নিশিরাত, বাঁকাফাঁদ, আকাশে... প্রথম পর্ব

অনির্বাণ দাস

 

জ্বলছে নিবছে একটা টুপি। অন্ধকার রাস্তা বরাবর একটু একটু করে এগিয়ে আসছে কাছে। ও কি কোন বারোয়ারি প্যান্ডেল থেকে পালিয়ে এসেছে? তা কী করে সম্ভব, পুজো শেষ হয়ে গেছে মাস খানেক হয়ে গেল। কুয়াশার ভিতর সেই জোনাকি টুপি একটু একটু করে স্পষ্ট হয়।বাজারে ঢুকছে সে। সাইকেল চালিয়ে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে দু’ধারে দুটো বড় বড় ব্যাগ। ব্যাগে এ’ধারে ও’ধারে মিলিয়ে কম করে পনেরো ষোলোটা ফ্লাস্ক। ফ্লাস্কে আছে মৃতসঞ্জীবনী, চা। এই মানুষের জিম্মায় কী নেই? লেবু দিয়ে হবে? হবে। একটু কড়া লিকার, চিনি ছাড়া হবে? হবে। হজমোলা চা? হবে হবে, সব হবে। শুধু একটা ফোন করতে হবে। মোবাইল কানে নিয়ে ঠেক হতে ঠেক- এ ঘুরে বেড়াচ্ছে এই লাইটিং টুপি, এই চলমান চা বাগান। এই মফস্বলের চা- খোর লোকজনের জীবনে থিতু নুয়ে পড়া জীবনে এখন তো কোন হি- ম্যান নেই, আছে এই টি- ম্যান। ছোটবেলায় একটা ছড়া ছিল “চাঁদের কপালে চাঁদ টি দিয়ে যা”...। তো চাঁদেরা সব এখানে ওখানে হাট বসিয়ে ফুলঝুরি ফাটাচ্ছে সন্ধের পর, আর গলা শুকিয়ে গেলেই ফোন, -“তপাদা, ছ’টা লিকার দিয়ে যাও জলদি...” কথা শেষের আগেই শুরু হয়ে যাবে চাকার ঘূর্ণন... প্যাডেলে পা...
লিকার শব্দের মহিমা অপার। এই হোম সার্ভিসের যুগে সব চরিত্র চলমান। বাবুদাকে ফোন করলে প্রথমে তুমি শুনতে পাবে গান- বসন পরো মা... তারপরই বজ্রগম্ভীর স্বরে – কী লাগবে? নাম্বার ওয়ানের পাইট। আছে? আছে আছে, কলসেন্টারের সামনে চলে আসো। জার্মানবাড়ির ভেপার আলোয় কুয়াশার ভিতর ডুবে থাকা দোলনা ঢেকি আর শূন্য বেঞ্চিগুলো পেরিয়ে যেতে হবে অন্ধকার যেদিকে নিয়ে যায়। চারটে গলিপথ চলে গেছে চারদিকে। তারই একদিকে ডুমুর গাছ। গাছ পেরিয়ে কচু ঝোপ। চালচিত্রের মত। সামনে সাবেকি বাবুদা, সাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো। রাত বিরেতে কোন ব্যাপার না। সাইকেলের হ্যান্ডেলে দু’ধারে দুটো বড় বড় ব্যাগে রাম রাবণ সব আছে, আছে হনুমানের নাচ। চলমান কাউন্টার। কুড়ি টাকা বেশি নেবে মাত্র। গরমের দিনে ঠান্ডাও বেঁচে। চেনা জানা খদ্দের সব। কার কী অসুখ, কার কী ওষুধ- ডাক্তার বোঝে ডাক্তার জানে। ফোন সামলাতে সামলাতেই আরেক হাতে ব্যাগের ভিতর থেকে অব্যর্থ বিশল্যকরণী বের করে আনে। টাকা গুণে নেয় নির্ভুল অন্ধকারে। গোঁফের ঝোপের নীচে রাত্তিরের স্বরে বলে- কাল মায়ের পুজো আছে বাড়িতে... চতুর্মুখী যজ্ঞ হবে... দুপুরে কিন্তু নিমন্তন্ন চলে এসো মাস্টার...
২।
নিশির ডাকের মতো এই মফস্বল শহর। এখানে ওখানে মারাত্মক সব ছাতিম গাছ। বিষ মাখানো তীরের মতো তার ফুলের গন্ধ। সেই গন্ধ বরাবর গেলেই ছোটবেলা। এখনো বসে আছে শিবপুকুরে ছিপ হাতে। ফাৎনার উপর এসে বসছে হঠাৎ আর উড়ে যাচ্ছে কখন আবার এসে বসবে বলে সময়ের ফড়িং। কয়েকঘর উদ্বাস্তু সবে এসে বসেছে এখানে। তখন চারদিকে কাশের বন। আর বড় বড় ঘাসের জঙ্গল। ঠাম্মার গল্পের মতো তারাভরা খোলামেলা বিশাল অন্তহীন একটা আকাশ। আকাশের নীচে দারিদ্র, আকাশের নীচে লড়াই, আকাশের নীচে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করা, আকাশের নীচে নিজের কাছে নিজের শপথ। ছেলেপুলে মানুষ করা, আধপেটা খেয়েও সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেবার, প্যারালাইজড স্বামীকে যত্ন করার আর ফেলে আসা ভিটে মাটি ভুলতে চেয়ে স্বপ্নের চারিপাশে বেড়া বাঁধা দিনরাত এটা ওটা দিয়ে। জোড়াতালি দেওয়া মানুষগুলো একদিন এভাবেই এখানে জড়ো হয়ে হয়ে বানিয়ে তুলছিল এই আলখাল্লাটিকে। ধাওয়া- খাওয়া মানুষ সব, প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসা। আমরা তাদেরই সন্তান সন্ততি আজ বাইক হাঁকিয়ে দাপটে হরেন মেরে কানে হেডফোন গুঁজে সিগারেট ঠোঁটে ঘুরে বেড়াই এখানে অবলীলায়। আমরা দাঙ্গা দেখিনি, আমরা রায়ট দেখিনি। যারা দেখেছিল তাদের দু’একজন এখনো কেঁপে কেঁপে ওঠে সে সব বলতে গিয়ে, কেরোসিনের কুপি থেকে ওঠা কালির মতো। টিভি তখন কোথায়? রেডিওয় কান পেতে থাকে কেউ কেউ। রিফিউজি কলোনির মানুষ এ তার আপদে ও তার বিপদে বুক দিয়ে আগলায় জীবন। এখন যেখানে নিউমার্কেট- নামেই মার্কেট, বাজার হাট বসে না। বাজার মানে গোলবাজার। নিউমার্কেট চত্বরে বিরাট এলাকা জুড়ে ঢালাই- যুদ্ধ বিমান নামার কথা। এখন সেখানে ক্রিকেট টুর্নামেন্টে এপাড়া ওপাড়া থেকে আসে শচীন, দ্রাবিড়, সৌরভ। আরেকটু এগিয়ে গেলেই নৈহাটি রোড। রোডের দু’ধারে ধু ধু করে ফসলশূন্য ক্ষেত খামার। রাস্তা চওড়া হবে বলে গাছ কেটে নিয়ে গেছে রাস্তার দুপাশ থেকে। রাস্তা চলে গেছে শ্মশানের পাশ দিয়ে। শ্মশানে আসার পথ কি এই একটাই? না, তা কেন হবে। ভিতর দিয়েও আসা যায়। ভিতর দিয়ে এলে তাড়াতাড়ি হয়। মৃত নদী পড়ে থাকে পাশে। বিদ্যাধরী নাম তার। রোগা শরীরে ডিঙি বেয়ে যায় শিকারি কিশোর। জাল পেতে রেখেছে মাছ ধরা পড়বে বলে। সর্ষে ক্ষেতের হলুদে নেমে আসে শেষ বিকেলের কুয়াশা। জালে ধরা পড়ে যায় শ্মশান থেকে পালিয়ে আসা ধোঁয়া আর ধূপের গন্ধ আর একটু একটু করে সন্ধ্যা নেমে আসে। সেই আঁধারে দূরাগত বাসও ট্রেকারের যাত্রী চলে যেতে যেতে দেখতে পায়, কুয়াশার ভিতর ঐ তো শেষ হয়ে এল আগুন। ছায়ামানুষেরা ঘিরে আছে সেই স্থান। ভোরের আগেই তারা দলবেঁধে ফিরে যাবে লোকালয়ের দিকে। সবার আগে আগে চলেছে হ্যাজাকবাতি নিয়ে একজন। সারা রাত জ্বলেছে বলে চোখ বুজে আসছে তারও। বাকিরা অনুসরণ করছে তাকে। ইলেক্ট্রিসিটি আসবে আরও অনেক পরে। মৃত্যু কি উদ্বাস্তু মানুষকে আরও একবার উদ্বাস্তু করতে পারে? ছায়ামানুষেরা কথা বলে না। নাকি বলে? কী বলে তারা নিজেদের মধ্যে- এই দেশটা আমার দেশ না। চলো দেশে ফিরে যাই। চলো মন।... শোনা যায় না সেই সব ফিসফিস... দেখা যায় না এতদূর থেকে তাদের লুকিয়ে চোখ মোছা... রাত ঠিক শেষ হয়ে যাবে দেখো- কে যেন কাকে বলতে চেয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে বলতে না পেরে... মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় রাতের বিয়োগ অঙ্ক ডানা মেলে কতবার... বাড়ি ফিরে স্নান করে অগ্নি লৌহ স্পর্শ করতে হবে আর দাঁতে কাটতে হবে নিমের পাতা... এখনো অনেক লড়াই বাকি টিকে থাকাটাই সব, টিকে থাকতেই হবে আমাদের... বাঁচার কথা পরে ভাববো... ঐ তো পূর্বাচল এসে গেল। ভয় কী? এ’সময় কি আর পিছু ফিরে তাকাতে আছে?

অলংকরণ- তৌসিফ হক
(ক্রমশ)

অনির্বাণ দাস

অনির্বাণ দাস


কবিতা আর লেখালেখির জগতে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত অনির্বাণ দাসের। “অহর্নিশ” পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন বহুদিন, বর্তমানে “বাতিঘর” পত্রিকার সম্পাদনায় নিযুক্ত। “ডাকাডাকি”, “এসো”, “বিষণ্ণ আসবাব”, “লোডশেডিঙের মাঠ”, এবং সর্বশেষ কবিতার বই “ব্লেড” পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। “ঘটি গরম এসপেশাল” অনির্বাণের প্রথম গদ্যের বই।

আপনার মতামত জানান