অঙ্কখাতার পিছন পাতা

সুপ্রভাত রায়

 



হাইওয়েতে রোজকার রোজগারের অভ্যেসে সাইকেল বাইক আর হাঁটা চালালে দেখা যায়, এই আমার অবস্থান... আর এই পেরিয়ে গেলেই বৃষ্টি। খেটেখুটে চাকরিটাকরি করে নিজেই নিজের ভটভটি’টি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টিও লিফলেট। এমনিই হাতে পড়ে জানান দেয় চালুশুরুআরম্ভ। না দেখেই ঝেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। হাইওয়েতে এতদিন ধরে বাইক চালিয়ে চাকরি করতে গিয়ে দেখেছি--এই বৃষ্টি শুরু হল ডলবি ডিজিট্যাল সাউন্ড নিয়ে। তড়বড় করে; প্রকাশ্যে ভরপুর পোস্টার সেঁটে -- জাস্ট মিনিট পেরিয়ে গেলেই আর নেই। এপাড়া ওপাড়া ভাগ করে নিয়েছে পতন। গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়ে আমার জীবনে আপাতত যে দোনোমনাটা কাজের মতো স্পার্ক দিয়ে ওয়ার্ক করে সবচে’ বেশি, ভিতরে ভিতরে। সেটা এইরকম বৃষ্টি ভিজেটিজে ঝাপসা আবছা দেখতে। যে ব্যাগে রেনকোটটা আছে তো ? ও। আগের দিনের ভেজাটা শুকিয়ে গুছিয়ে মা ব্যাগে ভরে দিয়েছে যত্ন জড়িয়ে। ব্যাগের ওপরওপর হাত বুলিয়েই বুঝতে পারি আছে। এক্ষুনি রেনকোটটা পড়ে নেব, কি নেব না ? যে ছেলে ধর্ম আর বর্ম দু’টোর প্রতিই মনোযোগ, সাধনা অথবা সরগম সব হারিয়ে ফেলেছে, তার পক্ষে বৃষ্টি পড়লেই শরীরে প্রাকৃতিক কষ্ট পেয়ে মনের মুখমণ্ডলে আকৃতির স্কেচ করে রোম্যান্টিক সাজা নিজের বাইকের লুকিং গ্লাসেও মানায় না। বানানো দৃশ্যকল্প ধুয়ে যায় পুরো। ‘কাজ’ করে ফেরার সময়, দলগত ‘অ আ’ পড়ে বড় হওয়া সমস্ত ছেলের একটা মেয়েকে ইংরেজিতে প্রপোজ করতে গেলে যেমন লাগে, সেই রকমটি। যে আগে কার্ভ; না আগে নার্ভ -- এর ওঠানামা বুঝতে বুজতেই টাইমআউট। ঘরে ফেরার। ভিজে যাওয়ার। ভিজে গিয়ে বহন করা জড়পদার্থের ভোগে চলে যাওয়াগুলো লাশ হয়ে বেরোয়। একেএকে। প্রাণ ত্যাগ করে। গুটিয়েশুটিয়ে। আস্তানায় ফিরে। তখন তাদের জীবনে ফেরানোর আর কোনো রাস্তা নেই। রিচার্জ করেও। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ হলেও আমরা তো বঙ্কুবাবু নই, তাই আমাদের সারপ্রাইজের আকাশ থেকে ক্যাপিটাল লেটারে বৃষ্টির ফোঁটা ছাড়া সেরকম কিছুই পড়ে না গায়ে।। কি আর করা যাবে, মনে মনে মেনে নিই। এই আমার সাজা। জীবনের সব থেকে বেশি ভুল তো বানানে করেছি। বানিয়ে করিনি। এই হল অভিজ্ঞতার বয়ে আনা রচনাবলী। খণ্ডে খণ্ডে।
বৃষ্টিটা নেমে গেল। আমার ব্যাগে যাবতীয় নিজেরই নামেশরীরে উপস্থিত থাকা পরীক্ষার পেরিয়ে আসা রেজাল্টপত্তর। যাদের এখন বয়স হয়ে গেছে। আমার মতো দুর্যোগে বেরোতে পারে না। অরিজিনাল হার্ড কপির নরম কাগজ। ইগনোর তো করা যায় না। যতই ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ একটা প্রিয় সিনেমার নাম হোক। এইসব সময় হাতে পাওয়া খুচরোর মতো আমি পাতে পাওয়া বন্ধ দোকান প্রেফার করি। কারণ; দেখেছি কোন দোকান চলে আর আর কোন দোকান চলে না সেটা অচেনা এলাকায় শুধুই তাকিয়ে বুঝতে পারিনা। আর না চলা দোকানের ছাদে ফালতুফালতু লোকেরা বৃষ্টি এড়াতে দাঁড়ালে মালিক বিরক্ত হয়। ওই ভিড়টার প্রতি। বেরিয়েও যেতে পারি না, আবার ওই দোকানে কিছু কেনারও থাকে না। ঝুলে থাকি দ্বিধা নিয়ে।
আমার কোনো উপায় ছিল না। ডান দিক চেপে বাইকটা একটা সেড দেখে দাঁড় করালাম। সিঙ্গল স্ট্যান্ড করে। ওটা শেড’ই। ক্লান্ত বিপদে পাশে পেয়ে যাওয়া ঝাঁকড়া গাছের মতো উপায়। দোকান না, একটা কাঠের কারখানা। আমি শুধু সামনের অ্যাজবেসটাসের বারান্দা হয়ে এগিয়ে আসা আস্কারা দেখে ঢুকে গেছি। জানি অপেক্ষা করলেই বৃষ্টি থেমে যাবে। ততোক্ষণ টুকু। যতটা গুটিয়ে থাকা যায় নিজেকে কম গুরুত্ব দিয়ে। সাধের মোবাইলটা আর কাজের কাগজ বাঁচিয়ে। উপরে তাকিয়ে দেখলাম আকাশ দেখা যাচ্ছে না, তাই এটাই শেল্টার। ওই ভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি এলেন। মালিক।
এসেই বললেন, আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন ? বসুন।
তিনটে ফাইবারের চেয়ার এমনিই পাতা ছিল। কে জানে কে বসে উঠে গেছিল। আমার যেমন স্বভাব, চেয়ার ফাঁকা থাকেলেই গিয়েগিয়েই বসে যেতে পারি না। উনি জলপ্রপাত সামলিয়ে চেরাই করা কাঠের মধ্যেমধ্যে খাঁজের ফাঁকে একটা চেয়ার পেতে দিলেন।
এখানে বসুন, ভিজবেন না।
এবার তো বসতেই হয়। আমার হেলমেটটা এতক্ষণ মাটিতে রেখেছিলাম। আমি যেমন বসিনি, হেলমেটটাকেও বসায় নি চেয়ারে, মাটিতে নামিয়ে রেখেছিলাম।
আরে ওখানে কেন, এখানে রাখুন।
আর একটা চেয়ার বাড়িয়ে দিলেন উনি। টুপ করেও যেখানে আমার কালো হেলমেটের মাথায় জল পড়বে না। এই সব পেয়ে যাচ্ছি দেখে বৃষ্টিটাও হয়ত হিংসে দিয়ে নিজকে কন্ট্রোল করে নিল। থেমে গেল। কতটুকুই আর বসেছিলাম আমি আর আমার হেলমেট, মুখোমুখি আলাদা আলাদা বাড়িয়ে দেওয়া চেয়ারে। স্টপওয়াচও ধরতে পারবে না এইসব । কি অপূর্ব ভাল লাগে না এইসব আস্তানা পেতে ? রাস্তার দু’পাশ মুখস্থ না করেও বেরিয়ে পরা যায় মেঘ মাথায় নিয়ে। মনে হয় এই তো উৎসাহ। বেঁচে থাকি। ভরপুর বেঁচেবর্তে থাকি যাবতীয় প্রকাশিত রাস্তাঘাটে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস কমন না পড়লেও...

প্রথম পর্ব- প্রথম পর্ব

সুপ্রভাত রায়

সুপ্রভাত রায়


সুপ্রভাত রায় কবিতা এবং গদ্যে সমান সাবলীল। এবার লিখতে বসলেন আদরের জন্য বিশেষ ব্লগ "অঙ্ক খাতার পিছন পাতা"...

আপনার মতামত জানান