কৌরবানি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

গৌরচন্দ্রিকা
মহাকবি ভাস দুর্যোধনের শেষরাত্রিটিকে কেন্দ্র করে ‘উরুভঙ্গম’ নামে যে সংস্কৃত নাটকটি রচনা করেছিলেন – তার সারসংক্ষেপ বাদে আমার বিশেষ কিছু পড়া নেই। তাই এই গল্পটি নেহাৎ কষ্টকল্পিত ভেবে নিজগুণে মার্জনা করবেন। ব্যাঙের সমুদ্রদর্শনের অক্ষম প্রচেষ্টা।
ঋণস্বীকারঃ রাজশেখর বসু এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ বিরচিত মহাভারত, শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বিরচিত মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং উইকিপিডিয়া।
শেষের শ্লোকটি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির বইতেই পড়া – কেন জানিনা এখানে বড়ো সুপ্রযুক্ত মনে হলো।
‘বিনাশয়তি ভূতানি অযোনিজ ইবানলঃ’
বাঙলায় বললে - অর্ন্তদেহে বাস বাঁধা তৃষ্ণা হলো এক কারণহীন আগুন যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।



(১)
রাত্রি প্রথম প্রহরে – এ প্রান্তরে কিছু মনুষ্যেতর প্রাণী বিনা আর জীবিত কেউই অবশিষ্ট নেই। অষ্টাদশী সমরবৃত্তান্ত এখন ইতিহাস – বেদব্যাসের বয়ানে এবং গজকর্ণ গণপতির লেখনীতে অমরত্বের আকাঙ্খায় ম্রিয়মাণ। পবিত্র কুরুক্ষেত্র একাকী – একটি বৃহৎ শবভূমি – যা প্রিয়জনের প্রেতক্রিয়ার মুহূর্তের অপেক্ষা ব্যাতীত – অন্য কোনো ক্রিয়ায় আপাতত অপারগ।
এহেন পরিপ্রেক্ষিতে কিঞ্চিৎ অতিরেক হয়ে গেছে অবশ্য। একটি প্রাণী এখনো জীবিত – অথবা জীবনের উপান্তে। একদা দুদৃঢ় মুষ্ঠিতে করবদ্ধ গদা নিতান্ত অবহেলায় পড়ে রয়েছে দূরে। মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় চারিদিকে ভ্রাম্যমাণ – কয়েকটি শৃগাল – এতোদিন যারা মহাযুদ্ধের হুহুংকারে – ত্রিসীমানাতেও আসেনি কুরুক্ষেত্রের – অথবা এলেও শূরবীরদের চক্ষুকর্ণগোচর হয়নি। কেমনেই বা হবে? শেষ কিছুদিন রাত্রি প্রথম প্রহর সকলের কেটেছে শিবিরে – যুদ্ধপরবর্তী পরিশ্রমমোচনকারী সুষুপ্তিতে – কিছু কিছু রাত্রিচর শিবির অবশ্য জেগেছে – পরবর্তী দিনের প্রস্তুতি পরিকল্পনায়।
অষ্টাদশী মহাসংগ্রামের গোপন ক্ষতগুলি বাঁধন খোলা পেয়ে এখন প্লাবন এনেছে অন্তিমের – শরীরের চারপাশের সামন্তপ্যঞ্চক ভূমি সিক্ত হচ্ছে অক্লেশে – কিছু মক্ষিকাও গুঞ্জন করছে তার আশেপাশে– অপমানের মাত্রা বাড়াচ্ছে।
পুষ্প বড়ো মধুর প্রহেলিকা। আর্য সভ্যতা কখনো তার ব্যবহার করে বিবাহের আনন্দঘন সন্ধ্যায়। কখনো প্রয়াণের সম্মানার্থে। এই বহুধা ব্যবহার একই বস্তুর এশুধু এই দ্বিপদ মনুষ্যপ্রজাতির পক্ষেই সম্ভব।
তখনো পর্যন্ত হস্তিনাপুরের একচ্ছত্র যুবরাজের যেটুকু অবশিষ্ট জ্ঞান ছিলো – তাতে ওই পুষ্পের কথাই ভাবাচ্ছিলো। ভীমসেনের সম্পূর্ণ অশাস্ত্রমতে গদাঘাতের পরপরই দ্যুলোক ভেদ করে ঝরে পড়েছিলো ওই পুষ্পরাজি। দেবগণ তার পতনে অভিবাদন জানাতেই পান্ডবকুলের হয়ে এই আনন্দপালন করলেন – নাকি মহাবীরের মার্তন্ডপ্রায় শেষযুদ্ধের প্রতি সম্মানার্থে – সেটাই ভাবছিলেন দুর্যোধন।
জীবৎকালে – অনেকের অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছেন সত্য - কিন্তু দেবতাদের অবহেলা করেননি ক্ষণকালের জন্যও। তাই নিতান্ত ধার্মিকের পতনে – তাঁদের হাস্যোজ্জ্বল হবার কোনো কারণ পেলেন না মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের এই জ্যেষ্ঠপুত্র। এটুকু ভেবে খুশিই হলেন – স্বর্গপ্রাপ্তির পর – হয়তো কোনো কৌরববৈরী এবং পান্ডবদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট পরলোকযাপন নেই – তাঁর জন্য।
শৃগালগুলির সাথে তখন কিছু হীনগোত্র সারমেয় এসে যোগ দিয়েছে – নিজের ভারী ভারী নিশ্বাস এবং তাদের পদচারণার সাথে সাথে মাঝে মাঝে নিজ উপস্থিতি জানান দেবার জন্য মৌখিক ধ্বনি – সমগ্র সামন্তপ্যঞ্চকে – তখন এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
এরই মাঝে একটি নুপূরশিঞ্জিত রমণীপদধ্বনি কর্ণগোচর হলো প্রথম কৌরবের। প্রথমে ভাবলেন ভ্রম। কিন্তু ক্রমে ধ্বনিটি স্পষ্টতর হলো। অবচেতন বীরকে সজাগ করলো – স্বয়ং কৃষ্ণ আজ প্রত্যুষে স্বীকার করেছেন – ভীমসেন পাহাড়প্রমাণ ভীতিউদ্রেকে সক্ষম – কিন্তু গদাধর হিসেবে দুর্যোধন অত্যন্ত বেশি সজাগ এবং ক্ষিপ্র। তাছাড়া – সমগ্র জীবৎকাল যাঁকে নিজপ্রাসাদে শত্রুভাবে কাটাতে হয়েছে – তাঁর আর উপায়ই বা কি আছে – ক্ষিপ্র হওয়া বিনা?
‘তবে কি মৃত্যু পদধ্বনি? লোকমুখে অবশ্য গোচর হয় – কালান্তক যম মৃত্যু অধিপতি – কিন্তু সে তো লোকে কতো কিছুই বলে! মৃত্যু কি তবে পৃথিবীকালীন শেষসুখ – নারীত্বের কোমলতায় আর্দ্র? ভালোবাসার মতো?’
দুর্যোধন এই আত্মচিন্তার মাঝে অনুধাবন করলেন শব্দটি থেমেছে – সাথে এও অনুভব করলেন আশেপাশে দ্বিতীয় কোনো মনুষ্যউপস্থিতি – কুরুবংশের রুধির তাঁর শরীরে – ষষ্ঠেন্দ্রিয় প্রায় জন্মসূত্রেই পাওয়া – ভেবে খুশি হলেন এই অন্তিম লগ্নেও সেটি অনেক আত্মীয়বন্ধুর ন্যায় পার্শ্বত্যাগ করেনি।
প্রশ্ন করতে গেলেন দুর্যোধন – কিন্তু কন্ঠ থেকে একটি ঘর্ঘরধ্বনি নির্গত হলো প্রথমে। গলায় ভীমসেনের গদাঘাতে প্রচন্ড যন্ত্রণা – তার সাথে দীর্ঘ কালরাত্রির শীতল অবহেলা – মিলেমিশে জমাটবদ্ধ রক্ত ও শ্লেষ্মা। কিঞ্চিৎ পরিশ্রম করেই সেটি মুখ থেকে বের করে ভূমিতে ফেললেন।
আগন্তুকই প্রথমে কথা বললো – ‘কেমন আছেন যুবরাজ?’
বহুপরিচিত কন্ঠস্বর কিন্তু দুর্যোধনের ঠিক প্রত্যয় হলোনা। তাও সন্দিগ্ধস্বরে বললেন – ‘ভানুমতী?’
‘আমি যুবরাজ’।
(২)
ভানুমতী দুর্যোধনের জন্য কিঞ্চিৎ মদিরা এনেছিলেন সঙ্গে করে – যদিও কুলস্ত্রীর মর্যাদা অনুপাতে কাজটি গর্হিত সন্দেহ নেই – কিন্তু কুরুকূলের কৌরব অংশে আর আছেই বা কি আর লজ্জাই বা কিসের? অন্ততঃ আজ এই অনন্তরাত্রিতে দুর্যোধনের মহিষীর নির্লজ্জা হতে বাঁধেনি।
ভানুমতী দুর্যোধনের পাশে বসলেন – মদিরা পানপাত্রে ঢাললেন কিছুটা, তারপর ক্লিষ্ট দুর্যোধনের শতাঘাতে বিদীর্ণ মস্তকটি নিজক্রোড়ে উঠিয়ে কিছুটা মদিরা পান করালেন – সময় নিয়ে। মদিরায় সাময়িক যন্ত্রণা কাটে।
কিছুটা বল উপার্জন করে মহিষীকে বললেন ধার্তরাষ্ট্র – ‘তুমি আসায় আমি বড়ো খুশি হয়েছি প্রিয়া। স্বয়ং মাতা গান্ধারীও আমার ক্রিয়াকলাপের অনুমোদক নন আর। একমাত্র পিতা আর তুমি রয়ে গেছো – এইটুকু ভালোবাসা, এইটুকু প্রশ্রয় আমার বীরগতির জন্য বরাদ্দ রইলো। পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণের মতো সর্বভুবনব্যাপী হাহাকার – নাহয় নাই বা হলো’।
ভানুমতী চুপ করে রইলেন। অথচ তিনি স্বভাবতঃ তাঁর দুর্বারগতি স্বামীর মতোই সোচ্চার। পাঞ্চালীর ন্যায় নীরব অগ্নি নন। তাঁর উপস্থিতিতে কলরবেরই প্রাধান্য।
দুর্যোধন কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন, কিন্তু তারপরও বলে চললেন – ‘দেখো প্রিয়া, কর্ণের পতনের পরই – এ যুদ্ধে আর জয়ের আশা করিনি। এই পরিণতি অবশ্যম্ভাবীই ছিলো। তুমি হয়তো জানোনা – গতকাল আমি সম্পূর্ণ দিবস অতিবাহিত করেছি – দ্বৈপায়ন হ্রদের ভিতরে – জলস্তম্ভের ভিতরে সেই যোগশয়ানে যেনো বা আমার সম্পূর্ণ জীবনটাই পুনরায় দেখতে পেলাম। সেই অস্ত্রক্রীড়া, সেই বারাণবত, সেই দ্যূতক্রীড়া – বেশকিছু স্থানে পিতামাতাকে আঘাত দিয়েছি তার জন্য অনুতপ্ত হলাম – কিন্তু বলো তো – আমার চাহিদায় অন্যায় কি ছিলো?’
ভানুমতী তখনো নিশ্চুপ রইলেন।
দুর্যোধন বলে চললেন – ‘ক্ষত্রিয়ের ধর্ম রাজ্য অধিকার করা। আমি যদি সে কার্যের জন্য অন্যায় করে থাকি – তাহলে অর্জুন, খুল্লতাত পান্ডু, পিতামহ ভীষ্ম, সমগ্র ভারতবর্ষের সমস্ত আর্য পূর্বপুরুষ তাঁরাও সেই অন্যায় বিনা কিছুই করেননি। এক বলতে পারো – কথায় কথায় সমরাঙ্গনে নিয়ে যাইনি ক্ষত্রিয় ধর্ম মেনে – আমি অক্ষের দানে পরাভূত করেছি। কিন্তু তুমিই বলো – মাতুল শকুনির পাশা অর্জুনের গান্ডীবের তুলনায় কতো স্বল্প নরমেধী এবং কতো সহজ সমাধান। বারংবার কুরুক্ষেত্র যে হয়নি সেইজন্য ভরতবংশের সদাসর্বদা আমার নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা উচিৎ - দেখছো তো যুদ্ধের পরিণাম কি হয়’।
ভানুমতী দুর্যোধনের মস্তকটি ক্রোড় থেকে নামিয়ে ভূমিতে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একে একে তার সমস্ত ভূষণ এবং আভূষণ পরিত্যাগ করে দিগম্বরী হলেন সহসা।
তারপর স্বামীর ওষ্ঠে চুম্বন করলেন। রুধিরসিক্ত সমগ্র শরীর লেহন করলেন। দুর্যোধনের উঠবার ক্ষমতা নেই আর। তার তাঁর ভগ্নউরু বাঁচিয়ে বিপরীত বিহারের প্রচেষ্টা করলেন। দুর্যোধনের পুরষাঙ্গটি নিজের যোনিতে প্রবেশ করাতে প্রচেষ্টা করলেন বারবার – কিন্তু পুরুষাঙ্গটি উত্থিত হলোনা। শেষে নির্জীব সেই প্রত্যঙ্গটি চুম্বন করে আবার পোশাক পরে নিলেন একে একে।
এবং দুর্যোধনের পাশে বসে প্রথমবার সোজা চোখের দিকে তাকালেন।
(৩)
দুর্যোধন ভানুমতীর এই সোচ্চার কামপ্রচেষ্টার থেকে তখনো ধাতস্থ হবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তেমনি সময় ভানুমতী শুরু করলেন কথা – ‘আপনি বলছিলেন না যুবরাজ, আমি আসায় বড়ো খুশি হয়েছেন?’
দুর্যোধন হতবিহ্বল অবস্থাতেই বললেন – ‘হ্যাঁ’।
‘আমি কি কারণে এই নিশীথে আপনার দর্শনপ্রার্থিনী জানলে, হয়তো অতোটা খুশি হবেন না’।
এই কন্ঠস্বরে প্রথম কোনো ধী দেখতে পেলেন দুর্যোধন যা তাঁর এই চিরপরিচিতা প্রগলভা মহিষীর মধ্যে কখনো দেখেননি। কলিঙ্গ প্রদেশের এই রাজকন্যার কন্ঠস্বরের মধ্যে হঠাৎ করে যেন দ্রুপদের সেই কৃষ্ণবর্ণা তনয়ার ব্যক্তিত্ব সাময়িক স্থায়িত্ব পেলো।
ভানুমতী কুরুবংশের এইমূহুর্তে জীবিতা নারীদের মধ্যে সম্ভবতঃ সবচেয়ে অগভীর। অন্ততঃ দুর্যোধন তাই ভাবতেন। গান্ধারীর ধর্মপ্রীতি, দ্রৌপদীর ব্যক্তিত্ব, কুন্তীর তীক্ষ্ণবুদ্ধি কোনোটাই তাঁর মধ্যে দেখেননি দুর্যোধন। তা নিয়ে বেশ খুশিও ছিলেন – কুরুবংশের এই বাকি সব রমণীরা বড়ো বেশি আলোকপ্রাপ্তা – দুর্যোধন নারীবিদ্বেষী নন – কিন্তু রাজসভা অথবা যুদ্ধক্ষেত্রের বহির্জগতে নারীর উপস্থিতি পছন্দ করেননা। তাঁর মহিষীটি অন্তঃপুরাচারিণী হয়ে খুশি এই ব্যাপারটি দুর্যোধনকে বড়ো সুখ দিতো।
‘আমাদের বিবাহের দিনটি আপনার মনে আছে যুবরাজ?’
‘মনে আছে’ – এখনো স্মরণশক্তি প্রবল রয়েছে দুর্যোধনের – ‘পাঞ্চালীর পরপরই, তোমার স্বয়ম্বর অধিষ্ঠিত হয়েছিল কলিঙ্গে, তোমাকে একপ্রকার হরণ করেই নিয়ে এসেছিলাম আমি আর সখা কর্ণ। সত্যি কথা বলতে তোমাকে আমার বরাবরই দ্রুপদদুহিতার চেয়ে বেশি রূপসী বোধ হয়, ওই কৃষ্ণবরণে মানুষ কি পায় বুঝিনা’।
‘একটা ঘটনা বিস্মরণ হয়েছে আপনার যুবরাজ’।
‘কি প্রিয়া?’
‘আমি আপনাকে বরমাল্য দানে অস্বীকার করেছিলাম’।
দুর্যোধনের প্রথমে মনে পড়লো না। তারপর পড়লো। কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের এই কন্যাটি বরমাল্যহস্তে এসে তাঁর সামনে স্থিতই হয়নি। দুর্যোধন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে ধনুকে জ্যা রোপণ করতে পারেননি – সে একপ্রকার যোগ্যতার পরীক্ষা ছিলো। কিন্তু এই কলিঙ্গকন্যা যা করেছিলেন – তা প্রায় জনসমক্ষে অপমান। দুর্যোধনের অহংয়ে সহ্য হয়নি। তাই মূলতঃ কর্ণের বীরত্বে ভর করে হরণ করে এনেছিলেন ভানুমতীকে।
দুর্যোধনকে নিশ্চুপ দেখে ভানুমতী বলতে শুরু করলেন – ‘আপনাদের বংশে কিন্তু অনিচ্ছুক কন্যাকে কেউ সবলে বিবাহ করেনি যুবরাজ – আপনি ছাড়া। এমনকি কাশীরাজকন্যা অম্বাকে হরণ করে এনেও তার প্রেমাষ্পদের কথা জানতে পেরে পিতামহ ভীষ্ম ফিরিয়ে দিয়েছিলেন’।
দুর্যোধনের কাছে সেই মূহুর্তে এই অভিযোগের কোনো উত্তর ছিলোনা।
ভানুমতী বললেন – ‘হস্তিনাপুরে এসে অবশ্য দেখলাম, কতো দাসদাসী কতো বৈভব – আমাদের ওই ক্ষুদ্র কলিঙ্গে যার লেশমাত্র ছিলোনা। অন্তঃপুরে এক কথায় ভালোই রেখেছিলেন। কিন্তু’
‘কিন্তু?’ – দুর্যোধন সজাগ এবং অসহায়ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আপনি বলছিলেন না, আপনি কি অন্যায় করেছেন বুঝতে পারেন নি এখনো?’
‘হ্যাঁ’।
‘আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্যায় সেটাই – যার জন্য আপনি এখনো বুঝতে পারেননি’।
‘তুমিও দোষারোপ করছো প্রিয়া’।
‘সত্য বলছি যুবরাজ। আপনার সাথে এতগুলো দিন অতিবাহিত করার সত্যটি বলছি’।
‘কি সেটা?’
‘আপনি কোনোদিন মহান নৃপতি হতে পারতেন না যুবরাজ। আপনি কারো মন বোঝেন না। কারণ আপনি নিজের মনের বাইরে কোনোদিন দেখেননি। প্রজাদের মনেও নয়, আপনার আত্মীয়দের মনেও নয়, আমার মনেও নয়। আপনার একটাই জগৎ আর সেটায় আপনি বরাবর একা। শুধু এই উরুভঙ্গ কালে রিক্ত সামন্তপ্যঞ্চকে নয়। বরাবর। আজীবন’।
‘আমাকে অনেকেই প্রিয়াষ্পদ করে রেখেছিলো মূঢ় নারী, ভ্রাতা দুঃশাসন, কর্ণ, মাতুল শকুনি’।
‘সেটা আপনার প্রতি প্রেম না পান্ডবদের প্রতি বিদ্বেষ সেটা স্বর্গে পৌঁছে জানবেন’।
‘বৈধব্যের অভিশাপ দিচ্ছো ভানুমতী – তাও নিজেকে’।
ভানুমতী হাসলেন – রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশী চন্দ্রমা যেন প্রকাশ হয়েই বিলীন হলো।
‘সে তো বহুদিন ধরেই দিচ্ছি যুবরাজ’।
হতবাক দুর্যোধন সক্রোধে একবার উঠে বসতে চেষ্টা করলেন।
পারলেন না – ভূপতিত হলেন।
‘তবে থেকে দিচ্ছি যবে থেকে আপনি ভ্রাতৃজায়াকে সভাস্থলে নিজ উরুপ্রদর্শন করলেন। আপনার মনে আছে কিনা জানিনা – একদিন আমি আর আপনার সখা পাশা খেলছিলাম অন্তঃপুরে। আমি প্রায় যখন পরাজিতা, সে লজ্জা অস্বীকার করে খেলা ছেড়ে উঠে পড়েছিলাম, কর্ণ আমার বস্ত্র আকর্ষণ করে বসাবার প্রচেষ্টা করছিলেন। সেসময় আপনি ঢুকে পড়েন – ভেবেছিলাম বিস্রস্তবসনা স্ত্রীকে দেখে সন্দেহ করবেন আমার উপর অথবা প্রাণাধিক সখার উপরে’।
ভানুমতী একটু থেমে বললেন -
‘কিন্তু আপনি শুধু আমার লুন্ঠিতা মুক্তাহারের মুক্তাগুলি সংগ্রহ করে বললেন হারটি কি আবার বানিয়ে দেবো?’
‘আমি কোনোদিন ভাবিনি তুমি আমার বিরুদ্ধে যেতে পারো ভানুমতী’।
‘ভাবেননি যুবরাজ। তার কারণ আমি আপনার ভাবনাতেই ছিলাম না। ঈর্ষা কিন্তু প্রেমেরই একটা রূপান্তর – একটা বহিঃপ্রকাশ। আপনি এইজীবনে শুধু একটি জড় পদার্থে সে প্রেম দিয়েছেন – হস্তিনাপুর রাজসিংহাসন’।
এতক্ষণের বাদানুবাদে শৃগাল ও সারমেয়গুলি কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়েছিলো, এবার তারা উপস্থিতি জানান দিলো।
রাত্রি তৃতীয়প্রহর আগতপ্রায়, চারপাশের শবদেহ থেকে পুতিগন্ধময়তা আচ্ছন্ন করছে চেতন – এই মরভূমিতে সুখ নেই, বীরত্ব নেই, প্রাপ্তি নেই – শুধু আদিগন্তব্যাপী ক্লীব মৃত্যু আলিঙ্গন।
শেষশয়ানে অপমানিত ও ক্লিষ্ট ধার্তরাষ্ট্র এরপর পর পর কয়েকটি প্রশ্ন করলেন নিজের স্ত্রীকে।
‘তবে তুমি পান্ডবেরা বনবাসে যাবার পর দ্রৌপদীর আভূষণ নিয়ে শিশুর মতো আনন্দ পেয়েছিলে কেন?’
‘জড় পদার্থকেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম আর্যপুত্র। আপনার আদর্শে’।
‘আমাকে কখনো ভালোবাসোনি?’
‘এক মুহূর্তের জন্যও – না’।
‘তবে আজ কেন এসেছো মহিষী – আমার এই দ্বিতীয় উরুভঙ্গ সংঘটনে?’
ভানুমতী নিজের আঁচলটি দিয়ে শরীর ঢেকে নিলেন – এই সময়টা একটা নিবিড় শৈত্য নামে মাঠে প্রান্তরে – এই অঞ্চলে। সরস্বতী অববাহিকা তো কাছেই। এখন সুস্থ থাকতে হবে – সামনে শ্রাদ্ধশান্তিসহ অনেক কাজ, দুর্যোধনপুত্র দুর্জয়কেও পরিচালনার দায়িত্ব এখন থেকে তাঁর – হয়তো দেবর পান্ডবেরা অবমাননা করবেনা – তাও।
‘এসেছি যুবরাজ কারণ এই সত্যগুলো বলার ছিলো’।
‘আর এই নিদারুণ নির্লজ্জ কামপ্রচেষ্টা। যেটা তুমি প্রায় বারবণিতার লিপ্সায় ঘটালে – কিছুক্ষণ আগে?’
‘অপমান করুন যুবরাজ – ক্রোধসংবরণ আমার বহুকালের অভ্যাস’।
একটু থামলেন ভানুমতী – কথাটা গুছিয়ে নিলেন।
‘আপনার দেহটার – এই সুনিপুণ দেশসুষমার প্রতি আমার বড়ো মোহ ছিলো যুবরাজ। যদি ভালোবাসা বলেন, তাহলে এতোদিনকার দাম্পত্যে এটুকুই আপনার সত্যিকারের প্রাপ্তি। আজকে নিশ্চিত হলাম – সেটা শেষ হয়ে গেছে’।
বলে এগিয়ে এসে দুর্যোধনের কপালে একটি চুম্বন করলেন কলিঙ্গকন্যা।
‘কাল বৈধব্যদশায় আমাকে সত্যিই অভিনয় করতে হবে – এটুকুই যা কষ্ট’।
চলে যাবার সময় ভানুমতী আর একবারের জন্যও ফিরে দেখার প্রয়োজন অনুভব করলেন না।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান