হিন্দি আগ্রাসন এবং

রঙ্গীত মিত্র

 




প্রবেশ
কলকাতার শহরে অন্য-পাখিদের ডাক, আমি বুঝতে পারিনা। তবু বোঝার চেষ্টা করি। কারণ আমার অন্য-প্রদেশের থেকে আসা বন্ধুদের বাঙালি সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা গুলো শুনে অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই হয়না।যেমন একদিন রফিকুল জানায়,এক ট্রেনে বাঙালিদের সাথে তার দাদা কলকাতা ফিরছিল।সে ভদ্রলোক ট্রেনে যাওয়ার সময় দাঁত খুঁটছিলেন । আর থুতু ফেলছিলেন ।তাতে তার সহযাত্রী বাঙালিরা প্রতিবাদ করে,এবং তাকে দাঁত খোঁটায় বিরত করে।রফিকুলের মতে,তার দাদা ঠিক।বাঙালিরাই দোষী। তাদের জন্যেই তার দাদা ট্রেনে দাঁত খুঁটতে পারেনি। পারলে সে বাঙালিদের দেশছাড়া করে দেয় ।অন্যদিকে আমাদের ডিজাইন পড়ান,নেহা ম্যাম।বিহারে তাঁর বাড়ি। দিল্লিতে,তাঁর একটা বাড়ি আছে । একদিন তিনি আমাকে ক্লাসের ভিতরই বললেন, কলকাতার কোনও ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নেই।কারণ এখানে কোনও শপিংমল নেই।লোকেরা ব্যাকডেটেট।কারণ তারা বলিউডকে ফলো করেনা।তার চেয়ে পাটনা কতো ভালো।কলকাতা একটা মৃত শহর।এইসব শুনতে শুনতে কান গরম হয়ে গেলে,প্রতিবাদ করি।তখন তিনি ডেকে বলেন,বাঙালিদের না কি উচ্চারণও ভুল।যেমন নগর নয় নাগর হবে...এইসব।আবার আমি আর একজনের কথা বলি।তিনি রভি স্যার।ক্লাসে মার্কেটিং পড়াতে পড়াতেই একদিন বললেন,বাঙালিরা ধর্ম,জাত-পাতে বিশ্বাস করেনা।এখানে সব ধর্মের উৎসবই হয়। সারা ভারতবর্ষে না কি এইরকম কোথাও নেই।তার মতে এটা খুবই খারাপ।

আমন্ত্রণমূলক
আমি নিজে হিন্দি জানিনা।জানতেও চাইনা।যদিও আমার কলেজে হিন্দি-ভাষাভাষী বন্ধুরা খুব বলে,আমি কেন ইংরেজিতে বলি কথা? এমন কি পান্তাভাত-খাওয়া পলিটিশিয়্যান ধান্দাবাজ জালি জাতির ভাষা নাকি তাদেরকে অপবিত্র করে।তবু তারা বাঙালি মেয়েদের সাথে প্রেম করে।তাদের মধ্যে একজন সুনীল পাণ্ডে। উত্তর প্রদেশে তার বাড়ি ।সে একদিন বলল,এখানে দূর্গাপুজোতে ঈশ্বর-সাধনা হয়না।নানা রকম প্যান্ডেল হয়।ধর্ম নিয়ে এইসব ক্রিয়েটিভিটি ধর্ম-বিরোধি । বিহার বা উত্তরপ্রদেশে এইসব হয় না। বাঙালিরা অলস।কি সব আউট অব দা বক্স ভাবে। আর তারা বিদেশে কালচারে প্রভাবিত। মেয়েদের মানুষ বলে বিবেচনা করে...এইসব।

অসময়
বাঙালি হওয়াটাই খারাপ! এই ধরুন যারা কলকাতায় থাকে অথচ বাংলায় কথা বলতে পারেনা...তাদের কলকাতা জন্মভূমি হলেও, তারা বিকৃত বাংলায় কথা বলে।অনেকে তো বাংলা জানেনা ভাব নিয়ে হিন্দিতে কথা বলে।তাদের জিজ্ঞাসা করলেই তারা বাংলা সম্বন্ধে যাতা বলে ।তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ তো অস্বীকার করবে যে তারা কলকাতায় জন্মেছে। তাদের এইরকম গোদা ভাবে পৃথিবীকে দেখাই উদ্দেশ্য। কেরিয়ার। গোঁড়ামি এইসবই তারা বোঝে।আসলে যা হোক করে প্রফিট তাদের চাই।তাদের কথাটা এখানে না কি শিল্প নেই। শুধু আঁতলামি আছে। অথচ তারা মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করার জন্যে ফ্ল্যাট কেনে। পার্টি দেয়।অযথা টাকা ছড়ায়। কিন্তু তাদের আপত্তি বাঙালি মেয়েরা নিজেদের পুরুষের সাথে সমান মনে করে।সিগারেট,মদ খায়। জিনস পরে...এইসব...

অযৌক্তিক
রতন স্যার একদিন আমাকে ওয়ার্ক শপ বিল্ডিং-এর সামনে ডেকে বললেন, “তুমি তো বাঙালি। জানো বাঙালিরা কাঠি-বাজ।এক বাঙালি আর এক বাঙালিকে উঠতে দেয় না। কলকাতায় আমার দুটো বাড়ি আছে। আমি জানি তোমারা কি ভয়ঙ্কর...”।যতদিন বাড়ে আমি বুঝতে পারি,আমার অন্য-প্রদেশের বন্ধুরা বাঙালিদের খুব ঘেন্না করে।কি উত্তর,কি দক্ষিণ,কি পশ্চিম...আমার অনেক সময় মনে হয় সারা ভারতবর্ষ-এর থেকে আমরা আলাদা। মনে হয় কেন? সত্যিই তো আমরা আলদা।আমাদের সব কিছু ওদের সাথে মেলেনা।ওদের বাজে স্বভাব। সেন্স-হীনতা।অশিক্ষা। দুনম্বরি। বেকওয়ার্ডপণা। কিছুতেই যে তারা ভালোর মর্যাদা দেবে না।তাদের প্রাদেশিকতা।ধর্মবোধ... আমি এইসব দেখে ভাবি,আমরা তো আলাদা।আমাদের এখানে তো কেউ টুকে পাশ করে না। মেয়েদের কেউ অমর্যাদা করে না।কখনো মনে হয় আমরা কেন ভারতবর্ষে সাথে? বাংলাদেশের সাথে মিশে গেলেই ভালো হতো।

শেষ-মেষ
কিন্তু কেন আমাকে হিন্দি শিখতে হবে? ওরা যা বলবে আমাকে তাই করতে হবে?আজকাল সিরিয়ালগুলোও দেখি, হিন্দি-সিরিয়ালের নকল। অনেক বাঙালিই বাংলায় কথা বলতে চাননা। খুব তাড়াতাড়ি নিজের বাঙালি পরিচয়টাকে লুকিয়ে ফেলতে চান।তাদের মনে হয় ভারতীয়-করণে মনোযোগ বেশি।আসলে আমরা মূলস্রোতের সাথে কতটা নিজেদের মিলিয়ে নিতে পারছি,সেটাই ওনাদের কাছে আসল। তাই বাজে অনুবাদ...কিম্বা সোজা হিন্দিই ঢুকে পড়ছে,আমার ভাষায়। আমরা হিন্দি-বলয়ের মানুষজনদের মতো নিজেদেরও তৈরি করছি। যাতে পার্থক্য করতে না হয়। যাতে আমারা মধ্য-মেধার ভিতর ঘুমিয়ে পড়ি। আমাদের বরং হাইরাইজ ।দামি বিদেশি গাড়ি।দুনম্বরী পয়সা। অবৈধ সম্পর্ক...আর যা যা আছে...সব রোগ চাই। জানি না কোনটা দোষের।কোনটা ঠিক।আমি শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের গ্রুপ দেখি।আর বুঝি আমার কোনও জায়গা নেই।তবু আমি “ আমার মতোই থাকবো।”এটাই আমার আলাদা থাকার লড়াই। শয়তানের স্তন থেকে অন্ধকার পান করছে শেয়ালেরা গারো অন্ধকারেও একটি গাছ,গণিকার পেশায় ; এখানে মদের মস্তিষ্ক ; সিগারেটের প্যাকেটের ভিতর গ্লোবাল তার মুখ বার করে আছে। যদিও জীবনের রিজিওনাল অফিস জানিনা ভিড়ের ভিতর থেকে তোমাকে পিছন থেকে দেখে উত্তেজনারা যুদ্ধ থামার কথা বলে। কিন্তু সে অলি-পাব নেই;আর আমি যে বোকার চূড়ান্ত লুকিয়ে কোনো কিছু করা উপায় নেই। টেলিগ্রামের মতো শুধু খবরের কাগজের কাগজ ছাড়া আমাকে কেউ ডাকেনা।

রঙ্গীত মিত্র

রঙ্গীত মিত্র


কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রঙ্গীত মিত্র আধুনিক কলকাতার কবি। আর তাকে কে না চেনে?
যারা চেনেন না তাদের জানাই রঙ্গিত কে না চিনলে জীবন বৃথা...


আপনার মতামত জানান