বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার স্যাপার

অভীক দত্ত

 

রাইয়ের সঙ্গে তুমুল হয়ে গেল পিকলুর। মাথা ফাথা গরম হয়ে গেছিল তার।
রাইয়ের বন্ধু রাহুলকে সে দু চোখে দেখতে পারে না। আর রাহুলের সঙ্গেই রাই সিনেমা দেখতে গেছিল জানার পর থেকে তার মাথা গরম ছিল।
রাই ফোন করতেই তুমুল ঝাড়ল।
প্রত্যুত্তরে রাইও ছেড়ে দিল না। ভালই ব্যাটিং করল। “তুই যখন তোর অফিস কলিগ ওই কী যেন, সঙ্গীতা জয়সওয়ালকে নিয়ে কাবাব খেতে যাস তখন আমি কিছু বলি?”
মোটামুটি পনেরো মিনিট তুলকালাম হবার পর ফোনটা কেটে দিয়েছে রাই।
পিকলু তিন চার বার ট্রাই নিয়েও পায় নি।
ভ্যাপসা গরম। এসি খারাপ হয়েছে আগের দিন।
পিকলু গজগজ করতে করতে ছাদে গেল। ছাদে খাটিয়া পাতা থাকে একটা।

খাটিয়ায় শুয়ে শুয়েই আবার চেষ্টা করল রাইকে। পেল না।
রাইয়ের মাথা ভীষণ গরম। রাগারাগি হলে হয় ফোন দেওয়ালে ছুঁড়ে মারবে নয়ত কাঁচের শো কেসে ঘুষি টুষি মেরে রক্তারক্তি কান্ড করবে।
একটু একটু চিন্তাও হচ্ছিল পিকলুর। প্রতিবার এটাই হয়। প্রথম প্রথম তুলকালামটা সেই করে। তারপরেই শুরু হয় রাইয়ের জন্য চিন্তা।
সপ্তমবার ফোন করার পরেও যখন রাইয়ের ফোন বিজি এল তখন পিকলু হতাশ হয়ে ফোন করা ছেড়ে দিল। রাইয়ের বাবাকে ভাবল একবার ফোন করে। তারপরেই মনে হল উনি জানলে দুজনকেই ঝাড়বেন। এর আগে যখন রাই শো কেসে হাত কেটেছিল তখন ঝাড় খেতে হয়েছিল। পিকলু ঠিক করল এক ঘন্টা দেখবে। তারপর আঙ্কেলকেই বাধ্য হয়ে ফোন করবে।
শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখছিল সে। ছোটবেলায় শেখা সপ্তর্ষিমণ্ডল মেলাবার চেষ্টা করছিল।
আর ঠিক এই সময়েই মাথায় অসহ্য ব্যথা হওয়া শুরু করল। প্রায় দশ সেকেন্ড ব্যথাটা হবার পর পিকলু শুনতে পেল মাথার মধ্যে ক্রমাগত কেউ বলে চলেছে “আরে ফিরে আয়, ভাই ওখানে তুই কী করছিস?”
পিকলু কিছুই বুঝল না। সে বলল “কে কে কথা বলছেন?”
মাথার মধ্যে ভেসে এল “খিস্তি খেয়েছ বাছাধন? খিস্তি?”
পিকলুর মাথা গরম ছিল, আরও গরম হল “কী শুরু করেছেন, কে বলছেন বলুন তো?”
“আরে ভাই সেই কবে থেকে তোকে পাচ্ছি না, শেষে তুই পৃথিবীতে গিয়ে লুকিয়ে আছিস, এতক্ষণে ট্রেস হল। এবার আয়, তোকে ছাড়া তো আমরা ফিরতেও পারব না”।
পিকলু বলল “পৃথিবীতে গিয়ে লুকিয়ে আছি মানে? আমি তো পৃথিবীরই লোক। কেন আপনি কোথাকার লোক?”
“আচ্ছা পাগল তো! মেমোরিটাও গেছে নাকি তোর? আরে আমরা লিপিক গ্রহের পাবলিক। তোর হলটা কী? এ তো চক্রান্ত মনে হচ্ছে!”
পিকলু রেগে গেল “দূর মশাই, তখন থেকে খালি মশকরা করে যাচ্ছেন, আমি ওই লিপিক, কিপিক কোন গ্রহের পাবলিক না, আমি শ্রী হরনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি”।
“বাঙালি? সেটা আবার কোন ধরণের প্রাণী?”
“ডেঞ্জার প্রাণী, একবার ধরলে না ছাড়বে না কোনভাবে। একটা জিনিসের তিনশো তেত্রিশ রকমের ব্যাখ্যা দেবার ক্ষমতা রাখে এরা”।
“ধুস, কী সব বলে যাচ্ছিস। তোর বোধ হয় কেউ মগজ ধোলাই করেছে। শোন ভাই, তুই মানুষই না”।
“সেটা জানি, ওই যে গান আছে তো রেখেছ বাঙালি করে মানুষ তো করনি”।
“আরে ভাই, কী সব রেফারেন্স দিচ্ছিস আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। শোন তোকে অনেকে অনেক রকম বুঝিয়েছে সেটা বুঝতে পারছি। দেখ আমরা হুকুকরা এমনিতে মানুষের মতই দেখতে। শুধু আমাদের মাথার পেছনে একটা হাড় সামান্য একটু উঁচু থাকে। খালি চোখে সেটা বোঝা সম্ভব না। হাত দিয়ে দেখলে বুঝতে পারবি।”
পিকলু মাথায় হাত দিয়ে বলল “দূর মশাই, আমি মানুষই, আমার কোন হাড় উঁচু নেই”।
“শিওর চক্রান্ত। কোন মানুষ তোর ওই হাড়টা কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে। মানুষ আর কিছু পারুক না পারুক, এটা ভালই পারে”।
পিকলু বলল “দেখুন, অনেকক্ষণ ধরে আমার মাথার মধ্যে বকবক করে চলেছেন, আপনি এবার ফুটুন তো, কোথায় কী কেলো করে বসে আছেন আর আমায় যা পারছেন বুঝিয়ে যাচ্ছেন”।
ফোনটা বেজে উঠল। পিকলু ফোনটা ধরল, রাই “হ্যালো”।
পিকলু বলল “কী রে, রাগ কমল?”
মাথার মধ্যে আবার ভনভন করা শুরু হল “এ ভাই রাগটা কী রে?”
পিকলু কান দিল না। রাই বলল “রাগের তো কিছু নেই। তুই যদি এরকম সন্দেহবাতিক হয়ে থাকিস তাহলে এই রিলেশনটা তো টেনে নিয়ে যাবার মত কিছু দেখছি না। তাছাড়া তুই তো ঠিক মানুষ না। মানুষের যে সব ইমোশন থাকে সেসব তোর মধ্যে নেই”।
পিকলুর মাথার মধ্যে উল্লাসধ্বনি শুরু হয়ে গেল “দেখ দেখ, সবাই জানে তুই মানুষ না। ওরে চল ভাই, দেরী করিস না, তোর জন্য আমরা ঝাড় খাব গ্রহে ফিরে”।
পিকলু চেঁচিয়ে উঠল “দূর বাল। তখন থেকে খালি মানুষ না মানুষ না করে যাচ্ছে”।
রাই বলল “কী? এত সাহস? তুই আমাকে খিস্তি মারছিস?”
পিকলু বলল “আরে না তোকে না”।
রাই বলল “তাহলে কাকে? তুই জাস্ট গো টু হেল। ইমম্যাচিওর ইনসেন একটা”!!!
রাই আবার ফোন কেটে দিল।
পিকলু চেঁচিয়ে উঠল, “এই আপনারা জাস্ট আমার মাথা থেকে বেরোন তো। আমি এমনিতেই পাগল হয়ে আছি। আর পাগল করবেন না। আপনারা যে চুলোয় যাবেন যান”।
“আরে ভাই, যার সাথে কথা বললি সে কে?”
“আমার গার্লফ্রেন্ড, আপনাদের জ্বালায় মনে হয় সে এতক্ষণে এক্স হয়ে গেছে”।
“গার্লফ্রেন্ড কী?”
“কয়েকদিন পৃথিবীতে থাকুন, বুঝে যাবেন কী!”
“ভাই তুই ক’দিনে কেমন পাল্টে গেলি”!
“আবার সেন্টু খাওয়াচ্ছেন কেন!”
“সেন্টু কী?”
“আরে আপনি বেরোবেন আমার মাথা থেকে? পাগল করে দেবেন তো দেখছি”।
“পাগল মানে কী?”
“এই যে কী সব হুপ হুপ গ্রহ বলছেন তাদের পাগল বলে”।
“হুপ হুপ না লিপিক, আর আমরা মানে তুই আমি সব হুকুক”।
“আরে মশাই, আমি মানুষ। কী করে বোঝাই বলুন তো?”
“বোঝাতে হবে না তুই বোঝ। এখন আমাদের তিনশো লাইট ইয়ার দূরে একটা গ্রহে যেতে হবে। ওখানে নাকি কীসব মিউজিক শোনা গেছে। নতুন কিছু ট্রেস পাওয়া যেতে পারে। তোকে ছাড়া আমরা কীভাবে যাব বল? তুই এত ভাল স্পেসশিপ চালাতে পারিস”।
“স্পেসশিপ? আরে আমি সাইকেলও চালাতে পারি না”।
“সাইকেল কী? ওটাও কি স্পেসশিপ?”
“উফ। আমি কী করি বলুন তো”।
“দাঁড়া তুই আসবি না তো? তোকেই নিয়ে আসছি। ওয়েট”।
পিকলু মাথার মধ্যে ব্যথা অনুভব করল আবার। কয়েক সেকেন্ড পর ব্যথাটা আবার এল।
“ওহ। ভাই”।
“বলুন”।
“সরি ভাই”।
“মানে?”
“রং নাম্বার হয়ে গেছে। আপনি না, আমাদের হুকুকটাকে খুঁজে পেয়ে গেছি আমরা। আপনি আনন্দে থাকুন”।
“ধন্যবাদ? আপনাদের জ্বালায় আমার জি এফ রেগে গিয়ে এখন কী করছে আমি জানি না, আর আপনি বলছেন আনন্দে থাকুন”।
“আন ডু করে দিন”।
“মানে?”
“আমরা হুকুকরা কোন ঝামেলা আন ডু করতে পারি। আপনারা পারেন না?”
“না”।
“তাহলে কী করেন?”
“আমাদের ম্যানুয়াল প্রসেস”।
“সেটা কী রকম?”
“জি এফের পায়ে ডাইভ”।
“আচ্ছা। আপনি তাই করুন। ভাল থাকুন”।
ফোনটা বেজে উঠল। রাই। “তুই আমায় গালাগাল দিলি কেন”?
“আবে তোকে না। কী একটা লিকপিক গ্রহের লোক এসে জ্বালাচ্ছিল”।
“গল্প বানানো হচ্ছে? উজবুক কোথাকার!!!”
“আরে না মাইরি না, বিশ্বাস কর... এই শোন শোন শোন...”


অভীক দত্ত

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান