স্বপ্ন

অভীক দত্ত

 

“কোন কোন মানুষ আসলে গভীর ঘুমের সময় মরে যায় জানেন?”
লোকটা অদ্ভুত চোখ করে আমাকে কথাগুলো বলল।
সন্ধ্যে হয়েছে। বৃষ্টি পড়ছে। স্টেশনে বসে আছি। ট্রেন আসতে দেড়ঘন্টা দেরী।
একটা ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে ডাক্তার ভিজিটে পাঠিয়েছিল শান্তনুদা। শান্তনুদা আমাদের ম্যানেজার। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ যেদিন থেকে করা শুরু করেছি কেন জানি না শুরু থেকেই দেখেছি শান্তনুদার আমাকে ঠিক পছন্দ নয়। নইলে মহাদেবপুরের মত জায়গায় কেউ পাঠায়?
সকাল সকাল বেরিয়েও দুপুরের আগে পৌঁছতে পারি নি। ডাক্তার খাস্তগীরকে মিট করে ফিরছি। ফাঁকা স্টেশন। টিকেট কেটে ট্রেনের জন্য বসে আছি এই সময় এই ভদ্রলোকের আগমন। কোন ভূমিকা ছাড়াই অদ্ভুত প্রশ্নটা করে বসলেন।
আমি বললাম “এরকম তো কিছু হয় বলে জানা নেই”।
লোকটা বলল “এই মানুষেরা যে স্বপ্ন দেখেন, তা কিন্তু স্বপ্ন না, তাদের আত্মা টাইম ট্রাভেল করে। সব দেখেশুনে আবার দেহে প্রাণ ফিরে এলে তাদের ঘুম ভাঙে। যেটুকু স্বপ্ন মনে থাকে তা আসলে স্মৃতি”।
আমি লোকটার চোখ দেখে ঠাহর করার চেষ্টা করলাম গাঁজা টাজা খেয়ে আছে নাকি। দেখলাম সেরকম কিছু না। বললাম “দেখুন স্বপ্নে টাইম ট্রাভেল যদি করেও, কত লোকই তো কত কিছু নিয়ে উল্টো পালটা স্বপ্ন দেখে। সেটা তাহলে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন”।
লোকটা আমার প্রশ্ন শুনে উৎসাহিত হল, বলল “গুড কোয়েশ্চেন। আত্মা ট্রাভেল করছে তো ওই সময়টা। আত্মার অসাধ্য কিছুই নেই”।
আমি বললাম “আপনি কি ইন্সেপশন দেখেছেন?”
লোকটা বলল “দেখেছি। স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন। খারাপ না সিনেমাটা”।
লোকটা উদাস মুখে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল।
আমি অবাক হলাম। শহর থেকে এত দূরে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় পাগলু বাদ দিয়ে যে কেউ ইন্সেপশন দেখতে পারে সেটা তো কম কথা না।
মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার ট্রেনগুলো প্রবল গতিতে স্টেশনটাকে অবজ্ঞা করতে করতে চলে যাচ্ছিল।
লোকটা বলল “আপনি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ”।
আমি বুঝলাম আমার ব্যাগটা দেখে ধরেছে। বললাম “হ্যাঁ, আপনি?”
লোকটা বলল “আমি স্বপ্ন দেখি। ওটাই আমার কাজ”।
বললাম “স্বপ্ন দেখে পেট ভরে?”
লোকটা বলল “তাছাড়াও প্রাইমারি স্কুলে পড়াই। কিন্তু কেন ভরবে না? ঠিক ঠাক স্বপ্ন দেখতে পারলে সব কিছু করা সম্ভব। কন্সেন্ট্রেশনটাই তো আসল”।
আমি বললাম “স্বপ্ন দেখে লোকে পেট ভরতে পারে?”
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল “স্বপ্ন দেখে যেখানে খুশি যেতেও পারেন। ভূতের রাজার বর লাগবে না”।
আমি বুঝলাম লোকটা আমার জানার বাইরেও খুব ভাল কোয়ালিটির কোন নেশা করেছে। উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা বের করলাম। আড়চোখে দেখলাম লোকটা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। ঈশানীর সঙ্গে আমার তিনমাস পরে বিয়ে। মেসেঞ্জারে ওর সঙ্গে বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে কথা বলছিলাম একসময় লোকটা বলে বসল “আপনি এই বিয়েটা ক্যান্সেল করে দিন। করবেন না”।
আমি লোকটার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। লোকটা বলল “এই স্বপ্নের মধ্যে আপনাকে একটু স্টাডি করে নিলাম। যা বুঝলাম আপনি সম্পর্কের ব্যাপারে খুব পরনির্ভরশীল। এই বিয়েটা আপনার কোন বন্ধু ঠিক করে দিয়েছে। বন্ধুটির নাম শাশ্বত। আপনাকে কোনদিন সে বলেছে ঈশানীর সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক ছিল?”
নিজের অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল “না। কিন্তু আপনি এত সব কী করে জানলেন?”
লোকটা সহজ গলায় বলল “আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন নি শুরুতে, ভেবেছেন আমি নেশা করে আছি”।
আমি বললাম “আপনি আমাকে ফলো করছেন নিশ্চয়ই কদিন ধরে। তাই জানতে পেরেছেন”।
লোকটা একটা হাই তুলতে তুলতে বলল “সাকুল্যে মাইনে পান বাইশ হাজার টাকা। ইন্সেন্টিভ ধরে তিরিশ। বাড়ি বলতে একটা দু কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন মার সাথে। তাতে আবার স্নান করতে করতে মাঝে মাঝে জল চলে যায়। আপনার পিছন পিছন ঘুরে আমার সময় নষ্ট করার মানেটা কী বলতে পারেন?”
আমার মুখের হাঁ টা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। আমি লোকটার দিকে এবার ভাল করে দেখলাম। পরিষ্কার করে দাড়ি কাটা। জামা কাপড় ধোপদুরস্ত। তবে গায়ে গ্রামের গন্ধ লেগে রয়েছে। শহরের লোক না তা বোঝা যাচ্ছে।
আমি বললাম “আমি যা বুঝতে পারছি আপনি স্বপ্নে থট রিডিং করছেন। এ তো অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। আপনি এই গ্রামে কী করেন?”
লোকটা বলল “ বললাম তো প্রাইমারি স্কুলে পড়াই। মিড ডে মিল দেখা শোনা করি”।
আমি বললাম “আপনার বাড়ি কোথায়?”
লোকটা বলল “এককালে কলকাতায় থাকতাম। এখানে চাকরি করছি প্রায় বছর দশেক। এখানেই থেকে গেলাম। তারপর শহরে ফিরে যাই নি আর”।
আমি বললাম “আপনার এই সুপার ন্যাচারাল ক্ষমতার কথা কে কে জানে?”
লোকটা বলল “কেউ না। আমি কাউকে বলি না। এ জায়গার মানুষ ভাল। তাদের মুখ আর মনে কোন পার্থক্য নেই। তাই আমার সুপার ন্যাচারাল ক্ষমতা এখানে প্রয়োগ করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। প্রতি বিকেলেই আমি স্টেশনে আসি ট্রেন দেখতে। চলন্ত ট্রেনের কোন মানুষের গল্প জানা আমার একটা হবি হয়ে গেছে। আমি সবই জানতে পারি। কিন্তু নিজের ভিতরেই রাখি”।
আমি বললাম “তাহলে আমাকে কেন দেখাতে গেলেন?”
লোকটা বলল “আপনার মধ্যে আমি নিজেকে দেখতে পাই বলে”।
আমি বললাম “মানে?”
লোকটা একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বলল “আপনিও ঘুমের মধ্য মারা যান প্রতিদিন”।
আমি হাসলাম “ধুস, কী যে বলেন”।
লোকটা বলল “আপনি ঘুমোতে যাবার আগে কোন মানুষের সম্পর্কে একটু বেশি ভাবলে তাকে স্বপ্নে দেখতে পান না?”
আমি বললাম “সে তো স্বাভাবিক। এটা অবচেতন মনের প্রক্রিয়া”।
লোকটা মাথা নাড়ল “সবার ক্ষেত্রে সেটা হয় না। যাকে স্বপ্নে দেখতে চাইবে তাকে নাও দেখতে পারে সবাই। আপনি স্পেশাল। আমার মত। পৃথিবীতে আমাদের মত অনেকেই আছেন। তারা জানেন না। আমি জানি। আপনাকে জানালাম। আপনিও জানবেন। আপনি এক কাজ করুন। চোখ বন্ধ করে কোন কিছু নিয়ে তীব্রভাবে ভাবুন তো”।
আমি চোখ বন্ধ করে ঈশানীর কথা ভাবতে লাগলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল ঈশানী শাশ্বতকে টেক্সট করছে। চোখ খুলে বললাম “আমি যেটা দেখলাম সেটা তো আপনি বললেন। এটা তো আপনার কথার এফেক্ট হতে পারে”।
লোকটা হাসিমুখে বলল “একদম। হতেই পারে। অন্যকিছু ভাবুন। আপনি এই স্টেশন নিয়ে ভাবুন। চোখ বন্ধ করুন। ঘুমনোর চেষ্টা করুন”।
আমি চোখ বন্ধ করে মহাদেবপুর স্টেশন নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। দেখলাম একটা এক্সপ্রেস ট্রেন সিগন্যাল না পেয়ে মহাদেবপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ খুললাম। বললাম লোকটাকে এই স্বপ্নের কথা। লোকটা বলল “ভাল হল তো। ফালতু লোকাল ট্রেনে আর ফিরতে হবে না। এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে পড়বেন”।
আমি বললাম “ধুস। এটাও মনের আশা থেকেই দেখলাম”।
লোকটা হাসল “বেশ তো। দেখে নেবেন। স্বপ্ন দেখাটাও অনেক অনুশীলনের ব্যাপার। আমি অনেক কষ্টে এখন টাইম ট্রাভেলটা শিখছি। ভবিষ্যতে কিংবা অতীত দেখার চেষ্টা করছি। এখনও পারি নি। অদূর ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই পারব। যা বুঝলাম আপনি স্বপ্ন দেখার দিক থেকে আমার থেকেও অ্যাডভান্স। কম সময়ের জন্য হলেও টাইম ট্রাভেল করে ফিউচার দেখেছেন। রোজ একটু সময় হলেও চেষ্টা করুন। আর শুনুন, দশটা লোককে বলে বেড়াবেন না যে আপনি এটা পারেন। ইন ফ্যাক্ট কাউকেই বলবেন না। ক্ষমতাটা নষ্ট হয়ে যাবে ”।
আমার সব কিছুই অবিশ্বাস্য লাগছিল। আমি বললাম “আপনার নাম কী?”
লোকটা বলল “অর্ঘ্য দাশগুপ্ত। নিন আপনার ট্রেন এসে গেছে। অন্তত দু ঘন্টা আগে আপনি বাড়ি পৌছবেন আজ”।
আমি অবাক চোখে দেখলাম একটা এক্সপ্রেস ট্রেন আমার এই অকিঞ্চিৎকর ছোট স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। আমি বললাম “আপনার ফোন নাম্বার আছে?”
লোকটা মাথা নাড়ল “ওসব ইউজ করি না। আপনি আসুন। সিগন্যাল কিন্তু বেশিক্ষণ থাকবে না”।
আমি অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকাতে তাকাতে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনটা সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিল।
লোকটা হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছিল।
আমি একটা বসার সিট পেলাম কপালজোরে। টিটিকে বলে টিকেটটা আপগ্রেড করানো গেল। সারাটা রাস্তা ঘুমাতে পারলাম না। প্রতিবারই মনে হতে লাগল কী দেখতে কী দেখব, তার চেয়ে চোখ খুলে থাকাই ভাল।
বাড়ি পৌঁছলাম যখন তখন রাত ন’টা বাজে। মা উদগ্রীব মুখে অপেক্ষা করছিল। আমি পৌঁছতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল “কী যে একটা চাকরি করলি। কোথায় কোথায় যেতে হয়। ঈশানীকে একটা ফোন করিস তো। কাল দুজনে গিয়ে আংটিটা দেখে আয়”।
আমি এড়িয়ে যেতে চাইলাম “কাল কাজ আছে মা। পরশু কর”।
মা বিরক্ত মুখে বলল “তুই এই করে যা”।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে ব্যাগটা রেখে মুখ হাত ধুয়ে ঈশানীকে ফোন করলাম, একটা রিং হতেই ঈশানী ধরল “হ্যাঁ, ফিরেছ?”
আমি একটু থেমে বললাম “আচ্ছা একটা কথা বলবে আমায়?”
“বল”।
“তোমার সঙ্গে কি শাশ্বতর কোন সম্পর্ক ছিল কোন কালে?”
ওপাশে বেশ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ফোনটা কেটে গেল।
আমি ফোনটা রেখে চুপ করে বসে থাকলাম।
ফোনটা বেজে উঠল মিনিট দশেক বাদে, দেখলাম শাশ্বত। ধরলাম “বল”।
“তুই ঈশানীকে কী বলেছিস?”
আমি বললাম “সিম্পল একটা জিনিস জানতে চেয়েছি। আচ্ছা তুই না হয় উত্তরটা দে”।
শাশ্বত বলল “কোন শুয়োরের বাচ্চা তোর কান ভাঙিয়েছে?”
নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “বিকেল ছ’টা নাগাদ ঈশানী তোকে মেসেজ করেছিল ‘তোমার বউকে একটু বাপের বাড়ি পাঠাও না বাপু, কতদিন তোমায় আদর করি না?’”
শাশ্বত ওপাশ থেকে তোতলাতে লাগল “মি... মিথ্যা কথা, এ এক্কেবারে জঘন্য মিথ্যে কথা, ছি ছি ছি, কোন শালা আমার ফোন হ্যাক করছে?”
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম “আগে ঠিক করে নে মিথ্যা কথাটা হিসেবে ধরব না হ্যাক করার কথাটা?”
শাশ্বত অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল আমাকে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কেটে দিলাম।
মা খাবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। আমি উঠে খাবার টেবিলে বসে মাকে বললাম “ঈশানীর সঙ্গে আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে মা। অন্য কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করতে হবে”।
মা কোন কথা না বলে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
ভাত বেড়ে দিল আপনমনে গজগজ করতে করতে। আমি খেয়ে ঘরে গিয়ে ল্যাপটপটা বের করে ডক্টর ভিজিটের রিপোর্টটা কোম্পানির ওয়েবসাইটে আপলোড করে চুপচাপ বসে থাকলাম।
কয়েক সেকেন্ড বাদে চোখ বন্ধ করলাম।
মিনিট পাঁচেক বাদে ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
সে রাতে আমার আর ঘুম এল না।
পরের দিন ভোর হতেই ট্রেন ধরে মহাদেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
দশটা নাগাদ স্টেশন পৌঁছে দেখলাম স্টেশনের বাইরে জনা পঞ্চাশেক লোকের ভিড়।
এলাকার এক প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার আজ সকালবেলা ট্রেনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান