জেগে থাকো শাহবাগ

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সাবধানে পথ চলি আমরা, পাছে লোকে কিছু বলে। সাবধানে কথা বলি আমরা, পাছে লোকে শুনতে পায়। সাবধানে ছবি আঁকি আমরা, পাছে সেটায় বিরোধী মনোভাব প্রকাশ পায়। মকবুল ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে অবশ্য কার্টুন ছবি এঁকে নেত্রীর মর্যাদাহানির অভিযোগ ওঠেনি, উঠেছিল অশ্লীলতার অভিযোগ। হিন্দু দেবদেবীর অশ্লীল ছবি নাকি এঁকেছিলেন তিনি। কারা অভিযোগ তুলেছিল তথাকথিত এই ‘শ্লীলতা’ নিয়ে? যারা গুজরাতে গর্ভবতী মহিলার পেটে তরোয়াল ঢুকিয়ে বার করে এনেছিল ভ্রূণ, আর তরোয়ালের ডগায় সেই ভ্রূণ নিয়ে ‘জয় রামজী কি’ বলে উন্মত্ত নৃত্য জুড়েছিল যারা! হ্যাঁ! আমাদের দেশের সবরকম ঠিক-ভুল, ভালো-মন্দের দায়িত্ব এইরকমই কিছু ‘মানুষ’-র হাতে। এই অবস্থায় আমাদের কি আর প্রতিবেশী দেশের সমস্যা, তাদের রাজনীতি নিয়ে কথা বলা মানায়? সেদিন ফেসবুকে বাংলাদেশের এক বন্ধুর স্ট্যাটাসে পড়লাম গুজরাতের দাঙ্গার কথা শুনে তাঁর কিশোর মনে প্রবল হিন্দু বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছিল।

তাই বলি, সাম্প্রদায়িকতার বা মৌলবাদের বিরোধিতা আমাদের এতদিন পরে করা মানায় না। এতগুলো দিন কি করছিলাম আমরা? এতগুলো বছর? বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় কি আমরা ঘুমিয়েছিলাম? নাকি গোধরার গণহত্যার সময় অন্ধ হয়েছিলাম? তাহলে হঠাৎ মৌলবাদের বিরোধিতা করার জন্য শাহবাগের আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করতে হল কেন এপারের বাঙালীদের? পথে নামেননি কেন এতদিন? নাকি এটা বাংলারই আরেক অংশ বলে তাঁদের এই সহমর্মিতা? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশকে বলব, ভাই তোমরা সীমানার পারের মানুষগুলোর সম্পর্কে কতটা জানো তা জানি না, কিন্তু এটুকু জেনে রেখো আমরা ভারতীয়রা ভীষণ হুজুগবাজ। আমাদের প্রতিবাদের ধার তোমাদের মতো নয়। তোমরা যেখানে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা রাতের পর রাত, দিনের পর দিন একটানা কুড়ি-বাইশ দিন ধরে শাহবাগের মাটি কামড়ে পড়ে আছ, আমরা কখনও তেমন পারিনি। করে দেখাইনি। দিল্লীতে ধর্ষণের প্রতিবাদে অপরাধীদের শাস্তি চেয়ে দিল্লীর ইন্ডিয়া গেটের কাছে কদিন অবস্থান করে চলে আসতে হয়েছে উপর মহলের সঙ্গে ‘আলোচনা’ করে। বাড়ি ফিরে খুব করে মোমবাতি মিছিল করেছি আমরা। ফেসবুকে ছবি দিয়েছি মোমবাতি হাতে সুন্দর পোজ দিয়ে আমি আর আমার বন্ধুরা। আর কিচ্ছু করিনি। পরের দিন, তার পরেরদিন, তারও পরেরদিন খবরের কাগজে আবারও একই ঘটনার খবর দেখেছি আর ভেবেছি, যাক, আমি তো চুপ করে বসেছিলাম না, আমি তো ‘সচেতন নাগরিক’-র মত আমার দায়িত্ব পালন করেছি।
বাংলাদেশের বন্ধুরা তোমরা তোমাদের দেশের প্রতি (যে দেশে আমাদের আগের প্রজন্ম বাস করতেন), শাহবাগের এই আন্দোলনের প্রতি এরকম বিশ্বাসঘাতকতা কোরোনা প্লিজ! অসম্মান জানানো হবে তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের। শত শহীদের রক্তে রাঙানো সোনার বাংলার ছেলেমেয়েরা রাত জেগে শাহবাগে বসে আছ যেমন, তেমনই বসে থাকো, আর গর্জে উঠুক লাকি আখতারের গলা, যতদিন না তোমরা সঠিক বিচার পাও। জেগে থাকো শাহবাগ। কলকাতা বা দিল্লীর মতো দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পোড়োনা প্লিজ!


কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান