শরশয্যা উপান্তে

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

(১)

সে দিনের মতো যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষিত হয়েছে কৌরব সেনাপতি রাধেয়র পতনের অব্যবহিত পরেই। ধরণীর প্রতি কোনো এক গভীর অভিমানে দিনমণি সেদিন আকস্মিক অস্তগত হয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের রণভেরী আজকের মতো স্তিমিত। পান্ডব শিবিরগুলিতে মহা ধনুর্ধরের পতনের সাময়িক উচ্ছাস এখন থিতিয়ে এসেছে। কৌরব শিবিরে মহামতি শল্য সেনাপতিত্বে বরণ হয়েছেন আগামী সমরের জন্য। কর্ণ পতনের প্রারম্ভিক শোক কাটিয়ে কিছুটা ক্ষত্রিয়চিতো বাঙ্ময় নীরবতা পালন করছে একদা একাদশ অক্ষৌহিণীতে গৌরবমন্ডিত শিবিরগগুলি। জয়লক্ষী ধীরে ধীরে হস্তিনাপুরের বর্তমান পরিত্যাগ করে ভবিষ্যতের অভিমুখে অভিসার যাত্রা করছেন - তা প্রায় সুস্পষ্ট।

ধর্মযুদ্ধের সপ্তদশ সন্ধ্যাকালের রজনীতে পরিবর্তিত হতে আর বেশি বিলম্ব নেই।

বাসুদেব মধুসূদন আজ কিঞ্চিৎ শ্রান্ত। এযাবৎ সমগ্র যুদ্ধপরিকল্পনা ইত্যাদি নিজ স্কন্ধারূঢ় করার ভারে আপন দিব্যমানসে হয়তো কিছু বা ন্যুব্জ। যদিও পান্ডবসেনানী সে বৃত্তান্ত সম্বন্ধে অবগত নয় ঘুণাক্ষরেও। দামোদরের উদ্যম ও দীপ্তি তাদের সম্মুখে উদাহরণবিশেষ। কালপ্রভাতে সেই চিরপরিচিত রূপই অবলোকন করবে কুরুপান্ডব অবশিষ্টাংশ।

আজ রজনীটি কৃষ্ণের নিজস্ব।

নিজের আবাল্য সঙ্গী মোহনবাঁশিটি বহু বহুদিন উপেক্ষিত - ঘটনাপ্রবাহে। শেষ কিছুদিন একের পর এক মহারথ, অতিরথ যোদ্ধার পতন, অনাবিল বীরত্ব, অবিরাম নৃশংসতা - ঘটনার আতিরেক্য তো নেহাত কম নয় - এই মহামারণলীলায় সঙ্গীত প্রায় অস্পৃশ্যা।

বাসুদেব মনস্থির করলেন - আজ রজনীটি রাজনীতি বিশ্রাম নিক নেপথ্যে - আজ যদু-বৃষ্ণিকুলমুখ্য মনে মনে শৈশবের বৃন্দাবনে ফিরতে চান

(২)

সম্ভবতঃ ইতিহাসের সহ্যক্ষমতা কিছু কম।

বাঁশিতে সুরারোপনের অব্যবহিত পরেই দুয়াররক্ষীর আগমন হলো।

'দ্রুপদতনয় মহাবীর শিখন্ডী আপনার দর্শন অভিলাষী কেশব। অনুমতি করুন'।

অগত্যা।

'রাজকুমারকে অবিলম্বে যথাসম্মানপূর্ব্বক নিয়ে এসো আমার সমীপে'।

শিখন্ডী উপবেশন করলেন কিছুটা দূরত্ব রেখেই। কৃষ্ণা দ্রৌপদীর এই ভ্রাতাটিকে কৃষ্ণ বিশেষ পছন্দ করেন। গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের উপর আজন্মলালিত জিঘাংসা ব্যতীত শিখন্ডী যথেষ্ট ধীরোদাত্ত সংবেদনশীল। সে পুরুষবেশে নারী, নারীবেশে পুরুষ নাকি নপুংসক - তা নিয়ে বিশ্বসংসার যতোই মুখরোচক কাহিনী সাজাক - বাসুদেব অদ্যাবধি মানুষের গুণাগুণ লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারণ করেননি।

'মহাযুদ্ধ তো প্রায় শেষ হয়ে এলো কেশব। আর সময়ের অপেক্ষা'।

'আমারও ধারণা তাই পাঞ্চালগৌরব। মাতুল শল্য আর স্বয়ং দুর্যোধন ব্যতীত বিপক্ষ প্রায় মহাবীরশূন্য'।

'আপনি আনন্দিত নন?'

'আপনি রাজপুত্র?'

শিখন্ডী শিবিরের বাতায়নের কাছে উঠে গেলেন। দূরে কোথাও নিজের দৃষ্টিকে আবদ্ধ করলেন অনিমেষে। বাইরের সর্বগ্রাসী নিকষ স্তব্ধতায় যেন কোনো উত্তর খুঁজতে লাগলেন।

দ্বারকাপতি বুঝলেন শিখন্ডী সময় নেবেন।

সময়ের হিসেব রাখেননি কেউই - তবু কিছু সময় পরে শিখন্ডী বললেন - 'গাঙ্গেয় ভীষ্ম সন্দর্শনে গিয়েছিলাম কেশব'।

(৩)

কৃষ্ণ শান্তস্বরে প্রশ্ন করলেন - 'কেমন আছেন কুরুমুখ্য দেবব্রত? কি বললেন? আজ তো তাঁর অমানুষী শরশয্যার সপ্তদিবস অতিক্রান্ত'।

'আপনি বিস্মিত হলেন না?'

বাসুদেব প্রত্যুত্তরে মৃদুহাস্য ছাড়া কিছুই ফেরালেন না।

শিখন্ডী বলতে শুরু করলেন - 'গঙ্গাপুত্র পতনের পর থেকে একটা আকন্ঠ অপরাধবোধ কাজ করছে। তিনি একে প্রবীণ তায় মহারথ যোদ্ধা - তাকে আমি নিতান্ত কাপুরুষী যুদ্ধে বিবশ করলাম? শুধুমাত্র লিঙ্গের সুযোগে? ধনঞ্জয় স্বয়ং যাঁকে জয়ে অসমর্থ হয়েছিলেন - যাঁর পরাক্রমে স্বয়ং আপনি প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে অস্ত্রধারণ করেছিলেন - তাও দু'বার - তাঁর পতনের জন্য দায়ী শুধু আমার লিঙ্গ? তাও তিনি স্বয়ং মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজের বধের উপায় বলে দিয়েছিলেন বলে আমরা এই অন্যায় যুদ্ধের সুযোগ নিলাম?'

'আপনি কাকে ভুল বোঝাচ্ছেন অম্বা?'

শিখন্ডী সচকিত হলেন কন্ঠস্বরের এই অদ্ভুত প্রজ্ঞায়।

'আপনার কি জানা নেই আপনি কী করেছেন? নাকি আপনার ধারণা মহাধী দেবব্রত নিতান্ত মূঢ় যে কিছুই অনুধাবন করেননি?'

'বাসুদেব!'

'শুনুন শিখন্ডী - না অম্বা নামটাই বেশি সুপ্রযুক্ত। সারা বিশ্বসংসার অবলোকন করেছে ভীষ্মের জন্য সুরক্ষিত আপনার স্বর্ণমুখী শররাজি। সারা বিশ্ব কী দেখেনি তার একটিও মহান দেবব্রতের বর্মভেদ করছে না? সারা বিশ্ব কী জানেনা যে কুরুবংসাবতংসের দেহবিদ্ধ সবকটি বাণ লৌহমুখী এবং তার সবকটি গান্ডীবনিসৃত? অস্বীকার করবেন না'।

'কী?'

'ওটা যুদ্ধ নয়, নিবেদন ছিলো'।

অম্বা শিখন্ডিনী স্থির দৃষ্টিতে কৃষ্ণের দিকে চেয়ে রইলেন। কপোল সিক্ত করে নেমে এলো যে দু-একটি অমর্ত্য অনুভূতি তাদের গুরুত্ব দেবার সময় ছিলোনা সেটা।

কেশব তাঁর সর্বগ্রাসী প্রজ্ঞায় অনুভব করলেন অম্বাকে। সময় দিলেন।

(৪)

রাত্রি প্রথম প্রহরে তখন কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গণে একা জীবিত সম্ভবতঃ শান্তনুনন্দন - যাঁর সপ্তাহব্যাপী অলৌকিক শরশয্যা আপাততঃ আলোচ্য নয়।

দেবকীনন্দনের আরও কিছু বলার ছিলো।

'আপনি প্রশ্ন করেছিলেন এই জয়ে আমি আনন্দিত কিনা! না অম্বা। নির্বিকল্প শান্তির অন্তরায় এই সংগ্রাম আমি অন্তর থেকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ সকলে জীবিত থাকুন'।

'পারেন নি'।

'পারিনি কারণ একমাত্র মহামতি বিদুর ব্যতীত সকল কুরুবৃদ্ধ কোথাও যুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন। মুখে যতোই দুর্যোধনের অর্থদাস বলুন নিজেকে ভীষ্মের কাছে পাঞ্চালের উপস্থিতিতে এই যুদ্ধ ভীষণভাবে ব্যক্তিগত ছিলো অম্বা'।

'কেন?'

'তার উত্তর তো মহারাজ শাল্ব আপনাকে প্রত্যাখান করার সময়েই বলেছিলেন। বৃদ্ধ ভীষ্মের সেই পরাক্রমের প্রতি আপনার হিংসাময় অনুরাগ কী একমুখী?'

অম্বা নিশ্চুপ রইলেন।

'প্রতিজ্ঞার কাছে দায়বদ্ধ দেবব্রত আপনাকে গুরু পরশুরামের আদেশেও জীবনে গ্রহণ করতে অক্ষম ছিলেন। তাই -'

'তাই?'

'মৃত্যুতে আপনি উপেক্ষিতা হোন সেটা তাঁর অভিপ্রায় কখনো হতে পারে?'

দ্রুপদপুত্ররূপে বেরিয়ে যাবার আগে শিখন্ডী জানিয়ে গেলেন - 'আজ ভীষ্ম শুধু একবার একটি কথাই বললেন'।

'কী?'

'বিলম্ব হয়ে গেল অম্বা'।

(৫)

কৃষ্ণের অনেক কথা মনে পড়ছিলো - প্রায় পূর্বজন্মের কথা। অক্রূর রথারূঢ় হবার পরে একজন বলেছিল অপেক্ষা করবে।

তাঁর স্নিগ্ধা মুখটিও কেশবের মানসে আবছা হয়ে গিয়েছিলো - আজ স্পষ্ট মনে পড়লো।

বিলম্ব হয়ে গেছে।

যাদবশ্রেষ্ঠ বাঁশিতে পুনরায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান