ছেড়ে যাওয়া...

অভীক দত্ত

 

যারা চলে যায়, তারা বলে যায় না,
যারা বলে যায়, তারা যেতে চায় নি কোনদিন...

বৃষ্টি হচ্ছে। একটা ঘর। চারদিকে জিনিসপত্র সব এলোমেলো অগোছালো হয়ে আছে। ঘরের মাঝবরাবর দুটো ট্রলি রাখা। বোঝা যাচ্ছে প্যাকিং করে রাখা।
একটা মেয়ে ঘরের এক কোণে বসে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছে। তার মন খারাপ। কিছুক্ষণ পরে গাড়ি আসবে। তাকে ব্যাঙ্গালোর চলে যেতে হবে। মেয়েটার নাম অন্তরা।
অন্তরার মন খারাপ। এই চাকরিটা পাবার জন্য সে কত কষ্ট করেছে অথচ যাবার সময়ে এরকম হচ্ছে কেন?
অরিত্রর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ব্রেক আপও তো হয়ে গেছে। তবে?
মা এলেন, চোখে মুখে উদ্বেগ “কী রে, সব ঠিক করে নিয়েছিস তো?”
অন্তরা বলল “হ্যাঁ মা নিয়েছি, কেন চিন্তা করছ বলত?”
অন্তরার মা বললেন “চিন্তার কি কোন কারণ থাকে রে! কী খাবি, কী করবি তুই জানিস”।
অন্তরা বলল “ঠিক খেয়ে পরে বেঁচে থাকব। কেন চিন্তা করছ? আর অত চিন্তা করলে তুমিও চল”।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “উপায় থাকলে তাই করতাম”।
অন্তরা কিছু বলল না।
কলিং বেল বাজছে। অন্তরা বলল “দেখো, গাড়ি এল নাকি”!
অন্তরার মা দরজা খুলতে গেলেন। কয়েক মিনিট পর বললেন “অরিত্র এসছে। ভিতরে আসতে বলব?”
অন্তরা কয়েক সেকেন্ড মার দিকে তাকিয়ে বলল “বল”।
মা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন অন্তরা বলল “প্লিজ। আমি জানি আমাকে কী বলতে হবে। তুমি এ ঘরে এসো না এখন”।
মা বেরিয়ে গেলেন। অরিত্র এসে ঢুকল।
অন্তরা বলল “কী হল? হঠাৎ?”
অরিত্র বলল “ইচ্ছা হল। চলে যাবি, বাই বাই করতে চলে এলাম দাঁত কেলিয়ে”।
অন্তরা বলল “অফিস যাস নি?”
অরিত্র বলল “নাহ। ব্রেক আপ সেলিব্রেট করছি”।
অন্তরা বলল “মদ খেয়েছিস নিশ্চয়ই”!
অরিত্র বলল “হু”।
অন্তরা বলল “ভাল। এখন তো তোরই সময়। মদই তো খাবি”।
অরিত্র বলল “হু”।
অন্তরা বলল “কী তখন থেকে হু হু শুরু করেছিস!”
অরিত্র বলল “কী বলব বুঝতে পারছি না আসলে। জীবনের প্রথম ব্রেক আপ তো!”
অন্তরা বলল “উই বোথ ডিসাইডেড। এখন আবার এত কথা কিসের?”
অরিত্র বলল “একটা মিউজিক ভিডিও দেখলাম। হুমা কুরেশি আছে”।
অন্তরা বলল “আমিও দেখেছি। মোস্ট প্রোবাবলি ছেলেটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে দিয়েছিল। তুই কি সেরকম কিছু করেছিস নাকি?”
অরিত্র হাসল “ক্ষেপেছিস? মদের টাকা কি আমার বাপ দেবে?”
অন্তরাও হেসে ফেলল “তা ঠিক। এই বাজারে কলকাতায় চাকরি আর সোনার পাথরবাটি এক জিনিস”।
অরিত্র বলল “অ্যাকচুয়ালি আই ওয়ান্টেড টু স্পেন্ট সাম টাইম... মানে বুঝতে পারছিস? গাড়ি এসে গেছে?”
অন্তরা বলল “আমি রেডি যখন তখন বুঝতেই পারছিস যে কোন সময় এসে যাবে”।
অরিত্র বলল “প্রথমে ভাবলাম সিনেমার মত এয়ারপোর্টে চলে যাই। তারপর মনে হল তাতে চাপ আছে। কোন ভাবে সেন্টু ফেন্টু খেয়ে তুই যদি যাওয়া ক্যান্সেল করে দিস তখন কী হবে! এই মুহূর্তে তো একটা ফ্ল্যাট কেনারও টাকা নেই আমার। ওই বারোয়ারি বাড়িতে রাখব কী করে তোকে?”
অন্তরা বলল “এই কথাগুলো তুই আমাকে কতবার বলবি বলত?”
অরিত্র বলল “নিজেকে বলছি। তোকে না ঠিক”।
অন্তরা বলল “হু। আই নো। আমাদের ব্রেকআপটা খুব হিসেবি আর স্মুদ ব্রেক আপ বল?”
অরিত্র বলল “ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে নতুন মামণ জুটাবি নিশ্চয়ই”?
অন্তরা বলল “অ্যাস ইফ ওটাই আমার কাজ!”
অরিত্র হাসল।
অন্তরা বলল “আমি তো আর কোন কাজে যাচ্ছি না বল? শুধু ঝাড়ি মারব আর প্রেম করব?”
অরিত্র বলল “আমি কিন্তু ঝাড়ি মারব। ইন ফ্যাক্ট আই অলরেডি স্টারটেড। পাড়ার ওই ঝিঙ্কুটার কথা বলছিলাম না ইদানীং খুব পাত্তা দিছে বুঝলি?”
অন্তরা বলল “বেস্ট অফ লাক। দেখ, ঘরজামাই রাখে নাকি”।
অরিত্র বলল “রাখতেও পারে। ক্যা পাতা। কাল ক্যা হো?”
অন্তরা বলল “সেই। তোর মত সুপাত্র তো আজকাল পাওয়া যায় না। মদ খাবার খালি অজুহাত চাই। ব্রেক আপ সেলিব্রেট করছে নাকি! ঢপ মারার আর জায়গা পাস না বল?”
অরিত্র বলল “বিপি। ভাল ব্র্যান্ড। ব্রেক আপ সেলিব্রেট করার জন্য পারফেক্ট ব্র্যান্ড। ইউ নো বিপির ফুল ফর্ম? ব্যর্থ প্রেম। যেমন তুই। আমার ব্যর্থ প্রেম”।
অন্তরা বলল “অনেক সফল প্রেম হবে। কত আর বয়স তোর? আমার থেকে মাত্র দু বছরের বড়। ঠিক জুটিয়ে নিবি কিছু একটা”।
অরিত্র বলল “হোপ সো। তোর পিছনে তো লাইন পড়ে যাবে”।
অন্তরা বলল “পড়তেই পারে। আমি খুশিই হব”।
অরিত্র বলল “আমিও। আই উইল প্রে ফর ইউ বেবি”।
অন্তরা বলল “কেন তুই পাদ্রী?”
অরিত্র বলল “ওয়েল উইশার তো বটেই”।
অন্তরা মুখ বিকৃত করল “প্লিজ অরিত্র, তোর মনে হয় না ব্যাপারটা খুব একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে?”
বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।
অরিত্র বলল “এই তো। বেঁচে গেলি একঘেয়ে হবার থেকে”।
অন্তরা বলল “আমাকে যেতে হবে”।
অরিত্র উঠল, “রাইট রাইট। ইউ হ্যাভ টু গো, ওকে, আচ্ছা, ক’টা ব্যাগ? গাড়িতে তুলে দি”।
অন্তরা বলল “তোকে এসব কিছু করতে হবে না। দয়া করে মার সামনে এই সময় কোন সিন ক্রিয়েট করিস না”।
অরিত্র বলল “ইয়েস ইয়েস, আই নো, ওকে। আচ্ছা, এয়ারপোর্ট অবধি যাব তোর সঙ্গে?”
অন্তরা বলল “না। জাস্ট লিভ। প্লিজ”।
অরিত্র উঠল। প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। বলল “অন গড বলছি বিলিভ মি, যদি মদ খেয়ে থাকতাম তাহলে ব্রেক আপ করতাম না”।
অন্তরা বলল “সিগারেটটা ফেল। মা আসবে এখনই”।
অরিত্র “সরি সরি” বলে উঠে সিগারেটটা জানলা থেকে ফেলে দিল।
অন্তরা বলল “ওকে, টাইম হয়ে গেছে। এলাম। ভাল থাকিস”।
অরিত্র বলল “ওহ, চলে যেতে বলছিস না? ওকে”।
অন্তরা বলল “হ্যাঁ। বলছি”।
অরিত্র কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল।
অরিত্র বেরোতেই অন্তরার মা এসে ঢুকলেন “কীরে, এখন আবার কী শুরু করলি?”
অন্তরা বলল “কিছু না মা, এটা কি খুব অস্বাভাবিক যে কারও কোন ফিল হবে না?”
অন্তরার মা বললেন “গাড়ি এসছে”।
অন্তরা বলল “গাড়ি চলে যেতে বল মা। আমি যাব না”।
মা অবাক হয়ে বললেন “যাবি না মানে?”
অন্তরা বলল “যাব না মানে যাব না?”
মা বললেন “ছেলেটার সঙ্গে যাবি?”
অন্তরা বলল “নাহ, ছেলেটার সঙ্গেও যাব না”।
মা বললেন “তবে?”
অন্তরা বলল “কলকাতাতেই কিছু খুঁজে নেব”।
মা বললেন “ছেলেটার সঙ্গে থাকবি বলে?”
অন্তরা বলল “থাকব না। ব্রেক আপ করে ফেলেছি তো”।
মা বললেন “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না”।
অন্তরা বলল “তোমাকে একটু খ্যাপালাম। চল বেরই এবার”।
মা রেগে বললেন “উফ, সবসময় তোর এই হেয়ালি করা কথা না আমার অসহ্য লাগে!”
অন্তরা হাসতে শুরু করল। অপ্রকৃতিস্থর মত হাসি।
মা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন “ছেলেটাকে খুব ভালবাসিস?”
অন্তরা বলল “নাহ। হি ইজ পাস্ট নাও। পাস্ট ইজ ডাস্ট। আচ্ছা মা বৃষ্টিতে প্লেন চলে? প্লেনেদের রেইনি ডে হয় না?”
মা বললেন “জানি না। বাবার সঙ্গে দেখা করে যাস”।
অন্তরা বলল “বাবা মরে গেছে মা। সব সময় একটা ফটোকে বাবা বলতে যাব কেন বলত?”
মা বললেন “থাক। দেখা করতে হবে না। চ”।
অন্তরা বলল “যে মেয়েরা কাদে না তারা কেমন মেয়ে মা? খুব খারাপ বল?”
মা বললেন “কেন খারাপ হবে? তুই কি আমার খারাপ মেয়ে? তুই আমার সব থেকে ভালো মেয়ে”।
অন্তরা বলল “এমন ভাবে বললে তোমার এক গাদা মেয়ে”।
মা বললেন “হয়েছে। তুই কি শেষ মেষ ফ্লাইটটা মিস করবি ঠিক করেছিস?”
অন্তরা বলল “নাহ। চল। বেরোই”।
ট্রলি দুটো অন্তরা নিজেই টেনে নিয়ে গেল বাইরে। ড্রাইভার ডিকিতে তুলে দিল।
মা বললেন “পৌঁছে ফোন করিস”।
অন্তরা গাড়িতে গিয়ে বসল।
আর চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিতান্ত নির্বিকারভাবে গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
যেভাবে আর পাঁচটা গাড়ি বেরোয়।
কয়েকঘন্টা বাদে অন্তরাও কলকাতা ছাড়ল।
যেভাবে আর পাঁচজন কলকাতা ছেড়ে চলে যায়...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান