মাথাব্যথা

সরোজ দরবার

 


কুকুরের মস্তিষ্ক কতটা উন্নত, সে নিয়ে কুকুরের তেমন মাথাব্যথা নেই। মানুষের আছে। মানুষের আসলে বহু কিছু নিয়ে মাথাব্যথা থাকে। যে মেয়েটা একা থাকে, তার ঘরে রোজ ছেলে আসে কেন থেকে শুরু করে যে ছেলেটা একা থাকে তার ঘরে শুধু ছেলেই আসে, মেয়ে আসে না কেন- এরকম বাপে তাড়ানো মায়ে খ্যাদানো মাথাব্যথা দের নিয়ে থাকতে মানুষ ভালোবাসে। কুকুরের এত মাথাব্যথা র দায় নেই। মিলনকালে মানুষ কেন তাকে ঢিল মারে, তার পিছনে মনস্ত্বত্ত্বের গভীরে ডুব দেওয়ার ইচ্ছেও বোধহয় তার নেই। আর ভাবনা করার মতো মাথাও নেই। সে তাই স্ট্রেট ভৌ করে খেঁকিয়ে ওঠে। নাগালে পেলে কামড় বসাতে ছোটে।
মাথাব্যথা র দায়েই মানুষ খতিয়ে দেখেছে যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের মাথা আর কুকুরের মাথা নাকি একইরকম ভাবে কাজ করে। কুকুরের মস্তিষ্কের basal ganglia , পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অনেকটা মানুষের মতোই দেখতে। ডাকে সাড়া দেওয়া, আবেগ প্রকাশ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে সারমেয়কুল তাই অনেকটাই মানুষের মতোই। নিউরোসায়েন্টিস্ট Gregory Berns এ নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন। প্রকাশিত হয়েছিল, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ। তাঁর প্রবন্ধের নাম ছিল, ‘Dogs are people, Too’. সে নিয়েও অবশ্য বিস্তর মানুষের বেজায় মাথাব্যথা ছিল।
তবে রাস্তা পেরনোর ক্ষেত্রে কুকুরদের কিছু মাথাব্যথা থাকা উচিৎ ছিল। এই কারণে সারমেয়কুল মাঝে মধ্যেই সমস্যায় পড়ে। প্রায়ই তারা রাস্তায় বেরিয়ে গাড়ি চাপা পড়ে। হতে পারে, গাড়ি দেখলে তাদের মটকা গরম হয়ে যায়। কিংবা গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে মজা পায়। যাই হোক, রস্তায় এই গাড়ির কবলে পড়েই তাদের দুর্ঘটনা ঘটে। বেশি ভাবনা চিন্তা না করেই বেচারিরা রাস্তা পেরোতে যায়। তারপর যতক্ষণে বোঝে কাজটা ঠিক হয়নি, তখন আবার ফেরত আসতে যায়। আর তাতেই কুকুরদের দুর্ঘটনা ঘটে বলে মানুষের অনুমান। আবেগে তাদের মস্তিষ্ক মানুষের মতো কাজ করলেও গতিবেগের পরিমাপে বোধহয় পাল্লা দিয়ে উঠতে পারে না।
মানুষ কিন্তু এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ সেয়ানা। এমন ভুল তার সচরাচর হয় না। মানুষ অনেক দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নয়। রাস্তা টপকে এ পার থেকে অন্য পারে মসৃণ মিশে যাওয়ার ব্যাপারে তার দক্ষতা অপরিসীম। উদাহরণস্বরূপ বিশ্ব সংসারের বৃহৎ পরিসরকে একটু সংকুচিত করে নিয়ে আমাদের দিকে একটু চোখ ফেরালেই হয়। দেখব আমরা কীরকম আস্তে করে কাস্তে-রাস্তা পেরিয়ে ফুলে ফুলে দলে দলে ঢলে ঢলে পড়েছি। আশাজীর গান মনের মণিকোঠায় থাকুক, কিন্তু যাব কি যাব না’র দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এক মিনিটও মনে স্থায়ী হয় না। কারণ অবশ্যই সিগন্যাল সিস্টেম। সেইই শিখিয়েছে এদিক ওদিক তাকাতে। সুতরাং একবার ৩৪ বছর আর একবার প্রতিশ্রুতির বহরের দিকে তাকিয়ে আমরা অবলীলায় রাস্তা পেরিয়ে যাই। কুকুরেরা চিরকালই স্ট্রেটকাট। তারা সেদিনও মিছিলের পাশে ছিল। আজও আছে। যে কোন রঙ মিছিলের পাশেই তারা আছে। মিছিলে কটা লোক, কোন লোক, মিছিল টাইট না শিথিল সে নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
সিদ্ধান্ত নিতে মানুষের থেকে দড় কেউ নেই। তাওতো মানুষের মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ক্রিয়াশীল। বাকি ৯০% কাজ শুরু করে দিলে তো কথাই নেই। সিদ্ধান্ত আর মতামত তাদের নিয়মিত মাথাব্যথা র বিষয়। দৃষ্টিটাকে একটু সরু করলেই দিব্যি দেখতে পাওয়া যায় মানুষের থুড়ি আমাদের রাজনৈতিক মতবাদ তৈরি করে দেয় টেলিভিশনের ভীষণ প্রহরীরা। হতে পারে তার একদিকই সক্রিয়, বাকি সকল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন কিন্তু বালাই ষাট জেট গতির জমানায় পিছিয়ে পড়ার রিস্ক কেউ নেয় নাকি! তারই মধ্যে টেনেটুনে যেটুকু যা নিজস্ব ভাবনাচিন্তা আমাদের ছিল, তারাও সব শহরের এ- ধারে ও-ধারে হোর্ডিংয়ে মুখ ঝামটা খেয়ে অবশেষে মেনে নেয় ওই মতটাই খাঁটি। না মেনে উপায়ও নেই, কেননা অন্য যারা কালকে তারায় ছিল, আজকে তারাই মা-টিতে নেমে মস্তিষ্কের কোষে কোষে চাঁটি মারতে থাকবে। জনপ্রিয় সাইট বলছে সবকিছু বিকিয়ে যায়, আর কনসেন্ট বিকোবে না? ও জিনিস ছবি না দিলেও বিকোবে। ঠিকঠাক না বিকোলেও পারচেজড হয়ে যাবেই যাবে। আর কে না জানে পারচেজড ল্যান্ডে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট থেকে লোনের ছাড়পত্র সবই মেলে। সে যাকগে, এদিকে ঘেঁটি ধরে আমাদের গানের ভালোমন্দের বিচারবোধ তৈরি করে দিয়ে যাবে সোয়াবিনের কোম্পানি। আর একবার ‘কাট’ ভার্সন, দ্বিতীয়বার ‘আনকাট’ ভার্সনে আমাদের হাসির ওঠাপড়া বেঁধে দেবে প্রখ্যাত সরিষার তৈল। এক মন তৈল, কীসে খরচ হৈল সে জানতে আমাদের আর কোন মাথাব্যথা নেই। তা সেই তেলও কতখানি কিনলে কতটা চিনি লাভ করা যায় তার হিসেব করে দেবে ঠান্ডা ঘরের বড় বাজার। লক্ষণের শক্তিশেল আর এহেন সেলের ভিতর কলা খাওয়া আর কলা দেখানো ছাড়া তেমন কিছুই তফাৎ নেই। দুই ক্ষেত্রেই আহতের লক্ষন এক। কিন্তু এ সব আমরা অনেক ভাবনা চিন্তা করেই করি। মানুষের মস্তিষ্কের ১০ শতাংশেরও কম ক্রিয়াশীল এরকম কথা তো কেউ বলছেন না। শুধু এটা নিশ্চিত যে কুকুরের মস্তিষ্কে cortex এর সংখ্যা মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় অনেক কম। ফলে কুকুর বেচারি অনেকাংশে অনুন্নতই থেকে গেছে। তাদের ট্রেনিং হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোন ছাত্র ইউনিয়ন নেই। প্রসঙ্গত কুকুররা অবশ্য কোনওদিন রিয়ালিটি শো দেখে ভৌ বলাও শেখেনি।
সুতরাং উন্নত মস্তিষ্কের মানুষ ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিয়েই রাস্তা পেরোয়। নতুন রাস্তা ধরে মুক্তবায়ু সেবনলোভে অনেকখানি হাঁটা হয়ে যায়।ঠিক তখনই যে কেন আশাজীর গানটা ফের বেজে ওঠে তার কোন মানে বোঝা যায় না। কিন্তু ওই যাব কি যাব না... হায়...হায় হায়... হঠাৎ চোখে পড়ে ‘যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম ভুলিয়ে দিলে তারে/আবার কোথা চলতে হবে গভীর অন্ধকারে।’ মঞ্চে মঞ্চে অন্ধকারের উৎস থেকে কত আলো উৎসারিত হয়, আর আলোয় আলোয় আমার মুক্তি বেদম হোঁচট খেয়ে বসে। তখন যাওয়া ভালো না ফেরা ভালো সে নিয়ে বিচার করতে না করতেই চোখে পড়বে দুরন্ত বেগে গণধ্বজার তান্ত্রিকগাড়ি ছুটে আসছে। নির্বিবাদে চাপা পড়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু মাথাব্যথা র প্রশ্নই নেই।
অতএব চাপা পড়ে গেলাম। মাথা টাথা সব থেঁথলে একসা, শুধু হাতে থাকল ক্লিন দেশ গড়ার অঙ্গীকার ঋদ্ধ বিশেষ একটি মোবাইল কোম্পানির এসএমএস আর উড বি বেস্ট সেলার আধা বান্ধবী। তবু মানুষের মাথা অনেক উন্নত। ওই থেঁথলানো অবস্থাতেও সে খানিকটা বোঝে, আসলে কেনেথ ডগলাস নামে যে মর্গ-রক্ষক ১০০ মহিলা মৃতদেহের সঙ্গে সঙ্গম করেছেন তার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত ফারাক খুবই কম। রাস্তা পেরনোর নামে বস্তুত আমরা যা পেরোতে চেয়েছিলাম তা এক মৃতদেহ থেকে আর এক মৃতদেহ। সংখ্যায় অবশ্য একটা ফারাক আছে। ন্যাশনাল মাইক্রোফোন বলবে শক্ত- কাঠ- মরা- শীতল মৃত যোনির সংখ্যা ৬৮, আর রিজিওনাল মাউথপিস হিসেব দেবে সংখ্যাটা ৩৪। অথচ ৬৮ র ভিতরেই তো ৩৪ ছিল। তবু মানুষ উন্নত মস্তিষ্কের প্রাণী বলেই এত আলাদা আলাদা করে ভাবতে পারে। কুকুররা এ সব মোটেও পারে না। তাদের মস্তিষ্ক এখনও ততটা উন্নত নয়।
শুধু দু’পক্ষেরই গাড়ি চাপা পড়ে যাওয়ায় একটা আপাত খিঁচ জেগে থাকল-এই যা। তা নিয়ে অবশ্য কুকুররা কোনদিনই মানুষের মাথা ঘেঁটে দেখতে যায়নি। অত সময়ই নেই তাদের চার পায়ে। এমনকী ‘People are dogs, Too’-এই শিরোনামে কেউ একখানা প্রবন্ধও ফেঁদে বসতে পারেন। কুকুরদের অবশ্য তা নিয়েও কোনও মাথাব্যথা নেই।

সরোজ দরবার

সরোজ দরবার


কথা ছিল আদরে বাঁদর হবার, হয়ে গেল ব্লগ লেখক। কিন্তু বাঁদরামি কমল কই? ভাগ্যিস বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা প্রবাদটি সত্যি। সেই জোরেই আদরে এবার তিতা পানের খয়ের। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উঠোনে হোঁচট খেয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে অবশেষে পেশায় সাংবাদিক। বেশিক্যালি না ঘরকা না ঘাটকা। জন্ম-হাওড়ায়। চরে বেড়ায়-কলকাতায়। না ভুলতে পেরেছে গ্রাম, না হয়েছে খাঁটি কোলকাতান। ফাঁটা বাঁশে আটকে ত্রাহি ত্রাহি রব। পেশা আর নেশাতেও একই সংকট। একদিকে তিতা হজম, অন্যদিকে তিতা উগরানো। সকলেই কলম ধরেন, কেউ কেউ কী-বোর্ড। অন্য কোনও ইজমে থাকার মতো মস্তিষ্ক নেই, কোনও বাদি নয় তাই, বিশুদ্ধ কী-বোর্ডি। এই করেই ধর্মে-জিরাফে-পদ্যে-গদ্ যে-গল্পে-আলাপে-প্রলাপে সর্বত্র গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। পানপাত্রে হাত দেওয়ার রেস্ত নেই, তাই পান পত্র নিয়েই হেস্ত নেস্তর আশায়। কী করতে চায়, ঈশ্বর খবরও রাখেন না। চোখে দৃষ্টি কম, গায়ে গত্তি নেই, ঘরে রোদ নেই, মিঠা পানকে খয়ের বেশি দিয়ে তিতো করে ফেলা ছাড়া আর কোন মুরোদ নেই। নেহাত বাঁদর-মুক্তো মালা প্রবাদটি ছিল বলেই, এ যাত্রায়...

আপনার মতামত জানান