ফিসফাস- ১০৮

সৌরাংশু

 

বহুদিন চুপচাপ থাকার পর ফিসফাসের পোকাটা একটু নড়ে উঠল। আসলে আলসেমি করতে কার ভাল লাগে বলুন? তা বলে আমি কি আর আলসেমি করছিলাম? নরেন্দ্র ভাইয়ের ‘লেস গবর্মেন্ট, মোর গভর্নেন্স’-এর চক্করে নাকে দড়ি দিয়ে হিল্লি দিল্লি করছিলাম। তবে ঘাঘু মাল, একটু পরেই দড়ি আলগা করার ফিকির শেখা হয়ে যায়। সরকারী চাকুরেদের অ্যাডাপ্টেবিলিটি ঐতিহাসিক।
যাই হোক, দিন চারেক আগে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ, ৯১.১ এফ এমের কাঁটায় শুনতে পেলাম আলোচনা চলছে বাচ্চাদের খেলার জায়গার অভাব নিয়ে। অবশ্য দিল্লিতে এমনিতে সবুজের অভাব নেই। জঙ্গলের বুক চিড়ে বানানো শহরে গাছপালা আর বাঁদরদের যত্রতত্র অধিষ্ঠান। কিন্তু কথা হল প্রকৃত খেলার মাঠ আছে কি?

কোলকাতায় যেমন ময়দানকে শহরের ফুসফুস বলা হয়, তেমনই দিল্লীতে এতটা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঠিক কোন খেলার জায়গা নেই বললেই চলে। যদিও দুটি বহু দেশীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হওয়ার সুবাদে একটা মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম, একটা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, একটা সুইমিং পুল, একটা একটা ফুটবল আর হকি স্টেডিয়াম আর খান তিনেক ইন্ডোর স্টেডিয়াম দিল্লির বুকে রয়েছে। আর অনতিদূরেই রয়েছে আন্তর্জাতিক রেসিং ট্র্যাক। কিন্তু সত্যি বলতে কি শিশু কিশোরদের খেলাধুলা করার জায়গা যে অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই নিয়ে আমার অভাব অভিযোগ বহুদিনের। তাই এই সম্পর্কে যখন বার্তালাপ চালু হল তখন কান তো গণেশ ঠাকুরের মতো লম্বা করতেই হল। গিনি বলে যে আরজে খেলার ছলে আলোচনা করছিলেন, তিনি এই নিয়ে দেখলাম বেশ প্যাশনেট।

তা মূল বক্তব্য হল, যে সব খেলার মাঠ বা পার্ক ছিল সেগুলো হঠাৎ করে সৌন্দর্যায়নের প্যাঁচে পড়ে গেছে। গাছ পালা লাগিয়ে বাড়ির বাগান করার শক জনসাধারণের ব্যবহারিক স্থানে উঠে এসেছে। কুড়ি মিটার জায়গা পেলেই তার মাঝখানে বসার বেঞ্চি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর হয়েছে ঢোকা মাত্রই একটি জাব্দা নীল কালো সাইন বোর্ডের আমদানী। যে সাইনবোর্ডটি গোটা গোটা অক্ষরে স্পষ্টের থেকেও জোরদার ভাষায় জানাচ্ছে যে, ক্রিকেট খেলা এবং কুকুর নিয়ে বেরানো বারণ। সত্যিই তো, ক্রিকেট খেলা তো কুত্তা ঘুমানার সমগোত্রীয়ই। তার জন্য সরকারের উচিত ভিন্ন জায়গা করে দেওয়া যাতে সাধারণ যারা বয়স্ক ব্যক্তিরা আছেন তাদের ঘোঁট পাকাবার জায়গার অভাব না হয়।

একটু ভিতরে ঢুকতেই জানা গেল যে এগুলো সব এলাকার আরডব্লিউএ-দের ফরমান। কিভাবে ডিডিএ বা জিডিএ পার্কের অধিকার আরডব্লিউএ-র হাতে চলে গেল, এবং কি ভাবেই বা স্পোর্টস গ্রাউণ্ডগুলো আধিকারিকের নকশায় রাতারাতি বদলে গিয়ে প্রমোদকাননে পরিণত হল, সে সব কথা আর কপচিয়ে কি করব। বুদ্ধিমান পাঠক/ পাঠিকারা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন যে এসব ম্যাজিক করতে পি সি সরকারের শরণাপন্ন হতে হয় না। প্রমাণ সাইজের ভুঁড়ি আড়ালেই কালো কালো থলিগুলি লুকিয়ে থাকে যারা এই সব ব্ল্যাক ম্যাজিক করে ফেলতে পারে।

আমার পুত্রটি যখন আরও একটু ছোট ছিল, তখন আমাদের এলাকার একটা খেলার মাঠ আর একটা পার্ক এভাবেই কেমন যেন বরপণের সঙ্গে ছোটদের হাত থেকে চলে গেছিল। যেমন ছোট ভাই বোনেদের দিদিদের হয়। হঠাৎ একদিন দেখে যে যে দিদি একান্ত আপন ছিল সে ঘোমটা গয়না চড়িয়ে পরের ঘর করতে চলে গেছে।

এতটা গলার, পেশীর বা ব্যাক পকেটের জোর কোন কালেই ছিল না যাতে এর প্রতিবাদ সামনে দাঁড়িয়ে করে ফেলতে পারি। আসলে নিজভূমে পরবাসের মতই দেখতাম, যে জায়গাটাকে সেই ২০০৫-এ নিজের বলে মনে করে আপন করে নিয়েছিলাম, তারই রকম সকম চাল চলন পালটে গেল। এত সবুজ এত সবুজ যে সবুজ পোশাকেও তা আঁটে না। আঁটবে কি করে? বাচ্চা বুড়োদের খেলাটা বন্ধ করাই তো মূল লক্ষ্য ছিল! তাহলেই তো নিজের বাড়ির কাঁচ ফুলের টব আর ডালের বাটি সুরক্ষিত থাকে।

সন্ধ্যায় একটু প্যাঁচ পয়জার করার জন্য শুধুমাত্র একতা কাপুরের আশ্রয় নিতে হয় না। কুটকাচালী, কিটি আড্ডা আর পিএনপিসি দেদার চলতে পারে মশার রাজত্বে হানা দিয়ে কালচে সবুজের বুকে! সত্যিই তো, খেলাধুলো করে কটাই বা শচীন আর বিরাট কোহলি বেরিয়েছে। পি টি ঊষা তো দূর অস্ত। ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করুক, না হলে মানুষ হবে কি করে? আসলে মানুষ তো নিজের বুদ্ধির জোরেই জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির আবির্ভাব তো উন্নতির লক্ষণ। তাই ভিডিও গেমস টিভি গেমস পেরিয়ে এসে মোবাইল গেমস।

কচি কচি বোকাবাক্সগুলোতে কচি কচি শৈশব কৈশোর বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা বড়রা বড়াই করছি এই বলে যে, “আমার ছেলের সময় কাটাবার জন্য অযথা সময় নষ্ট করে না” “আমার মেয়ে তো কম্পুটার এক্সপার্ট!” “আরে টুটুল তো আমার মোবাইলটা ব্যবহার করতে আমার থেকে অনেক ভাল জানে!” বাংলায় লিখলাম বটে, কিন্তু এই সমস্যা বিশ্বজনীন। বিশেষত দিল্লির মতো কসমোপলিটান শহরে যেখানে বৈদ্যুতিক বা ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তিবিদ্যা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সেখানে যুগের সঙ্গে চলতে গিয়ে ছোটাছুটি খেলাধুলো তো বিসর্জন দিতেই হবে। আমাদের তো রিমোট আছে, অনলাইন শপিং আছে। ইনস্ট্যান্ট মিক্স আছে। কে আর কষ্ট করে কসরত করে গতর খাটায়?

সমস্যাটা দেখবেন অন্যত্র! এমনিতেই এখন আণবিক পারমাণবিক পরিবার আর পরিবার নিয়ন্ত্রণের পাল্লায় পড়ে সমবয়সীদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্প কমে গেছে। তার উপর প্রযুক্তির প্রকোপ। দুই সমবয়সীকে সামনাসামনি বসিয়ে দিন না! দেখুন, “কেমন আছ”, “কোথায় আছ” “কি করছ”-র গণ্ডি পেরিয়ে তারা কথা খুঁজে পায় না। শেষমেশ গ্যাজেট গুরুর চরণে নিজেদের বাকি সময় সমর্পন করে বাঁচোয়া।

তারা এখন সোশাল মিডিয়া- ফেসবুক টুইটার হোয়াটসঅ্যাপে স্বচ্ছন্দ। প্রযুক্তির বিকাশ। কিন্তু এর শিকড়টা লুকিয়ে আছে অন্যত্র। আমাদের ফাস্ট লাইফস্টাইলের চক্করে পরে বছর তিরিশের মধ্যেই সকালে উঠে হাঁটতে শুরু করা আর জিম জয়েন করা এখন ফ্যাশন ফ্যাড হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাচ্চারাও হরেদরে জিম জয়েন করছে। ভাবতে পারেন, শিশুরা ঘাসে নিঃশ্বাসে মিশে না গিয়ে শরীরের যত্ন নেবার জন্য জিম জয়েন করছে? এর ফল স্বরূপ হয় সোফা কাউচে বা রোবোটিও গ্রীক ঈশ্বরে পরিণত হবে। আর লাইফস্টাইল সম্পর্কিত সবরকম রোগ বাঁধিয়ে বসবে। প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার জন্য তারা তো তৈরীই হচ্ছে না। তাদের তৈরীই করা হচ্ছে রেসের মাঠের ঘোড়া হিসাবে।

সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা, উষ্ণতা, নির্মল আনন্দ, কলরব, এসব কথাগুলো ধীরে ধীরে এলওএল, আরওএফএল, টিসি, আরআইপি এই সব ক্ষুদ্রনামের চাপে ফসিল হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব কি আমরাও এড়াতে পারছি। আরডব্লিউএ-র মাথায় যে সকল শুভবুদ্ধিহীন বয়স্ক ব্যক্তিরা বসে আছি, তারা তো আমাদেরই সিস্টেমের ফসল। চল্লিশ পেরিয়ে চালসে, পঞ্চাশ পেরিয়ে পানসে, ষাট পেরিয়ে গেঁটে বাতের ধাক্কায় বাহাত্তুরে ধরতে আমাদেরই তো বেশী সময় লাগছে না। প্রতিবাদ করব? সময় নেই! একসঙ্গে আলোচনা করব? সময় নেই। সামাজিকতা করব? সময় নেই! বাচ্চাদের নিয়ে নিজেরা খেলতে যাব? সময় নেই। অগ্রগতির চাকা তো আমাদের বুকের ওপর কুরুক্ষেত্রের কর্ণের চাকার মতো ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসছে, সে খেয়াল আছে?

ন্যুনতম শুরুটা তো আমাদেরকেই করতে হবে! কাউন্সিলরের সঙ্গে দেখা করে, স্থানীয় এনজিওগুলির সঙ্গে আলোচনা করে। সর্বোপরি আধিকারিকের কাছে বিষয়টি নিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকেই। মনে করে দেখুন তো কোন পৃথিবীতে আমরা এসেছিলাম আর কি রেখে যাব? মুকদ্দর কা সিকন্দর তো সেই হয় যে হাসতে হাসতে এই পৃথিবী থেকে যেতে পারে। উন্নতির কালো ধোঁয়ায় তো মুখ ঢেকে যাচ্ছে। আসুন না। আমরাই আগামী প্রজন্মকে সবুজ চেনাই।

সকালের সোঁদা গন্ধওলা ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটার আনন্দ চেনাই। ঘামের মধ্যে দিয়ে স্ফুর্তির পুর্তি উপভোগ করাই। দায়িত্ব তো থেকেই যায় আমাদের উত্তরপুরুষদের জন্য। আমেন।

সৌরাংশু

সৌরাংশু


সর্বঘটে কাঁঠালি কলা (Jack of All Trades and blah blah…) অথবা আর ডবলু এ বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের গোঁজ প্রার্থী বলতে যা বোঝায় আদতে কোলকাতার কিন্তু অধুনা দিল্লীর বাসিন্দা, সরকারি চাকুরে সৌরাংশু তাই। দানবিক শরীর নিয়ে মানবিক বা আণবিক যে কোন বিষয়েই সুড়ুত করে নিজেকে মাপ মতো লাগিয়ে নিতে পারেন।

আপনার বাথরুমের দরজার ছিটকিনি আটকাতে হবে? বা কেঁদো বেড়ালটা রাত বিরেতে বড়েগোলাম হবার চেষ্টায়? পাড়ার নাটকে বিবেক নাই? রাজা খাজনা নিবেক নাই? চিন্তায় শান দিবেক নাই- ফোন লাগান +৯১৯XXXXXXX৩২-এ। ভৌম দোষ বাড়াতে বা বনের মোষ তাড়াতে মাইকের মতো গলা আর টুথপিকের মতো হাসি নিয়ে সৌরাংশু হাজির হবেন।

গল্প অল্প স্বল্প লিখলেও তিনি ফিসফাসেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে শীতের রোদে তেল মাখেন আর গিটকিরি দিয়ে রামা হৈ গান। না শুনে যাবেন কোথায়! বুম্বা দা বলেছেন, “মাআআ, আআমি কিন্তু চুরি ক্করিনি!” সৌরাংশু বলেন, “যাঃ আমি কিন্তু বুড়ি ধরি নি!” খেলতে নেমে হাঁপান না, গাইতে গলা কাঁপান না, নিজের দায় পরের ঘাড়ে চাপান না, শুধু ফিসফাসেই বন দাপান! এই হলেন সৌরাংশু!
www.fisfas.in

আপনার মতামত জানান