।।কাফে কিছুক্ষণ।।

অভীক দত্ত

 

।।কাফে কিছুক্ষণ।।

প্রেমে পড়ার তো কোন দিনক্ষণ থাকে না, প্রেম হয়ে যায়।
হয়ে যায় অদ্ভুতভাবেই।
অবশ্য সব প্রেম অদ্ভুতভাবে হয় না। কোন কোন প্রেম কিম্ভূতভাবেও হয়ে যায়।
সোনামন আর ঋভুর প্রেম অবশ্য এর মধ্যে কোন ছাঁচে পড়ে, তা বলতে পারব না।
শুরুর দিনের কথাতেই আসি।
সেদিন হাওয়া ছিল, বৃষ্টি ছিল, আকাশে মেঘ ছিল, রবিবার দুপুরবেলা ছিল আর কাফেটেরিয়ায় মারাত্মক ভিড় ছিল।
ঋভু ল্যাপটপ নিয়ে গম্ভীর মুখে কাজ করছিল। একটা বড় মগে কফি দিয়ে গেছে বেয়ারা। খানিকক্ষণ পরে আসবে ফিশ ফিশ। এই ক্যাফের বেশ জনপ্রিয় আইটেম। ভেটকি মাছের বড়া। দারুণ করে সাজিয়ে দেওয়া হয়।
বেয়ারা বলে যাকে ডাকলাম, সে অবশ্য যথেষ্ট বেয়াড়াই। ঋভুর বন্ধু প্রভাত রায়। নিজের এই বয়স্ক নাম নিতে না পেরে, তার দাদুর উপর ব্যাপক খচে প্রভাত নিজের নাম রেখেছে রাবণ। বন্ধুরা তাকে আদর করে রা ওয়ান বলে ডাকে। গড়িয়াহাটের গলিতে এত সুন্দর একটা কাফে চালাচ্ছে রা। দোতলা বাড়িটা তার মামাবাড়ির সূত্রে পাওয়া। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে রা এম বি এ করে কাফেটা খুলেছে। বাবা কিছুতেই রাজি ছিল না। আপাতত শর্ত একটাই। দু বছরে লাভের মুখ দেখাতে পারলে এ দোকান চলবে, নয়ত রাকে বাপের ব্যবসা সামলাতে হবে।
রা জান লড়িয়ে দিচ্ছে। বেয়াড়ার মতই বেয়ারা হয়ে যাচ্ছে। বর্ষণমুখর রবিবারের দুপুরে কাফেতে ভিড় সামলাচ্ছে। রা-র এই সমস্ত জার্নিতে একটাই গাঁট। তার জামাইবাবু বিরূপাক্ষ। বিরূপাক্ষ লোকটা বাংলা কবিতা লেখে। কবিতা বেশ ভাল লেখে, তবে পেটে মদ পড়লে সে একবারে চার অক্ষরের খ্যাপা হয়ে যায়।
আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝছি, শুরুতেই এতগুলো ক্যারেকটারের এন্ট্রিতে আপনারা ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছেন।
বাদ দিন।
আপাতত আমাদের প্রেম কাহিনীর সিকোয়েন্সটা বলতে শুরু করি।
ঋভু ল্যাপটপে কাজ করছে। কী কাজ করছে? ঋভু আসলে লিখছে। তার জীবনের একটাই ইচ্ছা। সে সিনেমার স্ক্রিপ্টরাইটার হবে। তামিল, তেলেগুতে জর্জরিত বাংলা সিনেমাকে বাতিঘর দেখাবে। এক প্রোডিউসার তাকে আশ্বাস দিয়েছে, ঠিক ঠাক গল্প এনে হাজির করতে পারলে তার গল্পে সিনেমা করা হবে। সেই আশাতে ঋভু গল্প লেখা শুরু করেছে।
ঋভু সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সপ্তাহের অন্যান্য দিন অফিসে তাকে নিংড়ে নেওয়া হয়। আর রবিবার বাড়ি থাকলে শরিকি বাড়িতে মা তার জন্য কোন না কোন সম্বন্ধ নিয়ে হাজির হয় বলে সে তার বন্ধু রা-য়ের ক্যাফেতে চলে আসে। রা ফাঁকা থাকলে আড্ডা হয়।
রা তাকে ফ্রিতেই খাওয়াতে চায়, তবে ঋভু কিছুতেই ফ্রিতে খায় না। রা-র এই চেষ্টাটাকে সে খুব সম্মান করে।
উফ, আবার ধান ভানতে শিবের গীত শুরু হয়ে যাচ্ছে। আবার সিকোয়েন্সে ফিরে আসি।
ভিড় কাফে, বাইরে বৃষ্টি। ঋভু ল্যাপটপে কাজ করছে, এমন সময় কাফেতে ঢুকল সোনামন। সোনামনের মোটা ফ্রেমের চশমা, সোনামন মোটেও ফরসা নয়, এলোমেলো চুপ, আর ভীষণ ঝগড়ুটে।
সে কাফেতে ঢুকেই চারদিক দেখে বলল, “ধুস, ভাবলাম একটু নিরিবিলিতে বসব। তা না, থিকথিকে ভিড়”।
কাফের সবাই সেটা শুনল। হাসির ফোয়ারা ছুটল। ঋভু শুনল না।
তার হিরো তখন রেললাইনের উপর দিয়ে ভিলেনের পিছনে ছুটছে।
রা শুনল সোনামনের কথা। সে বলল, “ম্যাম, কী হয়েছে?”
সোনামন বলল, “কী হয়েছে বুঝছেন না? বসব কোথায়?”
রা বলল, “ওই তো, ওই যে”।
রা ঋভুর টেবিলটা দেখিয়ে দিল।
সোনামন বলল,”ওই যে মানে? ওখানে লোক আছে তো”।
রা হাসল, “আরে না ম্যাডাম, আপনি বুঝতে পারছেন না। ও লোক না”।
সোনামন বলল, “মানে? লোক না মানে? কে ও? রোবট?”
রা বলল, “ও আমার বন্ধু। আপনি ওখানে বসে যান। কোন প্রবলেম নেই”।
সোনামন কাঁধ ঝাঁকাল, “অগত্যা”।
রা এসে ঋভুর সামনের চেয়ার বের করে দিয়ে বলল, “প্লিজ ম্যাম, হ্যাভ এ সিট। কী খাবেন? এই ওয়েদারে ফিশ ফ্রাই চলবে?”
সোনামন বলল, “চলবে। আর লিকার টি দেবেন। আমি ডায়েটিং করছি। গ্রীন টি আছে?”
ঋভু বিরক্ত চোখে রা-এর দিকে তাকাল। সে দৃষ্টির মানে একটাই হয়, আমি এখানে মনঃসংযোগের চেষ্টা করছি, আর তুই সেটার মা মাটি মানুষ করছিস?
রা কাতর দৃষ্টিতে বোঝাতে চাইল খদ্দের লক্ষী।
ঋভু ভীষণ গম্ভীর মুখে ল্যাপটপে নজর দিল।
সোনামন ফোনে ব্যস্ত হল, এবং কিছুক্ষণ ঋভু শুনতে পেল সোনামন ফোন করছে কাকে, “হ্যালো… কী তুমি আসবে না?... ও আমি কালো বলে তাই না? বুঝেছি… থাক… ছেঁড়ো তুমি… ছিঁড়ে আটি বাঁধো… বাল”…
বলে ফোন রেখে দিল সোনামন।
কাফের মধ্যে আবার হাসির হররা উঠল। সোনামন চারদিকে তাকিয়ে বলল,”হোয়াট? এতে এত হাসির কী আছে? আমি কালো বলে আমার বয়ফ্রেন্ড জুটছে না, এটায় এত হাসির কিছু আছে কী? যত্তসব”।
সবাই গম্ভীর হয়ে গেল।
সোনামন বলল, “বাল শালা”।
ঋভুর হিরো তখন ভিলেনের বুকে উঠে দুম দুম করে ঘুষি মারছে। সে সোনামনের মুখে খিস্তি শুনে বলল, “গালাগাল দেবেন না প্লিজ”।
সোনামন এমনিতেই প্রচুর খচে ছিল, ঋভুর কথা শুনে বলল, “কেন, আপনি মেট্রোদাদু?”
ঋভু বিরক্ত মুখে বলল, “আচ্ছা, সরি। আমার বলা ভুল হয়েছে। আমায় ক্ষমা করে দিন”।
সোনামন বলল, “ক্ষমাই তো করে যাব সারাজন্ম ধরে। ওটাই আমার কাজ। বেঁচে আছি কী করতে? এই ক্ষমা করতে’।
ঋভু উত্তর দিল না।
সোনামনের গ্রীন টি নিয়ে এল রা। সোনামন গ্রীন টিতে চুমুক দিয়ে বলল, “মাগো, যেন গরুর মুত খাচ্ছি। এই, কফি আনুন তো। বাল ওজন কমাবো। কারো জন্য নিজেকে চেঞ্জ করব না”।
রা চারদিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল, “আচ্ছা, তাই হোক”।
সোনামন বলল, “তাই হোক মানে? টাকা নেবেন না এটার? আপনি কফি আনুন। এটাও খাই। কী করব, অর্ডার করেছি যখন খেয়েই নি”।
এক চুমুকে গরম গ্রীন টি খেয়ে ফেলল সোনামন। কাফের সবাই আড়চোখে দেখছে ওকে। চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে সবাই বেশ মজা পাচ্ছে।
ঋভুর ফিশ ফিশ দিয়ে গেল একজন ওয়েটার। সোনামন সেটা দেখে বলল, “এটা কী?”
রা বলল, “ফিশ ফিশ”।
সোনামন বলল, “এটা বেশ ভাল দেখতে তো। এটাও দিন আমাকে এক প্লেট”।
রা বলল, “আচ্ছা”।
ঋভু ফিশ ফিশের একটা বড়া থেকে খানিকটা খুবলে নিয়ে গন্ধ শুঁকে প্লেটে রাখল।
সোনামন বলল, “একী, একী? আপনি এটা কী করলেন? আপনি ভাবলেন আমি নজর দিয়েছি?”
ঋভু বলল, “দিতেই পারেন। তবে আপনি বলে না, এটা আমার ছোটবেলার অভ্যাস। কেউ কিছু দিলে খানিকটা গন্ধ শুঁকে রেখে দি”।
সোনামন কটমট করে ঋভুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখে তো শিক্ষিত বলে মনে হয়”।
ঋভু বলল, “গন্ধ শুঁকে ফেলার সঙ্গে শিক্ষিত অশিক্ষিতর কোন পার্থক্য নেই, সবার আগে এটা বুঝুন। আমার খুব নজর লাগে। পেটের রোগ আছে আমার”।
সোনামন বলল, “জঘন্য”।
ঋভু মন দিয়ে ফিশ ফিশ খেতে লাগল।
সোনামন বিড় বিড় করতে লাগল নিজের মনে। তার এই মুদ্রাদোষ আছে। একা একা বিড়বিড় করে।
ঋভুর নায়ক এখন নায়িকার সঙ্গে প্রেমালাপ করবে। সোনামনের বিড়বিড়ে সে কনসেন্ট্রেট করতে পারছিল না। বলল, “একটু থামবেন?”
সোনামন বলল, “কেন? থামব কেন? স্বাধীন দেশ, যা খুশি করব। আপনার কী? আপনি আমার বিল দেবেন?”
ঋভু মুখ দিয়ে “উফ” শব্দ করে আবার ল্যাপটপে মন দিল।
২।
কবিতা পাঠের আসর বসেছে।
আরেকটু পরেই বিরূপাক্ষর ডাক পড়বে। বিরূপাক্ষ তার ঝোলা ব্যাগে কোকের বোতলে রাম মিক্স করে এনেছে। দু মিনিট পর পর চুমুক দিচ্ছে।
তমালতরু তরুণ কবি। বিরূপাক্ষর কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল, “গুরু, আমাকেও দু ঢোক দাও”।
বিরূপাক্ষ বলল, “আমি মুখ দিয়ে খাই দেখেছিস তো? “
তমালতরু বলল, “তাতে কী হয় গুরু? প্রসাদ ভেবে খেয়ে নেব”।
বিরূপাক্ষ বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “মুখ দিয়ে খাবি না। জানে মেরে দেব শালা”।
তমালতরু বোতলটা নিয়ে হাঁ করে একটু খেয়েই মুখ বিকৃত করে বলল, “ওরে বাবারে, জল দাও নি?”
বিরূপাক্ষ বলল, “জল দিয়ে খাই আমি? দেখেছিস কোন দিন? সুভদ্রা কোথায় রে? জামিলদার সাথে ঘুম ঢলাচ্ছে দেখেছিস? ঠেকাচ্ছে? মজা পায় নাকি কাটা বাঁড়াতে?”
তমালতরু জিভ বের করে বলল, “আরে গুরু তোমার নেশা চড়ে গেছে। এসব কী বলতে শুরু করেছো?”
বিরূপাক্ষ বলল, “হুর বাল। কবিতা মাড়াতে এলে কি খিস্তি দেওয়া যাবে না নাকি? সতীপণা চোদাস না”।
তমালতরু চারদিক দেখে সরে গেল।
মঞ্চে পরিশীলিত গলায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছে ধূমাবতী রায়চৌধুরী। বিরূপাক্ষর নাম ডাকল।
বিরূপাক্ষ চেয়ারে ব্যাগ রেখে কবিতা পড়তে উঠল। ধূমাবতী তার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। বিরূপাক্ষর পাঠ হয়ে গেলে তার পাশে এসে বসল, “কী ভাল বললে গো”।
বিরূপাক্ষ বলল, “বলছিস?”
ধূমাবতী বলল, “হ্যাঁ”।
বিরূপাক্ষ বলল, “নামিয়ে দেব চ। সাদার্ন অ্যাভিনিউ তো”।
ধুমাবতী বলল, “হ্যাঁ। চল। দেখা করে আসবে না সুধীরদার সঙ্গে?”
বিরূপাক্ষ কিছু বলার আগেই সুধীর রুদ্র পাল এসে বললেন, “আরে বিরূপাক্ষ, কী ভাল বললে আজ তুমি। অসাধারণ। শক্তিদার কথা মনে পড়িয়ে দিলে”।
বিরূপাক্ষ বলল, “দাদা আপনার আশীর্বাদ”।
সুধীর বললেন, “চলে যাচ্ছো নাকি?”
বিরূপাক্ষ বলল, “কাল অফিস আছে দাদা। কী করব বল?”
সুধীর বললেন, “ওহ, ঠিক আছে। সাবধানে যেও। ম্যাগটা বেরোবে সামনেই, তোমার গুচ্ছ থাকবে”।
বিরূপাক্ষ খুশি হবার ভান করে বলল, “থ্যাঙ্কিউ দাদা। থ্যাঙ্কিউ”।
পকেট থেকে দুটো দু হাজার টাকার নোট বের করে সুধীরের হাতে দিয়ে বলল, “চাঁদাটা ভুলে গেছিলাম দাদা। সরি গো”।
সুধীর টাকা পেয়ে খুশি হয়ে গেলেন, “আরে সে ঠিক আছে। সাবধানে যেও। আরেকটা পুরস্কারের কথা আমাকে বলছিল তারা কয়েকজন গ্রুপের মনীষ আমাকে। আমি কিন্তু তোমার নাম রেকমেন্ড করেছি”।
বিরূপাক্ষ বলল, “সব আপনার আশীর্বাদ দাদা। আসি”।
সুধীর বিরূপাক্ষর কাঁধ চাপড়ে দিলেন, “যাও যাও। ভাল থেকো। কবিতায় থেকো”।
সুধীর যেতেই বিরূপাক্ষ বিড়বিড় করল, “বাল থেকো। গ্রুপবাজিতে থেকো। চুদির ভাই। কই গো ধূমাবতী চল”।
বিরূপাক্ষ হাঁটতে শুরু করল।
সভাঘর থেকে ধূমাবতী তড়িঘড়ি বেরিয়ে তার পিছন পিছন এলো।
রাস্তায় এসে বিরূপাক্ষ ট্যাক্সি নিল।
ধূমাবতী তার পাশে বসল। ট্যাক্সি স্টার্ট নিতে বিরূপাক্ষ ধূমাবতীর কোলে শুয়ে পড়ে বলল, “আজ ভাল লেগেছে কবিতা”?
ধূমাবতী খানিকটা চমকে গেছিল। বলল, “এই এ আবার কী?”
বিরূপাক্ষ বলল, “মাথাটা ঘুরিয়ে উঠল হঠাৎ করে। প্রেশার বেড়েছে মনে হয়”।
ধূমাবতী ফিসফিস করে বলল, “ঈশ, ট্যাক্সিওয়ালা কী ভাববে”।
বিরূপাক্ষ বলল, “কেউ কিছু ভাববে না। সবাই নিজের কাজ করছে। তুই বল আগে, আমার কবিতা কেমন লেগেছে”।
ধূমাবতী খানিকটা অপ্রস্তুত গলায় বলল, “ভাল লেগেছে। এই তুমি ওঠো না, বউদি জানলে কষ্ট পাবে”।
বিরূপাক্ষ বলল, “বাংলা কবিতা জগতে এসে বউদি, ছোড়দি, বড়দি টাইপ ক্যালানেপনা করলে হবে মা? বি ব্রেভ মাই গার্ল”।
ধূমাবতী বলল, “উফ, তু্‌মি একটা যাতা”।
বিরূপাক্ষ ব্যাগ থেকে বোতল বের করে খানিকটা চুমুক দিয়ে বলল, “তুই খাবি?”
ধূমাবতী বলল, “দাও”।
বোতলটা নিয়ে কয়েক চুমুক দিল সে।
বিরূপাক্ষ বলল, “তুই আমার নামে মিটু দিবি? কত দিন কেউ মিটু দেয় না। জীবনটা পানসে হয়ে গেল”।
ধূমাবতী হেসে ফেলল।


৩।
“কলকাতা গুজরাট না। এখানে বাঙালি স্টার্ট আপ করে লাভের মুখ দেখবে আশা করাই ভুল”।
কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন হিমাদ্রি।
ব্রেকফাস্টের জন্য টেবিলে বসেছিল রা। এসব কথা প্রতিদিনই তাকে শুনতে হয়। কান না দিয়ে পাউরুটি চিবোতে লাগল। তাপস চিকেন আর ভেটকি কিনতে গেছে। কেনা হলে তাদের বাড়ি এলে দুজনে মিলে কাফেতে যাবে। তার আগে বাবার লেকচার শুনে যেতে হবে।
হিমাদ্রি বললেন, “কাল কত হল?”
রা বলল, “কী কত হল?”
হিমাদ্রি বললেন, “আরে কাল রবিবার ছিল। কত এল চা কফি বেচে? ভালই তো ভিড় ছিল দেখছিলাম”।
রা বলল, “বাইশ”।
হিমাদ্রি বললেন, “হু। তা শুধু স্ন্যাক্সেই সীমাবদ্ধ থাকবি?”
রা বলল, “বার খুললে বাইশ লাখ হয়। লাইসেন্সে পেলে তাই করব”।
মণিকা অমলেট ভেজে আনছিলেন। হিমাদ্রি মণিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনলে ছেলের কথা? বাবার সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় ভুলে গেছে। বার লাইসেন্স লাগবে? হ্যাঁ? এত পড়াশুনা শিখে বার?”
রা বলল, “কী প্রবলেম? লিকার নিয়ে অহেতুক ট্যাবু তোমাদের। মদ কেন, যে কোন জিনিস বেচা যায়। চাকরি করে কী হবে?”
হিমাদ্রি বললেন, “চাকরি করে কী হবে তোর বন্ধু অনিমেষকে দেখে শিখতে পারছিস না? লন্ডনে সেটল করে গেল”।
রা বলল, “আমার কলকাতা ভাল লাগে। আমি কী করব? আমি কোথাও যাব না”।
হিমাদ্রি বললেন, “সেটা দেখব দু বছর পরে। অবশ্য তখন তোকে কে আর চাকরি দেওয়ার জন্য বসে থাকবে”?
রা কাঁটা চামচ দিয়ে অমলেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “তুমি তখন কলকাতার সঙ্গে গুজরাটকে কমপেয়ার করছিলে না? কোন গুজরাটি পরিবারে ব্যবসা করলে ফ্যামিলি থেকে এত নেগেটিভ কমেন্টও করে না। অ্যাটলিস্ট সাপোর্টটা লাগে। সেটা বোঝ?”
মণিকা রা-কে ঠেললেন, “এই, বাবার সঙ্গে এভাবে কথা বলে বুঝি?”
রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নাও। এন্ড অফ দ্য ডিসকাসন। আর কিছু বলা যাবে না”।
হিমাদ্রি মণিকার দিকে হাত তুলে বললেন, “দাঁড়াও। পাপাইকে বলতে দাও। বল, তোর আর কী সাপোর্ট লাগবে? কত টাকা ইনভেস্ট করেছি এখন কাফেটার পেছনে?”
রা গুম মেরে বলল, “সব টাকা ফেরত দিয়ে দেব বলেছি তো”।
হিমাদ্রি বললেন, “ফ্যামিলি ক্যাপিটালে ব্যবসা করে ব্যবসায়ী হয়েছিস তো। গায়ে হাওয়া লাগাতে হয় নি। বুঝতে পারছিস না কত ধানে কত চাল। যদি নিজেকে রোজগার করতে হত, তখন বুঝতিস”।
রা বলল, “করছি তো রোজগার। সময় দিতে হবে তো। ফুট ফল বেড়েছে কাফের। নেক্সট সানডে একটা অ্যালবাম রিলিজ হবে। টালিগঞ্জের একজন হিরোইনও আসবে। দুটো নিউজপেপার কভার করবে। এগুলো প্রোগ্রেস না?”
হিমাদ্রি বললেন, “অন্য কারো জন্য হলে অবশ্যই প্রোগ্রেস হত। তোর জন্য এগুলো কিছু না। তোকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল পাপাই। এক্সিকিউটিভ ক্লাসের চাওয়ালা হলি শেষমেশ”।
কলিং বেল বাজল। রা বুঝল তাপস এসেছে।
সে হাত দিয়ে অমলেটটা মুখে পুরে দিয়ে বলল, “অ্যাকরডিং টু ইওর গুজরাট মডেল তোমার এতে খুশি হওয়া উচিত। চা বিক্রি করে এখন একজন দেশ চালাচ্ছে। আমিও সেরকম পারব নিশ্চয়ই। আসি। ভাল থেকো। বিকেলের দিকে কাফেতে এসো”।
হিমাদ্রি বললেন, “আমি কিছু জানি না পাপাই। দু বছর…”
রা বলল, “দেখো। আসি”।
রা মণিকাকে চুমু খেয়ে বেরোল।
মণিকা বললেন, “সাবধানে যাবি। তাপস যেন বাইকটা ধীরে চালায়”।
রা বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ”।
দরজা খুলে বেরিয়ে তাপসের বাইকের পিছনে বসে রা বলল, “হেলমেট দে”।
তাপস হেলমেট দিল। কিছুক্ষণ পরে কাফেতে পৌছল দুজন। রা চাবি বের করে দরজা খুলল। তাপস কাফের কিচেনে বাজার রাখল।
রা রাস্তায় এসে সিগারেট ধরাল। মাথা জ্যাম হয়ে আছে। সোমবারগুলো সারাদিন ফাঁকা থাকে। সেই সন্ধ্যের দিকে সামান্য ভিড় হয়।
সে সিগারেট খেতে খেতে ভাবল নিজের জন্য চা বসাবে, পিছন ফিরছিল, এমন সময় পিছন থেকে কোন মেয়ের গলা ভেসে এল, “এই যে, ও দাদা”।
রা ঘাড় ঘুরাল, দেখল কালকের মেয়েটা।
সোনামন। সে বলল, “আমাকে ডাকছেন?”
সোনামন জোরে জোরে পা ফেলে এসে বলল, “হ্যাঁ আপনাকেই ডাকছি। আপনি কালকে যে ছেলেটার সামনে বসালেন, ওর নাম্বার আছে?”
রা হাঁ করে সোনামনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন বলুন তো?”
সোনামন বলল, “হেবি ফালতু ছেলে। কাল বাড়ি গিয়ে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি। ডিলিট করে দিয়েছে। ইয়ার্কি? আমাকে কী ভেবেছে? দেখে নেব!”
সোনামন রাগী গলায় কথাগুলো বলল।
রা হাঁ করে সোনামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
৪।
সকাল ন’টা। বিরূপাক্ষ নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিল। হৈমন্তী ঠেলল, “ওঠো এবার”।
বিরূপাক্ষ ধড়মড় করে উঠে বসল। বলল, “ক’টা বাজে? ঈস! মাথাটা কী ধরে আছে!”
হৈমন্তী বলল, “গ্যালন গ্যালন মদ গিললে মাথা তো ধরবেই। মাথার আর দোষ কী?”
বিরূপাক্ষ বলল, “আজ কী বার হিমু?”
হৈমন্তী বলল, “সোমবার। কেন?”
বিরূপাক্ষ জিভ কেটে বলল, “গাঁড় মেরেছে। আজ ন’টার মধ্যে অফিস ঢুকতে হত”।
হৈমন্তী বলল, “বাহ। এখনও বিছানায়। তার মানে আজ এগারোটার আগে তো প্রশ্নই আসে না। বাহ, বাহ। খুব ভাল”।
বিরূপাক্ষ লাফ দিয়ে খাট থেকে নেমে জামা প্যান্ট পরে বলল, “ও আমি অফিসে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নেব। এলাম”।
হৈমন্তী বলল, “মানে? বাথরুম?”
বিরূপাক্ষ ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বলল, “অফিসে গিয়ে। রাস্তায় পেলে রাস্তার পাশে বসে পড়ব। বাঙালি কবির জন্য গোটা শহর সুলভ। এলাম”।
হৈমন্তী কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল। সত্যি সত্যিই বিরূপাক্ষ বেরিয়ে গেল!
সে বলল, “কিছু বলার নেই”।
হাতের কাজ থাকে সকালে কিছু। রান্নার মেয়ে পারুল এসেছে। সে রান্না ঘরে গেলে মেয়েটা বলল, “কী করব বউদি?”
হৈমন্তী বলল, “মাংস আছে, ওই কর। মাংস আর ভাত। আর কিছু করতে হবে না। রাত্তিরে তো তোর দাদা খেয়েই আসবে নিশ্চয়ই”।
পারুল জ্ঞানী গলায় বলল, “রোজ বাইরে খেলে পেট খারাপ হয় বউদি”।
হৈমন্তী বলল, “হ্যাঁ। সে হয়। কী করব বল, তোর দাদারও তো বয়স হয়েছে। নিজের ভাল না বুঝলে আমার কী করার আছে?”
পারুল বলল, “ভাগ্য ভাল বউদি তোমার। শ্বশুর শাশুড়ি নেই। সেরকম শাশুড়ির পাল্লায় পড়লে বুঝতে। আমার শাশুড়ি…”
বকবক শুরু করে দিল পারুল।
হৈমন্তী সেটা শুনতে শুনতেই ফেসবুক খুলল।
খুলেই দেখল একটা মেয়ে তাকে মেসেজে একটা লিংক পাঠিয়েছে।
লিংকটা খুলল সে। সুভদ্রা পুরকায়স্থ নামে একটা মেয়ে একগাদা স্ক্রিণশট শেয়ার করেছে তার আর বিরূপাক্ষর। বিরূপাক্ষ মদ খেয়ে যা তা বলেছে তাকে। মলেস্ট করেছে।
হৈমন্তী একটার বেশি দেখতে পারল না। মাথা ধরে গেল। খাপে অসংখ্য কমেন্ট। সবাই ছি ছি করছে। বাংলা কবিতার এ কি হাল, ইত্যাদি কমেন্ট ভরে গেছে।
বিরূপাক্ষ রাস্তায় আছে এখন। বিরূপাক্ষর প্রোফাইল খুলল হৈমন্তী।
গাদা গুচ্ছের মেয়ে ভর্তি প্রোফাইলে।
সে কয়েক সেকেন্ড মাথায় হাত দিয়ে বসে বিরূপাক্ষকে ফোন করল। বিরূপাক্ষ ধরল, “হ্যাঁ বল”।
হৈমন্তী বলল, “সুভদ্রাটা কে?”
বিরূপাক্ষ বলল, “কেন? কী হল?”
হৈমন্তী বলল, “তুমি ওকে মলেস্ট করেছো?”
বিরূপাক্ষ বলল, “কবে?”
হৈমন্তী বলল, “সেটা আমি কী করে জানব? কবে মানে? ফেসবুকে স্ক্রিণশট দিয়ে খাপ খুলেছে তোমার নামে”।
বিরূপাক্ষ বলল, “মলেস্ট করেছি বলছে?”
হৈমন্তী বলল, “হ্যাঁ”।
বিরূপাক্ষ বলল, “ও মদের ঘোরে কাকে কী করেছি মনে পড়ছে না। তুমি ফোনটা রাখো তো, অফিসে প্রচুর ঝাঁট আছে আজ”।
হৈমন্তী রাগবে না চিৎকার করবে বুঝতে পারল না। বলল, “তুমি বুঝতে পারছো না কী বলতে চাইছি? মেয়েটা তোমাকে পোটেনশিয়াল রেপিস্ট বলেছে ফেসবুকে। ছিছি করছে সবাই। আমি কী করব?”
বিরূপাক্ষ বলল, “খেয়ে ঘুমাও। কী করবে? সুভদ্রা এখন অনেক কিছু বলবে। ফেসবুকে না বলে থানায় বলুক। জামিলের সঙ্গে সকাল বিকেল হোটেল যায়। ওকে চেনো তুমি?”
হৈমন্তী বলল, “আমি কাউকে চিনি না”।
বিরূপাক্ষ বলল, “কাউকে যখন চেনো না ফেসবুক রেখে শ্রীময়ী দেখো। আচ্ছা, দশ মিনিট সময় দাও”।
ফোন কেটে গেল।
হতভম্ব হয়ে বসে রইল হৈমন্তী।
দশ মিনিট গেল না, পাঁচ মিনিট পরেই ফোন করল বিরূপাক্ষ, ধরল হৈমন্তী, “বল”।
বিরূপাক্ষ বলল, “ফেসবুক খোল। খাপ উধাও। জাস্ট একটা কথা বললাম ফোন করে। জামিলকে নিয়ে ও যে হোটেলে যায়, তার সিসিটিভি ফুটেজ আছে আমার কাছে। বেশি চুলকালে বের করে দেব। ঠিক আছে? খুশি? রাখি”।
ফোন কেটে দিল বিরূপাক্ষ।
হৈমন্তী তাড়াতাড়ি সেই লিংকটা খুলল।
ঠিকই।
“দ্য অ্যাটাচমেন্ট ইজ নট অ্যাভেলেবল” বলছে।
পারুল এসে বলল, “চা খাবে বউদি?”
হৈমন্তী বলল, “বিষ খাব, আছে রে মা?”
৫।
হিরোইন হারিয়ে গেছে। হিরো তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। একটা রেসকিউ মিশনে নেমেছে হিরো। এই মুহূর্তে হিরোর কাছে কিছু নেই। মানিব্যাগ চুরি হয়ে গেছে। একটা অজানা শহরে হিরো হিরোইনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
“ঋভু”।
বসের ডাক শুনে চমকে তাকাল ঋভু। বলল, “হ্যাঁ স্যার”।
“তুমি কি দিবা নিদ্রা দিচ্ছিলে বাবা?” সাহা স্যার মাখনের মত গলায় প্রশ্ন করলেন।
সাহা স্যার এরকমই। গলা মাখনের মত। আর কথা মিছরির ছুরির মত। যখন চালাতে শুরু করেন, এফোঁড় ওফোঁড় করে দেন।
ঋভু বলল, “না স্যার। একচুয়ালি প্রোজেক্টটা নিয়েই ভাবছিলাম”।
সাহা বললেন, “কী ভাবছিলে?”
ঋভু বলল, “আমাকে মুম্বইতে গিয়ে কিছুদিন থাকতে হতে পারে। ক্লায়েন্টের রিকোয়ারমেন্টটা সাইটে থেকে বেশি বোঝা যাবে স্যার”।
সাহা বললেন, “সে তো যেতেই হবে। ঠিক আছে। তুমি একটা প্রপোজাল রেডি কর। আমি দেখছি”।
সাহা যেতে ঋভু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এই কাজের সময় সিনেমার আইডিয়া চলে এলে বড় চাপ হয়ে যায়। এভাবেই ম্যানেজ করতে হয়।
ফোন বাজছিল। দেখল রা ফোন করছে। ধরল, “বল”।
“হ্যাঁ রে ভাই, তুই কি আমাকে শান্তিতে ব্যবসাটা করতে দিবি না?” রায়ের করুণ গলা ভেসে এল।
ঋভু ডেস্ক থেকে উঠে বাইরে লবিতে বেরোল। “কেন বল তো? কী হল?”
রা বলল, “তুই কাল যে মেয়েটার সঙ্গে বসেছিলি, তার সঙ্গে কি কথা বলেছিলি?”
ঋভু বলল, “হ্যাঁ, নর্মাল কথা হয়েছিল। কেন বল তো?”
রা বলল, “তুই নাকি সে মেয়ের ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করিস নি, সে আমার কাফেতে হানা দিয়েছে। তোর নাম্বার চাইছে”।
ঋভু হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, “সে কী? আমাকে কখন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে? আর তাছাড়া অ্যাক্সেপ্ট করতে হবে, এরকম মাথার দিব্যি কে দিয়েছে?”
রা বলল, “জানি না ভাই, তুই বোঝ, এই নে, ও ম্যাডাম, এদিকে আসুন। কথা বলুন”।
রা সোনামনের হাতে ফোন ধরাতেই ওপাশ থেকে সোনামনের রাগী গলা ভেসে এল, “আপনি তো মহা অসভ্য লোক”!
ঋভু খাবি খেল। বলল, “আমি কী করলাম?”
সোনামন বলল, “আপনাকে আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। আপনি সেটা অ্যাক্সেপ্ট করেন নি কেন?”
ঋভু বলল, “দেখুন আমি সকালে দেখলাম একটা কী উদ্ভট নাম থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় না কী নাম। ফেক ভাবলাম”।
সোনামন ফুঁসে উঠল, “ফেকই তো ভাববেন। পড়াশুনা করেন? বাংলা কবিতা পড়েন? মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় একটা বিখ্যাত কবিতা। গানও আছে। জানবেন কী করে? সারাক্ষণ ল্যাপটপে মুখ ঢুকিয়ে বসে আছেন”।
ঋভু এবার রাগল, “দেখুন, আপনার এই ভাট কথা শোনার সময় আমার নেই। অফিসে কাজ আছে আমার”।
সোনামন বলল, “সে তো বলবেনই। কাজ তো থাকবেই। আপনার একারই কাজ আছে। আর আমি তো বনগাঁ লোকালে লজেন্স বিক্রি করতে যাব এবার”।
ঋভু রেগে মেগে ফোন কেটে দিয়ে বলল, “আজব পাগল তো!”
পর মুহূর্তেই আবার রা ফোন করল, “কী বে, ফোন কাটলি কেন? তোর ম্যাও, তুই সামলা ভাই”।
“আমার ম্যাও মানে?” ঋভু অবাক হল, “আমার ম্যাও কী করে হয়? কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল, অ্যাক্সেপ্ট না করলেই আমার ম্যাও হয়ে যাবে সে? এ কেমন কনসেপ্ট?”
“আমি জানি না ভাই। প্লিজ তোকে রিকোয়েস্ট করছি, ব্যাপারটা সামলা। আমার এখানে জানিস না কী অবস্থা। আশে পাশের বাড়ি থেকে লোকজন সন্দিগ্ধ চোখে দেখছে। ভাবছে কী না কী। দেখ”।
ঋভু মাথায় হাত দিল, “উফ, আচ্ছা দে ফোনটা”।
সোনামনের গলা ভেসে এল, “বলুন”।
ঋভু বলল, “শুনুন, আমি সরি। আপনি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। আমি অ্যাক্সেপ্ট করছি এবার”।
“আমি আর পাঠাবো না এবার”।
“ঠিক আছে। আমি পাঠাচ্ছি। মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় তো? পাঠাচ্ছি”।
“হু”।
“সরি”।
“হু”।
ফোন রাখল ঋভু। নিজের মনেই বলল, “এ কীরে ভাই, এ কেমন মেয়ে?”
ফেসবুক খুলে তাড়াতাড়ি সার্চ করল। অ্যাড করল।
দশ সেকেন্ডের মধ্যে সে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট হয়ে গেল।
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ইনবক্সে পিং করল সোনামন, “হাই”।
ঋভু দেখল বস লবিতে এসে তার দিকে কট্মট করে তাকাচ্ছেন।
সে ঘাবড়ে গিয়ে ফোন পকেটে পুরে বলল, “বাড়ির ফোন ছিল স্যার”।
সাহা বললেন, “অফিসে এসেছো, ভুলে যেও না দয়া করে”।
ঋভু বলল, “রাইট স্যার”।
সাহা বললেন, “প্রপোজালটা রেডি কর। ওকে?”
ঋভু বলল, “ওকে স্যার”।
সাহা বললেন, “ইউ আর এ ফ্রেশ ব্লাড। ডোন্ট ওয়েস্ট ইওর এনার্জি এনি হোয়ার। ওকে?”
ঋভু ঘাড় নাড়ল, “রাইট স্যার”।
সাহা বললেন, “যাও”।
ঋভু বলল, “রাইট স্যার”।
কিন্তু গেল না। সাহা বললেন, “আরে যাও”।
ঋভু এবার চমকে বলল, “সরি স্যার। যাই যাই”।
৬।
কাফে দুপুর দুটোয় খোলে। একদিকে ম্যাগাজিন কর্ণার করেছে রা। কথা হচ্ছে আরেকটা রুমে বুটিক খোলার। হৈমন্তীর অনেক দিন থেকেই ইচ্ছা সিরিয়াসলি বুটিক করার। রা-র তাতে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা অন্যত্র।
বিরূপাক্ষকে নিয়ে। বিরূপাক্ষ প্রায়ই কাফেতে এসে মদ খেতে শুরু করে। এর মধ্যে বেশ কয়েক জন আপত্তি জানিয়েছে। জামাইবাবু বলে বেশি কিছু বলা যায় না। হিমাদ্রিও ব্যাপারটা শুনে বিরক্তিপ্রকাশ করেছেন। রা বুঝতে পারে না জামাইবাবুকে কী করে হ্যান্ডেল করবে।
সোমবার দুপুর। ভিড় নেই।
রা খবরের কাগজ পড়ছিল। এমন সময় হৈমন্তী হল।
রা অবাক হল, “কী রে, তুই এমন সময়ে?”
হৈমন্তী বলল, “এমনি, এলাম। কী খবর তোর? কেমন চলছে?”
রা বলল, “লাঞ্চ করেছিস?”
হৈমন্তী উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে পড়ল।
রা বলল, “কী হল? বলবি আমাকে, না একা একা ভেউ ভেউ করে কাঁদবি? জানোয়ারটা আবার কিছু করেছে?”
হৈমন্তী ফোন বের করে সেভ করে রাখা স্ক্রিণশটগুলো রাকে দেখাল।
রা রেগে গিয়ে বলল, “বল এবার, তুই নিজে বল কী করবি?”
হৈমন্তী বলল, “বাবা বলবে ডিভোর্স বলে কিছু হয় না। মা বোঝাবে মানিয়ে নে। আমার নিজের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকাও নেই। তুই বল আমি কী করব?”
রা বলল, “তুই এই জানোয়ারটার মধ্যে কী দেখেছিলিস বল তো? সিরিয়াসলি আমি ভাবি, ঠিক কী দেখেছিলি?”
হৈমন্তী বলল, “বিরূপাক্ষ মেয়েটাকে ফোন করে নাকি মিটিয়ে নিয়েছে সব। কী সব হুমকি টুমকি দিয়েছে”।
রা বলল, “বুঝেছি। সিরিয়াস অ্যাবিউসার এরা। এদের পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব। তবে সব জেনে শুনে তুই এরকম একটা লোকের সঙ্গে থাকবি, এটা আমি মেনে নিতে পারি না কিছুতেই”।
হৈমন্তী বলল, “আমার তো কিছু করার নেই ভাই। তার ওপরে, আই অ্যাম এক্সপেক্টিং”।
রা চমকে তাকাল, “বলিস নি কেন?”
হৈমন্তী বলল, “কী করব বলে? আমি অনেক রকমভাবে চেষ্টা করেছি না নেওয়ার। তবু হয়ে গেল”।
রা বলল, “শিট! এবার কী হবে? ও যদি তোকে এই অবস্থায় মার ধোর করে, তাহলে তো আমি ওকে খুন করে আসব”।
হৈমন্তী বলল, “আমার আর কিছু ভাল লাগছে না। এসব নিয়ে ভাবতেও পারছি না আর”।
রা বলল, “আমি তোকে বলছি শোন, আমি সাপোর্ট দেব। আপাতত বেরিয়ে আয়। আর থাকিস না ওর সঙ্গে”।
হৈমন্তী বলল, “বেরিয়ে কোথায় যাব?”
রা বলল, “বেরিয়ে বাড়ি আয়। যা ঝামেলা হবে, বুঝে নেব”।
হৈমন্তী বলল, “না। বাড়ি যাব না। বাড়ি যাবার পর বাবা যখন ওভাবে তাকায়, আর মা ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝাতে শুরু করে ডিভোর্স হওয়া মানে লোকে কী বলবে, আমি জাস্ট নিতে পারি না। আমি কয়েকটা এক্সাম দেব। ফর্ম ফিল আপ করছি। জানি না কী হবে। যদি দশ হাজারটাকার চাকরিও পাই, তখন খানিকটা বলার মত জায়গায় আসব। আমি চ্যাচাতে পারি না আসলে। কাল রাত একটায় এল। বেহেড হয়ে। আমাকে বার বার কী একটা মেয়ের নামে ডাকতে লাগল। আমি তো বুঝতে পারছিলাম ওই নামের কারো একটার সঙ্গে কিছু করে এসেছে…”
হৈমন্তী মাথায় হাত দিল।
রা বলল, “এত চাপ নিস না। কিছু খা আগে। দাঁড়া, স্যান্ডউইচ আনি”।
রা তাপসকে ডেকে স্যান্ডউইচ করতে বলল।
হৈমন্তী বলল, “যে কোন দিন বড় সড় কোন কেস খাবে। জেলে যাবে। তুই দেখে নিস। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে? বেনামে কত প্রোফাইল থেকে আমার কাছে ওর কীর্তির ছবি আসে। এগুলো নিয়ে সেপারেট হয়ে খোরপোষ চাওয়া যেত। বাবা দেবে না। কিছুতেই মানবে না। ভিক্টোরিয়ান যুগের মেন্টালিটি নিয়ে ওরা বসে আছে”।
রা বলল, “শোন, আমার কথা শোন। মাথা ঠান্ডা কর। এভিডেন্স জোগাড় কর। যেটা বললি, সেটাই করা যাবে। আপাতত আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। আরো জমাই। তুই সব নিয়ে বেরিয়ে আয়। তোকে বাড়ি যেতে হবে না। আলাদা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করব। তারপর আমি দেখছি কী করা যায়। শুধু এখনও সময় নিয়ে ঠিক কর, বাচ্চাটা নিবি না নিবি না?”
হৈমন্তী উত্তর দিতে পারল না। চুপ করে বসে রইল।
৭।

অফিসে বিরূপাক্ষ ঢোকামাত্র তার বস ভবানী সিংহ ঘড়ি দেখলেন।

বিরূপাক্ষ বলল, “মাল খেয়ে উলটে গেছিলাম, বুঝলেন না? ভাবলাম ন’টায় ঢুকব। সেই এগারোটাই হল”।

ভবানী বললেন, “সরকারি অফিস বলে বেঁচে গেলে। বেসরকারী অফিস হলে এদ্দিনে তোমার চাকরি থাকত না”।

বিরূপাক্ষ বলল, “তা বটে, তবে কী করবেন স্যার? এই তো জীবন, কী আছে জীবনে, আমকাঠ পেছনে”।

ভবানী বললেন, “তুমি নিজে আমার কাছ থেকে কাজটা নিয়েছিলে বিরূপাক্ষ, এই বলে যে পার্টি আজকে সকালে আসবে। আর তুমি নিজে দেরী করলে। ভাগ্য ভাল আজ আমি দশটায় ঢুকে গেছিলাম, নইলে বেইজ্জত হতে হত”।

বিরূপাক্ষ বলল, “ও কাজটা হয়ে গেছে? বলবেন তো, তাহলে আরেকটু দেরী করে আসতাম”।

ভবানী বিরূপাক্ষর দিকে কটমট করে তাকালেন।

বিরূপাক্ষ বলল, “স্যার, স্নান করে আসি? তাড়াহুড়োয় করা হল না”।

ভবানী বললেন, “যা পারো কর। হোপলেস কেস”।

বিরূপাক্ষ ব্যাগের মধ্যে গামছা নিয়ে এসেছিল। সাবান আর শ্যাম্পুর ছোট শ্যাসে ছিল। কোন এক হোটেলে কাউকে নিয়ে গেছিল, তখন বাথরুম থেকে নিয়ে ব্যাগে রেখেছিল। সেসব নিয়ে শিস দিতে দিতে বাথরুমে ঢুকে গেল। স্নান সেরে এসে ক্যান্টিনে ফোন করল, “ডিম টোস্ট আর চা রেডি কর তো”।

ভবানী বিরূপাক্ষর ঘরেই বসেন। বললেন, “তুমি ঘুম থেকে ক’টায় উঠেছো?”

বিরূপাক্ষ বলল, “ন’টায়। উঠেই চলে এলাম। খাওয়াও হয় নি”।

ভবানী বললেন, “বেশ। ভালই আছো তুমি”।

বিরূপাক্ষ বলল, “খারাপ থাকার চান্সই নেই। আপনি আছেন, এত ভাল উপরওয়ালা। আপনি থাকলে চিন্তা আছে নাকি?”

ভবানী আর কথা না বাড়িয়ে কাজে মন দিলেন।

বিরূপাক্ষ ফোন বের করে ক্যান্টিনের দিকে রওনা দিল। সুভদ্রার ফোন রিং হতেই ধরল, “হ্যালো”।

বিরূপাক্ষ বলল, “কী ডার্লিং, খাপ ডিলিট করলে?”

সুভদ্রা বলল, “হু”।

বিরূপাক্ষ বলল, “কোন বানচোদ চুলকেছিল? জামিল?”

সুভদ্রা বলল, “আমি এই নিয়ে তোমার সঙ্গে কোন কথা বলতে রাজি নই”।

বিরূপাক্ষ বলল, “খাপটা তিন ঘন্টা ছিল। এই তিন ঘন্টা আমার ফেস লস হল। সে কমপেনসেশনটা কে দেবে? আমার কাছে তোর আর জামিলের হোটেলের সিডি আছে। আপলোড করব এক্স ভিডিওতে?”

সুভদ্রা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “আমি কমপেনসেট করতে রাজি, কী করতে হবে?”

বিরূপাক্ষ শিস দিয়ে উঠল, “রাজি? উরিব্বাস। চলে আসো তবে। হোটেলের টাকা নিয়ে এসো। আজকে আমি টাকা দেব না”।

সুভদ্রা বলল, “আমার কাছে টাকা নেই”।

বিরূপাক্ষ বলল, “তাহলে আরও ভাল। তৈরী হয়ে এসো। এখনই এসো। আর হ্যাঁ, ফোনটাও নিয়ে আসবে। আমার সঙ্গে একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করতে হবে। লিখবে আমাকে তুমি নিজের দাদার মত দেখেছো চিরকাল। একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে খাপটা খুলে ফেলেছিলে। এখন ভীষণভাবে অনুতপ্ত। ওকে?”

সুভদ্রা বলল “ওকে”।

বিরূপাক্ষ বলল, “এই যে আমাকে দাদার মত বলবে, সেটা হবে একটা গা গরম করা সেক্সের পর। ওই খাপে জামিল দেখলাম আমাকে বানচোদ বলেছে। সে কথাটার একটা ভ্যালিডেশনও হবে। আফটার অল, জামিল বাংলা কবিতায় আমাদের সিনিয়র, সিনিয়রের কথার একটা সম্মান আছে। তাই না?”

সুভদ্রা চুপ করে থেকে বলল, “তাই?”

বিরূপাক্ষ ঘড়ি দেখে বলল, “সাড়ে বারোটার মধ্যে চলে এসো, রাত কাটানোর মত প্রিপারেশন নিয়ে আসবে। আজকের কমপেনসেশনটা আমি সেভাবেই নেব। রাখলাম”।

ফোন কেটে দিল বিরূপাক্ষ, ক্যান্টিনে ঢুকে ডাক পাড়ল, “পুকান, হল রে?”

পুকান নামের ছেলেটা দৌড়ে এসে এক প্লেট ডিম টোস্ট আর এক কাপ চা দিল। বিরূপাক্ষ বলল, “বিট নুন কে দেবে? আমার বাবা? দিয়ে যা”।

পুকান জিভ কেটে বিট নুন ছড়িয়ে দিয়ে গেল। বিরূপাক্ষ মন দিয়ে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে ডিম পাউরুটিটা শেষ করে আবার চেম্বারে গেল। ভবানীবাবুকে বলল, “একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে বুঝলেন স্যার। আমাকে বেরোতে হবে”।

ভবানীবাবু বিরূপাক্ষর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।


চিকেন পকোড়া দু প্লেট।

দুটো কোল্ড কফি।

অর্ডার করেছে আমন হুসেন। কালীঘাটের অর্ডার।

অনীশ অর্ডারটা নিয়ে কিছুক্ষণের কিচেনে ঢুকল।

তাপস ফ্রিজ থেকে ম্যারিনেট করা চিকেন বের করছিল, অনীশকে দেখে বলল, “কী অর্ডার আছে?”

অনীশ বলল, “দু প্লেট পকোড়া, দুটো কোল্ড কফি”।

তাপস বলল, “বস ভাই, করে দিচ্ছি”।

কড়াইতে তেল দিল তাপস। বলল, “চারদিকে সেল কেমন?”

অনীশ বলল, “প্রচুর। মানুষ খাচ্ছে গেদে। আবার সন্দেহও কম না কারো। আচ্ছা, আমাদের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, লোকের প্যাকেট থেকে খাবার খেয়ে নেব? কোন একটা ভিডিও বেরিয়েছে, সে থেকে সবাই এখন আমাদের সন্দেহ করছে”।

তাপস বলল, “আচ্ছা ভাই তুই গ্র্যাজুয়েট না?”

অনীশ বলল, “হ্যাঁ। তাতে আর কী হয়? দেশে এখন প্রচুর গ্র্যাজুয়েট। আমার মত গ্র্যাজুয়েট ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে। এই যে চাকরি পেলাম, এই অনেক”।

তাপস বলল, “তা বটে, আমি ভাগ্যিস বেশি পড়াশুনা করি নি। করলেও ওই তো, নেতাদের পোঁদে পোঁদে ঘুরে চাকরি জোগাড় করতে হত”।

অনীশ বলল, “তাও পোঁদে ঘুরলে যদি চাকরি পাওয়া যেত, ঘুরতাম। তা তো হচ্ছে না। পোঁদে পোঁদে ঘোরাচ্ছেও, আবার টাকাও খাচ্ছে, চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একটা টেম্পোরারি কাজ দিচ্ছে। মাসে দু হাজার টাকা মাইনা, পনেরো দিন ডিউটি। কী লাভ?”

তাপস বলল, “সেই। আমি তো ভেবেছিলাম গ্রামে গিয়ে টোটো চালাব। একটা টোটো চালাতে যে টাকা খাওয়াতে হচ্ছে, তার থেকে সে টাকা ব্যাংকে রেখে দিলে সুদে বাড়বে। গরীব মানুষের জন্য এখন আর কিছু নেই ভাই”।

অনীশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

রা এসে বলল, “কীরে অনীশ, অর্ডার আছে নাকি?”

অনীশ বলল, “হ্যাঁ”।

রা তাপসকে বলল, “কালকে একটা অর্ডারে কমপ্লেইন করেছে কাস্টোমার। তোকে বলব ভাবছিলাম। কী হয়েছিল?”

তাপস বলল, “জানি না, আমাদের খাবার তো কখনো খারাপ থাকে না। আর ভাল চাইলে সোনা, রূপো গেলাতে হবে”।

রা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “যা বলেছিস। মানুষের জীবনে চাহিদার কোন শেষ নেই। পান থেকে চুল খসলেই কমপ্লেইন। কিন্তু কিছু করার নেই। এটাই লাইফ। এটা মেনে নিতে হবে”।

অনীশ বলল, “কোল্ড কফিটা ঠিক করে প্যাক করে দিও । পরশু দিন কফি পড়ে গেছিল”।

রা উঠে পড়ল চেয়ার থেকে, “দাঁড়া, তাপস তুই পকোড়াটা কর ঠিক করে কর। কফিটা আমি করে দিচ্ছি”।

ব্যস্ত হয়ে গেল রা। অনীশ বলল, “আমার আর এই ডেলিভারির কাজ ভাল লাগছে না দাদা। তোমার কাফেতে আর লোক লাগবে না?”

রা বলল, “তোর পোষাবে? আমি কিন্তু এখন অত দিতে পারব না তোকে”।

অনীশ বলল, “পুষিয়ে যাবে। বাইক নিয়ে এত দৌড় আর পোষাচ্ছে না। তার ওপর জানোই তো পুলিশের ঝামেলা তো আছেই”।

রা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, “ঠিক আছে, তুই নেক্সট মান্থ জয়েন করে যা। একজন লোক লাগবে। তবে দেখিস ভাই আগে থেকেই বলে দিচ্ছি, কাফে যত ভাল চলবে, তত ভাল টাকা পাবি”।

তাপস বলল “কী করে ভাল চলবে শুনি? লোকে একশো টাকার কফি খেয়ে দু ঘন্টা আড্ডা মারে। হয় এটাকে রেস্টুরেন্ট বানাও, নয় বার বানাও”।

রা হেসে ফেলল, “বাবাকে বলিস আমার। চ্যালাকাঠ নিয়ে তাড়া করবে। আজকে বলেছিলাম”।

তাপস বলল, “তাড়া করার কী আছে? তুমি আমি তো মদ খাব না। লোকে মদ খাবে। এতে এত চাপ নেওয়ার কী আছে?”

রা বলল, “আমার তো কোন কালেই চাপ নেই। মদ জিনিসটা নিয়ে মিডল ক্লাস বাঙালির অনেক সমস্যা আছে। আমাদের বাড়ির লোক মানবে না। কী করব?”

তাপস বলল, “তাহলে লাভও করতে পারবে না। অবশ্য করেও তোমার লস। তুমি বার করবে, আর তোমার জামাইবাবু একাই সব মদ খেয়ে চলে যাবে”।

রা হেসে ফেলল, “তা যা বলেছিস। এটা খুব একটা ভুলও না”।

তাপসের রান্না হয়ে গেছিল। সে প্যাক করে দিল।

অনীশ খাবার নিয়ে বেরিয়ে গেল।

হৈমন্তী এতক্ষণ একা একা কাফেতে বসে ছিল।

রান্নাঘরে এসে বলল, “ভাই আমি বেরোই। ভাল লাগছে না”।

রা বলল, “কীসে ফিরবি? পৌঁছে দিয়ে আসব?”

হৈমন্তী বলল, “নাহ, আমি চলে যাব। সাবধানে থাকিস”।

হৈমন্তী বেরিয়ে গেল।


অফিস থেকে বেরিয়ে হোটেলের সামনে গিয়ে বিরূপাক্ষ দেখল সুভদ্রা দাঁড়িয়ে আছে।

বিরূপাক্ষ বলল, “চল। চেক ইন করা যাক”।

সুভদ্রা কিছু বলল না।

চেক ইন করে রুমে পৌঁছে বিরূপাক্ষ রুম সার্ভিসে ফোন করল, “দুটো বিয়ার দিয়ে যাও”।

সুভদ্রা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

বিরূপাক্ষ বলল, “কী ব্যাপার? কমপেনসেট করবে না?”

সুভদ্রা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “তোমার কাছে সত্যিই ভিডিও আছে?”

বিরূপাক্ষ ঠ্যাঙের উপরে ঠ্যাং তুলে বলল, “কার পেছনে কাঠি করছো, সেটা না বুঝে সকাল সকাল কাঠি করতে লেগে পড়লে, একবারও ভাবলে না কোন বাম্বুটা লাগতে পারে? আজকালকার দিনে খালি কবিতা লিখলে হয়?”

সুভদ্রা বলল, “প্লিজ ডিলিট কর। বাড়িতে জানলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে”।

বিরূপাক্ষ বলল, “বাড়িতে জানে না মেয়ে কবি হবার নামে এর ওর তার সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়? মাইরি?”

সুভদ্রা মাথা নিচু করল।

বিরূপাক্ষ জুতো পরা অবস্থাতেই খাটের উপর উঠে কম্বল টেনে নিয়ে বলল, “ভারি ঠান্ডা ঘরটা। ঘুম ভাল হবে। আচ্ছা, ভুল করেছো যখন শাস্তি তো পেতে হবে”

সুভদ্রা বলল, “তুমি যা বলবে আমি তাই করব”।

বিরূপাক্ষ টিভি চালাল। রিমোটের সঙ্গে খানিকক্ষণ ধস্তাধস্তি করে টিভি বন্ধ করে বলল, “হুর, ফালতু ঝাঁট যত। তুমি পানু দেখো?”

সুভদ্রা বলল, “কী?”

বিরূপাক্ষ বলল, “বাপরে, সতীলক্ষী একেবারে। পানু দেখো? পর্ণ, পর্ণ”।

সুভদ্রা বলল, “হু”।

বিরূপাক্ষ বলল, “জাস্ট ইমাজিন, জনি সিন্স বাঙালি হত। লোকটা একাধারে কত কিছু। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, টিচার। বাঙালি হলে একটা পানু বানাতাম ওকে নিয়ে। কবি। কবিতা পাঠের আসর থেকে জনি সিন্স এক সুন্দরী পেটিওয়ালা কবিনীকে পাকড়াও করে নিয়ে গেল। তারপর উলটে পালটে…”

বিরূপাক্ষ খ্যাক খ্যাক করে হাসতে শুরু করল।

সুভদ্রা ক্লান্ত ভাবে খাটে বসে বলল, “জামিলদাকে আমি ভালবাসি”।

বিরূপাক্ষ বলল, “সে বাসো না, কে বলেছে খারাপ বাসতে? তো খানকির ছেলেটা আমার পোঁদে কাঠি করতে বলল আর তুমি করে দিলে?”

সুভদ্রা বলল, “কাল বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তোমায় নিয়ে কথা হচ্ছিল”

বিরূপাক্ষ বলল, “হ্যাঁ আর তখন তুমি বলে দিলে আমি তোমাকে জোর করে তোমার সঙ্গে শুই, আর তুমি নেকু পুষু, কিছুই জানো না, বয়স তোমার বাও কি তেও, সব দোষ চুদির ভাই ছেলেটার আর মেয়েটা তুলসী পাতা, তাই তো?”

সুভদ্রা মাথা নিচু করল। উত্তর দিল না।

দরজায় বেল বাজল।

বিরূপাক্ষ বলল, “যাও। বিয়ার দুটো নিয়ে এসো”।

সুভদ্রা উঠে দরজা খুলতে জামিল ঢুকল ঘরের মধ্যে। জামিল ঢুকতেই সুভদ্রা কেঁদে জামিলকে জড়িয়ে ধরল।

জামিল মারমুখী হয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে বলল, “এসব কী হচ্ছে?”

বিরূপাক্ষ হো হো করে হেসে বলল, “হ্যাঁ রে ভাই, ফুটোর গন্ধ এত ভাল যে তুই ওর পোঁদে পোঁদে এখানে চলে এলি? এত ভাল লাগে?”

জামিল থম্থমে মুখে বলল, “তুই ওকে ছেড়ে দে বীরু। কাজটা ঠিক হচ্ছে না’।

বিরূপাক্ষ বলল, “কোন কাজটা ঠিক হয়েছিল? আমার নামে সকাল সকাল খাপ খুলে আমার বউয়ের কাছে সে খাপের লিংক পাঠানোটা ঠিক হয়েছিল? তুই বল সেটা ঠিক হয়েছিল, আমি আর কিছু বলব না’।

জামিল বলল, “অতি উৎসাহে করে ফেলেছে সেটা সুভদ্রা। আর হবে না”।

আরেকবার বেল বাজল। বিরূপাক্ষ খাট থেকে নেমে ওয়েটারের কাছ থেকে বিয়ারের বোতল নিয়ে খাটের উপর সেগুলো নিয়ে বসে গ্লাসে বিয়ার ঢেলে বলল, “অতি উৎসাহে কাজ করে বলেই তো মানুষের গাঁড় মারা যায়। সেটা নিয়ে কোন কালেই আমার কোন সন্দেহ ছিল না। যাক গে, কমপেনসেশন চাই। সেটার জন্য আমি কোন কমপ্রোমাইজ করব না”।

জামিলের দিকে তাকাল বিরূপাক্ষ, “যাওয়ার আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাস”।

জামিল বলল, “কাজটা ভাল হচ্ছে না বীরু”।

বিরূপাক্ষ বলল, “তোর বউ জানে ভাইঝির বয়সী একটা মেয়ের ফুটোর গন্ধে পাগল হয়ে তুই অফিস কামাই করে হোটেলে হোটেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? জানাবো?”

জামিল একবার সুভদ্রা, আরেকবার বিরূপাক্ষর দিকে তাকিয়ে বলল, “যাচ্ছি”।

দাঁড়াল না জামিল। জোর পায়ে বেরিয়ে গেল।

বিরূপাক্ষ বিয়ারের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে সুভদ্রাকে বলল, “দরজাটা দিয়ে জামা কাপড় খুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। এটাই আজ শাস্তি তোমার”।
১০
আটটা বাজল ঋভুর বাড়িতে পৌঁছতে। তাদের শরিকি বাড়ি। তিন তলা বাড়ির নিচে একটা ঘর তাদের, আর একবারে তিনতলায়।
সে নিচের ঘরে জুতো মোজা ছাড়ছিল, এমন সময় তার কাকার মেয়ে পিঙ্কি এসে বলল, “এই দাদাভাই, আজ একটা কেস হয়েছে”।
ঋভু বলল, “কী কেস হয়েছে?”
পিঙ্কি বলল, “আমি বলেছি বলবি না বল”।
ঋভু বলল, “বলব না। বল শিগগিরি”।
পিঙ্কি নিচু গলায় বলল, “আজ একটা ঘটক এসছিল। বম্মা, মা সব বসে বসে একগাদা ফটো দেখেছে”।
ঋভু বিরক্ত মুখে বলল, “সে কী?”
পিঙ্কি বলল, “হ্যাঁ রে। তোর বিয়ে এবার দিয়েই ছাড়বে মনে হয়”।
ঋভু রাগী গলায় বলল, “কাঁচকলা বিয়ে করব আমি। ও যাই দেখুক। দেখে যাক। আমি বিয়ে করছি না”।
পিঙ্কি ফিকফিক করে হাসতে লাগল, “ওরম বললে হয় নাকি? শোন না, কানের দিবি একটা”।
ঋভু বলল, “কানের গোড়ায় দেব। যাবি? খুব বেড়েছিস”।
পিঙ্কি পালাল। ঋভু তিনতলায় উঠে দেখল মা পান সাজছে। তাকে দেখে বলল, “দারুণ একটা মেয়ে দেখেছি তোর জন্য। একেবারে ফরসা টুকটুকে”।
ঋভু বলল, “দেখে লাভ নেই। বলেছি তো আমি বিয়ে করব না”।
মা বলল, “বিয়ে তোকে করতেই হবে। আর মাথা থেকে ওই সিনেমার ভূতটাও নামাতে হবে”।
ঋভু বলল, “অফিস থেকে এলাম। এখনই মাথা খেও না দয়া করে”।
মা বলল, “টেবিলের ওপর ছবি রাখা আছে। দেখ। ভাল বাড়ির মেয়ে। খুব ভাল নাচ করে”।
ঋভু বলল, “নাচ করে দিয়ে আমি কী করব?”
মা বলল, “ও মা, একটা এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটি লাগবে না? গায়ের রঙ দেখ। পুরো গমের মত”।
ঋভু বলল, “আমার ফরসা মেয়ে পছন্দ না। কালো মেয়ে বিয়ে করব। দেখেছি একজনকে”।
কথাটা সে মাকে রাগানোর জন্যই বলল।
মা সেটা শুনে গালে হাত দিয়ে বলল, “কোথায়? অফিসে বুঝি? কী অবস্থা! দেখাও হয়ে গেছে? কই দেখি!”
ঋভু বলল, “দেখানো যাবে না”।
মা উঠে তার কাছে এসে বলল, “তোকে আমার দিব্যি। দেখা বলছি”।
ঋভু মহা বিপদে পড়ল। মোবাইল বের করে কী করবে বুঝতে না পেরে সোনামনের ডিপি বের করে দিল।
সোনামনের ডিপিটা বেশ অদ্ভুত। মুখ ভেংচে সেলফি তোলা। দুটো চোখ গগনে।
মা দেখে বলল, “একী? পাগল নাকি মেয়েটা?”
ঋভু বলল, “হ্যাঁ। হেড অফিসের সব স্ক্রু ঢিলা আছে। তোমাদের জন্য এই মেয়েই ঠিক আছে”।
মা বলল, “শোন, এসব মেয়ে এ বাড়িতে চলবে না। তুই নিজের মুখে না করে দিবি”।
ঋভুর মাথা গরম হয়ে গেল। সে বলল, “এই মেয়েই চলবে এই বাড়িতে। বিয়ে করলে আমি এই মেয়েকেই করব, নইলে করব না”।
মা গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে বলল, “তুই একটা মেয়ের জন্য নিজের মায়ের বিপক্ষে চলে গেলি? এত বড় কথা বলতে পারলি?”
ঋভু বলল, “হ্যাঁ বলতে পারলাম। তোমাদের কাছে আমি দু বছর সময় চেয়েছিলাম। বার বার বলেছিলাম আমাকে দু বছর সময় দাও, সিনেমাটা হয়ে যাক, তারপর যাকে ধরে নিয়ে আসবে তার সঙ্গে বিয়ে করব। তা যখন করলে না, তখন এটাই তবে। বিয়ে করলে আমি এই মেয়েকেই করব, নইলে কাউকে করব না”।
মা কাঁদো কাঁদো মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাবা অফিস থেকে ফিরে পাড়ায় তাস খেলতে গেছিল। এসে ঋভু আর তার মাকে যুযুধান অবস্থায় দেখে বলল, “কী হয়েছে?”
মা বলল, “ওগো, দেখো তোমার ছেলে কোত্থেকে একটা কেলে কুচ্ছিত ভূত ধরে নিয়ে এসে বলছে বিয়ে করলে তাকেই করবে”।
ঋভুর বাবা অমিত বললেন, “তাই নাকি? কই দেখি?”
ঋভু ফোন বের করে বাবাকে দেখাল। অমিত দেখে বললেন, “বাহ। বেশ সুন্দরী তো। আমিও ছেলের সঙ্গেই আছি। বিয়ে করলে একেই করবি”।
ঋভুর মা রেগে মেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
১১
সুভদ্রা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিয়ার খেতে খেতে বিরূপাক্ষ সুভদ্রার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি বলছিলে তুমি জামিলদাকে ভালবাসো। বলছিলে না? তো জামিলদা তোমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল কেন সুভদ্রা? বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি জামিল শেখ তোমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল? তুমি নাকি তার প্রেমিকা?”
সুভদ্রা মাথা নিচু করল। এসি ঘরটাকে শীতল করে দিচ্ছি। সুভদ্রার ঠান্ডা লাগছিল।
বিরূপাক্ষ বলল, “বাংলা বাজারকে তুমি ভদ্রলোকের জায়গা ভেবে নিয়েছিলে নাকি মামণি? নিজের পছন্দের লোক না হলেই যেখানে কাঠি করা শুরু হয়, স্বার্থসিদ্ধি না হলে যেখানে প্রকাশক লেখকের নাম চরিত্রের দোষ দিয়ে দেয়, হুইস্পার ক্যাম্পেনিং করে যেখানে লেখক কবির নামে বদনাম রটানো হয়, সেখানে তুমি জামিলের কথায় আমার নামে খাপ খুলে দিলে?”
সুভদ্রা বলল, “জামিলদা বলল”।
বিরূপাক্ষ খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে বলল, “তোমার জামিলদা বেগতিক দেখে পালিয়েছে। তার বউ বড় চাকরি করে তাকে খাওয়ায়, আর তিনি কচি মেয়েদের খেয়ে বেড়িয়ে কবিতা মারান। তুমি আগের সপ্তাহে কী একটা পুরস্কার পেলে না, কোন ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর পুরস্কার না কী পুরস্কার, সেটাও তো এই জামিলদাই করে দিয়েছিল তাই না? তার বদলে কী দিলে? ক’রাত?”
সুভদ্রা কেঁদে ফেলল, “আমি বাড়ি যাব”।
বিরূপাক্ষ বলল, “যাবে তো। বাড়ি তো যাবেই। আমরা সবাই একদিন বাড়ি যাব। সেটাই আমাদের শেষ জার্নি। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার আগে তুমি আমাকে বল আমার বউকে ফেক প্রোফাইল থেকে কে মেসেজ করেছিল?”
সুভদ্রা বলল, “আমি। জামিলদা করতে বলেছিলেন”।
বিরূপাক্ষ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কোন শুয়োরের বাচ্চা বলে কাক কাকের মাংস খায় না? একজনের বই বিক্রি হয় বলে আরেকজন তার নামে কেচ্ছার গন্ধ পেলে বই লিখতে চলে আসে। এটা সাহিত্যবৃত্তি? এটা যদি সাহিত্যবৃত্তি হয় তাহলে এর থেকে বেশ্যাবৃত্তি ভাল। চল, এদিকে এসো, জামিলের নামে একটা খাপ খোল”।
সুভদ্রা তার দিকে হাঁ করে তাকাল।
বিরূপাক্ষ বলল, “এসো, এসো। ইহাই তোমার প্রায়শ্চিত্ত হোক। আচ্ছা, বেশি চাপ দিয়ে দিচ্ছি? ঠিক আছে, দেব না। তুমি জাস্ট জামিলের সঙ্গে তোমার একটা ছবি পোস্ট কর প্রোফাইলে। তাতে লিখে দাও, আমার ঈশ্বর। জামিলের বউ সাহানা তোমার প্রোফাইলে আছে না? বাকিটা ওই বুঝে নেবে”।
সুভদ্রা কাঁদতে শুরু করল আবার, বলল, “প্লিজ আমাকে অন্য কোন শাস্তি দাও। এটা করতে বোল না”।
বিরূপাক্ষ জিভ দিয়ে চুক চুক করে শব্দ করে বলল, “উহু। সাপের লেজে পা দিয়েছো মামণি। এর কমে রেহাই দেওয়া সম্ভবই না। অসম্ভব। যা বলছি কর। ফোন বের কর”।
সুভদ্রা বলল, “প্লিজ”।
বিরূপাক্ষ বলল, “কোন প্লিজ না। যা বলছি, করে ফেলো। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবির চরিত্র উন্মোচিত হোক। দশ গুণব, দশের মধ্যে করলে ভাল, নইলে ওকে নিয়ে খাপ খুলতে হবে। বল কী করবে। এক, দুই, তিন…”
সুভদ্রা তাড়াতাড়ি তার ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, “করছি”।
বিরূপাক্ষ বলল, “দেখি, গ্যালারি দেখি, কোন ছবি পোস্ট করতে হবে সেটাও বলছি”।
সুভদ্রা বলল, “না না, আমি করে দিচ্ছি”।
বিরূপাক্ষ বলল, “উহু, ফোনটা দাও”।
সুভদ্রা হাত বাড়িয়ে তার ফোন দিল।
বিরূপাক্ষ মন দিয়ে সেই গ্যালারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “বাওয়া! জামিলের সঙ্গে আজকাল বহুত ঘোরঘুরি হয় দেখছি। দারুণ ব্যাপার। কত জায়গা যাওয়া হচ্ছে? উরিব্বাস! মন্দারমণিও? এই তো, সমুদ্রের সামনে দুজনে, এই ছবিটা পোস্ট কর”।
সুভদ্রা বলল, “বউদি জানে জামিলদা কবিতা পাঠ করতে গেছিল”।
বিরূপাক্ষ বলল “ভাল তো। ধরে নাও তোমার নাম কবিতা। তোমাকে পাঠ করতে মন্দারমণি নিয়ে গেছিল। চাপের কী আছে? চল চল, এটা পোস্ট কর, আর যে ক্যাপশনটা দিতে বললাম, দাও”।
সুভদ্রা কাঁপা কাঁপা হাতে বিরূপাক্ষর নির্দেশ শুনে কাজ করল।
বিরূপাক্ষ খুশি হয়ে বলল, “দ্যাটস লাইক এ গুড গার্ল। নাও কাম টু ইওর ড্যাডি”।
১২
সন্ধ্যেগুলোয় ভীষণ ডিপ্রেশন আসে হৈমন্তীর। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বিকেলের দিকে। কিন্তু সন্ধ্যের পর আর কিছু ভাল লাগে না।
মাঝে মাঝে হিমাদ্রি খোঁজ নেন। কিন্তু সেসব যত দিন যাচ্ছে, কমছে। বাপের বাড়ি বা নিজের বাড়ি বলে মেয়েদের কিছু হয় না, প্রতি মুহূর্তেই উপলব্ধি করে সে।
একমাত্র ভাইটাই তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে।
বিরূপাক্ষও তো এককালে বাসত। এখন আর বাসে? হৈমন্তী বুঝতে পারে না। একজন মানুষ, পৃথিবীর সবার সঙ্গে ঝামেলা করে বেড়াচ্ছে, অথচ বাড়ি এসে খাটে শুয়েই ঘুম। শিশুর মত। বড় বড় কথা কোন কালেই বলে নি বিরূপাক্ষ। বরাবরই বলে এসেছে “আমার সঙ্গে থাকলে ভাল থাকবে না হিমু। আমি লোকটা ভাল নই”।
প্রেম করত তখন তারা। নন্দন চত্বরে কবিতা পড়ছে বিরূপাক্ষ, সঙ্গে সেও গেছে। বাকি কবিরা তাকে আড়চোখে মাপছে। বিরূপাক্ষ তাকে আগলে রাখত যেন। বলেই দিত, “কারো সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই, এগুলো সবক’টা চরিত্রহীন। কবি মাত্রেই বহুগামী। আমিও হব একদিন। ভাল কথা বলছি, পালিয়ে যাও, থেকো না”।
হৈমন্তী হাসত। ভাবত ইয়ার্কি মারছে বিরূপাক্ষ। ব্যাপারটা যে কতটা সত্যি সে তখন বোঝে নি। বিয়ের ছ মাসও গেল না, হৈমন্তী জানতে পারল বিরূপাক্ষ একজনের সঙ্গে জড়িয়েছে। জিজ্ঞেস করায় বলে দিল “তোমাকে তো বলেছিলাম, আমাদের চরিত্র ভাল না। বলি নি?”
হৈমন্তী কিছু বলে নি। নিজেকে বুঝিয়েছে এগুলো স্বাভাবিক। একজন সাধারন মানুষ, আরেকজন কবির জীবন আলাদা হবেই। কী করে এক হবে?
সংসারে মন দিয়েছে সে। ধীরে ধীরে তার থেকে দূরে সরতে লাগল বিরূপাক্ষ। আগের মত তাকে আর কোন কবিতাপাঠের আসরে নিয়ে গেল না।
একদিন বলল, “অন্য কেউ তোমাকে দেখে ফ্যান্টাসাইজ করবে, আমি মেনে নিতে পারব না হিমু”।
হৈমন্তী একা একা কেঁদেছে। তাকে দেখে ফ্যান্টাসাইজ করবে সেটা মেনে নিতে পারবে না, অথচ নিজে অন্য মেয়েদের সঙ্গে হোটেলে শুয়ে আসবে?
একদিন মাকে বলল। মা সোয়েটার বুনছিল। তাকে বলল, “তুই বেঁধে রাখতে পারছিস না ওকে? ঠিক ঠাক দেখে রাখিস না বুঝি?”
হৈমন্তী অবাক হয়ে গেল। এখানেও তার দোষ? তাকেই বেঁধে রাখতে হবে?
বাবা মার কাছ থেকে শোনার পরে তাকে ঠারে ঠোরে বলে দিয়েছে বয়স হয়েছে, মেয়ে কোন ভুল সিদ্ধান্ত যেন না নিয়ে নেয়। এই বয়সে আবার কোন ঝামেলা নেওয়া সম্ভব না।
হৈমন্তী তারপর থেকে পাথর হয়ে গেছে। কারো কাছে কোন অভিযোগ করে না। শুধু মাঝে মাঝে সব এলোমেলো হয়ে যায়। মাথায় একটাই চিন্তা আসে তখন।
যেভাবেই হোক বেরিয়ে যেতে হবে। কোথাও একটা গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। একা থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে।
প্রেগনেন্সী কিটের পজিটিভ চিহ্নটা খুশি করতে পারে নি তাকে। আরো দ্বিধায় ফেলেছে। বাড়িতেও বলে নি, বিরূপাক্ষকেও না।
তাকেই সময় দিতে পারছে না যে, তার সন্তানকে দেবে কী করে? হৈমন্তী ভেবেছে সব নষ্ট করে দেবে। যে ভালবাসাই এখন আর বেঁচে আছে কিনা বোঝা যায় না, সে ভালবাসার ফসলকে পৃথিবীতে এনে কী হবে? পরক্ষণে মনে হয় সে আসলে হয়ত বিরূপাক্ষ পাল্টে যাবে। ক্ষীণ আশা জাগে। যদিও সে বিরূপাক্ষকে এতদিনে যা চিনেছে, তাতে বুঝতে পারে এতে কিছুই উনিশ বিশ হবে না। তবু নিজের গর্ভের সন্তানকে খুন করার চিন্তা মাথায় আনতে পারে না হৈমন্তী।
ফোন বাজছিল তার। বিরূপাক্ষ। ধরল, “বল”।
বিরূপাক্ষ বলল, “একটা মজা দেখবে?”
হৈমন্তী বলল, “বল”।
বিরূপাক্ষ বলল, “সকালে যে মেয়েটা আমার নামে খাপ খুলেছিল, দেখো এখন জামিলদাকে কেস দিয়েছে”।
হৈমন্তী শুকনো গলায় বলল, “ও। তাই?”
বিরূপাক্ষ বলল, “তাই মানে? তুমি খুশি হও নি?”
হৈমন্তী শ্বাস ছেড়ে বলল, “কখন আসবে?”
বিরূপাক্ষ বলল, “আজ আসব না। জরুরি কাজ আছে। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে”।
হৈমন্তী বলল, “যে মেয়েটা তোমাকে নিয়ে খাপ খুলেছিল, তাকেই শিক্ষা দিচ্ছো, তাই না?”
বিরূপাক্ষ বলল, “ইউ আর সাচ এ সুইটহার্ট। কাল দেখা হবে। বাই”।
ফোন কেটে গেল।
হৈমন্তী চুপ করে বসে রইল।
ভাবল একবার ফেসবুক খুলে দেখবে।
পরক্ষণেই আর ইচ্ছা হল না।
১৩
রাত আটটা।
কাফে জমছে একটু একটু করে। তাপস রান্নায় ব্যস্ত।
ক্রিকেট ম্যাচ দেখাচ্ছে টিভিতে। লোকজন সেটা দেখতে দেখতেই অর্ডার করছে।
হিমাদ্রিবাবু কাফেতে এলেন।
রা দেখে বলল, “বাঁচিয়েছো বাবা, ভাল সময়ে এসেছো, ক্যাশে বসে পড় শিগগিরি”।
হিমাদ্রি বললেন, “ধুস, আমি ক্যাশে বসতে আসি নি। দেখে চলে যেতাম”।
রা বলল, “বস বস। কফি দিচ্ছি”।
হিমাদ্রি বললেন, “ঠিক আছে”।
হিমাদ্রি ক্যাশে বসলেন।
তাপস ফিশ ফিশ ভাঁজছিল। বলল, “কাকাবাবু খুব ভাল মানুষ দাদা। এরকম বাবা পাওয়া যায় না”।
রা বলল, “সেটা ঠিক। তবে আমার ওপরও অনেক চাপ আছে। কাফে দাঁড় করাতে না পারলে ব্যাপারটা কী হবে বুঝতে পারছিস?”
তাপস বলল, “তবে অনীশকে কাজে রেখে ভাল করেছো। তোমার ওপরেও অনেক চাপ পড়ে যাচ্ছে। এত পড়াশুনো করে কফি শেক তৈরী করছো, দেখে কেমন কেমন লাগে”।
রা বলল, “নিজের ব্যবসায় কুলিগিরি করেও লাভ রে পাগলা। আমার কোন সমস্যা নেই। দেখি তিন নম্বরের অর্ডারটা ট্রেতে দে। দিয়ে আসি”।
তাপস বলল, “ধুস, কাকাবাবু দেখলে রেগে যাবেন। আমি দিয়ে আসছি”।
রা বলল, “না। আমাকেই দে। রাগ করবে না। চাপ নেই”।
তাপস অর্ডারটা রেডি করে দিল।
রা অর্ডারটা দিতে গেল। দুটো মেয়ে গম্ভীর মুখে মোবাইল ঘেঁটে যাচ্ছে। রা টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিল।
হিমাদ্রি ইশারায় রাকে ডাকলেন। রা বাবার কাছে গিয়ে বলল, “বল”।
হিমাদ্রি ফিসফিস করে বললেন, “ওই যে টেবিলে সার্ভ করলি, হলুদ ড্রেস পরা মেয়েটা বেশ ভাল লাগছে। বিয়ে করবি?"
রা মাথায় হাত দিয়ে বলল, “তুমি বাড়িতে এত বড় বড় কথা বল আর দোকানে এসে এসব করছ?”
হিমাদ্রি বললেন, “আমার কী? আমি তোর ভালর জন্য বললাম। একটা বিয়ে করলে দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতিস”।
রা বলল, “হ্যাঁ, পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান ওই বিয়েই”।
হিমাদ্রি বললেন, “তোর জন্য তো বটেই”।
রা বলল, “এসব কথা ছাড়ো, কাজের কথা শোন, আরেকটা ছেলে রিক্রুট করেছি। ছেলেটা অ্যাপ ডেলিভারি বয়”।
হিমাদ্রি বললেন, “হিন্দু তো?”
রা অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
হিমাদ্রি গলা নামিয়ে বললেন, “এ কলকাতা আর আগের কলকাতা নেই। কালকেই খবরে পড়লাম কোন জায়গায় নাকি এক ডেলিভারি বয় মুসলিম বলে খাবার ক্যান্সেল করে দিয়েছে”।
রা বলল, “সেরকম খদ্দেরকে আমি খাবার দেবও না, এটুকু সিওর থেকো”।
হিমাদ্রি বললেন, “মানে ছেলেটা মুসলমান?”
রা বলল, “না হিন্দু। তবে আমি অন্তত ওসব দেখব না”।
হিমাদ্রি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কাফেতে একজন ঢুকে সরাসরি ক্যাশের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “এই কাফের ওনারের সঙ্গে কথা বলতে পারি?”
হিমাদ্রি রা-কে দেখিয়ে দিলেন, “এই তো বলুন”।
ভদ্রলোক রা-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, বলা যাবে?”
রা বলল, “বলুন”।
ভদ্রলোক ইতস্তত করলেন, “এখানে? এন্টায়ার কাফে বুকিং দরকার ছিল শুটিং এর জন্য”।
রা বাবার দিকে একবার তাকিয়ে ভদ্রলোককে বললেন, “আসুন আমার সঙ্গে”।
কাফের ব্যালকনিতে দুটো চেয়ার নিয়ে একটায় ভদ্রলোককে বসিয়ে রা বলল, “বলুন”।
ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম অসিত রক্ষিত। টালিগঞ্জের এক প্রোডাকশান হাউজে কাজ করি। উইক ডেজে যে কোন দিন আপনার কাফেটা যদি আমরা শ্যুটিং এর জন্য নি, তাহলে কী রকম টাকা লাগবে যদি একটু বলেন”।
রা অসিত বাবুর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “দেখুন, সবে তো কাফেটা স্টার্ট করেছি। এখনই এসব ব্যাপারে কত টাকা লাগে সেই এস্টিমেট আমি দিতে পারব না। আপনি একটা কনট্যাক্ট নাম্বার দিয়ে যান, আমি আজ রাতে আপনাকে বলে দিই?”
অসিত একটা কার্ড পকেট থেকে বের করে বললেন, “এই যে”।
রা বলল, “কাফে সেট আপ তো স্টুডিওতেই করে নেওয়া যেত। এর জন্য কাফে ভাড়া নিতে হচ্ছে কেন?”
অসিত বললেন, “জানি না। আমাদের এক উঠতি প্রোডিউসার খুব করে ধরেছেন অন্তত একটা দিন যেন এখানে শ্যুট করা যায়। আমাদের আর কী কাজ? যা বলে, তাই মুখ বুজে করতে হবে”।
রা অবাক হয়ে বলল, “আজব তো! উঠতি প্রোডিউসার? কী নাম?”
অসিত বললেন, “দময়ন্তী ব্যানার্জি। রনি ব্যানার্জির মেয়ে। এখন বাপের ব্যবসা তিনিই সামলাচ্ছেন। চেনেন নাকি?”
রা কিছু বলল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, “ওকে বলে দেবেন, এই কাফেতে শ্যুটিং করা যাবে না। আমি এখনই আপনাকে ডিসিশন দিয়ে দিচ্ছি। আর রাতের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই”।
অসিত হাঁ করে রা-এর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
(ক্রমশ)

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান