ফিসফাস-১০৬

সৌরাংশু

 



শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ পঙক্তিটি মনে পড়ে যায়- ‘ধর্মেও নয় জিরাফেও নয়’। মাথা উঁচু করে চলতে চলতে হঠাৎ আবিষ্কার করি যে অর্ধেক লেফটে এবং অর্ধেক রাইটে চলে গেছে আর বাকিরা আমার পিছনে। ফিসফাসের পাঠক পাঠিকারা ভাবতেই পারেন যে হঠাৎ কাব্যি করার চেষ্টা করছি কেন? আসলে গভীরতা মাপার ফিতে দিয়ে তো মন মাপা যায় না। তাই বলদ শ্রেণীর প্রাণী হয়েও সেখানেই খেয়ে দেয়ে শিবের গাজন গাওয়া সবার ধাতে নেই। সহ্যও যে হয় তা আর বলছি না।

কর্মক্ষেত্রে যখন ল্যাদ আসতে আরম্ভ করে তখনই বুঝতে হবে যে সঠিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ল্যাদ ভুলে গিয়ে উদ্যমী কর্মশক্তিতে পরিণত হয় বলেই তাবড় তাবড় প্রবন্ধন গুরুর বক্তব্য। সেই অনুসারে আমাদেরও পাঠানো হয় সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের হিসাব মেলাতে প্রশিক্ষণ শিবিরে।

লিডারশিপ কারে কয়? নেতা টাইপের ব্যক্তিত্বরা যখন হুম হাম সহযোগে দলীয় ভাবনাকেই মদীয় ভাবনা মেনে নেন এবং তা সমাপন করতে যারপরনায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন তখনই নেতৃত্বের পূর্ণতা। তা প্রশিক্ষণ শিবিরে নেতৃত্ব বা লিডারশিপের উপরেও পরিমিত জ্ঞান প্রদান করা হয়।

এমনিতেই সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাঝারি স্তরের অধিকারীদের কর্ম সম্পর্কিত বহু অভাব অভিযোগ থাকে। তার উপরে যদি তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে আধিকারিক কার্মিক প্রশিক্ষণ সংস্থার প্রধান প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে জ্ঞান বিতরণ করতে থাকেন এবং মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকরা বিব্রত এবং ঘুমন্ত হয়ে পড়েন, তাহলে সত্যকারের নেতার কি কাজ? বুক চিতিয়ে শব্দভেদী বান বুকে নেওয়া? মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকদের পদানুসরণ করে মন্ত্রের সাধন এবং অবশেষে দিবানিদ্রা গমন করা? নাকি চলন্ত ট্রেনকে দুম করে চেন টেনে হ্যাঁচকা মেরে থামিয়ে দেওয়া? সুনেতার কর্তব্য হল শেষটি।

আরে বিশেষ কিছু নয় লিডারশীপ ক্যাম্প শেষ হবার পর আই এস টি এমের মুখ্য আধিকারিক এসে ‘তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ’ ‘তোমাদের হ্যানা করা উচিত তেনা করা উচিত’ বলে হরির লুটের মত জ্ঞান বিতরণ করছিলেন। কেউ কিস্যু করতে পারছেন না। মঞ্চে বসে থাকা প্রশিক্ষকরা সারা দিনের পরিশ্রমের শেষে যা তা রকমের ক্লান্ত। কোর্স ডাইরেক্টর বিব্রত এই সময় উপায় না দেখে যদি ‘ধন্যবাদ মহাশয়, আপনার উদ্দীপক বক্তৃতার জন্য। আমাদের কর্ম জীবনে এমন বক্তৃতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে’ বলে যদি দুম করে ব্রেক মেরে গাড়ি বন্ধ করে গ্যারেজের চাবি যদি শিকেয় তুলে দিই তাহলে তাকে কি জনসেবা বলা যাবে? ভেবে দেখার বিষয়।

প্রশিক্ষণের আবার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল ক্লাসে বসে পড়াশুনো। আরে বাবা সেই রামও নেই আর নেই সে অযোধ্যাও! দোল দোল দুলুনি চোখ জুড়ে ঢুলুনি! সামলাবি কেমনে পাগলা খাবি কি? জল খা! জল খা, হাওয়া খা, কপালে হাত ঘস, উঠে ঘুরে আয়! কিন্তু এসব করেই যদি চোখে টুথপিক লাগাতে হয়? তাহলে আর কি স্বীকার করেই নে! ঘুমনে গয়া থা! আব ওয়াপস! সব শুনেছি অবচেতনে! বলব আপনি শেষ বাক্য কি বলেছেন? আহা এ সব তো তরিবৎ শিল্প!

সেই প্রাচীনকালে যখন কেরিয়ার শুরু করি জুটমিলের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে, তখন চাকুরীর পরীক্ষা আর মেটিয়াবুরুজের যাত্রায় ঘুমের আনাগোনা খুব কম হত। তাই জাব্দা লেজার এক হাতে এক পাশে ধরে অপর হাতে পেন নিয়ে স্থির ঘুম বেশ আয়ত্ব ছিল। পারফেকশন! পারফেকশন! এতদিনের অভ্যেস একটু টান মারলেই ফিরে আসে। সাইকেল চালানো আর সাঁতার কি কেউ ভোলে হে?

যাই হোক, প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসাবে এবারে আছে রাজ্য সংযুক্তি আব স্টেট অ্যাটাচমেন্ট। অর্থাৎ কি না, ভারতের কোন একটি অঙ্গ রাজ্যে গিয়ে সকলে মিলে দিন চোদ্দর মোচ্ছব করা আর রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারী বিভিন্ন স্কিমগুলি খাচ্ছে না মাথায় মাখছে তার খবরদারি করে রিপোর্ট তৈরী করা।

চেন্নাইতে আমি এর আগে বার চারেক এসেছি। কিন্তু এবারের আসাটা যেন অন্য রকম। বাক্স প্যাঁটরা ছেড়ে এত দিনের জন্য সত্যিই কোথাও থাকি নি। পার্শ্ববর্তিনীর কথা ছেড়েই দিলাম চোদ্দটা দিন যেন ছেলে মেয়ে দুটো হুশ হুশ করে বড় হয়ে যাচ্ছে ফোনের ওপারে।

যাই হোক কাজে তো মন দিতেই হয়, নাহলে তো হাতে থেকে যায় পেন্সিল। প্রথম দিনের ব্রিফিং এবং জরুরী আলোচনা শেষে আমাদের দলকে দুই ভাগ করে পাঠানো হবে ভিল্লুপুরম এবং কুড্ডালোর জেলায়। যা হয় আর কি, ডানপিটে বাঁদর ছেলেগুলোকে তুলে পাঠানো হয় শুকনো এলাকায়, আর বাকিদের মনোরম স্থানে। আমরা মানে আমাদের ছোট নদী যাব ভিল্লুপুরম।

কিন্তু ঈদ তো মাশাল্লাহ। তাই ছুটি কাটাতে ছোট কাছে পিঠের নিরালায়। নিরালায় বলে নিরালায়? কাঞ্চিপুরম, জীবনে পার্শ্ববর্তিনীদের খুশী রাখতে সব পুরুষকেই অফিসের কাজে কিছু কিছু স্থানে তীর্থ করতে যেতে হয়। যেমন বেনারস, যেমন জয়পুর, যেমন কাঞ্চিপুরম। কিন্তু সঙ্গের সঙ্গীসাথীরা বিশেষত যিনি আমাদের স্থানীয় সঞ্চালক তিনি যদি তা লিটারালি নিয়ে ফেলেন? তাহলে আর কি? যাও হে পবননন্দন অনন্তধামে।

এমনিতেই তামিলনাড়ুর মন্দির শহর, আর কাঞ্চির তো কথাই নেই। শিব মন্দির বিষ্ণু মন্দির শঙ্করাচার্য মন্দির। ছয় কেন একশোলাপেও শেষ হবে কি না কে জানে। তার উপর সোনায় সোহাগা শঙ্করাচার্য দেবেন্দ্র সরস্বতীর দর্শন। আহা এত পুণ্য এক জীবনে পাব কোথায়? না হয় ধর্মে আর জিরাফে মেল খায় না। কিন্তু আঁটি পড়ে থেকে থেকে দেখে যায় আমরসের কাব্য।

আড়াই ঘণ্টা ধরে এই মন্দির সেই মন্দির। এমনিতে বিখ্যাত প্রখ্যাত ধর্মস্থানগুলিতে পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এবং বৈষম্য বড়ই চোখ টানে। Natives and Dogs are not allowed, আর As per Hindu belief and tradition, foreigners are not allowed beyond this point এই দুটির মধ্যে গুণগত মানের কি কোন পার্থক্য আছে? কে জানে তর্কে যাব না। বরং ঘুরে ঘুরে শিল্প স্থাপত্য দেখে কাটাই। আমার প্রাণের ঠাকুর আমার প্রাণেই থাকুক। তাকে না হয় সকল পানেই দেখি। চোখ বন্ধ করলেই কি মন বন্ধ হয় রে পাগলা?

অবশেষে স্থানীয় সঞ্চালকের সহায়তায় গিয়ে হাজির হই শাড়ির দোকানে। আহা ভানুরেখা গনেশন তো ঘরে ঘরে হে ঠাকুর। লক্ষ্মী যখন আসবে… তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই। দ্যাখ রে চেয়ে আপন পানে, পথ দুটি নাই পথ দুটি নাই। পূজার তো প্রসাদ হয়। প্রণামীও। লক্ষ্মী পূজোয় প্রণামী সওগাত কাঞ্জিভরমের ভারিক্কি সম্ভার। কিন্তু যে দোকানে নিয়ে গেল সে তো ত্রিশঙ্কুর স্বর্গ। না পারি গিলতে না পারি ফেলতে। অতঃপর, টুক করে বেরিয়ে গিয়ে সরকারি দোকানে দর দস্তুর করে বাকিদের খবর দিই। ইধার আও বাওয়া, স্বর্গ এখানেই কিন্তু জিপিএসে থোড়া গড়বড় হো গঈল বা। তবু ভুল ঠিক করতে কতক্ষণ। দরদাম দরদাম ধূম ধাম আহা গোলক ধাম।

তেরো বছর আগে কাঞ্চিপুরমে আরেকটি প্রশিক্ষার্থী দলের সঙ্গে এসে একই শাড়ি কিনেছিলাম আমি অপর এক প্রশিক্ষার্থীর অর্ধেক দামে। আরে বাবা ৪০% ছাড় দিচ্ছে তো কেয়া হুয়া? একটু দর দাম করে দেখিই না। চল্লিশ তো তখনও অনেক দূর ছিল, তবু ষাটেই রফা হয়েছিল। তাই নিয়ে কি চাপান উতোর। আরে হামে পতা হোতা তো হাম ভি বারগেনিং করতে। তুম ক্যায়সে কর লিয়া। এ দুনিয়ায় জিতে যাওয়াটাও পাপ। কাঁকড়ারা শুধু বাঙালীই হয় না।

যাই হোক, শেষে ফেরার পথে ফিরে এসে আবার দুপুরে গন্তব্য হয় মহাবলীপুরম। দক্ষিণ ভারতের আমার অন্যতম প্রিয় স্থান। যেখানে মন্দির আছে, কিন্তু ধর্মের ধ্বজাধারীরা নেই। সুন্দর আছে কিন্তু অনিত্যের পূজারীর স্থান নেই। সব তো এক দিনে হয় না। কিন্তু সময় তো বাধ্য না। অ্যায় যাতে হুয়ে লমহো যরা ঠ্যাহরো… ম্যায় ভি তো চলতা হুঁ, যরা উনসে মিলতা হুঁ! যো এক বাত দিল মে হ্যায় উনসে কহুঁ…… তো চলু! কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়। তাই সমুদ্রের বিচ পাশেই পরে থাকে। এক মুহুর্তের ভালবাসা নিয়ে ফিরে আসি, কাঁকড়া চিবোতে চিবোতে! এ কিন্তু সে নয়, এ আসল তাজা স্ফুর্তিলা রসিলা কাঁকড়াভাজা। চাটুতে দিয়ে চটর পটর করে মুখে! তবে সাবধানে, এত তার তাজা রস ছিটকে যেতে পারে এদিক ওদিক। দিন ফুরোয়ে।

পরের দিন যাত্রা করি চ্যালেঞ্জের পথে। চ্যালেঞ্জের নাম ভিল্লুপুরম। সবই আছে কিন্তু কিছুই নেই। সেই স্বর্ণ চতুর্ভূজ প্রকল্পের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় বা রাজ্য রাজমার্গগুলি একদম ঝাঁ চকচকে ইউরোপীয় উন্নত দেশগুলির রাস্তার মতো হয়ে গেছে। পথে অনলি কফিতে শুধু কফি কাপে চুমুক দিয়ে মন তাজা প্রাণ তাজা। এসে পৌঁছই জেলা সদরালয়ের কাছে আমাদের অস্থায়ী বাসস্থানে।

ভিল্লুপুরম জেলাটি ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়, অনগ্রসর অঞ্চলের উপর নজর দেবার জন্য। তামিলনাড়ুতে কিন্তু সরকারি কার্যে কোন ঢিলেমি নেই। সে আম্মাই হোক বা প্রবীণ চিত্রনাট্যকার। নিজের ঢাক পেটাতে গিয়ে কিন্তু খালি ঢাকের বোলেই কান ভরায় না। তাই কাজে লেগে যাও! দিনমান পেরিয়ে যায় কাজের চক্করে, রাতে একটু খোলা হাওয়া একটু ফরাসী বাতাস, একটু সমুদ্র সন্ধান। পুঁদিচ্চেরী ত সেই টেনিদার আমল থেকেই ফ্যাশনদুরস্ত। তাই মন লাগিয়ে প্রাণ লাগিয়ে একটু অন্ধকারের উৎস সন্ধান, একটু ভূরিভোজন বা ভুঁড়িভোজন। তারপর? তারপর আর কি? ফিরে চল বাওয়া অস্থায়ী বাসস্থানে। পর দিন থেকেআবার কাজ শুরু! সাত দিনের মধ্যে জেলার হালহকিকত নিয়ে রিপোর্ট পেশ। বাস্তব অভিজ্ঞতা! আর তার পরেই, ডাস্টবিনের দাসত্ব। সে উঠে আসুক পরের কিস্তিতে! আজ যাই? আহা যাই কি বলতে আছে? বল আসি! আসি আসি আসি!!

সৌরাংশু

সৌরাংশু


সর্বঘটে কাঁঠালি কলা (Jack of All Trades and blah blah…) অথবা আর ডবলু এ বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের গোঁজ প্রার্থী বলতে যা বোঝায় আদতে কোলকাতার কিন্তু অধুনা দিল্লীর বাসিন্দা, সরকারি চাকুরে সৌরাংশু তাই। দানবিক শরীর নিয়ে মানবিক বা আণবিক যে কোন বিষয়েই সুড়ুত করে নিজেকে মাপ মতো লাগিয়ে নিতে পারেন।

আপনার বাথরুমের দরজার ছিটকিনি আটকাতে হবে? বা কেঁদো বেড়ালটা রাত বিরেতে বড়েগোলাম হবার চেষ্টায়? পাড়ার নাটকে বিবেক নাই? রাজা খাজনা নিবেক নাই? চিন্তায় শান দিবেক নাই- ফোন লাগান +৯১৯XXXXXXX৩২-এ। ভৌম দোষ বাড়াতে বা বনের মোষ তাড়াতে মাইকের মতো গলা আর টুথপিকের মতো হাসি নিয়ে সৌরাংশু হাজির হবেন।

গল্প অল্প স্বল্প লিখলেও তিনি ফিসফাসেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে শীতের রোদে তেল মাখেন আর গিটকিরি দিয়ে রামা হৈ গান। না শুনে যাবেন কোথায়! বুম্বা দা বলেছেন, “মাআআ, আআমি কিন্তু চুরি ক্করিনি!” সৌরাংশু বলেন, “যাঃ আমি কিন্তু বুড়ি ধরি নি!” খেলতে নেমে হাঁপান না, গাইতে গলা কাঁপান না, নিজের দায় পরের ঘাড়ে চাপান না, শুধু ফিসফাসেই বন দাপান! এই হলেন সৌরাংশু!
www.fisfas.in

আপনার মতামত জানান