সাবান

অভীক দত্ত

 



“তুমি কোন ব্র্যান্ডের সাবান ব্যবহার কর?”

সোফায় বসে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে রমলা জিজ্ঞেস করল পম্পাকে।

এখনই এসেছে মেয়েটা। মেইড ডট কম নামের একটা অ্যাপ থেকে কাজের মেয়েটাকে পাওয়া গেছে। বেশি বয়স না। তিরিশ বত্রিশ হবে। গায়ের রঙ ময়লা। খুব একটা সুশ্রীও নয়। আগে যে ছিল, সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। রমলার একজন সর্বক্ষণের কাজের মেয়ে দরকার ছিল।

পম্পা প্রশ্নটা বুঝল না। রমলার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

রমলা এবার পম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, “সাবান ব্যবহার কর তো?”

পম্পা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ বউদি”।

রমলা বলল, “তো কোন সাবান ব্যবহার কর সেটাই জানতে চাইছি”।

পম্পা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ওই যে পাঁচ টাকায় যা পাওয়া যায়”।

রমলা নাক কুঁচকে পম্পার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আজ থেকে তুমি এখানেই থাকবে। বাইরের ঘরে যে ওয়াশরুমটা আছে। সেখানে স্নান করে নাও। শাড়ি, ব্লাউজ সব আছে। চেঞ্জ করে নাও”।

পম্পা ঘাড় নাড়ল, তবে গেল না। দাঁড়িয়ে রইল।

রমলা বলল, “কী হল? কী চাই?”

পম্পা বলল, “বউদি মাইনেটা যেটা বলা আছে, সেটাই তো?”

রমলা বলল, “টেন কে তো? হ্যাঁ তাই হবে। এখানে থাকবে। বাড়ি যাবে না। ফোন করার হলে করবে, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ যেন এই ফ্ল্যাটে না আসে। মনে থাকবে”?

পম্পা আবার ঘাড় নাড়ল।

রমলা বলল, “ছুটি বেশি দিতে পারব না”।

পম্পা বলল, “ঠিক আছে বউদি। আমি একা বিধবা মেয়ে, ছুটি নিয়ে কী করব?”

রমলা খুশি হল, কিন্তু বুঝতে দিল না। বলল, “যাও। দাঁড়িয়ে থেকো না। ভাল করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে এসো। তারপর বলছি কী করতে হবে”।

পম্পা যাওয়ার আগে দেওয়ালের দিকে তাকাল। রমলা আর অতীনের ছবি।

বলল, “বউদি, দাদা কোথায়?”

রমলা বলল, “দাদা মারা গেছেন। বেশি প্রশ্ন কোর না। যাও দয়া করে”।

পম্পা অতীনকে দেখতে দেখতে ঘর থেকে বেরোল।

রমলার ফোন বেজে উঠল।

পীযূষ ফোন করছে। রমলা ধরল, “হ্যাঁ, বল”।

পী্যূষ বলল, “এলো? কামওয়ালী বাঈ? ফ্রম মেইড ডট কম?”

রমলা বলল, “এসেছে। একেবারেই ক্লাস নেই বুঝলে। বলে পাঁচ টাকার সাবান ইউজ করে নাকি। ব্লাডি লো ক্লাস, শিট”।

পীযূষ হাসল, “সে তুমি ঠিক করে নেবে আমি জানি নিজের মত করে। ওসব নিয়ে ভাবছি না। যাই হোক, আজ আসব নাকি?”

মধ্য চল্লিশের রমলা আয়নার দিকে তাকাল। আসতে বলবে? আসুক।

বলল, “শিওর। এসো”।

পীযূষ বলল, “না, তোমার নিউ বাঈ কিছু মনে করে যদি?”

রমলা বলল, “কী মনে করবে? আর ও কী মনে করবে তার জন্য আমি চুপ করে থাকব নাকি? অবশ্য এটা ঠিক, ওর কৌতূহল কম নয়। অতীনের কথা জিজ্ঞেসও করে ফেলেছে এর মধ্যে”।

পীযূষ বলল, “এগুলো মেয়েলী কৌতূহল। সবার হয়”।

রমলা রেগে গেল, “মেয়েলী কৌতূহল আবার কী কথা? সব কিছুকেই মেয়েলী বলেই দাগিয়ে দাও কেন তুমি?”

পীযূষ হেসে ফেলল, “ওকে ওকে। ওসব কিছু বলব না। রেগে যেও না। আচ্ছা এখন রাখছি, সন্ধ্যেয় দেখা হচ্ছে”।

রমলা একটু থমকে বলল, “সুনয়নাকে কী বলবে?”

পীযূষ বলল, “কেন? অফিসে কি মিটিং এর অভাব আছে নাকি? ওসব নিয়ে ভেবো না। গেট রেডি ফর টু নাইট”।

রমলা হেসে ফোনটা রেখে সামনের ঘরে গেল।

বাথরুম থেকে জলের শব্দ আসছে। মেয়েটা মনে হয় মেঝে ভাসিয়ে দিচ্ছে স্নান করে।

বিরক্ত হল খানিকটা।

দরজা নক করল রমলা। জল পড়ার শব্দ বন্ধ হল। পম্পা বাথরুমের দরজা খুলে মুখ বাড়াল, “হ্যাঁ দিদি”।

রমলা বলল, “ওভাবে স্নান করে না। শাওয়ার ছেড়ে নাও”।

পম্পা হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ?”

রমলা বলল, “সর। দরজা খোল”।

পম্পা সরল। বিবস্ত্র হয়ে স্নান করছিল। সিঁটিয়ে দাঁড়াল। রমলা শাওয়ারের নব দেখিয়ে বলল, “এইটা ঘুরিয়ে দাও। জল পড়বে, দাঁড়িয়ে থাকবে। হয়ে গেলে নবটা বন্ধ করে দেবে। বুঝেছো?”

পম্পা মাথা নাড়ল।

রমলা বেরিয়ে গেল বাথরুম থেকে। তবে দাঁড়াল দরজার বাইরে। পম্পা দরজা বন্ধ করল।

রমলা শাওয়ারের শব্দ শোনার জন্য অপেক্ষা করল। সেটা কানে আসতে দরজা থেকে সরে আবার আগের ঘরে গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পর পম্পা গা মুছে চেঞ্জ করে বেরোল।

রমলা বলল, “এসো তোমাকে রান্নাঘর ব্যবহার করা শিখিয়ে দি”।

পম্পাকে নিয়ে কিচেনে ঢুকল রমলা।

মধ্যবিত্তের রান্নাঘর নয়।

উচ্চবিত্তের কিচেন। ফ্রিজ থেকে গ্যাস, সব শেখানোর প্রয়োজন আছে। পম্পার খানিকটা ক্লাস নেওয়ার পর রমলা বুঝল, মেয়েটার তাড়াতাড়ি শিখে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। সে খুশি হল, তবে প্রকাশ করল না।

সবজি কাটতে কাটতে পম্পা জিজ্ঞেস করল, “দাদার কী হয়েছিল বউদি?”

রমলা বলল, “হার্ট অ্যাটাক। তোমাকে বলেছি না, বেশি প্রশ্ন করবে না। এই ফ্ল্যাটে কী হচ্ছে, না হচ্ছে, সেসব নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। তোমার যেটা কাজ, সেটায় মন দেবে শুধু। মাথায় ঢুকল, কী বলতে চাইছি?”

পম্পা ঘাড় নাড়ল।

রমলা ডিপ ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে বলল, “পাবদা আছে। কালো জিরে দিয়ে রাঁধো। মিক্সড ভেজ করে নাও। বুঝেছো?”

পম্পা বলল, “হ্যাঁ বউদি”।

রমলা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কী মনে হতে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “সন্ধ্যেয় আমার এক বন্ধু আসবে। ওর সামনে আবার বেশি প্রশ্ন করতে শুরু করে দিও না আমাকে। যা বলব, সেটুকু করবে শুধু। ঠিক আছে?”

পম্পা ঘাড় নাড়ল।

২।

সন্ধ্যেবেলা। রমলা স্যালাড কাটতে শিখিয়ে দিচ্ছিল পম্পাকে। কলিং বেল বাজল।

রমলা পম্পাকে বলল, “মনে রেখো, যেমনটা বলেছি। কোন প্রশ্ন করবে না। আর একবারও ও ঘরে যাবে না। কেমন?” পম্পা মাথা নাড়ল।

রমলা দরজা খুলল।

পীযূষ একটা দামী বিদেশী চকলেটের বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে আছে। রমলা দরজা ছেড়ে দাঁড়াতে পীযূষ ফ্ল্যাটে ঢুকে বলল, “সো, হোয়ার ইজ শি?”

রমলা বলল, “কিচেন”।

পীযূষ চকলেটের বাক্সটা রমলাকে দিয়ে বলল, “ইওর ফেভ্রেট”।

রমলা হাসল, “এসো”।

ড্রয়িং রুমে বসল পীযূশ। রমলা বলল, “আসছি”।

পীযূষ বলল, “দেরী হবে?”

রমলা বলল, “একবারেই না। জাস্ট এক মিনিট”।

পীযূষ সোফায় বসল।

রমলার এক মিনিটেরও কম সময় লাগল। একটা ট্রেতে স্যালাড, স্ন্যাক্স, স্কচের দুটো গ্লাস নিয়ে টেবিলে রেখে বলল, “হেল্প ইওরসেলফ”।

পীযূষ বলল, “থ্যাংক্স। কিন্তু আমার পিপাসা কি এতে মিটবে?”

রমলা ক্লান্ত গলায় বলল, “অন্তত দুটো পেগ চড়াতে দাও। সারাদিন একে শিখিয়ে শিখিয়ে টায়ার্ড হয়ে গেলাম। একবারে অশিক্ষিত একটা। কোন ক্লাস নেই”।

পীযূষের হাত নিমেষে রমলার কোমরে গেল। রমলা পাতলা শিফনের শাড়ি পরে ছিল। পীযূষের হাত খেলা করতে শুরু করল রমলার শরীরে। রমলা চোখ বন্ধ করল। শরীর জাগছে।

সে মৃদু গলায় বলল, “দ্যাটস দ্য বেস্ট পার্ট অফ ইউ সুইটহার্ট। ইউ নো থিংস”।

পীযূষ এই কথাটার অপেক্ষায় ছিল। রমলার আরো কাছে ঘেঁষে সে রমলার ঘাড়ে চুমু খেল।

রমলা শিউরে উঠল আশ্লেষে। পীযূষকে প্রশ্রয় দিল।

পীযূষ সক্রিয় হতে শুরু করল।

রমলাও। শ্বাস ভারী হতে শুরু করল দুজনের। পীযূষের হাত রমলার শরীরে ঘোরাফেরা করতে শুরু করল। রমলা ঠোঁট কামড়ে পীযূষের জামা খামচে ধরল।

“খাবার দেব বউদি”?

মারাত্মক একটা ছন্দপতন ঘটল।

রমলা দেখল দরজায় পম্পা এসে দাঁড়িয়েছে। পীযূষ সরে গেল। অবিন্যস্ত পোষাকে রমলা চেঁচিয়ে উঠল, “গেট লস্ট। বেরোও এখান থেকে। তোমাকে কী বলেছিলাম আমি?”

পম্পা নিমেষে ছাই হয়ে পালিয়ে গেল।

রমলা বিরক্ত মুখে পীযূষকে বলল, “আমি একটু আসছি। একে এই মুহূর্তে বের করে দেব আমি। এটা ইচ্ছে করে করল বুঝতে পারলে? মজা দেখতে এসেছে। উফ! একে আমি রাখব না। কিছুতেই না”।

পীযূষ রমলার হাত ধরে আটকালো, “আহ… ছাড়ো না। জাস্ট লিভ ইট। বেডরুমে চল”।

রমলা পীযূষের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “ভাল লাগছে না এখন। ছাড়ো”।

পীযূষ রমলাকে জড়িয়ে ধরতে গেল, “ছাড়ো না, কেন মাথা গরম করছো?”

রমলা ছাড়িয়ে নিল, “ভাল লাগছে না। আমি একে রাখব না”।

পীযূষ রমলার ঊরুতে হাত রাখল, “ওকে। রেখো না। বাট প্লিজ, ডোন্ট স্পয়েল দিস নাইট। প্লিজ। ওই সাইটে রিপ্লেসমেন্ট চাইবে। পেয়ে যাবে। কালকেই পাল্টে দেবে মেয়েটাকে। এখন রেগে যেও না। ঠান্ডা হও”।

রমলা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “ওকে। ওকে। কিন্তু আমার রিপ্লেসমেন্ট চাই। তাড়াবোই”।

পীযূষ বলল, “উফ। ঠিক আছে তাড়িও। প্লিজ। ঠান্ডা হও”।

রমলা বলল, “মাথা ব্যথা করছে। ভাল লাগছে না”।

পীযূষ হাল ছেড়ে দিল, “ওকে। টেক ইওর টাইম”।

রমলা গলা তুলল, “পম্পা। এদিকে এসো”।

কেউ এল না।

রমলা আবার গলা তুলল, “পম্পা, আমি ডাকছি। এদিকে এসো”।

পম্পা ধীর পায়ে ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।

রমলা বলল, “তুমি এখন এলে কেন? তোমাকে বলেছিলাম আমি, যে না ডাকলে আসবে না?”

পম্পা ঘাড় নাড়ল, “ভুল হয়ে গেছে বউদি”।

রমলা ফুঁসছিল। বলল, “সভ্যতা ভদ্রতা জানবে সেটা আশাও করি না, কিন্তু যেটা বলব, সেটা শুনবে সেটা তো আশা করতেই পারি। তাই না? তুমি বাড়ি চলে যাও। তোমাকে আর থাকতে হবে না। আমি তোমার কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে নেব”।

পম্পা কোন কথা বলল না। কোথাও গেলো না।

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

রমলা বলল, “কী হল? যাও!”

পম্পা রমলার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “সাবানটা খুব ভাল বউদি। ওটা নিয়ে যাব?”

রমলা অবাক একবার পম্পা আরেকবার পীযূষের দিকে তাকাল।

তারপর পম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, “মানে?”

পম্পা মাথা নিচু করে বলল, “আজকের হিসেবে যে টাকাটা হয়, সেটা নেব না। সাবানটা নিয়ে যাই বউদি? খুব ভাল গন্ধ। আপনার মত আমার বরও মরেছে কিছুদিন আগে। একা থাকি, কেউ খোঁজও নিতে আসে না। নিয়ে যাব সাবানটা? যদি এই সাবানের গন্ধে কেউ খোঁজ নিতে আসে?”

অদ্ভুত একটা আর্তি ঝরে পড়ল পম্পার গলায়।

রমলা কেঁপে উঠল প্রশ্নটা শুনে। পম্পাকে কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না।

পম্পা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

রমলার উত্তরের প্রতীক্ষায়…

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান