স্মৃতির ওপারে....

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

আদরের নৌকার ব্লগ লিখতে শুরু করে ছিলাম কয়েকবছর আগে। বাঙাল-ঘটির কাজিয়া নিয়ে মজার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলাম। এবার অন্যরকম বাঙাল-ঘটি গল্প দিলাম তুলে। আজকের নায়ক-নায়িকা আমার দাদু-দিদিমা। ছোটবেলা থেকে শোনা গল্পগুলো এদ্দিনে লিপিবদ্ধ করতে পেরে খুব শান্তি পেলাম।
আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম । তাই এহেন “আমি” সেই অর্থে হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । তাই আমি মিসডি কথাও বলতি পারি আবার আট ডেসিবেল ক্রস ক‌ইরা ঝগড়া করতিও পারি । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার দোস্তি । যেমন রাঁধতি পারি ঝরঝরে ভাত তেমন ভাজতি পারি ফুলকো ফুলকো নুচি। তবে ঘটির ওপর আমি পক্ষপাতদুষ্ট । কারণ রক্ত ।
ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসছি খুলনা হল পশ্চিম আর পূর্ববাংলার সীমানার কাছে অতএব আমরা বাঙাল ন‌ই। আরে বাবা তাতে আমারই বা কি আপনারই বা কি! আমি বাঙালী ঘরে জন্মেছি সেটাই আমার কাছে বড় কথা। রবিঠাকুর, নজরুল, মাছের ঝোলভাত, কড়ায়ের ডাল-আলুপোস্ত আমার শয়নে-স্বপনে-জাগরণে। আমি বাঙালী বলেইতো বাংলাভাষা আমার সহজাত আর বাংলার শিল্প-কলা-কৃষ্টি আমার রোমকূপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সিঁধিয়ে আছে।
আমার মায়ের ঠাকুর্দা তারকনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সাতক্ষীরার খুলনা জেলার মোক্তার। ফিবছর বাড়িতে দুর্গোত্সব, জগদ্ধাত্রী পুজো হত । সেই উপলক্ষে দরিদ্রদদের বস্ত্র বিতরণ করতেন তিনি।আমার দাদামশায়ের জন্ম ওখানেই। দাদামশাই হরিনাথ মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশ থেকেই আই.এ পাশ করে মোক্তারি পড়েন। কিছুদিন মোক্তারি করার পর কলকাতায় চলে আসেন নিজের স্বাধীন ব্যবসা করতে। সাথে একটি দুচাকার সাইকেল ও মাত্র আশি টাকা। তাঁর সাথে বরাহনগরের কুটিঘাটের মেয়ে পরমাসুন্দরী প্রতিভাদেবীর (আমার দিদিমা) বিয়ে ও পরপর প্রথম চারটি সন্তানের জন্মও বাংলাদেশেই । আমার মায়ের জন্মের পর ঠিক তেরোদিনের মাথায় দাদু আবার খুলনায় ফেরেন অষ্টপ্রহর নাম যজ্ঞ করতে। মানত ছিল বোধ হয়। তিন-চার মাইল জুড়ে দরিদ্রনারায়ণ সেবা হয়েছিল সেবার।
দিদিমা খাস উত্তর কলকাতার কুটিঘাটের ব্যানার্জি পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র এগারো। দিদিমার বাবা রাশভারী মাখনলাল বন্দ্যোপাধ্যায় মিলিটারিতে চাকরী করতেন । সেই সূত্রে দিদিমাকে সারা ভারতবর্ষে ঘুরতে হয়েছিল মা-বাবার সাথে। সেই একাদশী একরত্তি ঘটিবাড়ির মেয়ের বাঙাল ঘরে বিয়ে হয়ে আসাটা যেন তার জীবনের ভোল পাল্টে দিয়েছিল রাতারাতি। ঐটুকুনি মেয়ে বিয়ের কি বোঝে! সে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্য। গাছের ফলপাকড়, টাটকা শাকসব্জী, নদী-পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা সেই বিবাহিতা কিশোরীর কাছে যেন বিস্ময় তখন। শহর বরানগর তখন অনেকটাই আটপৌরে গেঁয়োপনা ছেড়ে সবেমাত্র শহুরে হতে শিখেছে। কাজেই প্রকৃতি, সবুজের মাঝে অবাধ বিচরণ সেই কিশোরীর জীবনে অধরা ছিল । শ্বশুরবাড়িতে সকাল হতেই আতপ চালের ফেনাভাত খাওয়া তার কাছে অপার আনন্দ বয়ে আনত। বরানগরে তিনি শিখেছিলেন সকালের প্রাতরাশ হিসেবে পাঁউরুটি-মাখন খাওয়া অথবা লুচি-পরোটা কিম্বা রুটি তরকারী । এখানে এসে সেই ফেনাভাত তার কাছে অবাক করা এক ব্রেকফাস্ট সেই মুহূর্তে। দুপুর হলেই পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল তার কাছে এক আশ্চর্য্যের বিষয়।
দিদিমার মুখে গল্প শুনেছি শাশুড়ি, ননদ ভাজের মধুর সম্পর্কের কথা। দিদা প্রয়শঃই বলতেন বাঙালদেশের শাশুড়ি ননদরা অনেক আপন করে নেয় নতুন বৌটিকে। নতুন বৌ হয়ে তিনি যাবার পর তাঁকে এত যত্ন তাঁরা করেছিল যে তিনি মারা যাবার শেষদিন বধি বলে গেছেন সে কথা। দিদা ছিল বাড়ির মেজবৌ। ননদরা গরম ট্যাংরা মাছভাজা আর তেল দিয়ে একথালা ভাত দিয়ে নতুন বৌকে বসিয়ে আদর করে খেতে দিয়েছিল। দিদার মুখে কতবার শুনেছি এ কথা। নদীর টাটকা মাছ আর অমন যত্ন দিদার মাও বুঝি করেনি তাকে..তিনি বলতেন। বিয়ের বাসরে দাদু-দিদা একসাথে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন। সকলে এক্কেবারে স্পেলবাউন্ড। আবার এও শুনেছি.. “এই লভিনু সঙ্গ তব…” গাইছেন ওঁরা দুজনায়, দিদার শাশুড়ি বলে উঠলেন “ও বৌমা অত জোরে গান করোনা, লোকে কি বলবে!”আমাদের দেশে বিবাহিত মেয়েকে সন্তানপ্রসবের আগেই বাপের বাড়ি রেখে আসাটাই নাকি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দিদার বেলায় খুলনার মুখার্জী পরিবার বিদ্রোহ ঘোষণা করল। দিদার শাশুড়ি বলল” বাচ্ছা হতে বাপের বাড়ি যাবে কেন? সব বৌদের এখানে বাচ্ছা হয়েছে, মেজ বৌয়ের প্রসব এখানেই হবে। আমি স্আমলাব সব। সেখানেই বুঝি বাঙাল শাশুড়িমাদের জয়। বৌদের বারবার মেয়ে সন্তান হলে পাড়ার লোকে কত কি বলত…”তোমার বৌয়ের এত ঘন ঘন মেয়ে হয় কেন গো?” তিনি বলতেন” তাতে তোমাদের কি বাছা? যে মেয়ে জন্মালো তার বাপ-মা বুঝবে, তারা তাদের মেয়ে নিয়ে কি করবে সেটা তাদের মাথাব্যথা।”
মায়ের ঠাকুমার পাঠশালায় যাওয়া শুরু হতে না হতেই মাত্র সাতবছরে গৌরীদান।খুলনার উকিলবাড়িতে নানাধরণের মানুষজনের আনাগোনা ছোট থেকেই লক্ষ্য করলেন তিনি। বিদ্বজন, স্বল্পশিক্ষিত, সুশিক্ষিত সকলের মাঝে নিজেকে কেমন জানি অপাঙতেয় মনে হত সেই বালিকাবধূর। একটু বড় হতেই মুহুরীকে দিয়ে চুপিচুপি বর্ণপরিচয় কিনে আনালেন তিনি। তারপর একে ওকে তাকে জিগেস করে করে অক্ষর পরিচিতি ও শেষে শব্দ বানান ও পরে বাক্য গঠন অবধি হল। বাংলার পর এবার ইংরেজী শিখতে হবে। বাড়িতে খেতে বসে পুরুষ মানুষেরা হরদম ইংরেজী বলে। অনর্গল ইংরেজীতে চিঠি লেখেন তাঁরা। অতএব মাথায় ভূত চাপল। ইংরেজী শিখে ফেলতেই হবে। প্রায়শ‌ই মায়ের ঠাকুর্দার বন্ধুবান্ধবরা নৈশাহারে নিমন্ত্রিত হতেন। স্বামীর বন্ধু মহলে বালিকাবধূর প্রবেশ কিন্তু নিষিদ্ধ ছিলনা। তাহলেই বুঝুন কতটা আধুনিক ছিল পূর্ববঙ্গের সেই শ্বশুরবাড়ি। বিশাল দালানে আসন পেতে জমজমাটি নৈশাহারের ফাঁকে যে সব ইংরেজী শব্দ ব্যাবহৃত হত সেই শব্দমালার ফোনেটিক উচ্চারণ বাংলায় লিখে রাখতেন মায়ের ঠাকুমা। আর কোথায় লিখতেন? দেওয়ালে কাঠকয়লার আঁচড় কেটে। পরে মুহুরীদের কাছ থেকে সেই সব শব্দের ইংরেজী বানান ও অর্থ শিখে নিতেন খাতায় লিখে। এইভাবে সেই বালিকাবধূর অল্পবিদ্যা ভয়ংকর হতে শুরু করল। একবার তাঁর দেওর বৌদিকে কোনো একটি কাজের জন্য বলে ওঠেন “হোয়াট ইজ দিস?”
মায়ের ঠাকুমা একটুও দ্বিধাদ্বন্দে না পড়ে উত্তর দিলেন “দ্যাট ইজ মাই উইশ”!
এভাবেই বাংলাদেশের বালিকাবধূটির ঘরে বসে গিন্নীপনার সাথে সাথে পড়াশুনোতেও কিঞ্চিত ব্যুত্পত্তি হল। এবং ওষুধের নাম থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারত পড়ে রীতিমত আধুনিকা হয়ে উঠেছিলেন।
এইভাবে পূর্ব ও পশ্চিমবাংলার সারটুকুনি আর উভয় পরিবারের আত্মীয়তায় গড়ে ওঠে আমাদের পরিবার। আমরা এর মধ্যে দিয়েই বড় হলাম, শিখলাম আর এখনো ভাবতে থাকলাম।পূর্ববাংলায় সেই আমাদের মরাই ভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছের কথা। দুইবাংলার সংস্কৃতি তখন মিলেমিশে একাকার । জমে গেল ঘটি-বাঙালের রেসিপিরা। আর এহেন ক্ষুদ্র আমি মেলবন্ধন ঘটালাম এপার বাংলা ও ওপার বাংলার সেরা রসনার ।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন, ভালবাসেন নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল ইন্দিরার ব্লগ পড়ুন আদরে...

আপনার মতামত জানান