।
চোখ মারল বিশ্ব।
সোহিনী বিরক্ত হল “চোখ মেরো না। কেমন যেন একটা লাগে”।
বিশ্ব বলল “তুমিও বুড়ি হয়ে গেলে সোহিনী, আচ্ছা, আমি আসি। ভালো থেকো”।
হনহন করে হাঁটতে শুরু করল বিশ্ব। সোহিনী বাধা দিল না।
৪।
রুটি তরকা নিয়ে এসছিল বিশ্ব। প্রচন্ড ঝাল। কোনমতে খেয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল। লিখতে ইচ্ছা করছে না। ফেসবুক খুলল।
খোলার সাথে সাথেই পিং “হাই।কী করছ?”
মেয়েটা। বিশ্বর কথা বলতে ইচ্ছা হল। লিখল
“সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে”

-কী এটা? তুমি লিখলে? খুব সুইট।
বিশ্বর হাসি পেল। লিখল “জীবনানন্দ দাশের লেখা। পড়নি?”
-না। খুব ভাল লাগল। কী করছ?
-কিছু না।
-আচ্ছা তুমি আমার বন্ধু হবে নাকি বললে না তো!
-বন্ধু? কী করে হব? তুমি অনেক ছোট আমার থেকে। তাছাড়া তোমাকে চুপি চুপি একটা সিক্রেট বলি।
-বল। প্লিজ বল।
-আমার দাড়ি পেকে গেছে।
-হি হি। তাতে কী হয়েছে?
-বুড়ো হয়ে গেছি তো আমি। তুমি বাচ্চা মেয়ে। বুড়োর সাথে কী কথা তোমার সুরঞ্জনা?
-আমার নাম সুরঞ্জনা না ।
-ওই হল।
-হয় নি। তোমার হোয়াটস অ্যাপ নাম্বার দাও।
-কী করবে সেটা নিয়ে? ছবি আর ভিডিও ফরোয়ার্ড করবে?
-হ্যাঁ তাই করব দাও।
-আমি হোয়াটস অ্যাপ করি না তো সুরঞ্জনা।
-উফ। কতবার বলছি আমার নাম সুরঞ্জনা না।
-আচ্ছা আর ডাকব না ওই নামে।
-রাগ করলে? আচ্ছা ডাক।
-নাহ। ছাড়ো।
-আচ্ছা, তোমার জি এফ নেই?
-আছে তো।
-কোথায়? আগে বললে নেই?
-ছিল না, এখন আছে।
-মিথ্যুক। ফটো দেখাও।
-ফটো তো নেই।
-হু। জানো তোমায় আমি কতটা পছন্দ করি?
-জানি তো।
-ছাই জানো। তুমি কিছু জানো না।
-জানি না তো।
-এই তো বললে জানো।
-না না জানি না। পছন্দ কর?
-হ্যাঁ খুব। আচ্ছা আমরা তো একদিন দেখা করতে পারি?
-পারি তো। খুব পারি।
-তাহলে তোমার নাম্বার দাও।
-কী করবে নাম্বার নিয়ে? লাস্ট সীন চেক করবে?
-তোমার স্ট্যাটাসগুলো পড়ব।
-আমি তো হোয়াটস অ্যাপে কোন স্ট্যাটাস দি না।
-দেবে। সেগুলো পড়ব।
-আচ্ছা দেব।
-কবে দেবে?
-দেব একদিন।
-এখনই দাও।
-দেব একদিন।
-তুমি খুব পচা।
-তুমি খুব ভাল।
-হুহ। বাজে লোক।
-আচ্ছা তোমার বয়ফ্রেন্ড নেই?
-ছিল। খুব ইমম্যাচিওর।
-ওই জন্য আমার মত বুড়ো লোক পছন্দ?
-তুমি বুড়ো কে বলল?
-সামনে থেকে দেখলে তাই বলবে।
-তুমি এত বাজে কথা না বলে নাম্বারটা দাও তো আমায়!
বিশ্ব ফেসবুকটা বন্ধ করল। কথায় কথা বাড়ছে।
মেয়েটা কি কিছু আশা করে ফেলবে?
অরিত্রি ফোন করছে আবার। বিশ্ব ধরল। ওপাশ থেকে ফোঁপানোর আওয়াজ “আই অ্যাম সরি, ওখান থেকে এভাবে চলে আসার জন্য”।
বিশ্ব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এভাবেই চলবে তবে?

খ।
।। যায় যায় দিন।।

হাঁটতে ভাল লাগে। হিমু হাঁটে। নীললোহিত হাঁটে।
বিশ্ব মিত্র হাঁটে, অফিস থেকে ফেরার সময়। আগের বাস স্টপে নেমে যায়। তারপর বাকিটা রাস্তা হেঁটে ফেরে। অবশ্য এখন মোবাইলের সময়। হাঁটার সময় মোবাইলে ফোন আসে। অফিসের বস ফোন করে। বিভিন্ন কাজ মনে করিয়ে দেয়।
বিশ্ব মিত্রকে সে কাজগুলো মনে রাখতে হয়।
দাড়ি পাকছে। মা বাবা বিয়ের জন্য জ্বালিয়ে খাচ্ছে ফোন করে করে। বিশ্ব মিত্র ফোন অফ করে দিচ্ছে। বিয়ে করলে কে লিখবে এত লেখা?
বিশ্ব ঠিক করেছে খুব কঠিন কোন উপন্যাস লিখবে। গোটা বাঙালি জাতি চমকে উঠবে যে লেখা নিয়ে। বউদিবাজি না, নীরস তথ্য মূলক উপন্যাস না, লেখা হবে সবাইকে চমকে দেওয়ার মত।
কিন্তু বিষয়টা কী হবে সেটা বিশ্ব মিত্র এখনও ঠিক করে উঠতে পারে নি।
লিটল ম্যাগের লেখাগুলোই শেষ করা হয়ে উঠছে না।
হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ব একবার ফেসবুক চেক করল। একটাও নোটিফিকেশন আসে নি। নোটিফিকেশন না আসলে আজকাল নিজেকে অসহায় মনে হয়। বিশ্ব মিত্রর মনে পড়ে অরকুট আমলে তারা স্ক্র্যাপ গুনত।
তাদের মেসের বন্ধুদের মধ্যে তীব্র রেষারেষি চলত। বিশ্ব মিত্র একটু দাঁড়াল। আবার পুরনো কথা মনে পড়ছে তার।
নষ্টালজিয়া কোন কাজের কথা না। সোহিনী মাঝে মাঝে বলে পুরনো জিনিস নিয়ে ট্যানা হ্যাচড়া করে কী লাভ। সবটাই তো সামনের দিকে তাকাতে হবে।
মেয়েটা পিং করেছে, “কী করছ?”
বিশ্ব প্রথমে ভাবল উত্তর দেবে না। তারপর মনে হল কাজ নেই যখন দিয়েই দেয়, লিখল “হাঁটছি, অফিস থেকে ফিরছি”।
-আজ একটা মজার কান্ড হয়েছে।
বিশ্ব হাঁটতে শুরু করল। মোবাইলে হাত। আজকাল অভ্যাস হয়ে গেছে। যদিও ভারী বিপজ্জনক লাগে তার নিজের কাছেই ব্যাপারটা। তবু নেশা বড় বাজে জিনিস। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে প্রচন্ড গতিতে। খুব একটা জ্যাম নেই এখন।
বিশ্ব লিখল “কী মজার কান্ড হয়েছে?”
-আমার পুরনো ক্রাশ আজ মেসেজ করেছে। অনেক কথা হল। ভাল লাগল খুব।
বিশ্ব হাসল। বাচ্চা মেয়েটা কেমন মরিয়া হয়ে উঠছে। তাকে জ্বালানোর চেষ্টা করছে? তাহলে তার তো দেখানো উচিত সে জ্বলে যাচ্ছে। অভিনয় করবে? ঠিক করল তাই করবে। লিখল
“বেশ ভাল। তাহলে তার সাথেই কথা বল। আমাকে পরে পিং কোর”।
মেয়েটা সাথে সাথে লিখল “না না, এখন বলছি না তো। এখন তোমার সাথে কথা বলছি। আচ্ছা তুমি আজকে একটা মেয়ের সাথে খুব ফ্লার্ট করছিলে ফেসবুকে। আমার ভাল লাগছিল না একদম”।
বিশ্ব বিরক্ত হল। মেয়েটার এই একটা সমস্যা। জ্যেঠিমাগিরি।
বিশ্ব উত্তর দিল না। ফোনটা পকেটে রেখে দিল। মেয়েটা একটু অপেক্ষা করেই মেসেঞ্জারে ফোন করল। বিশ্ব ধরল না। ঠিক করল আস্তে আস্তে রিপ্লাই করা বন্ধ করতে হবে।
সোহিনী বলে সময়ের সাথে ভালবাসা কমে আসে। আর ইনফ্যাচুয়েশন তো আরও একেবারেই মুছে যায়।
বিশ্ব চলে এসছিল। তালা খুলে ঘরে ঢুকেই চমকে উঠল। ঘরের অবস্থা অসাধারন। খাটের ওপর খবরের কাগজ আর বইতে ছোটখাট গম্বুজ হয়ে আছে। সে অস্ফূটে বলে উঠল “আজকে শোব কোথায়?”
২।
কবি সম্মেলন চলছে। বিশ্ব মিত্র কবি নয়। তবুও অরুণাভদা ডেকেছে তাকে।
কবি সম্মেলন তো নামে হয়, আসলে পেশী প্রদর্শন চলে। দেখো, আমার গোষ্ঠীতে কত জন আছে। ফেসবুকে পারস্পরিক পিঠ চাপড়া চাপড়ি। কবিতা না পড়েই কমেন্ট বক্স “অসাধারন” কমেন্টে ভরিয়ে দেয় একে অন্যের। পুরোটাই গোষ্ঠীবাজি।
এ ডাল সে ডাল করে রাজনীতির ঠিক ডাল বেছে নিজের আধিপত্য নেওয়াটাই কাজ। রাজনীতিকদের থেকেও বড় কঠিন শিল্পী সাহিত্যিকদের রাজনীতি। বিশ্ব ইদানীং এড়িয়ে চলত। অরুণাভদা ফোন করে অনেক কিছু বলল। উইকেন্ডে কাজ ছিল না। চলে এল বিশ্ব।
নতুন বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে কবিতা পড়ল। বিশ্বর ভাল লাগল না বেশিরভাগই। সবাই শ্রীজাত হতে চাইছে। এই সব কবি সম্মেলনের অলিখিত নিয়ম হচ্ছে কারও লেখাই খারাপ বলা যাবে না। সবাই ভাল। গদগদ মুখ করে “কী ভাল লিখছ” বলার জন্য কম বেশি সব শিবিরেই একজন দিদি শ্রেণীর কেউ থাকেন।
অরুণাভদার শিবিরে শিলাদি আছে। অনেকেই আড়ালে শিলা কী জওয়ানি, অরুণাভ সওয়ারি বলে। অরুণাভদার বউ অসুস্থ। শিলাদিকে নিয়ে প্রায়ই এদিক সেদিক কবিতা পড়তে যায়। কবিতায় তোমায় ছুঁয়েছি ইত্যাদির আড়ালে ছোট খাট অনেক গল্পই লুকিয়ে থাকে।
কবিতা পাঠ সাড়ে ছ’টায় শেষ হল। বিশ্ব চাইছিল না, অরুণাভদা জোর করে তাকে স্টেজে তুলে একটা গল্প পাঠ করাল। বিশ্ব একটা প্রেমের গল্প পড়ল। বেশ কিছু হাততালি পড়ল। অরুণাভদা স্টেজের মধ্যেই তাকে একালের সুনীল বলে দিল।
বিশ্ব মনে মনে হাসল। একটু বেচাল দেখলেই সুনীল থেকে “কিছু লিখতে পারে না ছেলেটা” হতে এদের এক সেকেন্ডও লাগে না।
স্টেজ থেকে নামলে একটা মেয়ে একটা খাতা এগিয়ে দিল “অটোগ্রাফ প্লিজ”।
বিশ্ব মেয়েটার দিকে তাকাল। উনিশ কুড়ি হবে।
উঠতি কবি? মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগে কাঁচা ছন্দে একটা কবিতা বলছিল, বিশ্ব বলল “নাম কী?”
মেয়েটা বলল “বৈশালী”।
বিশ্ব নামটা নিয়ে কিছু লিখবে ভাবল। কিছু মাথায় এল না। নিজের নাম সই করে মেয়েটাকে খাতাটা ফেরত দিয়ে দিল।
বৈশালী বলল “আপনার লেখা আমার খুব ভাল লাগে”।
বিশ্ব হাসল “থ্যাঙ্ক ইউ”।
অরুণাভদা বেরিয়ে গেল। জায়গাটা ফাঁকা হচ্ছে। বিশ্ব বেরচ্ছিল। মেয়েটা বলল “আপনাকে না ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো যাচ্ছে না। আপনি কী সব প্রাইভেসী সেটিং করে রেখেছেন”।
বিশ্ব বলল “আচ্ছা, আমিই তোমাকে অ্যাড করে নিচ্ছি”।
বৈশালীর মুখে একটা আলো খেলে গেল। বিশ্ব মোবাইলটা বের করে মেয়েটার প্রোফাইলটা খুঁজে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সেন্ড করে দিল।
বৈশালী বলল “থ্যাঙ্ক ইউ। আচ্ছা, আপনি আমার কবিতা শুনেছেন?”
বিশ্ব বুঝল এবার অভিনয়ের সময় এসেছে। হালকা দীর্ঘশ্বাসও চাপল সে। ভাল বলতে হবে। আজকাল এই কবি দাদারা যদি একটু বলে দিত ঠিক কোথায় কোথায় ঠিক করলে লেখাটা আরও ভাল হত তা হলে হয়ত এত ঝুল কবিতে ভরে যেত না সব কিছু। একটু ভেবে ঠিক করল অভিনয়টা না করে বরং সত্যিটাই বলে দেবে।
তাতে যা হয় হবে। সেটাই করল সে “শুনেছি। বেশ কাঁচা মনে হল কিছু মনে কোর না”।
বিশ্ব ভেবেছিল মেয়েটা মুষড়ে পড়বে। সেটা হল না। বরং খুশি হল বেশ। বলল “আমার বাবাও একই কথা বলেন। বাবাও তো লেখেন। নাম শুনেছেন হয়ত আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়”।
বিশ্ব অবাক হল। আদিত্যদার মেয়ে? দীর্ঘকায় রূপবান কবি আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়? তার মেয়ে এত বড় হয়ে গেছে?
সে বলল “তোমার বাবার থেকে লেখা শিখতে পারো তো”।
বৈশালী বলল “শিখি তো। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলাম এখানে। ওরাই জোর করে স্টেজে তুলে দিল। আমিও জানি আমি খুব একটা ভাল লিখতে পারি না”।
বিশ্ব খুশি হল “তুমি যদি জানো তুমি ঠিক কেমন লিখছ তাহলে তোমাকে কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। এটা আমাকে আদিত্যদাই বলেছিলেন”।
বৈশালী হাসল, “একজ্যাক্টলি, বাবা আমাকেও এই কথা বলেন। আমি জানতাম না অবশ্য আপনি বাবাকে চেনেন”।
বিশ্ব বলল “হ্যাঁ, তুমি কী করে জানবে, তুমি ছোট মেয়ে”।
বৈশালী বলল “খুব ছোট না কিন্তু, থার্ড ইয়ারে পড়ছি, ছোট ছোট বলবেন না। আচ্ছা আপনি তো খুব বেশি বয়সী না, এত ছোট ছোট করছেন কেন আমাকে?”
বিশ্ব বলল “বেশি না, কমও না, তোমার থেকে ন’ বছরের বড় আমি”।
বৈশালী বলল “ভাল তো। আচ্ছা আপনি তো আমাকে কবিতা শেখাতে পারেন?”
তারা হাঁটছিল। বিশ্বর মেয়েটিকে ভাল লাগছিল। বেশ সপ্রতিভ। মেয়েটার দাবীটা শুনে সে খানিকটা সংকুচিত হল, বলল “আদিত্যদার মেয়ের কাছে আমার কাছে কবিতা লেখা শিখবে কেন? তাছাড়া আমি তো গদ্যের লোক, পদ্যের না”।
বৈশালী বলল “বাবা বড় ঠোঁটকাটা। মাঝে মাঝেই বলেন তোকে লিখতে হবে না কিছু, মন দিয়ে পড়াশুনা কর। আমার খুব শেখার ইচ্ছা। আমাকে ছন্দ শিখাবেন প্লিজ?”
বিশ্ব কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল “তুমি বলেছিলে তুমি কলেজের বন্ধুদের সাথে এসছ, তারা কোথায়?”
বৈশালী বলল “ওরা তো আমার কবিতার পরেই বেরিয়ে গেল। আমার রুট অন্যদিকে বলে থেকে গেলাম। আপনি আগে আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিন। শেখাবেন আমায়?”
বিশ্ব হাসল “আমি জানি না বিশ্বাস কর। আমি তোমায় কী শিখাব? আমি নিজেই মূর্খ লোক”।
বৈশালী বলল “আমি জানতাম, আপনি আমাকে শিখাতে রাজী হবেন না”।
অবাক হল বিশ্ব “কেন বলত?”
বৈশালী বলল “বুঝবেন না। আমি জানতাম। আচ্ছা আপনি আমাকে গল্প লেখা শিখাবেন? এবার বলুন সেটাও জানেন না”।
বিশ্ব বুঝল এই মেয়ে ছাড়ার না। সে বলল “আচ্ছা। তুমি লিখে আমায় পাঠিও। আমি দেখে দেব কোথায় কী ঠিক করতে হবে”।
বৈশালী এবার খুব খুশি হল। বলল “আচ্ছা, আমাকে একটা মিসড কল দিন। আমি কালকেই একটা গল্প লিখেছিলাম। আপনাকে বাড়ি গিয়েই পাঠাচ্ছি। ফোনে বলে দেবেন কোথায় কী ঠিক করতে হবে”। মেয়েটা নাম্বার দিল। বিশ্ব ফোন করতে যাবে এই সময় মোবাইলে ফোন এল তার। বিশ্ব দেখল অরিত্রি। ধরতেই ওপাশ থেকে চাপা গলায় অরিত্রি বলল “মেয়েটা কে তোমার সাথে?”
বিশ্ব অবাক হল। তাদের দেখছে কীভাবে, সেটাই জিজ্ঞেস করল সে। অরিত্রি বলল “এক্ষুণি ক্রস করলাম, দেখলাম বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে খুব গল্প করছ। কে মেয়েটা?”
বিশ্ব বিরক্ত হল। সেই এক জ্যেঠিমাগিরি। বলল “চিনবে না। পরে করছি”।
কেটে দিল ফোনটা। বৈশালী দাঁড়িয়ে ছিল। তার ফোন রাখা হলে বলল “তাড়াতাড়ি কল করুন, আমার বাস এসে গেছে”।
বিশ্ব দেখল একটা বাস এসেছে। যাদবপুরের দিকের। সে বলল “আমি মিসড কল মেরে নেব, তুমি সাবধানে যেও”।
বৈশালী বাসে উঠে পড়ল। বিশ্ব দাঁড়িয়ে থাকল।
কেমন একটা খারাপ লাগছে।
কেন ঠিক বুঝতে পারল না সে। আবার কি প্রেম ট্রেম পাচ্ছে নাকি বুড়ো বয়সে?
নিজের প্রতি নিজে বিরক্ত হল সে।
৩।
ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। পাড়ার মোড় থেকে খেয়ে এসছিল বিশ্ব। ঘরে ঢুকে ড্রেস চেঞ্জ করে ল্যাপটপের সামনে বসতে টের পেল অজানা নাম্বার থেকে ফোন এসছে। বৈশালী ভেবেছিল বিশ্ব। সাত তাড়াতাড়ি ধরল। মেয়ের গলা না, পুরুষকন্ঠ।
“হ্যালো। বিশ্ব বলছেন?”
বিশ্ব চিনল না। বলল “হ্যাঁ বলছি”।
“নমস্কার, আমি অর্ণব বলছি”।
বিশ্ব প্রথমে বুঝল না, একটু থমকাল, ওপাশ থেকে এল “অরিত্রির হাজব্যান্ড”।
বিশ্ব বিরক্ত হল, অরিত্রি তার নম্বর অর্ণবকে দিয়ে দিয়েছে?
সে বলল “বলুন”।
“দেখুন, আপনাকে একটা কথা বলি। একটু ভেবে দেখুন। আপনি আমার আর অরিত্রির মধ্যে থাকবেন না। তাহলে কিন্তু আমি বুঝে নেব”।
বিশ্ব চমৎকৃত হল। বেশ সুন্দর গুছিয়ে থ্রেট দিতে পারে তো ছেলেটা! সে বলল “আমি তো আপনার আর অরিত্রির মধ্যে কোন কালেই ছিলাম না! এই ধারণাটা আপনার কোত্থেকে হল?”
ওপাশ একটু সময় নিয়ে বলল “যা ধারণা সে তো অরিত্রির কাছ থেকে বুঝতেই পারছি। শুনুন, ও আমার বিয়ে করা বউ, আপনি ওর সাথে একদম কথা বলবেন না বুঝেছেন?”
বিশ্বর মাথাটা গরম হল একটু “বিয়ে করা বউ তো সংসার করুন না, মার্কেটে ছেড়ে রেখেছেন কেন ফাঁকা গরুর মত?”
ওপাশ রেগেছে। ফুঁসছে “এই খানকির ছেলে, তোকে এত এক্সপ্ল্যানেশন দেব নাকি? তুই আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবি, ব্যস, মনে থাকবে?”
বিশ্বর তিতে লাগছিল পুরো ব্যাপারটাই। সে ফোনটা কেটে দিল। যার প্রতি বিন্দুমাত্র ফিলিংস নেই তার জন্য কেস খাওয়াটা একেবারেই অযৌক্তিক লাগছিল তার কাছে।
মিনিট পাঁচেক পর অরিত্রি ফোন করল। প্রথমে বিশ্ব ধরল না।
তারপর আবার ফোন করল। এবারে ধরল বিশ্ব। ওপাশ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করল “অর্ণব তোকে ফোন করেছিল?”
বিশ্ব বলল “করেছিল। তোমরা এবার মিটিয়ে নাও প্লিজ। আমাকে আর ইনভলভ কোর না দয়া করে”।
অরিত্রি বলল “আমি তোমায় ভালবাসি বিশ্ব। আমি ওকে আর ভালবাসি না”।
বিশ্ব ফোনটা কেটে দিল। অরিত্রির আর ছেলের নাম্বারটা ব্লক করল আগে। ক’দিন ধরে ঠারে ঠোরে বোঝাচ্ছিল এবার একেবারে মরিয়া হয়ে গেছে অরিত্রি।
বিস্বাদ লাগছিল বিশ্বর। এটা কোন জীবন? অফিস যাও আসো, আর ফিরে এসে এই সব চুতিয়াপা সহ্য কর।
বিশ্ব ঠিক করল চাকরিটা ছেড়ে দেবে কালকেই। যা কিছু টাকা জমানো আছে তা নিয়ে কোথাও একটা রওনা দেবে। কোন হিল স্টেশনে।
শহর বড় দুর্বিষহ হয়ে উঠছে দিনের পর দিন।
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
বৈশালী। তখন নাম্বারটা সেভ করা হয়েছিল মনে পড়ে গেল বিশ্বর।
ফোনটা ধরছিল না বিশ্ব।
ঠিক করতে পারছিল না আসলে বৈশালীকে নিয়ে হিল স্টেশনে যাবে না একা একাই রওনা হবে...

গ।
।।অন্তবিহীন।।

মাঝরাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল ল্যাপটপ অন রেখেই। একটা লেখা শুরু করেছিল। সেটার মাঝপথে ঘুম এসে গেছিল। সকালে উঠে বিশ্ব দেখল কোথাও একটা চাপ পড়ে স্ক্রিন উল্টো হয়ে গেছে।
উল্টো ডেস্কটপ, উল্টো সব কিছু। কার্সরটা ডান দিকে নিলে বাদিকে চলে যায়। সেদিন অফিসে একটা ছেলে একটা শর্ট কাট কি-র কথা বলেছিল এটা ঠিক করার জন্য, বিশ্ব মনে করতে পারছিল না। বহু কষ্টে স্ক্রিনটাকে ঠিক করতে করতে ভাবছিল পৃথিবীটাও যদি একদিন হঠাৎ করে উলটে যেত। রাজনীতিবিদরা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন যারা বামপন্থী ছিলেন তারা ডানপন্থী চিন্তাভাবনা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না। ডানপন্থীরা সব বামপন্থী হয়ে গেলেন। ঘুম চোখেই বিশ্ব ব্যাপারটা ভেবে বেশ খানিকটা হেসে নিল।
আটটায় ঘুম ভেঙেছে। দশটায় অফিস। বিশ্ব মোবাইলটা বের করল। বেশ কয়েকটা আননোন নম্বর থেকে ফোন। অরিত্রি বা অর্ণব কেউ হবে নির্ঘাত। বিরক্ত হল বিশ্ব। এবার এই ব্যাপারটা থেকে পুরোপুরি বেরোতে হবে। না বেরোলে সমস্যা বাড়বে। কমবে না।
ফোনটা বেজে উঠল। বিশ্ব দেখল স্বাগত। অবাক হল। এত সকালে কী করতে ফোন করছে, ফোন ধরল সে, “হ্যাঁ বল, কী হল তোর সকাল সকাল?”
ঘুম জড়ানো গলায় স্বাগত বলল “তোমার কাছে একটা স্যামসাঙের চার্জার এক্সট্রা আছে না? নিয়ে এসো তো”।
বিশ্ব বলল “হ্যাঁ নিয়ে যাব, কেন কী হল তোর?”
স্বাগত বলল “আরে সৌমির ফ্ল্যাটে ফেলে এসছি কাল”।
বিশ্ব বলল “আচ্ছা”। ফোনটা রেখে দিল।
সৌমি স্বাগতর বন্ধু। মানে স্বাগত তাই বলে। ব্যাপারটা অবশ্য বন্ধুত্বের পর্যায়ে নেই আর। কলেজে তারা একসাথে পড়ত, তারপর সৌমির বিয়ে হয়ে যায়। সৌমির বর প্রায়ই এদিক সেদিক যায়। সে সুযোগে দুজনে দেখা সাক্ষাৎ করে। বিশ্ব অনেকবার স্বাগতকে বুঝিয়েছে সম্পর্কটা ঠিক স্বাভাবিক সম্পর্ক নয়, স্বাগত বুঝতে চায় না। বিয়েও করে নি। অনেক মেয়ের সাথেই সম্পর্ক তৈরি হয় কিন্তু সৌমির জন্য ভেস্তে যায়। বিশ্ব বোঝে স্বাগত আসলে সৌমিকে ভালোবেসে ফেলেছে। উদ্দেশ্যহীন, পরিণামহীন ভালোবাসা। সৌমির দুটো বাচ্চা আছে। এদের ছেড়ে স্বাগতর কাছে নিশ্চয়ই চলে আসবে না সৌমি। কথাগুলো অফিসের আর কেউ জানে না বিশ্ব ছাড়া। একদিন মদের নেশায় সব বলে দিয়েছিল স্বাগত। তারপর থেকে বিশ্ব ভয়ে ভয়ে থাকে এই হয়ত কোনদিন শুনবে সৌমির বরের কাছে স্বাগত মার খেয়ে গেছে।
রাতে খাটের এক কোণ পরিস্কার করে সেখানে শুয়ে পড়েছিল বিশ্ব। উঠে আরেক কোণের দিকে তাকাল। গাদা খানেক প্যারাসিটামল, অ্যালার্জির ট্যাব্লেট পড়ে আছে। দশবারো দিন আগের খবরের কাগজ, চিপ্সের আধ খাওয়া প্যাকেটও আছে একটা। বিশ্ব চিপ্সের প্যাকেটে হাত বাড়াল। এখনও দু চারটে আছে। খেতে গিয়েও খেল না। হোয়াটস অ্যাপ খুলল। অনেকদিন পরে সানন্দা পিং করেছে “কেমন আছ?”
বিশ্ব সানন্দার ডিপি দেখল। একটা ছেলের সাথে সেলফি দিয়েছে। তাকে জানান দিচ্ছে এখন সে কমিটেড।
বিশ্ব উত্তর দিল না। এককালে তারা চ্যাট করত। সানন্দার ধারণা বিশ্ব ফেস রিডিং করতে পারে। একটা ছেলের ফটো দিয়ে বিশ্বকে বলত দেখো তো ছেলেটাকে কী মনে হচ্ছে?
বিশ্ব বুঝত তাকে জ্বালানোর জন্য হচ্ছে ব্যাপারটা। সে ভাল ভাল কথা বলত ছেলেটার সম্পর্কে। সানন্দা বলত এই ছেলেটা ক’দিন ধরে খুব মেসেজ করছে।
বিশ্ব বলত ঝুলে পড়। সানন্দা রেগে যেত। এক দুদিন মেসেজ করত না। বিশ্বও করত না। একসময় সত্যি সত্যি সানন্দা হয়ত এক প্রকার জোর করেই রিলেশনে পড়ে যেত কোন ছেলের সাথে। সাত আট দিন পরে শুরু করত ছেলেটা বাজে, কথায় কথায় শুধু শরীরে হাত দিতে চায়। বিশ্ব বলে দিত কীভাবে কাটাবে। সে ফেজটায় অনেক কথা হত তাদের মধ্যে। আবার সানন্দা প্রেমে পড়ত কারও। বিশ্বকে বলত ওর বয়ফ্রেন্ড ওর ফোন চেক করে। মেসেজ না করতে। বিশ্ব করত না। কিছুদিন পরে আবার সানন্দা জানিয়ে দিত ব্রেক আপ করে দিয়েছে। সানন্দার সাথে অনেকটা অভ্যাসেই কথা বলত বিশ্ব। অভ্যাস হয়ে গেছিল চ্যাট করতে করতে। একদিন মদ খেয়ে সানন্দা তাকে সারারাত ধরে মেসেজ করে গেল “তুমি জানো আমি কেন কোন রিলেশনে থাকতে পারি না? আমার বার বার তোমার কথা মনে হয়। সবাইকে আমি তোমার সাথে কম্পেয়ার করি। তোমাকে হিংসায় ফেলতে গিয়ে আমি দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছি বিশ্ব। এই অভিনয় আর পারছি না বিশ্বাস কর। আমাকে ভালবাস প্লিজ বিশ্ব”।
বিশ্ব ভালবাসতে পারে নি। মা বলে বিশ্ব খুব নিষ্ঠুর। বিশ্বরও তাই মনে হয়। আরও বেশি মনে হয় সে আসলে ভিতু। সব সম্পর্কেই তার ভয়। খানিকটা এগিয়েই আটকে যায় সে।
রিপ্লাই দেয় নি বেশ কিছু দিন সানন্দাকে। সানন্দা ফোন করেছিল। ধরে নি। এতদিন পরে মেয়েটা আবার পিং করেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিশ্ব।
আর কারও সাথেই চ্যাট করা যাবে না। অকারণ এক্সপেক্টেশন তৈরি হয়ে যায় যেখান থেকে বেরনোটা একসময়ে কঠিন হয়ে পড়ে।
কাল বৈশালীর সাথে বেশ খানিকক্ষণ কথা হয়েছে। বৈশালী প্রথমেই জানতে চেয়েছে তার গার্লফ্রেন্ড কী করে। বিশ্ব তার গার্লফ্রেন্ডের অস্তিত্বহীনতার কথা জানাতে একগাদা প্রশ্ন করে গেছে বৈশালী। বিশ্ব একটু গম্ভীর হয়ে বলেছিল “তুমি না বলেছিলে গল্প পাঠাবে, এই প্রশ্নগুলো কেন করছ?”
বৈশালী একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েছিল। বিশ্বর একটু খারাপ লেগেছিল কিন্তু নরম হয় নি। কাউকে স্বপ্ন দেখাতে গেলে নিজেকেও সে স্বপ্নটা দেখতে হয়। বিশ্ব দেখতে চায় না।
একা থাকাটা একটা নেশার মত। নিজেকে ভালোবেসে ফেললে কাউকে ভালবাসাটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে।
২।
“আচ্ছা এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের এত দুঃখ বিলাস কেন রে ভাই?” হুইস্কির গ্লাসটা ডান হাতে। বা হাতে সিগারেট টানতে টানতে প্রশ্নটা করল শান্তনুদা। অফিস থেকে বেরিয়ে শান্তনুদার কাছে এসছে বিশ্ব। লোকটার সাথে আড্ডা মারতে ভাল লাগে।বিখ্যাত লেখক হলেও ঠোঁটকাটা। কাউকে খুশি করে চলে না, এবং সৎ। সৎ লোকেদের সাথে কথা বলে একটা মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।
বিশ্ব বলল “কেন তুমি কিসে দুঃখ বিলাস দেখলে বাচ্চা মেয়েদের?”
শান্তনু বলল “আমার ফ্রেন্ডলিস্টে একটা মেয়ে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। সেদিন পিং করে বলল আমার গল্পটা পড়। পড়ে দেখলাম শুধু দুঃখু আর দুঃখু। এত দুঃখু কিসের বাল? জীবনটা কী দেখেছিস তোরা? সিনেমা দেখ, এক্সের সাথে দেখা হল ট্রেনে। সে নিয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে বাঙালি। মোটা দাগের কাজ নিয়ে হই হই করছে। ওরে বোকাচোদারা জতুগৃহ দেখ, সম্পর্কের সূক্ষতা বোঝ। মেল শভিনিজম চোদানো জিনিস হই হই করে ভালবাসছিস। একটু পড়াশুনা কর। ফেসবুক এসে যাওয়ায় সবই কত সোজা। ডিরেক্টর ফ্রেন্ড লিস্টে আছে? ট্যাগ করে তেল মেরে দাও। ডিরেক্টর গদ গদ হয়ে সেটা শেয়ার করে দিচ্ছে। আদতে কি কিছু ভ্যালু অ্যাড হচ্ছে ভাই?এত মিডিওক্রেসী ভরে গেল কেন জাতটায়?”
বিশ্ব হাসল “বিরহ বেশি খায় লোকে। প্রেমও। আমিও বাজারি হয়ে গেছি শান্তনুদা”।
শান্তনুদার সিগারেট শেষ হয়ে গেছিল। আরেকটা ধরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল “লেখা ছেড়ে দে বিশ্ব। ভাল কথা বলছি শোন। তিন চার মাস লিখিস না। পড়। শুধু পড়। পারমুটেশন কম্বিনেশন করে প্রেমের গল্প লিখিস না। তোর সাম্প্রতিক লেখাগুলো আমি পড়েছি। যদিও অনেক বালের থেকে ভাল। কিন্তু আটকে থাকিস না একটা জায়গায়। আজকাল কেউ পড়ে না। আমাদের সময় আমরা গোগ্রাসে গিলেছি। মোবাইল স্ক্রিনে যা আসছে তাই পড়ছে লোকজন। নয়ত বাংলা সিরিয়াল দেখছে। অথেনটিক সোর্সের খবরের থেকে ট্রোল পেজের গুজব বেশি বিশ্বাস করছে। তোর তো কিছু ইনফ্লুয়েন্স হয়েছে। তুই গা ভাসাবি কেন?”
বিশ্ব বলল “পিঠ চাপড়ানিটা দরকার না বলছ? হাজার হাজার শেয়ার? লাইক? ভালো লাগে না?”
শান্তনুদা হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে একটা মাছভাজার একটু ছিঁড়ে নিল। তারপর বলল “আমাকে একটা কথা বল,ধর তোর পেজ দশ লাখ লাইক হল। কী হল তাতে? ধরে নিলাম টাকা পাবি। তো? তুই তোর পোটেন্সিয়াল ভাববি না, তুই কী করতে পারতি? তোর টাকার দরকার? আমার থেকে নে। কিন্তু অন্যরকম লেখা লিখলে দশটা লোক ভাল লাগল না বা বুঝলাম না বলায় মুষড়ে না পড়ে সেদিকেই মন দে। তোর পাঠককে বড় হতে দে। তুই বড় হ। সবাই বাচ্চা বাচ্চা প্রেমের গল্প পড়ে উদ্বাহু নেত্য করলে হবে?”
বিশ্ব হেসে ফেলল। কথাগুলো কেউ বলে না। এরকম কথা বলার লোক আজকাল বড় কমে আসছে। সে বলল “বউদি কোথায়? আজ একটু বেশি গিলছ দেখছি। বাড়ি নেই নাকি?”
শান্তনুদা চোখ মারল “বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। যত দূরে থাকে তত ভাল রে ভাই। মদ খেতে দেখলেই খিট খিট করে। বউ থাকা বড় জ্বালা। আজকাল লেখাও হয় না তেমন”।
বিশ্বর মোবাইলে শব্দ হল। কেউ মেসেজ করেছে। বিশ্ব দেখল বৈশালী। লিখেছে, “হাই, কী করছেন?”
বিশ্ব ফোনটা পকেটে রাখল।
শান্তনু বলল “মামণি?”
বিশ্ব বলল “হ্যাঁ”।
খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল শান্তনুদা “এই জন্যই এইসব প্রেমের গল্প লিখিস নাকি? মামণিরা পছন্দ করে?”
বিশ্ব বলল “শুধু মামণি কেন, সব শ্রেণীর লোকই পছন্দ করে”।
শান্তনুদা বলল “হ্যাঁ, ওই একটু এদিক ওদিক করে লাস্ট সীনে স্লো মোশনে মিলিয়ে দেওয়া তাই তো? ওরে জানি জানি। প্রেমের গল্পের মার্কেট তো সব সময় হাই। জানিস আমি প্রেমেন মিত্তিরের ছোটগল্প পড়ছিলাম। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ও। পড়লে কষ্ট হয়। এত ডার্ক। অথচ এই লোকগুলোই টেনিদা ঘনাদা লিখেছে। তাহলে? ডার্ক কি কম্পালসারি? তুইও তো দেখলাম একটা ডার্ক লিখেছিস। প্রেমের গল্প থেকে বেরনোর জন্য রিলিফ খুঁজিস নাকি ডার্ক লিখে?”
বিশ্ব হাসল। বলল “ঝাঁট জ্বলে থাকলে লিখি”।
হো হো করে হাসল শান্তনুদা।
শান্তনুদারা বনেদী বড়লোক। নিজেও চাকরি করে বড় ফার্মে। কিন্তু বরাবরই বিশ্বকে ভীষণ স্নেহ করে। বলল “শোন একটা কাজ করবি। মাঝে মাঝে হাওড়া স্টেশনে বা শিয়ালদা স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে বসে থাকবি। একা একাই কোন জায়গা থেকে ঘুরে আসবি। যেখানে কোনদিন যাস নি। ধরে নে সেটা বনগাঁ হতে পারে কিংবা হাসনাবাদ। বা হয়ত একদিন ক্যানিং চলে গেলি ট্রেনে করে। দেখবি ওই অচেনা অজানা লোকগুলোর মধ্যে কত কত গল্প লুকিয়ে আছে। সে গল্পগুলো খোঁজ। জানিস একদিন আমি এসপ্ল্যানেড গেছি, দেখি বাসস্ট্যান্ডে একটা লোকের কোলে লোকটার তিন চার বছরের মেয়ে নীরবে কেঁদে যাচ্ছে, আর লোকটার চোখ থেকেও অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছে। কেমন সাইলেন্ট একটা মিনিট দুয়েকের সিনেমা দেখলাম। কত গল্প বলে বলত। হতে পারে লোকটা হসপিটাল থেকে আসছে, ওনার বউ মারা গেছে, মেয়েটাও সেজন্য কাঁদছে। প্রোবাবিলিটি কত রকম হতে পারে। তোকে সেখানে গল্প খুঁজতে হবে বিশ্ব।আমি জানি তোর মধ্যে সেই পোটেনশিয়াল আছে। খোঁজ খোঁজ ভাই আমার। দুটো লাইকের জন্য বাজারি হয়ে যাস না”।
বিশ্ব নড়ে চড়ে বসল। ভাল আইডিয়া। সে বলল “জানো আমি কেমন মেসেজ পাই। কিছুদিন আগে একটা ডার্ক লিখেছিলাম, তাতে একজন ইনবক্সে এসে জানিয়ে গেলেন চারদিকে তো নেগেটিভ গল্পই লিখছে সবাই, তাহলে আমি কেন এসব লিখছি। বেঁচে থাকার জন্যও তো কতজন আমার ওপর নির্ভর করেন, তাদের কথা আমি কেন ভাবি না”।
শান্তনুদা হাত তুললেন “নেগেটিভ কেন লিখবি। তুই তোর মত করে সময়কে ধরবি। সময়টাকে তো ধরতে হবে! ক’টা লোক এখন এই সময়কে নিয়ে লেখার সাহস করছে বলতে পারবি? কেউ একটা প্রেসক্রাইব করে দিচ্ছে তোমরা বাওয়া এভাবে লেখো, সেভাবেই লিখে যাচ্ছে সব। এই তো একটা পূজাবার্ষিকীতে কার একটা লেখা পড়লাম, মনে হল ডকুমেন্টারি পড়ছি। তথ্য তথ্য এবং তথ্য। আরে তথ্য ধুয়ে কি জল খাব বাল?”
বিশ্ব বলল “পার্থদার কথা বলছ? সেটা তুমি পার্থদাকে হিংসা করে বলছ”।
শান্তনুদা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “হিংসা করি, ওর সাথে ইগো ক্ল্যাশ আছে সব আছে। কিন্তু ওর প্রথম উপন্যাসটা যে দারুণ ছিল সেটা আমিই জনে জনে বলে বেড়াতাম ভুলে যাস না”।
বিশ্ব কিছু বলল না। কথাটা ঠিকই। কারও লেখা খারাপ হলে সে যতই প্রিয় লোক হোক শান্তনুদা তার মুখের ওপর বলে দেয়। সে উঠল।
শান্তনুদা হা হা করে উঠল “এখন যাবি কী রে? আজ থেকে যা। বাড়ি ফাঁকা তো”।
বিশ্ব বলল “না গো, কাজ আছে, একটা লেখা বাকি আছে”।
শান্তনুদা হাত তুলল “ঠিক ঠিক, লেখা ফার্স্ট প্রায়োরিটি হওয়া উচিত। ওকে, সাবধানে যাস”।
শান্তনুদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিশ্ব হাসল। যত যাই হোক, দিনের শেষে নিজের ডেরায় না ফিরতে পারলে আসলে কিছুই ভাল লাগে না।
৩।
ফেসবুকটা আসলে একটা অদ্ভুত ভার্চুয়াল দুনিয়া। যেখানে কাউকে কোনদিন না দেখেই লোকে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। শুধু লেখার ওপর ভিত্তি করেই একে অপরের মাথা কাটতে চায়।
সবার স্ট্যাটাস দেখা বিশ্বর প্রতিদিনের কাজের মধ্যে একটা।
সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে সবার আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে। সবাই নিজের মত করে নিজের দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছে।
বৈশালী পিং করল –“আমি একটা কথা বলব?”
বিশ্ব লিখল “বল”।
-আমি না আসলে কোন গল্প লিখিনি।
-মানে? অবাক হল বিশ্ব।
-আমি আসলে আপনার সাথে আলাপ করার ছুঁতো খুঁজছিলাম। আজ সারাদিন ধরে অনেক করে ভাবলাম, লিখতেও বসলাম কিন্তু ছড়িয়ে ফেলছি। হচ্ছে না।
বিশ্বর হাসি পেল। টিন এজ সিনড্রোম!লিখল “ভাল করেছ। অ্যাটলিস্ট তুমি অনেস্ট।বলে দিলে পারনি। অনেস্ট থাকাটাই আসল। অন্য কারও গল্প কপি করে লিখে পাঠাও নি তাতেই আমি খুশি”।
-এমা, অন্য কারও গল্প কপি করতে যাব কেন?
-আছে। এই রোগটাও অনেকের আছে। কোথাও কোন লেখা পেলে নিজের নামটা বসিয়ে দিয়ে শেয়ার করে দিল। ক্ষণিক সময়ের পিঠ চাপড়ানির লোভ। আসলে এটা কিন্তু একটা ব্যাধি জানো তো?
-জানি না। আচ্ছা আমার না এই সব কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
-কী কথা বলতে ইচ্ছা করছে তোমার?
-আপনার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করছে। আপনার গার্ল ফ্রেন্ড নেই কেন?
বিশ্ব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেই একই লুপ। লিখল “তুমি আদিত্যদার মেয়ে বৈশালী”।
-তো? কী প্রবলেম!
-আমরা এত কথা বলছি তুমি বাবাকে বলেছ?
-বলেছি তো। কালকে বাড়ি ফিরেই বলেছি। ইনফ্যাক্ট বাবা তো খুশিই হয়েছে আমি আপনার সাথে কথা বলেছি বলে। তবে এর বেশি কিছু বলি নি।
-এর বেশি মানে?
-বলব না।
-আমি বুঝলাম না বৈশালী।
-বুঝতে হবে না। অত বুঝে কী করবেন? আচ্ছা আজ একটা প্রেমের গল্প লিখবেন প্লিজ? এই ওয়েদার একটা প্রেমের গল্প ডিম্যান্ড করছে কিন্তু!
হাসি পেয়ে গেল বিশ্বর। আবার প্রেমের গল্প!
লিখল –আমি প্রেমের গল্প লেখা ছেড়ে দিয়েছি। শান্তনুদা খুব বকেছে এত প্রেমের গল্প লিখছি বলে।
-শান্তনুকাকা? ধুস! শান্তনুকাকা বলল বলে আপনি প্রেমের গল্প লিখবেন না? শুনুন, আপনি সব রকমই লিখবেন। প্রেমের গল্পও লিখবেন, অন্য কিছুই লিখবেন। আপনি শুধু লিখবেন। যা পারেন পাতার পর পাতা লিখবেন। আমি তাই পড়ব।
-তাই? এত ভাল লাগে আমার লেখা?
-লাগে। আপনি শুধু লিখুন।
-শোন। এটা এক ধরণের মোহ। আজ থেকে দু বছর পরে তোমার মনে হবে ধুস, বিশ্ব মিত্রর লেখা আমি কত পছন্দ করতাম কেন! কী বাজে লেখা! তুমি এক সময় আমার লেখার ধাঁচ বুঝে যাবে, এর পরে কী হতে পারে সেটা বুঝে যাবে, প্রেডিক্টেবল শিট হয়ে পড়ে থাকব, তখন কী করবে? একটা সময় সুনির্মল রায়ের গান কী ভাল লাগত। তারপর দেখলাম সব গানই ওই একই দিকে একই সুরে একই ভাবে হয়ে যাচ্ছে। তারপরেই কেমন একটা মোহভঙ্গ হয়ে গেল। ওই যে একটা রক ব্যান্ড, কলেজ লাইফে কী ভালই না লাগত, পাগল ছিলাম, একটা সময়ের পর ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগলাম। হতে পারে বার বার শুনে শুনে এই মোহভঙ্গটা হয়েছে। হতে পারে আমি কিছুই বুঝি না। কিন্তু মোদ্দা কথা হল আমার জিনিসটা আর ভাল লাগল না। আমিও সেটাই ঠিক করেছি। আমার প্রায় সব লেখাই আগে আমি পাঠক হিসেবে পড়ে দেখি। এরকম অনেক গল্পই আছে যেটা পড়ে আমার বিচ্ছিরি লেগেছে কিন্তু পরিশ্রম করে লিখেছি বলে গল্পটা পেজে দিয়েছি। লোকে সেই গল্পটাই কত ভাল বলে দিয়েছে। অথচ কিছু কিছু গল্প অনেক পরিশ্রম করে লিখেছি, নিজেও বুঝেছি এটাই সেরকম একটা গল্প যেরকমটা আমি লিখতে চাইছিলাম। আদতে দেখা গেল একেবারেই কেউ পছন্দ করল না সেটা। সব ছুঁড়ে ফেলে দি মনে হয়। মানুষ তো আমি, তাই না?
-হবে না। বিশ্বাস করি। আপনার উপর আমি বিশ্বাস করি।
অনেকটা কথা লিখে ফেলেছিল বিশ্ব। ক্লান্ত লাগছিল।
বৈশালী লিখল -আপনার প্রায় সব লেখায় একটা নাম দেখি ঘুরে ফিরে আসে। সোহিনী। উনি কি আপনার এক্স?
বিশ্ব লিখল –অনেকটা তাই।
-অনেকটা তাই মানে? এখনও ভালবাসেন?
বিশ্ব একটু ভাবল, তারপরে লিখল “ভালোবাসা হারিয়ে যায় না বৈশালী। সবই থাকে। শুধু ভালবাসারা আমাদের ভুলে যায়”।

ঘ।
।।তুমি আসবে বলেই।।


হাওড়া স্টেশনে বসে ছিল বিশ্ব। শান্তনুদার কথাটা মনে ধরেছে তার। অফিস থেকে বেরিয়ে স্টেশনে এসে বসেছে। প্রথমে সিট খালি ছিল না,সব বসার জায়গাই ভর্তি কেবল একটা চেয়ারের ওপর লাগেজ রাখা ছিল। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক ভদ্রলোক লাগেজটা নামিয়ে দিলেন। বিশ্ব বসতে জিজ্ঞেস করলেন “কালকা মেল?”
বিশ্ব ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে। উপরে বোর্ডে বেশ কিছু ট্রেন দেখাচ্ছে।
সে বলল “না”।
ভদ্রলোক বললেন “তবে?”
বিশ্ব একটু ইতস্তত করল। স্টেশনে লোক দেখতে বসেছে ভাবলে হয় পাগল ভাববে নয় জঙ্গী ভাববে। সে একটু ভেবে বলল “একজন আসবে। তাকে নিতে এসছি”।
ভদ্রলোক ছাড়ার লোক নন। বললেন “কোন ট্রেনে?”
বিশ্ব বিরক্ত হল। অচেনা লোক এত প্রশ্ন করলে বড় বিরক্ত লাগে।
সে বোর্ডে তাকিয়ে কয়েকটা ট্রেন দেখে বলল “এই বর্ধমান লোকালে আসছে”।
“ও গ্রামের লোক?”
বিশ্ব উত্তর না দিয়ে মোবাইল খুলে গম্ভীর হয়ে ফেসবুক খুলল। ভদ্রলোক বকবক করে যেতে লাগলেন “আমাকে দিল্লি পৌঁছতে হবে। মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।জামাই বাইরে আছে। ভাবলাম প্লেনে চলে যাব, অনেক টাকা পড়ে যাচ্ছে। আজ টিটি ম্যানেজ করতে হবে, জানি না কী হবে”।
বিশ্ব বুঝল ভদ্রলোক উৎকণ্ঠাতেই এত বকবক করে যাচ্ছেন। সবারই নিজের নিজের টেনশন আছে। কেউ বেড়াতে যাচ্ছে, কেউ কাজে। কেউ আবার পরম নিশ্চিন্ততায় মেঝেতেই কাগজ পেতে ফ্যামিলি নিয়ে পাত পেড়ে বসে আছে। একদল লোক এল হই হই করতে করতে। এক ভদ্রলোক হাফপ্যান্ট পরে সে দলটাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, সম্ভবত ট্যুর গাইড।
বিশ্বর মন খারাপ হয়ে গেল। তার মনে হল স্টেশনে না এলেই ভাল হত। এখানে এলেই কোথাও যেতে ইচ্ছা করে। যখনই তার মনে পড়ল আবার তো সেই ঘরেই ফিরে যেতে হবে সে আর বসে থাকল না। উঠে পড়ল।
ভদ্রলোক বলল “কী হল, বর্ধমান লোকাল এসে গেছে?”
বিশ্ব বলল “এই আসছি আমি একটু”।
ভদ্রলোক বললেন “জায়গা রাখব?”
বিশ্ব বলল “না না দরকার হবে না, আমি আসছি”।
সে হাঁটা দিল। বিশ্ব একবার মুখ ফিরিয়ে দেখল ভদ্রলোক কেমন করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই টুকু সময়ে পরম আত্মীয়তা তৈরী হতে পারে কারও সঙ্গে? এই ভদ্রলোক যেমন কথা বলেন ট্রেনে উঠে নিশ্চয়ই পাশের সিটের কারও সাথে আবার নতুন করে আত্মীয়তা তৈরী করে নেবেন?
তার মনে পড়ে গেল সে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে তখন সাউথ ইন্ডিয়া ঘুরতে গেছিল তারা। ফেরার সময় ট্রেনে অল্প আলাপেই তাদের সঙ্গেই ফেরা বরানগরের একটা পরিবারের সাথে ট্রেনে কী তুমুল হৃদ্যতা! ওনারা মুড়ি কিনলেও সবার জন্য কিনছেন, তার বাবা চা নিলে সবার জন্য নিচ্ছেন। মাদ্রাজ মেলের ওই দুদিন মনে হচ্ছিল তারা কী পরম আত্মীয়! বিশ্বর মনে পড়ে না ফেরার পর তাদের সাথে কোন রকম যোগাযোগ হয়েছিল তাদের। প্রথম প্রথম দুয়েকটা ফোন হয়েছিল হয়ত, কিন্তু তাদের বাড়ি থেকে বরানগর দূরে হওয়ায় এবং দৈনন্দিন কাজে উভয় পক্ষই ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ টিমটিমে থেকে শূন্য হয়ে যেতে কোন সময়ই নেয় নি। বাইরে যাদের সাথে হৃদ্যতা তৈরি হয়ে যায়, ঘরের ব্যস্ততায় তাদের মনে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেই লোকগুলোই পরে সামনে এলে মনে হয় ওহ, এরা তো আমাদের মতই লোক। ভাত খায়, স্নান করে, অফিস যায়। নিজের কমফর্ট জোনে থাকলে খুব একটা কথাও বলা হয়ে ওঠে না। অথচ বাইরে অচেনা অজানা ভিন্নভাষী পরিবেশে একজন কারও মুখ থেকে বাংলা ভাষা শুনলে পরম আত্মীয় মনে হয় তাকে।
স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে বিশ্ব একটা ক্যাব নিল। তার একটু মন খারাপ লাগছিল। কেন অফিস যেতে হয় তাকে? পেট চালাতে চাকরির নিরাপত্তা কেন দরকার?
অফিসের জাঁতাকলেই চলে যাবে জীবনটা। দিন কাটিয়ে যাওয়া শুধু। নিজেদের কোনভাবে কাজের শিকলে, সংসারের শিকলে জড়িয়ে নিয়ে সেটাকে সিস্টেম বানিয়ে রেখে মানুষ কত খুশি হয়ে গেল!
বিশ্ব মোবাইল বের করল। আপাতত ফেসবুক দেখেই মন খারাপটা কাটিয়ে নেওয়া যাক।
২।
-আমরা একদিন দেখা করতে পারি না?
-পারি তো।
-তাহলে করি না কেন?
-ব্যস্ত আছি বৈশালী।
-কেন ব্যস্ত আছেন? লিখছেন কিছু?
-না, লিখছি না তো। লিখতে পারছি না কিছু আজকাল।
-বাজে কথা। পরশুদিনই তো লিখলেন।
-সেটা কি লেখা হচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে না তো!
-কে এই সব মাথায় ঢোকাচ্ছে বলুন তো? খুব লেখা হচ্ছে। আপনি এভাবেই লিখুন।
-হু।
-ফোন করব?
-না, একটু ব্যস্ত আছি।
-রাগ করেছেন?
-না না রাগ করব কেন?
-হু।
-আচ্ছা, পরে কথা বলছি।
ফোনটা দূরে সরাল বিশ্ব। ফোন থাকলে লেখার বারোটা অনিবার্য। ভাট বকা হয়, মাঝখান থেকে লেখাটা আর হয়ে ওঠে না।
বিশ্ব দেখেছে এই ফোন ব্যবহার করে করে তার এমন হয়েছে অনেক লেখার প্লট একবার মাথায় এসছে, তারপর ফোনের চক্করে করে প্লটটাই ভুলে বসে আছে।
তারপর থেকে প্লট মাথায় এলেই মোবাইলে নোট করে রাখে সে। ভুলে গেলে ওখান থেকেই দেখে নেওয়া যায়।
খাটের ওপর পিজা রাখা আছে। একটু খেয়ে আর খেতে পারে নি। ছিবড়ার মত লাগে বেশ খানিকটা খাবার পর। বিশ্ব একটু ভাবল। ভেবেছিল পিজা খেয়ে ডিনার করবে। এখন মনে হচ্ছে এতে পেট ভরবে না। আবার বেরোতে হবে? বিরক্ত লাগছিল। সোহিনী বলত রান্না শিখে নাও, তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যাবার যায়। বিশ্ব বলত লেখক মানুষরা যদি রান্নাই করবে তবে লিখবে কবে? সোহিনী রেগে যেত। বলত আগে রান্না কর তারপরে লেখ। খাওয়াটা আগে।
সোহিনীর কথা ভাবতে ভাবতে সোহিনীই ফোন করল। বিশ্ব চমৎকৃত হল। টেলিপ্যাথি পাওয়ার কি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে তার? ফোন ধরল সে, “বল, তোমার কথাই ভাবছিলাম”।
-আমার কথা ভাবছিলে? অথচ সাত দিন হয়ে গেল একবারও পিং কর নি।
বিশ্ব অবাক হল। সাতদিন হয়ে গেছে? মুখে বলল “ওই জন্যই তো ভাবছিলাম। সাত দিন হয়ে গেল তো”।
-সিরিয়াসলি এগারো বছরের ছোট মেয়ের প্রেমে পড়লে নাকি?
-সেসব না, কাজ ছিল কিছু।
-কী কাজ?
-ওই অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
-ওহ। তাও ভাল।
-এখন আটটা বাজে। অফিসে নাকি?
-না না বাড়িতে আছি।
-বাড়িতে ফোন করছ? বর কিছু বলবে না?
-বর টিভি দেখছে। তাছাড়া কত বছর বিয়ের হয়ে গেল সে খেয়াল আছে? সন্দেহ করে কী করবে?
-তাও বটে। সেদিন একটা মেয়ের সাথে আলাপ হল। আদিত্যদার মেয়ে। বৈশালী। এক কবি সম্মেলনে। দেখা করতে চাইছে আবার।
-তাই?
-হ্যাঁ।
-তো দেখা কর। বিয়ে কর। ক’দিন আর একলা ষাড়ের মত ঘুরবে?
-এই মেয়েটাও অনেক ছোট তো। তাছাড়া চেনা জানা লোকের মেয়ে। ওর বাবাকে দাদা ডাকি।
-তোমার সমস্যা কী বল তো? বাবাকে দাদা বলে ডাকলে বিয়ে করা যাবে না? কত লোককেই তো দেখলাম মেয়ের বাবাকে দাদা বলে ডেকে বিয়ের পর দিব্যি বাবা বলে দিচ্ছে। তোমার সমস্যা আসলে তুমি ওই খানিকটা চলার পরে কেমন ঘেঁটে যাও। লোকজন তোমার এই বোহেমিয়ান নেচার দেখে প্রেমে পড়ে। তারপর তুমি দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু ঘেঁটে দাও।
-হতে পারে। আসলে আমি যখন ভাবি এই ঘরে আরেকজন এসে আমাকে কম্যান্ড করবে, এই কর ওই কর বলবে, তখন আমার কতটা বাজে লাগবে।
-এটা কিন্তু মানসিক রোগ।
-তুমিও মাসীমা হয়ে গেলে সোহিনী।
-ধুস। তোমার সাথে কিছু কথা বলাই যায় না। যা পার কর।
ফোনটা কেটে দিল সোহিনী। বিশ্ব বুঝল রেগে গেছে। সে আর ফোন করল না। এখন ফোন করলে আরও রেগে যাবে।
বিশ্ব ফেসবুক অন করল। বেশ কিছু নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসছে। অনেকেই ইনবক্সে জানিয়েছে তার লেখা খুব ভাল লাগছে তাদের। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে এসে লিখেছে আপনি সিঙ্গল? বিশ্বর হাসি পায়। সিঙ্গল জেনে কী করবে?
সেই মেয়েটা অনেক কিছু লিখে মেসেজ করেছে। বিশ্ব পড়ল “সরি, আমি আর তোমায় ডিস্টার্ব করব না। আমি জানি আমি তোমার মনের মত না। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি। সরি ফর ডিস্টার্বিঙ ইউ”।
বিশ্ব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টিন এজদের আবেগ খুব বেশি থাকে। অভিমানও। সে কী করে একে বোঝাবে ভালবাসা আসলে এভাবে হয় না? একদিনও না দেখে শুধু লেখা পড়ে ভালোবাসা হয়ে যায়? এ কি সম্ভব?
রিপ্লাই দেবে না ঠিক করল সে। একজন খারাপ মানুষ হয়ে থাকাই ভাল। উত্তর দিলেই জড়িয়ে পড়া হচ্ছে আসলে। বিশ্ব ঠিক করল বৈশালীকেও ধীরে ধীরে উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেবে সে।
৩।
অফিস কলিগদের পার্টিতে যেতে ইচ্ছা করে না বিশ্বর। তবু যেতে হয়।
আশিসদার গৃহপ্রবেশ উপলক্ষ্যে ওর ফ্ল্যাটে পার্টিতে যেতে হল।
হাতে একটা গ্লাস নিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। স্বাগত এসে তার পাশে বসল। ফিসফিস করে বলল “বিশ্বদা। একটা কেস খেয়েছি,পার্টি ফারটি সব মাথায় উঠে গেল”।
বিশ্ব স্বাগতর দিকে তাকাল “কী কেস রে? সৌমির বর সব জেনে গেছে নাকি?”
“ধুস, সে সব না। বলছি তুমি এরকম কোন জায়গা জানো যারা অ্যাবরশন করে”?
বিশ্ব অবাক হল “সৌমি?”
স্বাগত বলল “ধুর, না, ও না। সায়েরী। পিরিয়ড মিস করেছে”।
বিশ্ব অবাক হল। বলল “সায়েরী? ওর সাথে আবার তোর কবে কী হল?”
স্বাগত বলল “হয়েছে। ক্যাসুয়াল কেস। এই তো ক’দিন আগে। ওর ফ্ল্যাটে গেছিলাম, ফাঁকা ছিল হয়ে গেছিল”।
বিশ্ব হেসে ফেলল। সম্পর্কগুলো আজকাল কেমন সব ঘোঁট পাকিয়ে যাচ্ছে। এই তো কিছুদিন আগে সৌমি ছাড়া থাকতে পারছিল না স্বাগত। বলল “সৌমি জানতে পারে অ্যাবরশন ক্লিনিকের কথা। ওকে বল”।
স্বাগত বলল “তুমি ক্ষেপেছ? সৌমি জানলে মেরে ফেলবে আমাকে”।
বিশ্ব বলল “কেন মেরে ফেলবে, ওর বর আছে তো”।
বিশ্ব আড় চোখে সায়েরীর দিকে তাকাল। দিব্যি অফিসের বাকি মেয়েগুলোর সাথে গল্প করছে। দেখে মনেই হচ্ছে না এত বড় কিছু হয়ে গেছে। সে বলল “তুই সায়েরীকে বিয়ে করে নে না। প্রবলেম কী?”
স্বাগত হাতের গ্লাসের মদটা ঢকঢক করে গলায় ঢেলে বলল “তুমি ক্ষেপেছ? ও তো যার তার সাথেই শুয়ে পড়ে। ওকে কেন বিয়ে করব?”
বিশ্ব বলল “তাহলে তো ও এক্সপেরিয়েন্সড। তুই চাপ নিচ্ছিস কেন?”
স্বাগত বলল “আমাকে চাপ দিচ্ছে তো। বলছে তুই যা করার কর, আমি কিছু জানি না”।
বিশ্বর একটু একটু মাথা ধরছিল। সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটা সময় কাউকে ভালবাসি বলতে সারাজীবন লেগে যেত, এখন শুতে লোকে দশ সেকেন্ডও ভাবে না। সে একটু থেমে বলল “সৌমি বেটার না সায়েরী? বেডে?”
স্বাগত আহত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল “সৌমিকে আমি ভালবাসি বিশ্বদা”।
“ওর সাথে শুস নি?”
“না”।
বিশ্ব স্বাগতর দিকে তাকাল। বলল “ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে কী করিস তাহলে? সাপলুডো খেলিস?”
স্বাগত বলল “না, তবে ওই সব কিছু করি না।”
বিশ্ব কিছু বলল না। স্বাগতর সব কথা সত্যি বলে মনে হয় না।
স্বাগত জোর দিল “বল না, অ্যাবরশন ক্লিনিকের কথা জানো না কিছু?”
বিশ্ব হাসল “আমি কী করে জানব বল তো! তুই অন্য কাউকে দেখ”।
স্বাগত নীরস মুখে বসে ছিল। বিশ্ব উঠে ব্যালকনিতে এল। ফাঁকা ছিল। একটা চেয়ারে বসে একটা সিগারেট ধরাল সে। ফোনটা বের করে দেখল। তিন দিন হল বৈশালীকে রিপ্লাই করা হয় না। বেশ কয়েকবার পিং করেছে, ফোন করেছে ধরে নি সে।
“বিশ্বদা না? কী করছ একা একা?”
বিশ্ব মাথা ঘুরিয়ে দেখল সায়েরী। অবাক হল। সায়েরীর সাথে তো তার তেমন কোন কথা হয় না!
সে বলল “হ্যাঁ, এই একটু ফুঁকতে এলাম। বল”।
সায়েরী বলল “আরে অফিসে প্রায়ই ভাবি বলব ভুলে যাই রোজ কাজের চাপে। আজ মনে পড়ে গেল কথাটা”।
বিশ্ব বলল “কী মনে পড়ল বল তো?”
সায়েরী বলল “আমার এক বৌদি তোমাকে চেনে। আমাকে জিজ্ঞেস করছিল তুমি আমার ডিপার্টমেন্টে আছ কিনা”।
বিশ্ব বলল “কে বলত?”
সায়েরী বলল “সোহিনী বোস। আমার পিসতুতো দাদার বঊ। চেনো?”
বিশ্ব একটু থমকাল। পৃথিবীটা গোলই বটে।
৪।
অফিস থেকে বেরিয়ে শান্তনুদার বাড়িতে গিয়ে অপ্রস্তুত হল বিশ্ব। শান্তনুদার মেয়ের জন্মদিন। শান্তনুদা অন্যান্যদিনের মতই বলেছিল যেতে। সে গিয়ে দেখল বাড়িভর্তি গিজগিজ করছে লোক।
শান্তনুদা তাকে দেখেই “আয় আয় বিশ্ব, আমি ভাবলাম তুই বুঝি আর এলি না”।
বিশ্ব বলল “আগে বলতে তো। তিতলির জন্য কিছুই আনা হল না”।
শান্তনুদা তার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল “তুই গিফট দিবি? তোর লজ্জা লাগে না?”
বিশ্ব বলল “তোমার জন্মদিন হলে দিতাম না কিন্তু তিতলির জন্মদিনে কিছু না নিয়ে এসে অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে”।
শান্তনুদা হাত নেড়ে বলল “ওসব পরে হবে। তুই আগে বল তোকে যেটা বলেছিলাম করলি? স্টেশনে গেছিলি?”
বিশ্ব হাসল “গেছিলাম, বেশিক্ষণ টিকতে পারি নি”।
শান্তনুদা আশাহত গলায় বলল “এটাই তো তোদের জেনারেশনের সমস্যা রে, তোদের ধৈর্য বড় কম”।
বিশ্বর অস্বস্তি লাগছিল। একগাদা বাচ্চা ঘর ময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের মাঝখানে এইসব কথা বলার কি খুব দরকার ছিল?
বৌদি এসে তার হাতে একগাদা খাবারের প্লেট দিয়ে গেল। বিশ্ব আঁতকে উঠল। এত খাবার খেলে আর দেখতে হবে না।
সামনের টেবিলে প্লেটটা নামিয়ে রাখল সে।
শান্তনুদা বলল “শোন, তুই এক কাজ কর, শহর থেকে পালা। আমার শান্তিনিকেতনের বাড়িটাতে গিয়ে থেকে আয়। ফ্রেশ মাইন্ডে লিখতে বোস”।
বিশ্ব বলল “আমার আজকাল কলকাতা ছাড়া কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না”।
শান্তনুদা রাগল খানিকটা “কমফর্ট জোন থেকে বেরনোটাই তো চ্যালেঞ্জ রে। সেটা বুঝিস? সারাক্ষণ ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপ করে তো লেখালেখির বারোটা বাজাচ্ছিস বুঝতেই পারছি। রাত দেড়টাতেও দেখি সবুজ আলো জ্বালিয়ে বসে আছিস! কী করিস অত রাত অবধি?”
তিতলির পাঁচ বছর বয়স হল। বন্ধুদের সাথে ঘরময় দাপাদাপি করে খেলছে। বিশ্ব প্লেটটা তুলে লুচিটা খাওয়া শুরু করল, বলল “আগে বল তো তুমি কী কর রাত দেড়টায়?”
শান্তনুদা বলল “সেটা প্রশ্ন না। তুই আগে বল”।
বিশ্ব বলল “আমি তো ল্যাপটপ অন রেখেই ঘুমিয়ে পড়ি। সেটাই দেখায়”।
শান্তনুদা বলল “মেয়েদের সাথে কথা বলিস না?”
বিশ্ব বলল “খুব কমিয়ে দিয়েছি”।
শান্তনুদা হতাশ হয়ে মাথাটা সোফায় এলিয়ে বলল “তাহলে তোর লেখা বাল হবে। যে লেখক মেয়েদের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিতে চায়, সে আসলে বাল লেখক হবে”। বলেই জিভ কাটল। বলল “ঈশ রে, তোর বউদি শুনলে রক্ষা নেই”।
বিশ্ব হেসে ফেলল।
আর এই সময়েই তার সেমি হার্ট অ্যাটাক ঘটিয়ে ঘরে ঢুকল আদিত্যদা আর বৈশালী।
শান্তনুদা লাফিয়ে উঠল, “আরে, এই তো এসে গেছে বাংলা সাহিত্যের আরেক নক্ষত্র আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। আসুন আসুন”। শান্তনুদা আর আদিত্যদা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল।
বিশ্ব বৈশালীর দিকে তাকাল। বৈশালী সোজাসুজি তার দিকেই তাকিয়ে। মুখটা থমথমে, ঝড় আসব আসব করছে...


ঙ।
ভাল আছি ভাল থেকো

১।
“আপনি যা লেখেন তা নিজে বিশ্বাস করেন না, না?”
মাঝরাতে এক মহিলার থেকে এমন একটা মেসেজ দেখে অবাক হল বিশ্ব। সে আদার মেসেজবক্সও চেক করে। অনেকেরই তার লেখা নিয়ে অনেকরকম প্রশ্ন থাকে। ইচ্ছা করলে তার উত্তরও দেয়।
আদার মেসেজবক্স চেক করতেই মেসেজটা চোখে পড়ল। সে প্রশ্নটা দেখে একটু ভাবল, তারপর লিখল “কেন বলুন তো?”
উত্তর এল “আমার মনে হল। এবার আপনি বলুন”।
বিশ্ব অবাক হল। এ কি তারই চেনাজানা কারও ফেক? ঠিক করল উত্তরটা দেবে। লিখল “আমার সব লেখাই আমি কল্পনা থেকে লিখি। এতে অনেকেই ভাবেন এর মধ্যে আমি জড়িয়ে আছি কিংবা আমার এই সব ব্যাপারে এক্সপেরিয়েন্স আছে। আদতে তা না। তবে সত্যি মিথ্যা যদি বলেন, সত্যিকারের প্রেমের প্রতি আমার এখনও খানিকটা অবিশ্বাস আছে, তা বলতে পারি”।
-সত্যি? প্রেমের কাহিনীকার বিশ্ব মিত্র যদি এই কথা বলেন, সেটা যদি সবাই জানে তাহলে কি কেউ আপনার গল্প আর পড়বে?”
-কেন পড়বে না? গল্পকার ব্যক্তিগতভাবে কী মনে করেন সেটা তো পাঠকের জেনে লাভ নেই, তারা গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য নাকি সেটা দেখবে।
-তাই? আমার কিন্তু মনে হয় লেখকের বিশ্বাসও গল্পে একটা প্রভাব ফেলে।
-আপনি কিভাবে জানলেন আমি লাভ স্টোরিতে বিশ্বাস করি না?
-আপনার গল্প পড়ে না। আপনার অন্যান্য লেখা থেকে সেটা মনে হয়েছে। প্রেমকে আপনি খাটো করে দেখেন হয়ত।
-না না। খাটো করে দেখি না, আমার আপত্তি অন্য জায়গায়, প্রেম ছাড়াও যে অন্যান্য বিষয় আছে, তা নিয়ে লেখা কম হয়ে যায় পাঠকের চাহিদায়, আপত্তি সেখানেই।
-দেখুন, আমার মনে হয় প্রেম একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আপনি যদি প্রেমকে বাদ দিয়ে অন্যান্য বিষয় নিয়েও লেখেন, প্রেম যে অনিবার্যভাবে আসবে, সেটাকে উপেক্ষাও করতে পারেন না আপনি।
-আপনি কে বলুন তো? জানতে পারি?
-আমি আপনার একজন মুগ্ধ পাঠক।
-আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনাকে আমি চিনি।
-চেনেন না। আমি কিন্তু আপনাকে চিনি। আপনার লেখা পড়ে পড়ে আপনাকে চিনেছি। আপনি যেখানে যা লিখেছেন তা খুঁজে খুঁজে পড়েছি, প্রতিটা শব্দে আপনাকে জেনেছি।
-আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি আপনার মত একজন পাঠক পেয়েছি।
-না, ভাগ্যবান মনে করবেন না। তবে আপনাকে একটা সত্যিকথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আপনাকে একটা কথা বলতে পারি?
-অফকোর্স। বলুন।
-আমাদের অফিসে একটা ছেলে আছে। ওর প্রতি আমার একটু ক্রাশ ছিল। অনেকদিন ধরেই ভেবেছিলাম তাকে বলব আমার মনের কথা। একজনকে দিয়ে বলিয়েছিও...
-বাহ। তারপর? তিনি রাজি হয়েছেন?
-না, তিনি তাকে জানিয়েছেন, তিনি একজনকে ভালবাসতেন। মেয়েটির বাবা ছেলেটির অন্য জাত বলে, ভাবুন, এই সময়েও অন্য জাত বলে মেয়েটিকে বিয়ে দিলেন না ছেলেটির সাথে। অন্য একজনের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ের রাতে মেয়েটি সুইসাইড করল।
-এক সেকেন্ড। গল্পটা আমার একটা গল্পের সাথে...
-একজ্যাক্টলি। তবে জাত ইত্যাদি ছিল না তাতে। ফেসবুকে এই গল্পটাই প্রথম পড়ি আপনার। এবং কী কাকতালীয় বলুন, আমার নিজের জীবনেও একজ্যাক্টলি একই গল্প মিলে গেল। যাই হোক, আসল কথাটা হল ছেলেটা এখনও বিয়ে করল না।
-স্ট্রেঞ্জ। এখনও এরকম ঘটনা ঘটে?
-ঘটেছে তো। আপনি তো ভেবেছিলেন এরকম ঘটতে পারে তাই তো গল্পটা লিখেছিলেন, তাই না? আরও স্ট্রেঞ্জ জানেন? আমিও ঠিক করেছি বিয়ে করলে এই ছেলেটিকেই বিয়ে করব নইলে করব না। বাড়ি থেকে প্রায়ই কত সম্বন্ধ আসে, কিছুতেই আমি সে সম্বন্ধগুলো এগোতে দিই না। বিশ্বাস হচ্ছে?”
বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল। এমনও হয়? মেয়েটা লিখল “আমি আপনাকে পিং করে অনেকগুলো কথা বলে গেলাম। ভাবতে পারি নি আপনি রিপ্লাই করবেন”।
বিশ্ব লিখল “ভাল লাগল আপনার কথা শুনে”।
মেয়েটা লিখল “ভালবাসার উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস করুন বিশ্ববাবু। আপনার লেখা পড়েই আমি ভালবাসাতে এখনও বিশ্বাস রেখেছি। হারিয়ে যাবেন না প্লিজ। ভাল থাকুন। শুভ রাত্রি”।
বিশ্ব বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ বসে থাকল। কিছু কিছু হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনা কোন কোন বিষয় নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করে। ভদ্রমহিলার সাথে কথা তাকে অনেকখানি নাড়া দিল।
ভালবাসার ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ? সেই ক্লিশে কথা? এখনও তবে ভালবাসার প্রাসঙ্গিকতা আছে?
বৈশালী কি তাকে ভালবাসে? শান্তনুদার বাড়িতে তার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিতর মত আচরণ করল মেয়েটা। চোখ মুখ শক্ত করে থাকল। তিতলির সাথে খেলল, হই চই করল কিন্তু তার সাথে একটা কথাও বলল না। আদিত্যদা যখন তাকে দেখেই বলল “আরে বিশ্ব মিত্র, জানো আমার মেয়ে তোমার কত বড় ফ্যান?”
বৈশালী তখন হাল্কা একটা হাসি হেসে তিতলির সাথে খেলায় মত্ত হয়ে গেল। বিশ্ব বুঝতে পারছিল ভীষণ রেগে আছে মেয়েটা। বিশ্বর অস্বস্তি হচ্ছিল। সে বেশিক্ষণ থাকল না। শান্তনু হাঁ হাঁ করে উঠেছিল “আরে ভাই, এখনই পালাবি কী রে?”
বিশ্ব তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এসছিল শান্তনুদার বাড়ি থেকে। একটা অদ্ভুত মন খারাপ হয়েছিল। খানিকটা ইগোও। বিশ্ব মিত্র তো কাউকে রিপ্লাই করবে না, পাত্তা দেবে না এটাই স্বতঃসিদ্ধ ছিল, তাকে যখন কেউ পাত্তা দেবে না তখন সেও তো রাগ করতে পারে না হিসেব মত! নিজেকে অনেকক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা করেছিল বিশ্ব। পারে নি। বেশ কয়েকবার বৈশালীকে মেসেজ করার চেষ্টা করল। মেসেজ লিখেও শেষ মুহূর্তে সেন্ড করল না সেটা। সারারাত জেগে বসে থাকল। শেষ রাতে ঘুম এল।
পরের দিন অফিস যেতে পারল না। সারা দিন উদ্দেশ্যহীনের মত কলকাতা ঘুরে বেড়াল, সন্ধ্যের দিকে সোহিনীকে ফোন করল। সোহিনী দুবারের পরে ধরল, বিশ্ব বলল “আজ একটু দেখা করতে পারবে?”
সোহিনী নিচু গলায় বলল “আমার ননদকে দেখতে এসছে আজ, আজ আর ফোন কোর না”।
ফোনটা কেটে যেতে বিশ্ব অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিল।
সোহিনী ফোন করতে পারবে না। ও এখন অন্যের বউ।
ভালোবাসারা কী অবলীলায় পর হয়ে যায়...
২।
“অমিতাভখ্যাত, প্রসেনজিত খ্যাত, দেব খ্যাত ল্যাংচার দোকান হতে পারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খ্যাত, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় খ্যাত ল্যাংচার দোকান হবে না কেন?”
শক্তিগড়ের দোকানে একটা দশটাকার ল্যাংচার চামচ দিয়ে পেট কেটে প্রশ্নটা করল শান্তনুদা। অরিত্র শান্তনুদার কথা শুনে বলল “সিনেমাস্টাররা বেশি বিখ্যাত লেখকদের থেকে তাই”।
শান্তনুদা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “নাহ, কারণটা আর কিছু নয় বাওয়া, কারণটা হল শিক্ষার অভাব। শিক্ষার অভাব হলে শিক্ষিতদের আদর কমে দেশে। কথার গভীরে যাওয়ার লোক কমছে যত দিন যাচ্ছে। দেখ না এই দোকানেই হয়ত কোনদিন সুনীলদা ল্যাংচা খেয়ে গেছিলেন, কিন্তু কেউ তার নাম নেবে না। এখন কোন লেখক মারা গেলে লোকের মনে পড়ে যে হ্যাঁ কেউ একজন ছিল এরকম। ওদিকে দেখ, রণবীর কাপুরের জাঙ্গিয়ার কালার খবরের ফ্রন্টপেজে বেরচ্ছে দিনের পর দিন।অবশ্য লেখকদেরও দোষ আছে, রাজানুগ্রহ পাবার জন্য, লবিবাজী করার জন্য তারা যদি জামা পালটে নেয়, আদর্শের তোয়াক্কা না করে, তাহলে তাদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে। নাইটের মত উপাধি এদেশের কেউ যে প্রত্যাখ্যান করেছিল তা আজকাল কেউ ভাবতে পারে ভাই?”
বিশ্ব কিছু বলল না। যেখানে সেখানে রাজনৈতিক কথা বার্তা বলতে ইচ্ছা করে না তার। অরিত্র, শান্তনুদা, তীর্থদা আর সে শান্তিনিকেতন যাচ্ছে। শান্তনুদার বাড়িতে দোল কাটাবে। আদতে মদ খাওয়া। ডানকুনি পেরোতেই শান্তনুদা বিয়ার খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। সে খায় নি। রাস্তায় খায় না কিছু। ইদানীং কেউ জোর না করলে কিছুই খায় না। শান্তনুদা বলে “একদিকে ঠিকই করিস, লেখক মানেই মদ খেতে হবে এটা কোথাও লেখা নেই”।
সকালে ব্রেক ফাস্ট করে আসা হয় নি। শক্তিগড়েই ব্রেক ফাস্ট হল। বেরনোর সময় শান্তনুদা ড্রাইভারকে তিনবার জিজ্ঞেস করেছে “ভাই তুমি ফ্রেশ আছ তো? কুড়ি বাইশ ঘন্টা কোথাও জার্নি করে আসো নি তো? দেখো ভাই, মেরো না এই বয়সে। মেয়ে ছোট। এই বাকি তিন জন যারা যাচ্ছে তারা মরলে বাংলা সাহিত্যের কিন্তু ভরাডুবি হবে, মনে রেখো”।
সবাই হেসে দিয়েছিল। ড্রাইভারও। সে বলল “চিন্তা করবেন না। আমি একদম ফেরেশ আছি”।
অরিত্র তারই বয়সী। দু বছর আগে বিয়ে করেছে। গাড়িতে উঠেই বিশ্বকে বলেছে “ভাই রে, খুব বাঁচা বেঁচে গেছিস বিয়ে করিস নি। এত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আসতে হল যে এখনও মাথা ভোঁ ভোঁ করছে”।
তীর্থদা কবিতা লেখে। নিরীহ নির্বিবাদী মানুষ। শান্তনুদা যেমন মানুষ পছন্দ করে তেমনই। তার খাওয়া হয়ে গেছিল। শান্তনুদাকে বলল “তুমি যেখানে সেখানে সব কিছু বোল না তো! মার ধোর খেয়ে যাবে”।
শান্তনুদা বলল “মার খেলে খাব। সত্যি কথা বলার জন্য লোকে তো মার খাবেই। তাতে শহীদ হতে হয় হব”।
বিশ্ব বলল “বিয়ারেও আজকাল তোমার নেশা হচ্ছে। কিছু বলার নেই”।
শান্তনুদা রেগে গেল “নেশা কেন হবে? দশটা বোতলেও আমার কিছু হয় না। সত্যি কথায় লোকের গায়ে ফোস্কা পড়তেই পারে তাতে আমার কিছু ছেঁড়া যায় না”।
খাওয়া দাওয়া সেরে তারা যখন গাড়িতে উঠল যখন তখন সাড়ে দশটা বাজে। শান্তনুদা ঘুমিয়ে পড়ল। তীর্থদা বিশ্বকে বলল “নতুন কিছু লিখলি?”
বিশ্ব বলল “না গো, সেরকম কিছুই লিখি নি”।
অরিত্র বলল “বিশ্ব অনেকদিন কবিতা লিখিস না ভাই। নতুন কিছু লেখ”।
বিশ্ব প্রতিবাদ করল “ধুস, কবিতা আমার আসে না। গদ্যের সিচুয়েশনে মাঝে সাঝে চলে আসে। কিন্তু কবিতা লিখতে বসলে মাথায় কিছুই আসে না তেমন”।
তীর্থদা বলল “তবু চেষ্টা করিস। আমরা একটা কাগজ করছি। ঠিক করেছি তোর থেকে একটা কবিতা নেব”।
বিশ্ব হাসল “গল্প ভাল লাগছে না আমার? কবিতা দিয়ে জায়গা ভরাবে নাকি?”
তীর্থদা চোখ পাকাল, “মার খাবি তুই। তোর গদ্য ভাল লাগে না বলেছি? কমপ্লেক্সে ভুগছিস নাকি আজকাল? পত্রিকাটা কবিতার। তাই কবিতা চাইলাম তোর কাছে”।
শান্তনুদা ঘুমের ঘোরেই বলে উঠল “একদম লিখবি না বিশ্ব, এখন সবাই কবি, পৃথিবীতে এন নাম্বার অফ বাঙালি কবি, দয়া করে এন প্লাস ওয়ান হোস না”।
তীর্থদা বলল “তুমি ঘুমোও বুড়ো। যত দিন যাচ্ছে তত জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে”।
অরিত্র বলল “এই তীর্থদা, আমার কুটিরে যাব তো আমরা? কিছু না নিয়ে গেলে আমার কপালে দুঃখ আছে”।
বিশ্ব হেসে ফেলল “কাল ভোরে উঠে প্রভাতফেরী করবে, ওরে গৃহবাসী। তারপর যদি খোলা থাকে, যাব”।
অরিত্র বলল “দেখিস কিছু হলেও নিয়ে যেতে হবে, আমি ভুলে গেলেও তুই ভুলিস না ভাই। স্কচের নেশায় আমার স্মৃতিশক্তি কাজ করে না। ভুলিস না বিশ্ব, আমার সংসার রক্ষার দায় তোর”।
বিশ্ব আর তীর্থদা হো হো করে হেসে উঠল। শান্তনুদা ঘুম ঘোরে বলল “দেশটার ইয়ে মারা যাচ্ছে আর এরা হাসছে, হাস হাস”।
তীর্থ বলল “এই জ্ঞানবৃদ্ধবুড়ো, তুমি ঘুমাও।একদম স্পিকটি নট”।
শান্তনুদা চোখ টোখ খুলে উঠে বসল। একটা বিয়ারের ক্যান খুলে মুখের ভিতর খানিকটা ঢেলে জোরে জোরে গান গাওয়া শুরু করল।
বিশ্বর খারাপ লাগছিল না। অনেকদিন পর কলকাতার বাইরে এসে ভাল লাগছে। কেন এভাবে বেরনোর কথা আগে মাথায় আসে নি?
#
কয়েকবছর আগে শান্তিনিকেতনে এসছিল তারা। তখন রিক্সার রমরমা ছিল।
এখন টোটোর যুগ। দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেছিল তারা। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর তিনজনে মিলে টেনে ঘুম লাগাল। বিশ্বর বিরক্ত লাগছিল। একা একাই বেরিয়ে পড়ল।
টোটোতে করে সোনাঝুরির হাটে চলে গেল। যেতে যেতে তার মনে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ এখন বেঁচে থাকলে টোটো চড়তেন নিশ্চয়ই। দৃশ্যটা কল্পনা করতে হাসি পেয়ে গেল।
সোনাঝুরির হাটে আগে খুব একটা ভিড় হত না। এখন হুজুগে হুজুগে জায়গাটায় পা ফেলার জায়গা নেই। বিশ্ব মেলায় ঢুকবে না ঢুকবে না করেও ঢুকল। কিছু কিনল না। বেশ খানিকক্ষণ “হৃদমাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না” শুনল বসে বসে।
“কেমন আছ বিশ্ব?”
বিশ্ব অন্যমনস্ক ছিল। নিজের নাম শুনে চমকে তাকাল। সানন্দা! ওর দিকে তাকাতেই তার চোখ পড়ল সানন্দার সিঁথিতে। সিঁদুর।
সে অবাক হল “তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?”
সানন্দা হাসল, বলল “হঠাৎ করেই, দাঁড়াও, তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দি”।
পাশেই একজন যুবক ঝুঁকে কিছু একটা দরদাম করছিল, সানন্দা তাকে ডাকতে সে উঠল, তারপর তার দিকে তাকিয়ে নমস্কার করল।
বিশ্ব প্রতিনমস্কার করল। তার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে বলল “কবে হল?”
ছেলেটা বলল “এই মাসেই। কিছুই ঠিক ছিল না আসলে”।
সানন্দাকে বিহ্বল লাগছিল “আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল তোমাকে এখানে দেখতে পাব। কি কোইন্সিডেন্স না?”
বিশ্ব কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল “বিয়েতে বলতে পারতে”।
ছেলেটা বলল “বিশ্ববাবু, আপনার লেখার কিন্তু আমিও ফ্যান। তবে ওই পড়িয়েছিল আমাকে প্রথমে। খুব বেশি গল্পের বই পড়ি না। আপনার বই পড়ে ভাল লেগেছে বলতে পারেন”।
বিশ্ব বলল “আপনি কোথায় থাকেন?”
ছেলেটা বলল “খড়গপুরে। আসবেন প্লিজ। আচ্ছা, আপনাকে ঠিকানাটা দিয়ে দি এক মিনিট”।
সানন্দা তাড়া দিল “এখন দেরী কোর না, পরে দিও। মা হোটেলে একা আছে। আচ্ছা আমরা এখন বেরোব। আসি হ্যাঁ?”
একটু তাড়াতাড়িই বরকে নিয়ে সানন্দা ভিড়ে মিশে গেল। ছেলেটাকে খারাপ লাগল না বিশ্বর। পরক্ষণেই মনে হল ছেলেটা হয়ত জানে না সানন্দা তাকে এককালে ভালবাসত। জানলে কি আর এত ভালভাবে কথা বলত?
হাট থেকে বেরিয়ে লাল মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করল বিশ্ব। মাঝে মাঝে যেটা চায়, সেটা হলেও এত খারাপ লাগে কেন?

চ।
।।ও যে মানে না মানা।।
“মন খারাপ হলে আমরা আসলে একটা আশ্রয় খুঁজি, কেউ পাই, কেউ পাই না...”
এতটা লিখে বিশ্ব মিত্র থমকাল।
আশ্রয় কি আসলে আমরা সবাই পাই?
আজ নিজের হাতে ঘর পরিস্কার করেছে সে। খাটের তলাও। দুটো বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ ভর্তি হয়েছে ফুরিয়ে যাওয়া চিপসের প্যাকেটে, সিগারেটের শেষাংশে, কবে খাওয়া চকোলেটের মোড়ক, মল থেকে কেনা একটু খেয়েই ফেলে দেওয়া জুসের আধ খাওয়া ক্যান, একটু খেয়ে পরে খাবে বলে পরে ভুলে যাওয়া বিস্কুটের প্যাকেট যেটা কাগজের তলা থেকে বেরিয়েছে, সব কিছু দিয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগটা ভর্তি করেছে।
ঝাটা কেনা হয়েছিল আগের দিন। সেটা দিয়ে ঘর ঝাট দিয়ে ঘর মুছে তারপরে স্নান করে লিখতে বসেছে।
বিশ্ব মিত্র লিখতে বসেছে অনেক দিন পরে।
কিছুটা লিখছে, কিছুটা কাটছে। সে ল্যাপটপে লেখে। কাগজে তার লেখা আসে না।
অরুণাভদা বলেছিল কাগজে লিখতে। তাতে নাকি লেখা কাটলে সেটা একটা তৃপ্তি এনে দেয়। সে লিখতে গিয়ে দেখেছে হয় না। প্রজন্মের পরিবর্তন হচ্ছে অরুণাভদারা বুঝতে চান না। ল্যাপটপেও যে লেখা কাটা যায়, সেটা বুঝতে পারেন না।
অবশ্য অরুণাভদা ফেসবুকে আসেন মাঝে মাঝেই। এর ওর স্ট্যাটাসে গিয়ে উল্টো পালটা কমেন্ট করেন। বিশ্ব ভেবে দেখেছে যে সব লোকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সড়গড় নয়, তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা উচিত না। পাঠক বা শ্রোতার কাছে সেলিব্রিটিদের একটা ইমেজ তৈরি হয়। তারা আলটপকা মন্তব্য করে বা পরস্পরের সাথে চুলোচুলিতে মেতে নিজেদের শ্রদ্ধার জায়গাটা নষ্ট করে দেন। একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াকে কেন্দ্র করে। আর একটা প্রজন্ম সেটা শিখতে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলছে, এটা বিশ্বর বড় অসম মনে হয়। লেখক কবিদের মধ্যে তীব্র চুলোচুলি হয়ে এসেছে, লেখা নিয়ে হয়েছে, ইগো নিয়ে হয়েছে, কিন্তু সেটা কম পরিসরে হয়েছে। অনেক দিন পরে খবরের কাগজে সে সম্পর্কিত লেখা পড়ে মানুষ অবাক হয়েছে, যদি সেটা প্রকাশ পায়। সোশ্যাল মিডিয়া আসার পরে সেটার অবকাশ নেই, সরাসরি কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে।
বেশ খানিকটা লিখল বিশ্ব। লিখতে ভাল লাগছে অনেকদিন পর।
ঘর নোংরা ছিল বলেই কি মনঃসংযোগ হচ্ছিল না? নাকি সম্পূর্ণ একা থাকাটা দরকার? শান্তনুদা সেদিন একটা ভাল কথা বলেছিল। অনেক জনের মধ্যেও লেখকদের একা হয়ে যাওয়াটা জরুরি। লিখতে বসে মন একবার অন্যদিকে চলে গেলেই লেখাটা নষ্ট হয়ে যায়। লেখার সময় বাকি জগত থেকে নিজেকে আলাদা না করে দিতে পারলেই যত সমস্যার সৃষ্টি হয়। একটু স্বার্থপর না হলে লেখাটা হয়ে ওঠে না আসলে।
ফোনটা বাজছিল। সোহিনী। প্রথমে ধরল না।
একবার পুরো রিং হয়ে গেল।
আরেকবার রিং শুরু হতে ধরল বিশ্ব, “বল”।
-কী ব্যাপার? সেই কবে ফোন করেছিলে। ভুলে গেলে নাকি?
বিশ্ব হাসল। বলল “ভুলে যাওয়া সম্ভব? তোমার কী মনে হয়?”
-সম্ভব কি সম্ভব না সেটা তুমিই জানো। ফোন করি ধর না, মেসেজের রিপ্লাই দাও না। কী হয়েছে?
-কিছু হয় নি তো!
-তবে?
-আসলে তোমাকে অনেক জ্বালাতন করেছি তো। ঠিক করলাম আর করব না।
-ওহ, বুঝেছি। সেদিন ফোন করেছিলে, কথা বলি নি বলে রাগ করেছ তাই তো?
-আমি এখন লিখছি জানো?
-লিখছ? ও, তাহলে পরে ফোন করছি।
-না না, রাখতে হবে না, শোন। আমি এখন লিখছি, প্রথম বাক্যটা লিখেছিলাম মন খারাপ হলে আমরা একটা আশ্রয় খুঁজি। কেউ পাই, কেউ পাই না।তোমাকে খুব জ্বালিয়েছি না?
-কী সব বলছ বিশ্ব, তুমি ফোন করলে যদি জ্বালাতন হয় তাহলে আমি তোমাকে ফোন করব কেন? আমি বুঝতে পেরেছি তুমি একটা ক্রাইসিসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছ, তুমি কি সব কিছু নিয়ে বেশি ভেবে ফেলছ? না কি... প্রেমে পড়েছ?
একটু থমকাল বিশ্ব সোহিনীর কথাটা শুনে, তারপর বলল “হয়ত। হয়ত নয়। প্রেমে পড়লে কি লোকে এরকম কাজ করে? তাহলে তো বলতে হয় সব সময়েই আমি প্রেমে পড়ে ছিলাম”।
সোহিনী বলল “তুমি বেঁচে গেছ বিশ্ব, আমাদের বিয়েটা তখন হয় নি বলে। আমি তোমাকে বুঝতে পারতাম না, ঝগড়া টগড়া করে হয়ত এতদিনে ডিভোর্স হয়ে যেত আমাদের। দূরে থেকেই তুমি ভাল আছ”।
বিশ্ব হাসল “তাই হবে। তবে আমি ঠিক করেছি তোমাকে আর একদম জ্বালাব না। তোমার আলাদা সংসার আছে, একটা আলাদা স্পেস আছে, সেই স্পেসে বারবার আমি ঢুকে পড়ছি, এভাবে চুরি করার মত করে ভালবাসতে আমি চাইনি সোহিনী। আমাদের যোগাযোগটা বোধহয় না হলেই ভাল হয়”।
দুজনেই খানিকক্ষণ চুপ থাকল। তারপর সোহিনী বলল “তুমি এ’কদিনে হঠাৎ ম্যাচিওর হয়ে গেছ। কী হল হঠাৎ করে”?
বিশ্ব বলল “তুমি খানিকটা জানো হয়ত, আমি যে এ ক’দিন লিখছি, অনেকের সাথেই আলাপ হয়েছে। অজান্তেই অনেকের সাথে অনেকরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেটা ভার্চুয়াল রিলেশন ছিল। এই ভার্চুয়াল পৃথিবীতে কেউ যখন বলেছে আমার গল্প তাদের ভাল লাগে, কেউ কেউ প্রেম নিবেদন করে বসেছে টিন এজ আবেগে, আমি এ সবকিছুই ভেবে নিয়েছিলাম টেকেন ফর গ্র্যান্টেড। একটা মেয়ে যে আমার কথা বলার উপরে ভিত্তি করেই একটা নিজের আলাদা জগত তৈরি করতে পারে আমি সেটা কল্পনাতেও ভাবি নি। সানন্দাকে তুমি চেনো না, ওর সাথেও আমার ফেসবুকেই আলাপ, সেখান থেকে হোয়াটস অ্যাপ। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছি ওর সাথে। সেদিন সোনাঝুরির হাটে ওর সাথে দেখা হয়ে গেল। ও বিয়ে করেছে। আমাকে দেখে প্রথমে খুব খুশি হল। তারপরেই ওর মুখ দেখে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম ও আসলে আমাকে ভয় পাচ্ছে সোহিনী। যদি ওর বিয়ের পর আমি ওর নিরাপদ সংসারে ঢুকে পড়ি। আরেকটা জিনিসও মনে হল। ও যেন আমার থেকে পালাতেই বিয়েটা করেছে। কোনদিন দেখা না হয়ে শুধু ভার্চুয়াল কথা যে এভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে কে ভেবেছিল? তড়িঘড়ি পালিয়ে গেল মেয়েটা। আমার মাথা কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল আমার একটা আশ্রয় দরকার যাকে মনের কথাগুলো খুলে বলতে পারি। বোকার মত তোমায় ফোন করলাম। তুমি ব্যস্ত ছিলে। ফোনটা কেটে গেলে নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছিল। আমাদের মনে হয় ফোন করাটা ঠিক নয় সোহিনী”।
সোহিনী একটু সময় নিল, তারপর বলল “একজন মানুষের সম্পর্ক অনেক রকম হতে পারে বিশ্ব। সব সময়ে ভালবাসতেই হবে তাদের এরকম কোন মাথার দিব্যি কেউ দেয় নি। তুমি জানো আমার বাবার বডিটা যখন নার্সিং হোম থেকে বের করা হল, মার বিহ্বল মুখ দেখে আমার সবার আগে মনে হয়েছিল মার কেন একটা এক্সট্রা ম্যারিট্যাল ছিল না? থাকলে অন্তত এই বয়সে এসে ভালবাসার অভাব হত না। মানুষ বড় একা বিশ্ব। অনেক মানুষের ভিড়ে থেকেও তারা একা। আমি জানি, তুমি অনেকটা ইমম্যাচিওর, বাস্তব বুদ্ধি কম, এখনও সমান রোম্যান্টিক থেকে গেছ, আমি নিজেই কতবার তোমাকে বলেছি গ্রো আপ, এখন মনে হচ্ছে তুমি এরকমই থাক। আমরা সবাই তো ম্যাচিওর হয়ে গেছি, কী এমন লাভ করতে পেরেছি বল? এখনও সেদিনটার কথা মনে পড়ে যায় যেদিন বৃষ্টির মধ্যে তুমি দেখা করতে এসেছিলে, হাতে গামছা নিয়ে বোকার মত মুখ করে বললে ‘দেখেছ, মেঘ হয়েছে দেখে ছাতার জায়গায় গামছা নিয়ে বেরিয়েছি, ভেবেছি ভিজলে গামছা দিয়ে গা শুকিয়ে নেব। ছাতা না থাকলে গামছাটাই যে ভিজে যাবে সে খেয়াল নেই। আসলে একটা কালো মেয়ের গল্প লিখছিলাম যে অনেকদিন অরকুটে একটা ছেলের সাথে প্রেম করে ছেলেটার সাথে প্রথম দেখা করতে যাচ্ছে। বাকি সব ভুলে গেছিলাম’। সেদিন তোমার উপর খুব রাগ করেছিলাম। মনে হয়েছিল তুমি একেবারেই সাংসারিক হবে না। এখন মনে হয় ভুল করেছিলাম। ম্যাচিওর লোকের থেকে রোম্যান্টিক লোকই দরকার বোধহয় আমাদের এখন। তাহলে এত হিংসা বিবাদ থাকত না। সংসার করে কী হবে বিশ্ব? আমার বর একজন পারফেক্ট হাজব্যান্ড, পারফেক্ট অফিস করে, বাচ্চা সামলায়, আমাকে স্পেস দেয়, ঘড়ি ধরে আমাদের সবকিছু হয়, নিয়ম করে ভালবাসাবাসি হয়, সব কিছু কেমন নিয়ম মেনে হয়। একদিকে ভীষণ সুখে আছি। কিন্তু কিছু একটা নেই, এত সবকিছুর আড়ালে কিছু একটা নেই, যেটা আমাকে অনেকবার ভাবিয়েছে। তারপর একদিন হঠাৎ করে খেয়াল করলাম আমাদের মধ্যে আসলে কোন ঝগড়া হয় না। শেষ কবে আমরা তুমুল ঝগড়া করেছিলাম, শেষ কবে আমার অভিমান ভাঙাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছে আমি মনে করতে পারি না। তুমি যে ফোন কর, আমরা দেখা করি, তোমার ক্রাইসিসগুলো তুমি আমাকে বল, এগুলো আছে বলেই এখনও খানিকটা ভাল আছি। বাইরে থেকে আমাদের দেখলে কেউ বলে দিতেই পারে ব্যাপারটা এক্সট্রাম্যারিটাল, কিন্তু আসলে কি তাই?”
বিশ্ব একটু হেসে বলল “মেয়েদের না এই জন্য আমি বুঝতে পারি না মাইরি, এই এতদিন ধরে বললে গ্রো আপ, এখন আবার পালটি মারছে”।
সোহিনীও হেসে দিল। বলল “তুমি এবার আমাকে সত্যি কথাটা বল তো। মেয়েটা কে?”
বিশ্ব তাড়া লাগাল “পরে কথা বলছি, লেখা অনেক বাকি বুঝলে?”
সোহিনী বলল “বুঝেছি বুঝেছি, বলবে না”, তারপর একটা ছদ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “যাই হোক, আর যাই কর বাপু, মাঝে মাঝে আমার নামটা যেমন গল্পে রাখো, সেরকম রেখো তাহলেই হবে, একেবারেই সরিয়ে দিলে খুব কষ্ট পাব কিন্তু”।
বিশ্ব হাসতে হাসতে বলল “আচ্ছা, রাখছি, পরে ফোন করব না হয়”।
ফোনটা রেখে বিশ্ব কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল।
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা নম্বরে ফোন করল। তিনবার রিং হল ফোনটা কেউ ধরল না।
ফোনটা খাটের ওপর রেখে কিছুক্ষণ বসে থাকল। তারপর উঠল। চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছিল। এমনিতে চা খাওয়া অভ্যাস নেই কিন্তু এখন মনটা চা-চা করছিল। সে ফোনটা রেখেই বাইরে বেরোল।
২।
আধ ঘন্টা পরে বিশ্ব ফিরল। এমনিতে ফোনটা তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল এতদিন।এই আধঘণ্টায় বার বার তার মনে হচ্ছিল ফেসবুকে কে কী আপডেট করল, হোয়াটস অ্যাপে কেউ কিছু মেসেজ করল নাকি। ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিতেই দেখল দশটা মিসড কল। সে কল ব্যাক করল, ওপাশ এবার একটা রিং হতেই ধরল, “টিউশনে ছিলাম, সাইলেন্ট ছিল ফোন, বলুন কেন ফোন করেছিলেন?”
বিশ্ব বলল “আমরা কি দেখা করতে পারি বৈশালী?”
বৈশালী বলল “কেন বলুন তো?”
বিশ্ব বলল “কিছু কথা বলার আছে”।
-আজকে তো হবে না। পড়া আছে।
-ঠিক আছে। তুমি বল কবে?
-কালকে। সকাল এগারোটায়। ওহ, আপনার তো অফিস আছে না?
-ঠিক আছে। কালকে ছুটি নিয়ে নেব। তুমি কি এখনও আমার ওপর রেগে আছ?
-না না, রেগে থাকব কেন? রেগে নেই। আচ্ছা রাখছি এখন।
ফোনটা কেটে দিল বৈশালী। ব্যাপারটা কি হ্যাংলামি হয়ে গেল একটু?
ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল সে। মন খারাপটা আবার ফিরে আসছে। দু চারবার হাতটা ফোনের কি প্যাডে যেতে গিয়েও আটকে গেল।
মিনিট পাঁচেক পরে আবার ফোন এল, বিশ্ব ধরল, এবার গলাটা রূঢ় নয়, কান্নায় ভেঙে পড়া, “আপনি কেন আমার সাথে এরকম করছেন বলুন তো? নিশ্চয়ই কালকে আসবেন না। নয়ত কিছুক্ষণ পরে আবার কিছু না কিছু ছুতো দিয়ে কাটিয়ে দেবেন? বলুন তাই করবেন না?সেদিন অনেক কষ্টে নিজেকে চেক করে রেখেছিলাম শান্তনুকাকার ওখানে, মনে হচ্ছিল আপনাকে মেরেই দি, আঁচড়ে কামড়ে একসা করে দি, এতবার মেসেজ করেছি আপনাকে আপনি একবারও রিপ্লাই করলেন না। আজ বার বার ফোন করে যাচ্ছি ধরছেন না, আপনি এত নিষ্ঠুর কেন? বলুন বলুন, আবার চুপ হয়ে যাবেন একটু পরেই, ঠিক বলছি না আমি?”
বিশ্ব বলল “শোন শোন, আমাকে একটু বলতে দাও”।
বৈশালী বলল “বলুন, কী বলবেন?”
বিশ্ব বলল “আমি ইচ্ছা করে ফোন ধরি নি ব্যাপারটা এরকম নয় বৈশালী। আমি বেরিয়েছিলাম ফোন রেখে, আমায় বিশ্বাস কর। আর কালকে কেন তোমাকে ডাকছি সেটা কী শুনতে চাও?”
বৈশালী বলল “শোনান”।
বিশ্ব হেসে বলল “দাদা বলে ডাকা লোককে বিয়ের পরে বাবা বলে না ডেকে দাদা ডাকলে কি তোমার কোন সমস্যা হবে?”
বৈশালী কাঁদতে কাঁদতে হেসে দিল, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে হাসল, তারপর বলল “জানি না, আপনি জানেন”।
বিশ্ব বলল “আমার সমস্যা কী বলত?”
বৈশালী বলল “কী?”
বিশ্ব বলল “প্রেমের গল্প লিখব না ভেবেছিলাম, সেই প্রেমেই পরিণতি হল আমার। কী কপাল বল তো?”
বৈশালী হাসতে লাগল।
বিশ্ব চুপচাপ সে হাসি শুনতে লাগল।
৩।
“ভেবেছিলাম একটা জেনুইন রাইটার পাবে বাংলা সাহিত্য”।
শান্তনুদা তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিশ্ব বলল “পাবে না কেন বলছ?”
শান্তনুদা বলল “কী করে তোকে বোঝাব? তুই নিজেই বুঝে নে”।
বিশ্ব বলল “আমি কিছুই বুঝছি না”।
শান্তনুদা বলল “লেখক প্রেম পীরিত করবে, আর লিখবে কখন?”
বিশ্ব বলল “কেন লেখকরা কি ব্রহ্মচারী হয় নাকি? ল্যাঙট পরে লেখালেখি করে?”
শান্তনুদা বলল “বললাম তো তুই বুঝবি না। আমারই হয়! একটা সরেস প্লট মাথায় এসছে, ঠিক তখন ও ঘর থেকে তেনার গলা ভেসে এল, এই শুনছ পেঁয়াজ শেষ হয়ে গেছে। বিল্টুও নেই এখন। যাও না একটু। নয়ত একটা দুর্দান্ত প্লট সবে খাতায় নামাচ্ছি তখন ‘ওগো তিতলিকে নাচের ক্লাসে দিতে যেতে হবে তো’ বলে ডাক উঠবে। মনঃসংযোগ করবি কোত্থেকে? এই অবস্থায় সাহিত্য কি পেছন থেকে বেরোবে? মগজ থেকে তো বেরনো সম্ভব না।”
বিশ্ব বলল “আমি তো ঠিক করেছি আপাতত কিছুদিন লেখাই ছেড়ে দেব”।
শান্তনুদা সোফায় বডিটা ছেড়ে দিয়ে বলল “এটাই ভাল। প্রেমে প্রেমে তো সাগর বানিয়ে দিয়েছিস বাওয়া, এখন আরেকটা মহাসাগর তৈরী হয়ে গেছে বিশ্ব মিত্র প্রেম সাগর নামে। লেখা বন্ধ রাখ কিছুদিন। দুদিন পরে সংসার করে খিটখিটে সব লেখা বেরোবে, সেটাই ঠিক আছে”।
বিশ্ব হেসে ফেলল। শান্তনুদা সিরিয়াস হল “পার্সোনাল লাইফ নিয়ে যা ইচ্ছা কর, কেউ দেখতে যাবে না, যেগুলো বলেছি, সেগুলো ভুলিস না”।
বিশ্ব উঠল “জো হুকুম দাদা, এবার আমি বাড়ি যাই”।
শান্তনুদা বলল “সাবধানে যাস”।
তারপরেই বলল “যত্তসব”।
৪।
-আমি আজকাল একটা দুঃস্বপ্ন দেখি।
-কী?
-তুমি আবার আমাকে ইগনোর করা শুরু করেছ। আবার সব রিপ্লাই দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছ।
-আমি তো আরও ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
-কী?
-আদিত্যদা একটা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর আমাকে বলছেন ‘ওহে বিশ্ব, আমার পাঁচটা কবিতা আগে মুখস্ত বল নইলে নীল ডাউন হও’।
-আমার বাবা একদম ওরকম না।
-আমিও ওরকম না।
-আপনি ওরকমই।
-আবার আপনি?
-ওই হল। বাবাকে টানবে না কিন্তু বুঝেছ?
-বুঝেছি।
-ছাতা বুঝেছ। হুহ...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান