সার্থক ফেসবুকজন্ম আমার

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

মার্কবাবু কী ফেসবুক বানানোর সময় ভাবতে পেরেছিলেন আমাদের ফেসবুকজন্ম এত সার্থক হবে? আমরা এখন ফেসবুকে খাই, ঘুমোই, গান শুনি, বই পড়ি, ছবি তুলি, বেড়াতে যাই, প্রেম করি, লেঙ্গি খাই, লেঙ্গি মারি, ডিভোর্স দিই। ফেসবুকেই আমাদের বাচ্চা প্রথম হাঁটতে শেখে। তার সেই প্রথম হাঁটার ভিডিওর নীচে কমেন্ট পড়তে থাকে “সো সুইট” “ হাউ কিউট” (আমার এক দিদি বলেছিল, ফেসবুকের কমেন্ট দেখে মনে হয় ইংরেজীতে দুটোই বিশেষণ আছে “সো সুইট” আর “হাউ কিউট” ) “গুবলু পুগলু” “মুউউউউয়া বেবি” । বাবা-মা বা অত্যন্ত কাছের কেউ মারা গেলে ফেসবুকে তক্ষণই স্ট্যাটাস আপডেটিত হয় “লস্ট গ্র্যান্ডপা টু আওয়ারস এগো, আই ওয়াজ হিজ ডিয়ারেস্ট, ফিলিং স্যাড”। কোষ্ঠকাঠিন্যে স্ট্যাটাস পড়ে “কন্সটিপেশন ইজ স্টার্টেড এগেন।“ একি মজার খেলা রে ভাই!

কয়েকবছর বাদে ইলেকট্রনিক আর প্রিন্টমিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের আর কোনো দরকার থাকবে না। নানা বাণিজ্যিক পণ্য যেমন আইপ্যাড থেকে আশীর্বাদ আটা সবের বিজ্ঞাপন এখানে পাওয়া যায়। ভোটের প্রচার চলে। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে চাপান উতোর থেকে শুরু করে কাঁচা হুমকি সবই চলে। প্রার্থীদেরও ফেবু অ্যাকাউন্ট আছে। তবে আর দাদা অন্য মিডিয়ায় যাব কেন?

বেসিক্যালি মুখে রাজা উজির মারতে ফেসবুকের জুড়ি নেই। আমি প্রতিবাদ জানাতে চাই। কিন্তু কড়িকাঠ গোনা ছাড়া ফান্ডা নাই। তাহলে চলো গরম স্ট্যাটাস বানাই। সেগুলো দিয়ে দেওয়াল ভরাই। যে টপিকটা নিয়ে বাজার গরম সেটায় ইভেন্ট বানিয়ে দলে দলে যোগদান করি আর যে টপিক টা পাবলিক খাচ্ছে না, সেটা নিয়ে কিন্তু টুঁ শব্দ নয়। যেমন সোনি সোরি বা বারাসাতের কামদুনি এখন ফেসবুকের আউট অফ সিলেবাস।

আর আছেন মহামান্য ফেসবুক কবিগণ। যাঁদের সম্পর্কে চন্দ্রিল বলেছেন, ফেসবুকে সকলেই কবি। তা এঁরা শুধুই কবিতা লেখেন না। সেগুলোয় ট্যাগ করেন আপামর জনসাধারণকে। তারপর তাতে কমেন্ট পড়তে থাকে (এক্ষেত্রে কিন্তু বাংলায়) “আহা! অপূর্ব” “জীবনানন্দের পর এইরকম এক্সপেরিমেন্ট এই প্রথম দেখলাম” ইত্যাদি ইত্যাদি।
ততসঙ্গে সঙ্গতকারক ডিএসএলআর ধারীরা, তাঁদের ঝাঁ চকচকে ছবিতে কমেন্ট পড়ে “নাইস স্ন্যাপ” “গুড শট” ইত্যাদি। তবে এঁদের বেশিরভাগেই প্রকৃতির ছবি মন্দ তোলেন না।

ফেসবুক আসলে যা চাই তা পাইয়ের চরম নিদর্শন। ফেসবুক আসার আগে পুরনো প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ঘাড় থেকে নামাতে বেশ বেগ পেতে হত। এখন সোজা। যেখানে ‘ইন এ রিলেশনশিপ উইথ অমুক’ ছিল, সেটাকে ‘সিঙ্গল’ করে দিলেই হল। বন্ধুরা কমেন্ট দেবে ‘’ওম্মা! কি হয়েছিল?” “বোথ অফ ইউ ওয়্যার নাইস জোড়ি ইয়ার!” ইত্যাদি প্রভৃতি। এবার মাসখানেক পর আরেকজনের সঙ্গে কফিশপে ছবি আপলোড করে পরের সপ্তাহে ‘ইন এ কমপ্লিকেটেড রিলেশনশিপ’ আর তারপরে ‘ইন এ রিলেশনশিপ উইথ তমুক’ করে দিলেই হল। ইজি কেস। চাপ নেবার কি আছে?

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান