অঙ্কখাতার পিছন পাতা

সুপ্রভাত রায়

 






ওই যে একটা অঙ্ক থাকত না; জন্ম সাল মাস দিন দেওয়া আছে তাহলে আজকের তারিখে তার বয়স কত বের করতে হবে। কিছুতেই হত না । ভুলভাল বয়স বেরিয়ে যেত এরওরতার। এই অঙ্কটা করতে গিয়ে নিজেই নিজের বয়স কতবার যে বাড়িয়ে কমিয়ে ফেলেছি ততবার হয়ত কোনো গানের ভল্যিউমও না। বাবা শিখিয়ে দিয়েছিল। কিভাবে প্রয়োজনে মাস’কে বছরের কাছ থেকে বারো আর দিন’কে মাসের কাছ থেকে তিরিশ ধার করে যোগবিয়োগটা করতে হয়। তারপর আর ভুল হত না। সঠিক বের করা বয়সের গলার সাথে উত্তরমালা মিলে যেত।

বাড়ি থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে যে গ্রামের প্রথমিক স্কুলটিতে আমি শিক্ষকতা করি, সেখানে এই অঙ্কটি আমার ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগে সব থেকে বেশি। না, বাচ্চাদের শেখাতে গিয়ে না। বড়দের সামলাতে গিয়ে। ‘ছোট মাষ্টার’ নাম দিয়ে দিল চাকরি পাওয়ার শুরুতেই গাঁয়ের লোক। এখন আমি সেই স্কুলেরই সিনিয়র টিচার, এই দশ এগারো বছরে। এই গ্রামটিতে এখনও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের কোনো ঘর তৈরী হয়নি। তাই আমাদের স্কুলের রান্না ঘরে ওদেরও রান্না হয়। গর্ভবতী মহিলা থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশু অবধি খিচুড়ি আর ডিমসেদ্ধ পায়। শিশুগুলি এক হাতে থালা আর অন্য হাতে যেভাবে ওই ডিম সেদ্ধটাকে মুঠোয় ধরে টলমল পায়ে বাড়ি নিয়ে যায়, তখন ওই পুচকে হাতে ধবধবে সাদা ডিমসেদ্ধকে পৃথিবীর সব থেকে আকাঙ্খিত খাবার মনে হয় আমার। অঙ্গনওয়াড়ি সেন্টারের দিদিমণি পাশের গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে আসেন। আমাদেরও যখন মর্নিং স্কুল হয় তখন দু’টো উনুনের ঘুম ভাঙে একসাথে। আগে পরে হাঁড়ি নামে ওঠে।
ক্লাস নিচ্ছিলাম। গ্রামের বউটি গুটিগুটি পায়ে মেয়ের হাত ধরে এসে দাঁড়াল দরজার কাছে।
‘দাদা, দ্যাখোতো রাধার বয়স পাঁচ বছর হয়েছে কিনা ? তাহলে ভর্তি করে নাও’।
গোটা গ্রামে একমাত্র এই বউটি আমায় ‘দাদা’ বলে। স্যার বা মাষ্টারমশাই না। ‘স্যার’ আর ‘আপনি’ শুনতে খুব সঙ্কোচ হয় আমার। ‘তুমি তুমি’ করে কথা বলে বউটি। খুব স্বস্তি পায়। কারণ তার বাপের বাড়ি আমাদের পাড়ার পাশের পাড়ায়। সে নাকি আমাকে চিনত ছোট থেকে। কেন জানিনা আমি তার ছোটবেলার মুখ কিছুতেই মনে করতে পারি না। কিন্তু আমিও খুব খেলতে যেতাম ওই পাড়ায়।
রাধা তার ফুটফুটে বড় মেয়ে। ছোটটি এখনও হাঁটতে শেখেনি। বউটির হাতে হাসপাতালের দেওয়া গোলাপি কাগজ। তাতে রাধার জন্ম সাল তারিখ লেখা।
আমি জিঞ্জেস করলাম, ‘কেন, খিচুড়ি বন্ধ করে দিয়েছে’?
শান্তভাবে হ্যাঁ- এর দিকে ঘাড় নাড়ল সে। বের করে ফেললাম ‘আজকের তারিখে’ রাধার বয়স কত। পাঁচ বছর পূর্ণ হতে এখনও চার মাস কয়েকদিন বাকি। অতএব তার ডিম সেদ্ধ খিচুড়ি পাওয়া উচিত। জানালাম। যেতে যেতে সে বলে গেল, ‘তুমি একটু দিদিমণিকে বলে দেবে’?
এই ঘটনা যে দিনের তখন মর্নিং স্কুল, তাই তক্ষুনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে দিদিমণিকে জানালাম ‘আজকের তারিখে’ রাধার বয়স। দিদিমণি বললেন, ‘আমি শুধু জন্ম সালটা ধরেছি বলে ভুল করে ফেলেছি’। আরও বললেন, ‘মাষ্টারমশাই এই যে আপনি আজকের দিনে বয়সটা কি করে বের করেন মাস দিন সহ এটা একটু শিখিয়ে দেবেন ভাল করে ? আমার খুব ভুল হয়ে যায়’।
‘আমারও খুব ভুল হত’-- এই বলে তুমুল উৎসাহে ক্লাস ওয়ানের আশা নামে একটি মেয়ের কাছ থেকে খাতা নিয়ে দিদিমণিকে শেখাতে লাগলাম স্কুলের বারান্দার মেঝেতে বসে।
তখন ক্লাসে ফিরে এসেছি আমার পুচকেগুলোর কাছে। কিছুক্ষণ বাদে দিদিমণি আবার এলেন।
‘আপনাকে একটা জন্ম তারিখ বলছি আপনি আজকের দিনে বয়সটা বের করে দিন তো’। আমি আবার আশার কাছে খাতাটা চেয়ে নিলাম। দেখলাম দিদিমণি স্মৃতি থেকে একটা ডেট অফ বার্থ বললেন। আমি অঙ্ক কষে বের করলাম উনিশবছর চারমাস ষোলোদিন। তারপর নিজের চোখে কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম দিদিমণির দিকে, এটা কার বয়স জানতে।
‘আমার বড় মেয়েটা বেঁচে থাকলে আজকের তারিখে ওর এই বয়স হত’...এই বলে চোখ মুছতে মুছতে ক্লাস থেকে চলে গেলেন । মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল।
আমি ফ্যালফ্যাল করে বছরমাসদিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম আশার খাতায়।

সুপ্রভাত রায়

সুপ্রভাত রায়


সুপ্রভাত রায় কবিতা এবং গদ্যে সমান সাবলীল। এবার লিখতে বসলেন আদরের জন্য বিশেষ ব্লগ "অঙ্ক খাতার পিছন পাতা"...

আপনার মতামত জানান