শ্রী

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

(১)
তারপর মুখরতা বিহীন হলো সব। দিনমণি তবু নিজ নিয়মে প্রতি প্রত্যুষে উদিত হতে থাকলেন – দিবসান্তে অস্তমিতও হতে থাকলেন, নিয়ম অমান্য না করেই। কিন্তু স্তিমিত জনপদটি – জাগেনা।
এক গভীর অভিমানে সমগ্র জগৎ থেকে একদা কলহমুখর প্রতিটি গোচারণভূমি, কালিন্দী নদীর প্রতিটি ঘাট – অনির্দিষ্টকাল বিচ্ছিন্ন। গোকুল অপেক্ষায়মান।
প্রাণাধিক সেই প্রাণপুরুষ –ব্রজলীলা উপান্তে তিনি এখন মথুরা স্থলাভিষিক্ত। দিনের সমস্ত কার্যের ফাঁকে গোপীবালারা একটি অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখেন। বৃক্ষেরা পক্ষীদের প্রশ্ন করে – ‘জানো কি?কালিন্দীর তীরে আর বংশিধ্বনি শুনিনা কেন?’
(২)
স্মৃতি সততই অসুখের। আজ থেকে প্রায় দুই বর্ষ আগে তেমনি এক স্মৃতি গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন অক্রুর। জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন – যশোদা জননী নেহাতই পালিকা মাতা, নন্দরাজ রক্ষক বই কিছু নয় – এক চরম রাজক্রোধ তথা উন্মত্ততা থেকে এক ক্ষণজন্মাকে রক্ষার্থে এদের ভূমিকা ইতিহাসের কাছে শুধুই খড়কুটো এগিয়ে দেবার।গোকুল – নেহাত একটি অজ্ঞাতবাসস্থল।
(৩)
‘বড়াই’
‘বধূমাতা?’
‘নন্দগৃহে গিয়েছিলি? কোনো সংবাদ এসেছে? আমার জন্য?’
‘আসেনি বধূমাতা – আসবে না। তুমি তো তাঁকে সকলের থেকে বেশি চেনো – জানোনা এই জনপদ তাঁর ধারণভূমি হিসেবে কতো ক্ষুদ্র?’
‘আমিও? অভিসার সঙ্গিনী হিসেবে?’
বড়াই আর কিছু বলা সমীচীন বোধ করলো না। আসলে শ্রীরাধা সমস্তটুকুই জানেন। স্বয়ং যশোদানন্দন তাঁকে এক মোহময় বাসন্তী সন্ধ্যায় নিজ বিধিলিপির কাহিনী ব্যক্ত করেছিলেন।
কিন্তু, হয়তো শ্রীরাধার বিধিলিপি – অপেক্ষা করা।
বর্ণিল প্রতিটি গোধূলি – প্রতিটিই যেন সেই স্বপ্নবাসর – অথবা প্রখর বাস্তব। একসময় তো তাই ছিলো।
(৪)
“আমাকে সমস্তটুকু দাও রাধা, তোমার প্রকাশ্য, তোমার গোপন – তোমার গগনের পানে তাকানো – আর তখন আমারই কথা স্মরণ করা – সবটুকু”
“অসম্ভব রাখালরাজ”
“অসম্ভব? আমার কাছে?”
“আমি পরদার কেশব”
“সে তো তোমার লীলা রাধা। এই জন্মের লীলা – আর আগের সমস্ত জন্ম যে আমি সবটুকু দিয়ে এসেছি – তোমাকে”
(৫)
না আয়ান মানুষ হিসেবে ভালো। স্বামী হিসেবে কোনো তর্জনী তোলেন নি – নিজের মাতা কি ভগিণীর মতো।
তা তুলেছিল বাকি গোকুল।কুলটা, ব্যাভিচারিণী প্রায় সমস্ত বিশেষণ শ্রীরাধার পরিচয়কে প্রায় হতশ্রী করে তুলেছিল।আজো যশোদা তাঁকে এড়িয়ে চলেন আত্মীয়তা থাকা সত্ত্বেও।
অথচ যার জন্য এতো কিছু তিনি অক্রুরের রথে ওঠার আগের মূহুর্তে শ্রীরাধা কোথায় সেই সংবাদটুকুও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি।
আয়ান কিন্তু পারতেন – পত্নী, উপপত্নী ইত্যাদি গ্রহণ করতে। সমাজ হয়তো তাকে সহানুভূতির চোখেই দেখতো। কোনোটাই করেন নি।
এই দয়াটা মাঝে মাঝে কালিন্দীতে ডুব দিয়ে আত্মহননেচ্ছাটা জানান দিয়ে যায় –শ্রীরাধাকে।
(৬)
“তুমি কি চাও তোমার পুত্র একটি মাতৃমুখী বালক হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাক? তুমি জানোনা ওর জন্মবৃত্তান্ত?”
“জানি নাথ – কিন্তু”
“যশোদা-প্রিয়া-গোকুল তার বিশ্রামস্থল ছিলো আর তো কিছু নয়”
“পালিকা মাতার স্নেহটাও কি নিক্তিতে ওজন করতে শিখে গেছে – কানাই?”
“বার্তা পাঠিয়েছে – শীঘ্রই আসবে”
“কি?”
নিজ বণিতার কাছে এহেন মিথ্যাভাষণ নন্দরাজকে খুশি করলোনা।আচ্ছা রাজপ্রহরী দূতকে বিতাড়িত করেছে – নিজে একবার গেলে হয়না? নাকি তার ভাগ্যেও জুটবে সাধারণ প্রজাসুলভ অসম্মান?
(৭)
আয়ান অদ্যাবধি রাধাকে একবারও স্পর্শ করেননি। রাধা বুঝতে পারেনা এটা সংকোচ না চাপা ক্ষোভ।
কৃষ্ণ ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মৃত্তিকার।তার আহ্বানে সাড়া না দেওয়াটা শ্রী-র ইচ্ছাধীন হতোনা – অনেক সময়ই।বহুবার রাধার ঈর্শার উদ্রেক করতে অন্য গোপিনীর সাথে অবলীলায় লীলা করেছেন।
এক রাত্রে আয়ানকে শ্রী প্রশ্নটি করেই ফেলে – “আমাকে ত্যাগ করেননি কেন আর্যপুত্র?”
“এ কথা কেন প্রিয়া?”
“কিছুই তো আপনার অজ্ঞাত নয় – আমার হৃদয়বল্লভ আপনি নন তা সমগ্র ধরিত্রী অবগত।তাও আমাকে পত্নীর মর্যাদা দিয়ে রেখেছেন? শুধু কূলগৌরবের জন্য?”
“শ্রী”
“নাথ?”
“তুমি বুঝবেনা – এখনো সময় হয়নি”।
(৮)
নাহ – নন্দরাজ বিতাড়িত হন নি। কিন্তু মথুরাজামাতা তথা কেশবপিতা বাসুদেব অত্যন্ত খেদের সাথে জানিয়েছেন কৃষ্ণ বলরাম হস্তিনাপুরে যাত্রা করেছেন। সেখানে গুরু দ্রোণের কাছে অস্ত্রশিক্ষা প্রাপ্ত কৌরব ও পান্ডবগণকে নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। পান্ডবজননী কুন্তীর বিশেষ নিমন্ত্রিত কৃষ্ণ বলরাম দুই সদ্য তরুণ।
তাঁরা ফিরে এলেই যথা শীঘ্র সম্ভব গোকুল যাত্রার প্রচেষ্টা করা হবে।
(৯)
সায়াহ্নে যশোদা নিজের গবাক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন – এখান থেকে কালিন্দী নদীটি পরিষ্কার দেখা যায়।হঠাত পরিচারিকাকে ডাকলেন।
“দাসী”
“নন্দরাণী”
“দিবসান্তে একাকিনী নদীকূলে উপবিষ্ট কে ওই রমণী? উন্মাদিনী নয়তো?”
“শ্রীরাধিকা নন্দরাণী”
“শ্রীরাধিকা? রাধা?”
“হ্যাঁ নন্দরাণী”
যশোদা কিয়ৎক্ষণ চুপ করে থাকলেন।তারপর বললেন-
“ডাকো তো একটি বার”
শ্রী অত্যন্ত ভীত পদক্ষেপে নন্দগৃহে পা রাখলো। যশোদা একপলক তাঁর যৌবনময়ী সুন্দর অথচ বিমর্ষ মুখটির দিকে তাকিয়ে বললেন – “এসো”।
(১০)
যশোদা যা বুঝতে পেরেছিলেন সেটা বোধহয় এই রকম - তাঁর জন্য তবু মাতৃমর্যাদা আছে – কিন্তু দূরসম্পর্কের ভ্রাতা আয়ান ঘোষের স্ত্রীর জন্য শুধুই গ্লানি।
ঘরে ফিরে সেদিন শ্রী দেখে দ্বারে আয়ান স্বয়ং অপেক্ষারত
“আজ ফিরতে বড়ো বিলম্ব হলো শ্রী”– ক্রোধ নয় উদ্বিগ্নতাই ছিলো সেই কন্ঠস্বরে।
সেদিন রাত্রে শ্রী তাঁর স্বামীকে বললো
“আমি যে ভুলতে পারিনা – আর্যপুত্র – সেই উদ্দাম ইতিহাস”
“সমগ্র গোকুলই তো পারেনি শ্রী”
“কি পাবে আমার কাছে?”
আয়ান কিছুক্ষণ মৌন থেকে তারপর বললেন-“তোমাকে”
“আমাকে?”
“তোমার কেশবের জন্য প্রেমকে – নিস্বার্থ প্রেমের শিক্ষা তুমিই তো দিলে”
“আর্যপুত্র”
আয়ান শ্রীর নতমুখের অশ্রু মুছিয়ে একটি প্রাকচুম্বন মূহুর্ত তৈরী করতে করতে বললেন – “সবাই বলতে পারেনা শ্রী”।
(১১)
গণপতি কলম সঞ্চালণ বন্ধ করলেন। বেদব্যাস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
“এই মহাভারত শুধু মহাকাব্য নয় ঋষি। এ অসামান্য লোকশিক্ষার আকর। এই গ্রামীণ প্রেমকাহিনীতে সেই অসাধারাণত্ব কই?”
একটু নিশ্চুপ থেকে বেদব্যাস অনুধাবন করলেন সেই পরামর্শ।
“তাই হোক বিনায়ক। এই শ্লোক ক’টি বিনষ্ট করে ফেলা হোক।কাহিনী এগিয়ে চলুক হস্তিনাপুরে – কৌরব পান্ডবের প্রদর্শনীর দিকে”।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান