আড্ডা, পুনরাধুনিক

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



আড্ডা। পুরোনো দিনের মানুষরা বলছেন এই শব্দটা নাকি এখন জাদুঘরে ঢুকে পড়েছে। আড্ডা। আজকালকার মানুষরা বলছেন এই শব্দটা এখন আগের চেয়েও জ্যান্ত। ঘটনা হল, রোয়াকে বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ আর সেই অর্থে নেই। উত্তর কলকাতা থেকে টেনিদার দিনগুলো ফুরিয়ে গেছে বহুদিনই। কিন্তু এসে পড়েছে স্কাইপে, এসে পড়েছে ফেসবুক এবং অন্যান্য ওয়েবসাইটে চ্যাটের সুযোগ। পাশাপাশি দুটো বাড়ির মধ্যে আড্ডা উঠে যাচ্ছে বটে, কিন্তু পাশাপাশি, এমনকি মহাসাগরের দুই কিনারে অবস্থিত দুটো দেশে বাস করেও আজ আড্ডা দেওয়া যায়, এমনকি পরস্পরের মুখও দেখা যায়।
তাহলে কী করে বলবেন আড্ডা আজ এক বিলুপ্ত শিল্প? বলার উপায় তো নেই।
এখানে অধুনান্তিক পরিসরের ভিতর দিয়ে যখন আমরা পুনরাধুনিকের দিকে এগোচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি আড্ডার কোনো সীমা নেই।
কিন্তু অসীমের কি অন্তঃকরণ থাকে?
এটা অবশ্যই এক প্রশ্ন, আড্ডা তো বেঁচে আছে, সে হয়তো অফুরন্ত, কিন্তু তার হৃৎপিন্ড সচল তো? নাকি, শুধু মস্তিষ্কই আছে সজীব? এইসব প্রশ্নের মধ্যে ষড়যন্ত্র বাস করে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাওয়া হয়, আগেকার দিনে যে আড্ডাটা মানুষ দিত, আজ আর দিতে পারছে না, আজকের আড্ডা মৃত শিল্প মাত্র। বলা হয়, আজকের আড্ডা নিছক কথোপকথনের বেশি কিছু নয়। চা এবং বিড়ির ধোঁয়া উড়ল না, দু-চারটে মুখ খারাপ হল না, পিঠে দশাসই রদ্দা এসে পড়ল না, এ আবার কেমন আড্ডা! এ তো সোনার পাথরবাটি।
কিন্তু সেটাই কি? পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান এবং চাটুজ্জেদের রোয়াক বা বনমালি নস্কর লেনের বৈঠকখানা যে আড্ডা দেখেছে, কিংবা যেসব আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন ভজহরি, ঘনশ্যাম বা ব্রজদা, যে সব আড্ডায় রাজা-উজির বধ হত, রাজার মা-কে ডাইনি বানিয়ে দেওয়া হত চোখের পলকে, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, বা উত্তমকুমার-সৌমিত্রকে নিয়ে হাতাহাতি হত, গল্প আর গুল্প এক হয়ে যেত, সেগুলোই কি আড্ডা? আজ স্কাইপেতে ধূমায়িত কফিকাপ বা বিয়ারের মগ নিয়ে যেটা হয়... সেটা শুধুই কথা বলা?
সম্ভবত না। ঢেকুরে যেমন খাদ্যের পুষ্টিগুণ থাকে না, বিগত দিনের দীর্ঘশ্বাসেও কোনো প্রাণ থাকে না। যা গেছে তা যুগের দাবিতেই গেছে, যা আছে তা অবশ্যই প্রাণবান। তাই সে বেঁচে আছে, ও বাঁচছে, এবং এই প্রজন্ম তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
আড্ডার চরিত্র তো ঐতিহাসিকভাবেই বদলেছে চিরকাল। এমনকি, আড্ডা দিয়েই ইতিহাসকে ব্যাখ্যাও করা যায়। গ্রীক বা রোমানরা যেভাবে আড্ডা দিতেন, সেই আড্ডা হারিয়ে গেল মধ্যযুগে। মধ্যযুগে অন্ধকারের অন্যতম উৎস ছিল বাক্যালাপের অনুপস্থিতি। সংলাপ আর সভ্যতা একে অন্যের হাত ধরে চলে। হাত ছাড়াছাড়ি হলেই নেমে আসে অরাজকতা, মাৎস্যান্যায়। সেটা যে কোনো দেশকালে সত্য। যে কোনো রাজনীতি থেকে যখন সংলাপ বিদায় নেয়, সেখানে নেমে আসে সেই স্তব্ধতা যা জীবনকে থামিয়ে দিতে চায়। উঠে দাঁড়ান একজন একনায়ক। শুধু তাঁর কথাই চলে তখন। তাঁর নাম নিরো হতে পারে, স্তালিন হতে পারে, হিটলার হতে পারে, সাদ্দামও হতে পারে।
যে কোনো সৃষ্টির মূলেই আছে সংলাপ। একজনের নয়। বহুস্বরিক। বহুস্বরকে অধুনান্তিক তত্ববিশ্ব নিজের করে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সে তো আসলে আধুনিকের সম্পদ! একজন নতুন আধুনিক মানুষ একটি সংলাপের দিকে বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে তাকান। তিনি একদেশদর্শী হন না। যদি ‘মহাভারত’-এর দিকে তাকান, দেখতে পাওয়া যায় এই মহাকাব্য রচিতই হয়েছে সংলাপ হিসেবে। হয়তো বলছেন একজন, কিন্তু শ্রোতা অগণিত, এবং প্রতিটি শ্রোতা তাঁর মনের বাঁক এই মহাকাব্যের ধরাতেই পারেন, কোনো বাধা নেই, কোনো প্রতিরোধ নেই। যদি ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’ বা ‘ডেকামেরন’-এর দিকে তাকানো হয়, সেখানেও এই একই খেলা। এমনকি যদি তাকানো হয় ‘আরব্য রজনী’-র দিকে। এই সংলাপ, আসলে এক গল্প বলিয়ের আড্ডা, এই কাজগুলোকে কালোত্তর করেছে।
যে কাজের মধ্যে সংলাপ নেই, সমকাল এবং চিরকাল তার কাছে একইরকম দুটো বন্ধ দরজা।
আজকের যুগে মানুষের সঙ্গে মানুষের শারীরিক দূরত্ব বেড়েছে ঢের। মানুষ এখন চাইলেও মানুষের পাশে গিয়ে বসতে পারে না। কিন্তু একটা পথের শেষে আরেকটা পথ খুলে যায়। মানুষ ভার্চ্যুয়াল জগতে মানুষের পাশে, এমনকি মানুষের ভিতরে প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়ে গেছে।
এ এক অলৌকিক আড্ডা। ফেসবুকে যখন দুটি মানুষ কথা বলছেন, তখন একজন হয়তো কানাডার সকালে বসে আছেন, আরেকজন চন্দননগরের রাত্তিরে। স্থান এবং কালকে এভাবে আপেক্ষিক করে দিয়ে দুজন মানুষ দূরত্বের ধারণাটাকে মুছে দিয়ে কাছাকাছি হচ্ছেন, অথচ তাঁদের সেটা মাথাতেই হয়তো নেই, তাঁরা নিছক বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে হয়তো কথা বলতে ব্যস্ত, বা গাজার হত্যালীলা নিয়ে দুজনেই ব্যথাতুর। এই যে ঘটনাটি ঘটছে, তার কোনো তুলনা হয় কি ঐতিহাসিকভাবে? এরপরেই হয়তো নাইজেরিয়া থেকে আরেক বঙ্গভাষী যোগ দিলেন তাঁদের আড্ডায়। ভূগোল ফুটিফাটা হয়ে গেল, জেগে থাকল শুধু ইতিহাস।
হ্যাঁ, অনলাইনের জগতে আমাদের সমসময়ে আড্ডার একটা নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে।
এবং, যে কোনো কিছুর মতোই, এই সমকালীন ইতিহাসের খারাপ দিকও আছে। ‘খারাপ’ শব্দটাকে যদি সত্যিই আপনি স্বীকার করেন।
মানুষ মানুষের ঘামের গন্ধ ভুলে যাচ্ছে। মুখের দুর্গন্ধ ভুলে যাচ্ছে প্রিয় বন্ধুর। ভার্চ্যুয়াল জগতে অবাস্তবতার অভিযোগ উঠতে পারে না। তার নিজস্ব বাস্তবতা আছে, এবং সেখানে যে আড্ডাটা চলে, সেটা অনেক বেশ স্পর্শযোগ্য। তা হারিয়ে যায় না। কিন্তু, সেই সঙ্গেই এমন একটা কিছু থাকে, যা আমাদের ত্রস্ত করতে পারে।
নৈকট্য এবং দূরত্বের বিভাজন এইভাবে আবছা হতে হতে একদিন ঘুচে যাবে না তো!
মানুষ আর আলাদা করে পরস্পরের কাছে আসার তাগিদটাই ভুলে যাবে না তো!
যখন গভীর রাতে দুই নারী-পুরুষ বা সমকামী দুটি মানুষ সেক্স-চ্যাটে মেতে ওঠেন, সেই মত্ততার নামও কি আড্ডা? দূরত্ব যেখানে যৌনতাকে নির্ণয় করতে চায়, এবং ব্যর্থ হয়, কোথায় যে মানুষের ‘মানব’ নামের সীমাটাও ভয় পেয়ে যায়! ওঁরা আনন্দ করছেন। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, সেই আনন্দকে আমরা শারীরিক আখ্যা দিতে বাধ্য, যদিও ত্রিসীমানায় নৈকট্যের ধারণাটা বজায় থাকছে না।
তখন হঠাৎ মনে একটা ভাবনা জেগে ওঠে।
তবে কি হোমো স্যাপিয়েন্সের দিন ফুরোলো!
এ কি এক নতুন প্রজন্ম, নাকি এক নতুন প্রজাতি!
সংলাপের নিরিখে, আড্ডার ভুবনে, সত্যিই মানুষ বুঝি আর হোমো স্যাপিয়েন্স থাকছে না। সে এত দ্রুত বদলাচ্ছে, যেটাকে মিউটেশন বলা চলে। শারীরিকভাবে সে ভিন্ন না হলেও, তাকে ১৯১৪-র একজন মানুষের পাশে বসানো মুশকিল।
এ শুধু প্রযুক্তির প্রভেদ নয়।
মানুষ আমূল বদলে যাচ্ছে।
মানুষের বদলের দলিল হয়ে থাকছে তার আড্ডার ধরণ, ও ধাঁচের পরিবর্তণ। সেটার দিকে হাল্কাভাবে তাকালে যে জিনিসটাকে হারাতে হবে, তার নাম ‘পরিসর’। সে সময়ের থাকে না। স্থানের থাকে না। কিন্তু সে মানুষের হয়ে থাকতে চায়। বিনিময়ে পরিসর শুধু এটুকুই চায় যে, মানুষও তার হয়ে থাকবে। নিজের শর্ত বাদ দিয়ে নয়।। অবশ্যই সংলাপ নিয়ে।
একজন পুনরাধুনিক মানুষ আড্ডা বাদ দিয়ে জীবনকে ভাববেন না। তিনি জানেন, সংলাপ বাদ দিলে জীবনের কিছুই পড়ে থাকে না।

অনুপম মুখোপাধ্যায়

অনুপম মুখোপাধ্যায়


জন্ম ১৯৭৯। শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। একমাত্র পেশা : বিতর্কের বাইরে থাকা।
অধুনান্তিক পরিসরে লেখালেখি শুরু করে একটা সময় অনুপম বুঝতে পারেন, এই পরিসরে সংশয় এবং ক্লান্তি ছাড়া একজন কবির কিছু দেওয়ার নেই তাঁর পাঠককে। বুঝতে পারেন সংলাপের স্থান ক্রমেই নিয়ে চলেছে প্রলাপ। কাব্যগ্রন্থগুলোর নামকরণ থেকে শুরু হয়ে দুই মলাটের ভিতরে ও বাইরে অসংলগ্নতাকে ব্যঞ্জনা হিসেবে ভুল করছেন কবি, সমালোচক এবং পাঠকেরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পান, বাংলা সাহিত্যের কোনো বাজার না থাকলেও বাজারিয়ানার রাজত্ব চলছে। যে বইগুলো আধুনিকের স্বর্ণযুগে বটতলায় বিকোত, সেগুলোই হয়ে উঠেছে মূলধারা, এবং সিরিয়াস সাহিত্য চলে গেছে প্রান্তে, প্রায় বিনাশের কিনারায়। এই পরিসরে কবিতাচর্চার এবং জীবনযাপনের অর্থকে যদি পুনরুদ্ধার করতেই হয় তবে একলা চলতে হবে, অনেকের পাশে। গোষ্টী এখানে সংঘের মুখোশ পরেছে। সেই মুখোশের আড়ালে মুখ লুকোতে চাননি অনুপম। ব্যক্তিগতভাবে একটি বিপ্লবের সূচণা করতে চেয়েছেন।সম্পূর্ণতার দিকে যাত্রা, যা কদাপি ফুরোবে না। তার নাম পুনরাধুনিক। না, re-modern নয়। বলতে পারেন neo-modern। নতুন আধুনিক। এই শতাব্দীর নিজস্ব আধুনিক। সময় এবং স্থানের আদল ও আদরকে স্বীকার করেই।

আপনার মতামত জানান