সেই দিনগুলো

অভীক দত্ত

 



এখন প্রায় সব বাচ্চাই দেখি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে।
আমরা বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়েছি। ফোর অবধি প্রাইভেট স্কুল, ফাইভ থেকে সরকারি স্কুল।
প্রাইভেট স্কুলে আঁটোসাঁটো নিয়ম কানুন ছিল।
সরকারি স্কুলে সেসব ছিল না।
ফাইভে আমাদের মা বাবারা পড়লেন ভারি সমস্যায়।
কারণ আর কিছুই না। স্কুল যখন তখন ছুটি হয়ে যেত। ফোর অবধি তো রিক্সাকাকু বা ভ্যানকাকুরা ঠিক স্কুল শেষ হলেই বাগে করে তুলে নিতেন, এই স্কুলে তারা খবরই পেতেন না।
কোন দিন স্কুলের সভাপতি মারা গেলেন, কোন দিন বা কোন নেতা মারা গেলেন, ব্যস!
স্কুল ছুটি হয়ে যেত।
এলাকায় কেউ মারা গেলেই ছাত্রদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করত।
এরকম দিনগুলোতে সাধারণত প্রেয়ারের পরেই হেডস্যার ছুটির ঘোষণা করতেন।
আমরা দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করতাম।
দেখা গেল কেউ মারা গেছেন বলে ছুটি ঘোষণা হয়েছে, ওদিকে ছুটি ঘোষণা হওয়া মাত্র ছেলেরা হই হই করে উল্লাস করতে করতে স্কুলের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের বাড়ির লোকেরা চিন্তায় পড়তেন, কারণ ছুটি হয়ে গেলে আর ভ্যান রিক্সা কিছু থাকত না। আমরা হেঁটে ফিরতাম। ওদের যেটা চিন্তার কারণ ছিল, আমাদের ছিল সেটা মজার ব্যাপার।
আমরা বন্ধুরা মিলে লাফাতে লাফাতে স্কুল থেকে ফিরতাম।
হঠাৎ স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পর হাঁটতেও ভারি মজা লাগত।
স্কুল হলে অবশ্য ব্যাপারটা মোটেও মজার ব্যাপার হত না। কোন কোন স্যার থাকতেন, ছাত্র না পিটিয়ে খুশি হতে পারতেন না। এক স্যার ইতিহাস নিতেন।
পাতা ধরে মুখস্ত নিতেন। “চাইর পাতা থিকা পাঁচ পাতা মুখস্ত কইরা আসবি”।
যে ছাত্র মুখস্ত করতেন না, তাকে ডাকতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে “শুয়ারডা” বলে দুম করে কিল মারতেন। সে ছেলে কোলাব্যাঙের মত মাটিতে পড়ে কান্নাকাটি জুড়ত।
মুলত সেই স্যারের ভয়েই ছাত্ররা সবাই ইতিহাস ভাল করে মুখস্ত করে যেত।
আরেক স্যার ছিলেন ক্লাসে বেচাল দেখলেই সবার পেটে চিমটি কাটতে শুরু করতেন। সে এমন চিমটি, পেটে খাবার পর আর সুস্থ থাকা যেত না।
আমাদের ক্লাসরুমগুলোতে ফ্যান ছিল না। তীব্র গ্রীষ্মেও ফ্যান নেই। বাথরুম শেষ কবে পরিষ্কার করা হয়েছে কে জানে। ক্লাস সেভেন থেকে আমায় সাইকেল দেওয়া হত। বড় বাইরে পেলে স্যারদের বলে বাড়ি গিয়ে বড় বাথরুম করে আসতাম। আরেকটা আকর্ষণ ছিল অবশ্য। দুপুর আড়াইটা থেকে তখন “যুগ” হত। বিপ্লবীদের নিয়ে সিরিয়াল।
যুগের আকর্ষণ ছিল অমোঘ। সপ্তাহে দু থেকে তিন দিন স্কুলের যত দস্যি ছেলে আছে, তাদের দুপুর দুটো পনেরো নাগাদ “বড় বাইরে” পেত। সাইকেল নিয়ে সবাই বাড়ি গিয়ে যুগ দেখে তিনটে দশ পনেরোতে ঢুকত। লাস্ট পিরিয়ডে নাম ডাকা হত। তাই বাড়ি গিয়ে বসে থাকার কোন উপায় থাকত না।
স্কুল করতে করতেই পরীক্ষা এসে যেত। সারা বছরে মাত্র দুবার পরীক্ষা হত। হাফ ইয়ারলি, আর অ্যানুয়াল (আমরা বলতাম অ্যানুয়ারলি)।
খাতা দেখাত যেদিন, খুব টেনশন হত। দুম করে স্যার সব খাতা নিয়ে হাজির হয়ে গেলেন। রোল নাম্বার ধরে ধরে খাতা দিতেন। দুরু দুরু বুকে সে খাতা দেখা, নাম্বার যোগ করা এবং বাড়ি ফিরলে মাকে দেখানোর পর ঠ্যাঙানির দৃশ্য সব একসঙ্গে চোখে ভাসত নাম্বারটা দেখলেই।
সব থেকে প্রিয় ক্লাস ছিল লাইব্রেরী ক্লাস। কত ভাল ভাল গল্পের বই থাকত। ওখানেই বুদ্ধদেব গুহর “গুগুনোগুম্বরের দেশে”, “রু আহা”, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি”, “গোঁসাইবাগানের ভূত”, সুনীল গাঙ্গুলির “সবুজ দ্বীপের রাজা” প্রথম পড়ি। এক সপ্তাহ বই নিয়ে যেতে হত, পরের সপ্তাহে বই ফেরত দিয়ে আরেকটা বই। এখনও মনে আছে মঙ্গলবার করে লাইব্রেরী ক্লাস হত। মঙ্গলবার রাতেই সে বই শেষ হয়ে যেত। কাতর হয়ে অপেক্ষা করতাম পরের মঙ্গলের জন্য। ক্লাস সিক্স নাগাদ এলাকার লাইব্রেরীর মেম্বারশিপ নিলাম।
বই-বই-বই। বাড়িতে বই পড়লেও, লাইব্রেরীতে গিয়ে যেন পাগল হয়ে গেলাম। কী নেই? হেমেন্দ্রকুমার রায় থেকে শুরু করে প্রেমেন্দ্র মিত্র! চাঁদমামা, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা, শুকতারা রাখা হত লাইব্রেরীতে। যেদিন স্কুল ডুব মারতাম, সেদিন দুপুরে লাইব্রেরী চলে যেতাম। দু তিন ঘন্টা লাইব্রেরীতে কাটাতাম। কোন তাকে কী বই আছে মুখস্ত হয়ে গেছিল। কোন কোন দিন একটা বই নিয়ে গিয়ে পরের দিনই বইটা ফেরত দেওয়ায় লাইব্রেরীয়ান সন্দেহ প্রকাশ করতেন।
একদিন পড়া ধরলেন। যখন দেখলেন পড়া পারছি, ভারি খুশি হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, তুমি দুটো বই নিয়ে যেতে পারো”।
সে এক আলাদাই মজা ছিল।
লাইব্রেরী থেকে ফিরে বাড়িতে বই রেখেই মাঠে ছুট। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত যে ঋতুই হোক। খেলা হবেই।
এক বর্ষায় কাঁদায় দাপিয়ে খেলে গোটা শরীরে কাঁদা মেখে বাড়ি ফিরছিলাম। এক পিসেমশাই কোলকাতা থেকে এসে আমাকে দেখে ঠাকুরদাকে বললেন, “একী অবস্থা? একে হোস্টেলে দিয়ে দিন, এখানে মানুষ হবে না”।
ঠাকুরদার ছিলাম আমি প্রাণ। এই প্রস্তাব শুনে ঠাকুরদা সেই পিসেমশাইকে পারলে ছাতা নিয়ে তাড়া করেন। খুব রেগে গিয়ে বলেছিলেন, “এই বয়সে খেলবে না তো কোন বয়সে খেলবে?”
এখন যখন অফিস থেকে ফেরার সময় খেলার মাঠের কোণে দেখি ছোট ছোট ছেলেরা মোবাইলে পাবজি খেলতে ব্যস্ত, তখন ঠাকুরদার সেই কথাটাই মনে পড়ে যায়, “এই বয়সে খেলবে না তো, কোন বয়সে খেলবে?”
(ক্রমশ)

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান