একা

অভীক দত্ত

 

"তুমি একা একা ক্যাফেইনে বসে কী কর শুভম?"
অর্পিতা কখন এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারি নি। মন দিয়ে মোবাইল ঘাটছিলাম।
অর্পিতার গলা শুনে মুখ তুলে ওর দিকে তাকালাম।
সাদা সালোয়ার। লাল ওড়না।
সবাইকে সাদায় মানায় না।
অর্পিতাকে মানায়। ক্যাফেইনের মায়াবী আলোয় অর্পিতাকে বেশ ভাল লাগছে। নাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অর্পিতা আমার ওপর রেগে আছে।
আমাদের প্রিয়াতে সিনেমা দেখতে যাবার কথা ছিল।
আমি অফিস আছে বলেছিলাম শেষ মুহূর্তে । ফোন করে। অর্পিতা যে আমাকে বিশ্বাস করবে না এটা বুঝিনি।
ও ঠিকই জানত আমি ক্যাফেইনে চলে আসব।
বললাম “বস”।
অর্পিতা বলল “বসব না”।
আমি বললাম “আরে বস। রেগে আছ। রাগটা কমাও”।
অর্পিতা বসল। বললাম “কী খাবে? কোল্ড কফি উইথ আইসক্রিম?”
অর্পিতা বলল “আমি কিছু খাব না। তুমি খাও”।
আমি বললাম “আমি তো অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। তুমি খাবে না?”
অর্পিতা বলল “না। তুমি আমাকে মিথ্যা বললে কেন?”
আমি বললাম “মিথ্যা না, ঠিক ছিল না আসলে। মিটিংটা হল না”।
অর্পিতা বলল “তুমি খুব ভাল মিথ্যা বলতে পারো। আর আমি খুব ভাল মিথ্যা ধরতে পারি। এখানে কার জন্য ওয়েট করছিলে?”
আমি বললাম “বস। যদি সে আসে তবে দেখতে পাবে”।
অর্পিতা বলল “আমি জানি কেউ আসবে না। একা একা বসে থাক কী করে তুমি? আমি তো বুঝতে পারি না কিছুই”।
আমি বললাম “ভাল লাগে বলে”।
অর্পিতা বলল “বস তুমি। আমি যাই”।
আমি বাধা দিলাম না। অর্পিতা হয়ত ভেবেছিল আমি ওকে বাধা দেব।
ও বেরিয়ে গেল।
আমি চুপচাপ বসে আমার খাবারের জন্য ওয়েট করলাম। সব খেয়ে বিল মিটিয়ে রাস্তায় নামলাম। গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন গল্প করছে।
আমি একজনকে চিনতে পারলাম। পিয়াল। দেখলেই দু ঘন্টা বরবাদ করে দেবে ভাট বকে।
আমি উল্টো দিকে হাঁটা লাগালাম।
বাজার বসেছে। একগাদা লোক ভিড় করে আসছে। পুজোর বাজার। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাবা খেলা দেখলাম। আরেকটু হেঁটে আনন্দমেলার সামনে গিয়ে দেখি অর্পিতা দাঁড়িয়ে কোন এক ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
আমি ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অর্পিতা আমাকে দেখল কিন্তু পাত্তা দিল না।
বুঝলাম আমাকে জ্বালাতে চাইছে। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে দেখলাম কালীঘাটের দিকে একটা বাস দাঁড়িয়েছে। দৌড়ে বাসটায় গিয়ে উঠলাম।
বাসে উঠে অর্পিতার দিকে তাকালাম। অর্পিতা আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে।
বাসে বিচ্ছিরি ভিড় এবং গরম। প্রিয়া সিনেমা হলের কাছে নেমে গেলাম। মনে পড়ল অর্পিতা প্রিয়াতে আসার কথাই বলছিল।
টিকেট কেটে হলে ঢুকে পড়লাম।
ঝাড়পিটের সিনেমা হচ্ছে কিছু একটা। একা একা দেখলাম। ইন্টারভ্যালে বিরক্ত লাগছিল।
উঠে বেরিয়ে গেলাম। রাত হয়েছে।
পুজোর বাজার জমজমাট। লোক জন ভিড় করে আছে।
কী মনে হল ফোনটা বের করলাম। অর্পিতাকে ফোন করলাম।
বেশ কয়েকবার রিং হবার পর অর্পিতা ফোন ধরল “বল”।
বললাম “আমি তোমাকে ভালবাসি”।
অর্পিতা একটু থেমে বলল “এটা কি প্রপোজ করলে?”
আমি বললাম “হ্যাঁ”।
অর্পিতা বলল “হঠাৎ?”
আমি বললাম “মনে হল”।
অর্পিতা বলল “তোমার কখন যে কী মনে হয় তুমিই জানো। কাল আবার মনে হবে না তুমি আমাকে ভালোবাসো। তুমি কাল বোল আমাকে”।
আমি বললাম “আচ্ছা”।
ফোনটা রেখে দিলাম।
ওলা সার্চ করলাম। একটা ওলা দাঁড়িয়ে আছে।
বুক করলাম। ড্রাইভারকে ফোন করতে যাব এই সময় দেখলাম অর্পিতা ফোন করছে।
ফোন ধরলাম “হ্যালো”।
অর্পিতা বলল “আমি তোমার সঙ্গে এখন দেখা করতে চাই”।
বললাম “আমি তো প্রিয়ার বাইরে। সিনেমা দেখে বেরলাম”।
অর্পিতা অবাক গলায় বলল “একা?”
আমি বললাম “হ্যাঁ”।
ফোনটা কেটে গেল।
আমি ওলা ড্রাইভারকে ফোন করলাম। ড্রাইভার মিনিট তিনেকের মধ্যে চলে এল। আমি আমার মেসের ঠিকানা বললাম। অর্পিতা আবার ফোন করছে।
এবার আমি ফোন ধরলাম না।
অর্পিতা বার বার ফোন করে যেতে লাগল।
আমি ফোন ধরলাম না।
মেসে ফিরে মুখ ধুয়ে অর্পিতাকে ফোন করলাম। ফোন ধরতেই অর্পিতা বলল “ফোন ধরছিলে না কেন?”
আমি বললাম “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ওলাতে”।
অর্পিতা বলল “যা ইচ্ছা কর। তুমি আমাকে প্রপোজ করলে কেন? সিরিয়াসলি ভেবে করেছ?”
আমি বললাম “তখন ওই ছেলেটার সঙ্গে তুমি কথা বলছিলে। আমাকে দেখলে না। আমি ভাবলাম তোমাকে একটু ঝাঁট জ্বালাই। তাই প্রপোজ করলাম। নাথিং সিরিয়াস”।
অর্পিতা বলল “তুমি একজন সাইকো সেটা তুমি জানো?”
আমি বললাম “হ্যাঁ”।
অর্পিতা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে গালাগাল দিয়ে গেল। শেষটা দেখলাম তুইতে নেমে এসছে। আমি সবটাই মন দিয়ে শুনলাম। মাঝে মাঝে গ্রামাটিক্যাল মিস্টেক ধরিয়ে দিলাম। যেমন আমাকে একবার ও কুত্তা মাগী বলল। আমি বললাম ছেলেদের মাগী বলে না। তুমি ইংলিশ মিডিয়াম তাই মাগী মানে জানো না।
সেটা শুনে অর্পিতা রাগে খানিকক্ষণ বোবা হয়ে গেল। সে সময়টা আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলাম।
অনেকক্ষণ গালাগাল দিয়ে ও ফোনটা কেটে দিল।
আমি আধঘন্টা চুপচাপ বসে আবার ওকে ফোন করলাম।
অর্পিতা ফোন ধরল “কী হল আবার কী বলবে?”
আমি বললাম “আমি কিন্তু তোমাকে সিরিয়াসলি প্রপোজ করেছিলাম”।
অর্পিতা ফোনটা কেটে দিল।
আমি বেশ কয়েকবার ফোন করার চেষ্টা করে বুঝলাম ওপাশ থেকে ফোন অফ আছে।
আমি মেসের জল জল ডাল আর ডিমের ঝোল খেয়ে মশারি খাটিয়ে তার ভিতরে সেধিয়ে গেলাম। ও পাশের ঘরে মদ খাওয়া চলছে।
আমাকে দু চারবার ডাকতে এসছিল। শুনিনি।
বেশি লোক যেখানে থাকে সেখানে আমার পোষায় না।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মাঝ রাতে ঘুম ভাঙল ফোনের ভাইব্রেশনে।
অর্পিতা। ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল। সঙ্গে একই কথা লুপে “তুমি কেন বোঝ না শুভম আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি, কেন আমার সঙ্গে বার বার একই জিনিস করে যাও”।
আমি কিছু উত্তর দিলাম না।
কেন করি আমি নিজেই জানি না।
সম্ভবত অর্পিতাই ঠিক।
কোন ভাল মাথার ডাক্তার দেখানো উচিত আমাকে।
সান্ত্বনার কথা বলা উচিত অর্পিতাকে।
কিছুই মাথায় এলো না।
বেশ খানিকক্ষণ ওর কান্না শুনে বললাম “আচ্ছা তুমি কিন্তু এর থেকে অনেক ভাল কাঁদতে পার। এই কান্নাটা কেমন বেসুরো কান্না। একটু সুরে কাঁদতে পার তো”।
আবার ফোন কেটে গেল।
আমি জানি।
অর্পিতা সামলে সুমলে ঠিক তিন ঘন্টা পরে ফোন করবে।
আপাতত ততক্ষণ আবার ঘুমিয়ে নেওয়া যাক...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান