মেয়েমানুষের ভাষা

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত মেয়েদের স্কুলে কাটাবার পর যখন কো-এড কলেজে পড়তে যেতে হচ্ছে, মা পইপই করে সাবধান করে দিয়েছিলেন। নাঃ কলেজের ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করায় নিষেধাজ্ঞা নয়, ভীষণ সিরিয়াস মুখ করে বলেছিলেন “এতদিন মেয়েদের সঙ্গে মিশেছ নিশ্চিন্ত ছিলাম, এখন কলেজে গিয়ে ছেলেদের থেকে গালাগালি শিখে এসে যেন বাড়িতে বোলো না। মেয়েদের ওসব মানায় না”। মায়ের ওই ‘সিরিয়াস মুখ’-র ভাবসম্প্রসারণ তখন করা হয়নি, তাই মেয়েদের ‘ওসব’ কেন মানায় না তা আর বুঝিনি, তাই বিপত্তি বাধালাম। একটা নাটকের দলের তখন নিয়মিত সদস্য, সেখানকারই এক দাদার অভ্যেস ছিল সবাইকে হেতু নির্বিশেষে ‘গান্ডু’ বলে সম্বোধন করার, তো বিশাল অনুপ্রাণিত হয়ে একদিন বাড়িতে বোনকে বলে ফেললাম “আরে গান্ডু! এইটাও বুঝিস না?” বোন শুনে কি বুঝল জানিনা , কিন্তু মা পাশেই ছিলেন সেটা আমি বুঝিনি, তাই মা শুনলেন বুঝলেন এবং বললেন “ছেলেদের এইসব নোংরা কথা মেয়েদের মুখে মানায় না”।
ঠিক এইকথা মনে পড়ে গেল হালফিলের একটি বাংলা ছবি ‘হনুমান ডট কম’র একটি সংলাপে, যেখানে প্রসেনজিৎ অভিনীত চরিত্র একটি কিশোরী মেয়ের মুখে ‘পোঁয়া’ শব্দটি শুনে খুব শিউরে টিউরে উঠে বলছেন “ছিঃ মা, খারাপ কথা বলতে নেই, তুমি না মেয়েমানুষ”।
‘মেয়েমানুষের খারাপ কথা বলতে নেই’ ধারণাটি কিন্তু একদমই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বেড়ে ওঠা। আপনি ক্যানিং লোকাল বা বনগাঁ লোকালের তথাকথিত ‘বিখ্যাত’ ট্রেনগুলির মহিলা কামরায় উঠে নিত্যযাত্রী মহিলাদের কথাবার্তা রেকর্ড করে আনুন, যেকোনো চ্যানেল লম্বা ‘বিপ্’ এমন বাজাবে যে শুধু ওই বিপদসঙ্কেতটুকুই শোনা যাবে, বাকিসব কথাবার্তা তার আড়ালে।‘গালাগালি’ বা ‘স্ল্যাং’ বা ‘নোংরা কথা’ কিন্তু তাই পুরুষ=ক্ষমতাবানের ভাষা নয়। কারণ লক আউট হওয়া কারখানার শ্রমিক তার মালিকের গাড়ির কাঁচে থুতু ছিটিয়ে নোংরা কথা বলতে পারে, পুজোয় বকশিস না দিলে মিত্রর বাড়ীর কাজের মাসি পাশের বাড়ীর সেন বাড়ীর ঠিকে লোক পল্টুর মা’কে মিত্র বৌদির নামে ‘নোংরা কথা’ বলতে পারে। তাহলে এই ধারণার মূল কোথায়? মূল এই মধ্যবিত্ত ভদ্দরলোক সমাজের মনে, যেখানে এখনও পাত্রীর বিশেষণ ঘরোয়া-গৃহকর্মনিপুণা-ভ লো গান জানে আর পাত্রের বিশেষণ কেঃসঃচাঃ-কলিতে নিজ বাড়ী। নারীর ক্ষমতায়ণ নিয়ে খুব গম্ভীর গম্ভীর ইংরাজীতে (কখনও সখনও অবশ্য বাংলাতেও) ততোধিক গম্ভীর সেমিনার হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের ক্ষমতায়ণের ক্ষেত্রে যে মেয়েদের মুখের ভাষাগত ‘ট্যাবু’ একটা বড় জায়গা দখল করে রেখেছে, তার কথা কোথায়?
আসলে আমাদের সমাজ শেখায় আদর্শ নারী হবে নম্র-ভদ্র, কোনো অবস্থাতেই কক্ষনো কোনো খারাপ কথা বলবে না, আর ছেলেরা? আরে ওদের কথা বাদ দাও, পুরুষমানুষের বাইরে কত চাপ! মেয়েরা মায়ের জাত, অত মাথা গরম করলে চলে? মোটামুটি এই মানসিকতা থেকেই মেয়েদের স্কুলে স্কুলে ঈভ-টিজিং প্রতিরোধে কর্মশালা, সচেতনতা শিবির এইসবের আয়োজন করা হয়, আর ছেলেদের স্কুলে কিসসু না। কিহবে করে? ঘরের মেয়েরা ঠিক থাকলেই সব ঠিক থাকে! কেনা জানে নারী নরকের দ্বার ইত্যাদি প্রভৃতি। তাই ঘরের মেয়েরা যখন কলির ফেরে আজকাল ঘরের বাইরে বেরোচ্ছেই, কী আর করা যাবে, তাই বলে ব্যাটাছেলেদের মতো মুখ খারাপ করবে? ছিঃ আমাদের একটা কালচারাল হেরিটেজ নেই? যেন এইসব ‘নোংরা কথা’ বা ‘স্ল্যাং’ বা অশিষ্ট শব্দ ও বাক্য প্রয়োগ সংস্কৃতির মানচিত্রের বাইরের ব্যাপার। ‘স্ল্যাং’ বা ‘গালি’ বা ‘খিস্তি’ যেনামেই ডাকি অশিষ্ট শব্দ সমস্ত ভাষারই একটা অন্যতম প্রধান অংশ। তাই বলে নিশ্চই সবাই সর্বত্র সব জায়গায় স্ল্যাঙাব না বা পুনরায় খ্যামটা-খেউড়ের আড্ডায় ফিরে যাব না ভাষাকে সমৃদ্ধতর করতে, কিন্তু যখনই সেটা মেয়েদের মুখে শুনতে পাব তখনই “তওবা তওবা” কেন? নিজেকে প্রগতিশীল বলে পরিচয় দেওয়া এক বন্ধুকে শুনলাম কোনো একটি মেয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে বলছেন “মেয়েটার মুখে কিছুই বাধে না”, কিন্তু অনুরূপ একটি “কিছুই বাধেনা’ ছেলের পরিচয় দিতে গেলে কি তিনি এই কম্পালসারি চেতাবনিটি দিতেন?
ভাষার সঙ্গে এইদিক থেকে ক্ষমতার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে উপার্জনকারীর ভূমিকা নারী ও পুরুষ উভয়েরই প্রায় সমান, তাই বলে যে মেয়েদের পুরুষের সমান সামাজিক বা পারিবারিক মর্যাদা আছে তা নয়, তবুও সেখানে ‘মেয়েমানুষের ভাষা’ ‘পুরুষমানুষের ভাষা’ বিভাজন প্রায় নেই। কিন্তু ভারতের মহান মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা কিনা ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তারা চাইলেই রেনেসাঁ হয়ে যায় চিন্তা করলেই বিপ্লব, তাদের কাছে নারীকন্ঠে অশ্লীল ভাষা নৈব নৈব চ। অথচ খেয়াল করে দেখুন যেসব অশিষ্ট শব্দের ধার বা তীব্রতা বেশী তাদের অধিকাংশই কিন্তু নারীসম্পর্কিত।আমরা অনায়াসেই সেইসব স্ত্রীলিঙ্গবাচক অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করি, এমনকি কোনো পুরুষের উদ্দেশ্যেও তা প্রয়োগ করা যায়, শুধু শব্দটির পাশে ‘-র বাচ্চা’ শব্দটি জুড়ে দিতে হবে এডিটিঙের সময়, তাহলেই চলবে। অতএব, এইবার নাক মুখ কুঁচকে বলতেই পারেন উফ্ আরোওওও একটা ফেমিনিস্ট লেখা!
কিন্তু এইবার বোধহয় এই কথাগুলো বলার সময় হয়েছে। আজ যখন ধর্ষণের প্রতি চুয়ান্ন মিনিটের ব্যাবধানটা ক্রমেই কমছে, আর তারমধ্যে বেশীরভাগ ধর্ষণের ঘটনাই নথিভুক্তির অভাবে থেকে যাচ্ছে, তখন বোধহয় দরকার আছে মেয়েদের শিষ্ট শান্ত শ্লীল মিউ মিউ করে পুরুষতন্ত্রের শেখানো বুলি থেকে সরে গর্জে উঠে ‘ভালো মেয়ে’র ‘ভালো ভাষা’র গণ্ডির বাইরে গিয়ে হুঙ্কার দেবার। মেয়েরা জন্মাবার আগে ভ্রূণ অবস্থা থেকেই চাঁদমারি, তারপর শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ(নতুন সুপার ট্রেন্ডি অস্ত্র গণধর্ষণ), পণের জন্য হত্যা, প্রেমে প্রত্যাখ্যান করলে মুখে অ্যাসিড এইসব শানানো অস্ত্র ছোঁড়া হতে থাকে সেই নির্বাক চাঁদমারিতে। নির্বাক কারণ মুখ খুললেই সবাই জেনে যাবে আর ধর্ষিতাকে বলবে “এইসব করে (অর্থাৎ ধর্ষিতা হয়ে)এ পাড়ায় থাকা যাবে না”, নির্বাক, কারণ এত ভদ্র, শান্ত ‘মেয়েমানুষের যুগ্যি’ ভাষায় বশ্যতা স্বীকার ছাড়া গর্জে ওঠা যায়? যায় না। তাই মেয়েদের খারাপ কথা বলতে দেওয়া হয় না।
আমি বলতে চাইছিনা যে নারী আন্দোলনের হাতিয়ার উঠুক অশিষ্ট ভাষা, বা ঐ পথেই মেয়েদের ক্রমমুক্তি হবে ইত্যাদি প্রভৃতি।কিংবা আসুন সবাই খিস্তোই। যেটা বলতে চাইছি সেটা হল “ছিঃ মা, খারাপ কথা বলতে নেই, তুমি না মেয়েমানুষ” এই সংলাপ যেন আর না রচিত হয়, না পর্দায় না জীবনে।

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান