যাত্রাকালীন

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

অতঃপর অর্জুনের নিষেধে উদ্যত অনুরোধ, মিনতি, চিৎকার উপেক্ষা করে ধৃষ্টদ্যুম্ন নিখাদ আঘাতটি করলেন। অতঃপর কুরু-পান্ডব-পাঞ্চাল সেনানীর সম্মুখে নিতান্ত হেলায় অশীতিপর বৃদ্ধের ছিন্ন মস্তকটি প্রদর্শন করে হেলায় ফেলে দিলেন ভূমিতে। অতঃপর ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে সংঘটিত হলো একটি পান্ডবপক্ষীয় পাপ। অতঃপর সসাগরা পৃথিবী তাঁর কিংবদন্তীপ্রতিম অস্ত্রগুরুকে হারালো।
গাঙ্গেয় ভীষ্মের পতনের পর পাঁচদিন যুদ্ধ পরিচালনা করে – আচার্য দ্রোণ – নিহত হলেন।
~
কতক্ষণ চলেছেন – কত প্রহর – দ্রোণ প্রচেষ্টা করেও বুঝতে পারলেন না। সময়ের বোধ বোধহয় নিতান্ত পার্থিব। কে জানে, এই কারণেই জীবনচর্যাকে সাময়িকী মায়ার সাথে একাঙ্গী করে দেখা হয় কিনা?
অথচ এই সাময়িক অবস্থিতি, নিতান্ত ক্ষণিকের গৌরবে মন্ডিত হতেই এতো যুদ্ধোন্মাদ হুহুংকার – লোকক্ষয়।
ভরদ্বাজতনয় দ্রোণ যদি জীবিত থাকতেন – তাহলে হয়তো একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করতেন।
শুধু সময়ের বোধ নয় অবশ্য – অতিক্রান্ত দূরত্বের পরিমাপ - তজ্জনিত ক্লান্তিবোধ – ক্ষুধা-তৃষ্ণা – সমস্ত কিছু পেরিয়ে পারিপার্শ্ব যেন বা সৃষ্টির সময় থেকেই এক কৈবল্যবোধে আচ্ছন্ন। আবহাওয়াবোধ নেই বলতে গেলে – বিপরীতগামী শীত ও গ্রীষ্মবোধের মধ্যবর্তী চারদিকের জলবায়ুতে - এক নিসঃঙ্গ নাতিশীতোষ্ণ ঘটমান বর্তমান।
‘এই চিরনিঃসঙ্গতাপ্রাপ্তি র নামই কি অমরাবতী?’ – দ্রোণ নিজেকেই অনুচ্চারিত প্রশ্ন করলেন, সম্ভবতঃ নিজেরই অজান্তে।
‘না ভারদ্বজ’ – অনতিদূরে এক অদৃশ্য কিন্তু বহুপরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন দ্রোণ।
ভ্রম? ভ্রমই বোধহয়? একথা বোধহয় ঠিক নয় যে, মরণোত্তর এই স্বর্গযাত্রাতে ক্লান্তিবোধ নেই। কোনো অপ্রস্ফুটিত ক্লান্তিই বোধহয় মস্তিষ্ককে ভুল পথে চালনা করছে।
‘না ব্রাহ্মণ। ভ্রম নয়। যা তোমার শ্রব্য হয়েছে – তা নির্জলা সত্যি’।
মহারাজ দ্রুপদ – সশরীরেই অবতীর্ণ হলেন - দ্রোণ বা দ্রোণের আত্মার সমগ্র শরীর বা শরীরবোধে আলোড়ন ঘটিয়ে – পৃথিবী হলে যেই অনুভূতিকে দেহ কন্টকিত করা বলা যেতো।
‘পাঞ্চালাধিপতি?’
‘ভুল করছো দ্রোণ, ভূতপূর্ব পাঞ্চালাধিপতি’।
‘তোমার মৃত্যু তো’-
‘কালই হয়েছে। তোমারই ভল্লক্ষেপণে’।
‘তাহলে? এই পথে এখনো? কি করছো?’
‘অপেক্ষা’।
‘অপেক্ষা?’
‘তোমার আগমনের’।
~
অপেক্ষার হেতু জানানোর পরে বেশ কিছুক্ষণ দ্রুপদ ও দ্রোণ পাশাপাশিই চললেন – নির্বাক।
অমরাবতী যাবার এই পরম নিঃসঙ্গ- নিষ্ঠুর- নির্লিপ্ত যাত্রায় যেন সঙ্গীদেরও কথা বলা বারণ।
মৌনতা ভঙ্গের দায় কাউকে নিতেই হতো – দ্রুপদই নিলেন – ‘কুরুপান্ডব যুদ্ধে আমার ওপর পরম আক্রোশটা তুমি ধর্মযুদ্ধের নামে, পাঞ্চালদের গণহত্যা সাধিত করে না নিলেই পারতে ব্রাহ্মণ’।
দ্রুপদ ভেবেছিলেন কথাটা তুলবেন না। পার্থিব মায়া-মোহ-মমতার দায় কাটিয়ে এসে এসব অপ্রাপ্তি-অসুখের কথা বলার অর্থ, অবিনশ্বর এই মৃত্যুপরবর্তী জীবনের ভার বাড়ানো।
তবু পিতৃহারা হবার পর থেকে – মহারাজ পৃষতের পুত্র দ্রুপদ মহামান্য পাঞ্চালরাজ। নিজের দায় না থাকলেও প্রজাপালনের একটা দায়, প্রজাদের এতোদিনের অভিভাবকের থেকেই যায় – দ্রুপদ নিজ মোহ-মায়াহীন শান্তির পরমাশ্রয়ী হবার লোভে – সেই দায় কাটাতে চান না। সে তাঁর স্বভাবও নয়।
দ্রোণ এই প্রশ্ন হয়তো আশা করেছিলেন। তাই তার কোনো বিকার দেখা গেলোনা। শুধু আরো কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন।
মহারাজ দ্রুপদও এই ব্রহ্মক্ষত্রিয়ের মৌনতাভঙ্গের অপেক্ষা করলেন। আজ তাঁদের কারোরই কোনো শীঘ্রতা নেই।
কিছু সময় অথবা না-সময় অতিবাহিত হলে দ্রোণ তাঁর প্রতিপ্রশ্নটি করলেন – ‘আমরা দু’জনেই কি খুব খুব,ভীষণ একটা ব্যক্তিগত যুদ্ধই করছিলাম না?’
‘হয়তো দ্রোণ’ – দ্রুপদ বললেন – ‘কিন্তু তাঁর বীজ যে অনেক গভীরে প্রোথিত করেছ তুমিই, বহুপূর্বে। তোমার শিষ্য কুরু এবং মুখ্যতঃ অর্জুনের হাতে আমায় যুদ্ধে নিগৃহীত করে। প্রতিশোধ নেওয়াটা তো আমার প্রাপ্য ছিলো’।
‘যা তোমার পুত্র নিলো। নিতান্ত ধ্যানমগ্ন অশীতিপর তাঁর অস্ত্রগুরুর মস্তকে তরবারির আঘাত করে। পিতৃঋণের কি ভয়ানক উৎকেন্দ্রিক পরিণতি!’
‘কিন্তু তোমার প্রতিশোধটা কার ওপরে ছিলো দ্রোণ? আমার তো রাগের সঙ্গতঃ কারণ ছিলো – তোমার শিষ্যের হাতে আমার নিগ্রহ। আমার তনয়া দ্রৌপদীসহ সমগ্র জামাতাকুলের নিগ্রহ কৌরবদের হাতে – যেটা থামাতে তুমি প্রায় কিছুই করোনি’।
‘কিছুই করিনি? দুর্যোধনকে বারংবার নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা করিনি?’
‘কখন? যখন সে মদগর্বী উচ্ছৃঙ্খল অনিয়ন্ত্রিত – তখন দূরদর্শিতায় পরিণতি দেখতে পেয়ে – তাঁর আগে? অক্ষক্রীড়ার আসরে বিদুর আর বিকর্ণ ভিন্ন আর কেউ – আর কোনো মহামান্য কুরুসভাসদ প্রতিবাদ করেছিলে? দ্রৌপদীর ভূলুন্ঠিতা মানমর্যাদার পক্ষ নিয়ে? কেউ বিরাটের যুদ্ধে অর্জুনকে দেখে বলেছিলে এই অন্যায় যুদ্ধে আমি কৌরবপক্ষে লড়বো না?’
‘অর্থের ঋণ দ্রুপদ’।
‘তুমি সমগ্র উত্তর পাঞ্চালের অধিপতি ছিলে দ্রোণ, মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত – ভীষ্মের বৃত্তিধারী হয়ে আজীবনকাল বাঁচবার – তোমার কোনো দায় ছিলোনা। তুমি কেন তখনো প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলছিলে দ্রোণ? তোমার কিসের প্রতিশোধ নেওয়া বাকি ছিলো আমার ওপর?’
দ্রোণ এই জলস্রোততুল্য অভিযোগরাশির মধ্যে তৃণ অবলম্বন খুঁজে পেতে চেয়ে – বোধ হয় কিছুই পেলেন না।
‘তোমার কেন মনে হয় আমি নিজের প্রতিশোধস্পৃহায় কুরুপক্ষে লড়লাম?’
‘আগেই তো বলেছি দ্রোণ – তুমি সমগ্র যুদ্ধে পান্ডবপক্ষীয় কোনো মহাবীরকে স্পর্শ অবধি করলে না – তোমার সমস্ত ব্রাহ্মণ্য বুদ্ধিমত্তা, সমস্ত ক্ষত্রিয়সুলভ শৌর্য – শুধু এবং শুধুমাত্র পাঞ্চালদের অভিমুখী করে রেখে দিলে – পঞ্চদশ দিবসের পতনের পূর্বে। প্রতিশোধ নয়?’
‘হয়তো’।
‘কিন্তু কেন?’
‘সম্ভবতঃ - সম্ভবতঃ ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্মের জন্য’।
‘ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্মের জন্য?’
‘তুমি আমার হন্তা হিসেবে ধৃষ্টদ্যুম্নকে লাভ করেছো যজ্ঞ বিভূতি হিসেবে – তা জেনে বুঝেছিলাম – তুমি কিছুই ক্ষমা করোনি। কিছুই ভোলোনি – এই দায় আমাদেরকে আমরণ বহন করতেই হবে – যা একদা কোনো বিস্মৃতপ্রায়কালে – বন্ধুত্ব ছিলো’।
দ্রুপদের নিশ্চুপ থাকার সময় এলো।
দ্রোণ তাঁর ব্রাহ্মণ্য ধী ধারণ করেই বললেন – ‘অনেক কথাই বলতে হবে দ্রুপদ, এখনই উপযুক্ত ক্ষণ’।
~
‘আমি ব্রাহ্মণ হতে চেয়েছিলাম দ্রুপদ, আমার ধ্বজাতেও তাই যজ্ঞবেদী চিহ্ন। কিন্তু পারিনি। অথবা মানবিক দোষগুণ আমাকে থাকতে দেয়নি। আমি আমার পিতা মহর্ষি ভরদ্বাজের কাছে নিতান্ত বিনোদনের তরেই অস্ত্রশিক্ষা করেছিলাম। পিতার কাছে তা অবসরবিনোদনই ছিলো। আমার কাছে যা জীবিকা হয়ে দাঁড়ালো’।
‘কেন?’
‘ব্রাহ্মণ্যবৃত্তি সম্বন্ধে সামাজিক মনোভাবে। ব্রাহ্মণ বলতে অবশিষ্ট সমাজ যা বোঝে তা আমি কোনোকালেই গ্রহণ করতে পারিনি তাই – ব্রাহ্মণ্য জীবন মানেই যজ্ঞবৃত্তি – ব্রাহ্মণ্য জীবন মানে ত্যাগমহিমা – ব্রাহ্মণ্য জীবন মানেই পরভৃতের ন্যায় দারিদ্র্যযাপন – ব্রাহ্মণ্য জীবন মানেই ক্ষত্রিয়রাজমুখাপেক্ষ ী জীবিকানির্বাহ অথবা সংসারের চাহিদার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তপস্যায় দিনযাপন – আমার মনোভাবের অনুকূল ছিলোনা – কোনোদিনই। আমার স্ত্রীর দারিদ্র্য, পুত্রের কষ্টের কথা ছেড়েই দাও – আমি স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিলাম দ্রুপদ। তুমি অথবা তোমার পাঞ্চাল – ব্রাহ্মণ্যধর্মের কিংবদন্তী পীঠস্থান পাঞ্চাল – আমাকে স্বাবলম্বী থাকতে দেয়নি। যা হস্তিনাপুর দিয়েছিলো’।
‘তুমি চতুর্বগের বিপরীত চিন্তা করেছিলে দ্বিজ – সৃঞ্জয় পাঞ্চালদের কাছে তুমি ধর্মনাশক ভিন্ন কী?’
‘চতুর্বগের উত্থান তো মানুষের কার্যকে নির্দিষ্ট করে নিজ কর্তব্যে স্থিত রাখার জন্য। মানবমনের আকাঙ্খাকে গন্ডিতে আবদ্ধ করার জন্য নয়’।
‘ভুল করছো দ্রোণ। সনাতন ধর্ম আকাঙ্খাবিহীন কার্যেই প্রণিপাত করতে বলে’।
‘জানি – আর জানি বলেই – ব্যাথাজর্জর দ্বিচারিতা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হলো’।
‘তোমাকে বুঝতে পারছিনা দ্রোণ’।
‘পারবে না রাজা। ব্রাহ্মণ্যধর্মের অবগুন্ঠনের ভিতর থেকে তুমি দ্রোণকে চিরকালই ভুল বুঝবে – তুমিও ভুল বুঝবে, ভাবীকালও তাই। আর এইভাবে এই সমাজ, এই চিরন্তন নদীনদের নাব্য অববাহিকায় গড়ে ওঠা দেশ – এই ভারতবর্ষ – এই পৃথিবী- ধর্ম শব্দটার অর্থ বিকৃতি করতে করতে কয়েকটা পরজীবি গোষ্ঠীতে ভেঙেচুরে ফেলবে মানুষদের। যারা ধর্মকে কয়েকটা নিয়ম নিগড়ে আকীর্ণ করবে – ধর্মের মূল অর্থ যে নিজ কর্তব্য অনুসারে জীবনযাপন – সেই অনুবাদক্রিয়ায় অক্ষম হবে। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শেষে হয়তো – হয়তো কেন নিশ্চয় বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের অধিনায়কত্বে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু তা চিরস্থায়ী কেন? ক্ষণস্থায়ীও হবেনা।
এরপর থেকে শুধু ধর্মের কিছু বিকৃত ব্যাখ্যা অবলম্বন করে আমার মতো অর্থলিপ্সু যুদ্ধকামী হবে অথবা তোমার মতো সমাজমুখ্য মানুষেরা স্বাভাবিক প্রকৃতিকে নিগড়ে বাঁধবে। স্বাধীনতা আর স্বাবলম্বিতার জন্য আপৎকাল আসছে দ্রুপদ – মিলিয়ে নিও’।
~
এর পরের নীরবতার হয়তো সময়কাল হয়না। হয়তো স্বর্গদ্বার - শেষ কথাগুলির সময় অনতিদূরেই ছিলো।
তাই মানুষের ক্রিয়াক্লেশ অতিক্রম করতে করতে দুই মহারথীর, যাঁরা একে অন্যের মৃত্যুর কারণ - শেষ বাক্যালাপ যেভাবে হলো –
দ্রুপদ বললেন – ‘আমি হয়তো মহাপাপ করেছি। অর্থ যাচনা করতে আসা তোমাকে বিশাল রাজ্যের কিছুটা ভাগ দিলে হয়তো অনেক সর্বনাশ এড়ানো যেতো’।
‘তুমি তো আমায় রাজ্যদানের প্রতিজ্ঞা করোনি দ্রুপদ – রাজ্যসুখ দেবার কথা বলেছিলে – রাজ্যদানের কথাটা আমিই তোমার মুখে বসিয়ে দিয়েছিলাম’।
‘জীবনের শেষদিকে হঠাৎ হঠাৎ কি মনে হতো জানো দ্রোণ?’
‘কী?’
‘ঋষি অগ্নিবেশ্যের আশ্রমবাসের সেই দিনগুলির কথা। সেই অধ্যয়নরত বালকযুগলের কথা – যাঁদের মধ্যে ঘুণাক্ষরেও কুরু-পান্ডব-পাঞ্চাল জটিলতা আসার সময় হয়নি তখনো। জানি সবই মায়া’।
‘জানি দ্রুপদ, কিন্তু ওই মায়ার নাম বন্ধুত্ব ছিলো – যাঁর আশ্লেষ আমরা দু’জনেই নিজ দায়িত্বে বিনষ্ট করেছি’।
‘এরপর কী হবে?’
‘কুরু-পাঞ্চালের যুদ্ধে আরো একযুগল শত্রু তৈরী হবে – পরবর্তী প্রজন্মের বাহক হিসেবে – অশ্বত্থামা- ধৃষ্টদ্যুম্ন। নৃশংসতা এমনই চিরন্তনী – একবার অধিষ্ঠিতা হলে তাঁকে উৎখাত করা – সাধারণী কার্য নয়’।
‘পরলোকের সেই দায় নেই দ্রোণ। পরলোক সাধারণী নয়’।
‘তুমি কি কিছু বলতে চাও দ্রুপদ?’
‘পথ অনেক দূর চলা হলো দ্রোণ – আমরা পারষ্পরিক প্রতিশোধ, লিপ্সা, অহংকার, যুদ্ধ কাটিয়ে ফিরতে পারিনা?’
‘কোথায়?’
‘যেখানে তোমায় ফেরাতে পথেই অপেক্ষারত ছিলাম’।
‘কোথায়? প্রাঞ্জল হও দ্রুপদ’।
‘বন্ধুত্বে’।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান