পুনরাধুনিক কবিতা এবং ছন্দ-অলঙ্কার

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



কবি স্বভাবতই স্বাধীন। কিন্তু একাধিক দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার একটা সম্ভবত সামাজিক তথা প্রচলিত কিছু অনুশাসন। তাঁর নিজেরই স্বভাব অথবা সমাজ অথবা কোনো বিশেষ মতবাদ তাঁকে নিজের কবিতায় কিছু ‘আবশ্যিক’ শর্ত মেনে চলতে বলে। সেগুলো কি তিনি মানবেন? একজন আধুনিক কবিকে এই প্রশ্নের মোকাবিলা করতেই হয়েছে। তিনি মানেননি, বড়োজোর মেনে নেওয়ার ছল করেছেন। অধুনান্তিক কবি প্রচলিত কবিতা বা মাননীয় তত্ত্বের কিছু শর্ত নিজের অজান্তে বা জেনেই কবিতায় মেনে নিয়েছেন। কিন্তু একজন পুনরাধুনিক কবি? যিনি ভাবীকালের আধুনিক? তাঁর জন্যও কি কিছু অবশ্যপালনীয় শর্ত থাকবেই? এই প্রশ্ন আমাকে আজকাল করা হচ্ছে। জানতে চাওয়া হচ্ছে পুনরাধুনিক কবিতার কোনো ম্যানিফেস্টো আছে কিনা। এমনকি না জেনে বিদ্রূপও করে হচ্ছে। যেমন এই সাইনবোর্ড।


‘কাক পত্রিকা’ মানে আমার দ্বারা পরিচালিত ‘বাক পত্রিকা’। ‘খাটাল’ হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শহর ঘাটাল। এই উপহার আমাকে প্রাণীত করেছে। এই উপহার বুঝিয়ে দিচ্ছে কোথাও না কোথাও পুনরাধুনিক বিষয়ে আমার কথাবার্তা বিরক্তির সূচণা করেছে। একজন প্রচারকের আর কী চাওয়ার থাকতে পারে এই বিদ্রূপ ছাড়া।
হ্যাঁ, আমি নিজেকে প্রচারক মনে করি। পুনরাধুনিকের একমাত্র প্রচারক। পুনরাধুনিক কিন্তু re-modern নয়, সে হল neo-modern । ফেলে আসা আধুনিক পরিসরগুলো থেকে সে রসদ অবশ্যই নেবে কিন্তু কম্পাস আর মানচিত্র নয়।
একজন পুনরাধুনিক এক পথিক, কোনোদিন শেষ না হওয়ার পথে, অনন্ত সূর্যোদয়ের দিকে।
না। পুনরাধুনিকের কোনো অবশ্যপালনীয় শর্ত নেই, থাকতেই পারে না একমাত্র শর্তহীনতা পালন করা ছাড়া। শর্ত একটা সামাজিক ধারণা, আমার মতে। কিন্তু পুনরাধুনিক একজন একক ব্যক্তির ব্যাপার। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই সে এক অব্যক্ত ক্রোধের বশে সমাজকে আক্রমণ করতে চাইছে taxi driver সিনেমার রবার্ট ডি নিরোর মতো। সেরকম নয়। আক্রমণের কোনো সুযোগ পুনরাধুনিকে নেই। শুধু শর্তহীনভাবে একজন নিজের কবিতাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করবেন। কবিতায় আনন্দের সঙ্গে বিস্ময়ের কোনো বিরোধ থাকবে না তাঁর।
এমনকি ইচ্ছে হলে তিনি সামাজিক শর্ত মেনে নেওয়ার খেলাটাও খেলতে পারেন, নাহলে তাঁর স্বাধীনতার ধারণাটা থাকল কোথায়? সেই মান্যতা একটি লীলা মাত্র।
কেউ যদি প্রশ্ন করেন পুনরাধুনিক কবিতায় ছন্দের স্থান নিয়ে... বলতেই হয় একজন পুনরাধুনিক কবি প্রচলিত ছন্দে লিখতে পারেন না-ও পারেন। আসলে ছন্দ কবিতার একটা উপকরণ মাত্র। যে কবি শুধু ছন্দের জোরে নিজের অমরত্ব বা প্রবলতা প্রতিপাদন করতে চান, তিনি ভ্রান্ত। একটা মাত্র উপকরণ কোনোকিছুকেই চরিত্র দিতে পারে না, অস্তিত্ব তো অনেক দূরের ব্যাপার। একজন কবি প্রচলিত ছন্দে লিখেও কাজ করতে পারেন, না লিখেও সেটা পারেন। আসলে কবিতাটা তখনই কবিতা হয়, যখন তাতে অপ্রচলিত ছন্দ থাকে। আমাদের সমস্যাটা হল, আমরা ছন্দের কিছু নাম দিয়েছি... অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, মন্দাক্রান্তা ইত্যাদি। এগুলোকে আমরা মাত্রা গুণে নিজেদের লেখায় এবং পাঠে মিলিয়ে নিতে চাই। ঘটনা হল, একজন প্রকৃত কবি ইচ্ছে করলে এই অনুশাসনের চ্যালেঞ্জ মেনে নিয়ে লিখতে পারেন, অথবা স্ব-ছন্দের দিকে যেতে পারেন। দ্বিতীয় কাজটা অবশ্যই কঠিন। সম্প্রতি একটি প্রিন্টেড পত্রিকার জন্য আমার কাছে একটি কাব্যনাটক চাওয়া হয়। আমি কাজটা পয়ারে করব ঠিক করলাম। ঠিক করলাম ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’-এর আদলে লিখব। ভীষ্ম এবং কর্ণের একটি দীর্ঘ সংলাপ রচনা করলাম। মোটে ৩-৪ ঘন্টা সময় লাগল। বেশ অবাক হয়ে গেলাম। বিদ্যায়তনিক ছন্দে আমি বহুদিন লিখিনি। এত দ্রুত কাজটা হল কী করে! এই কাজই আমার নিজস্ব স্টাইলে করতে হলে ১০-১২ দিন সময় লেগে যেত, এবং তার মধ্যে অন্য কোনো কাজ করতে পারতাম না।
কেন পয়ারে লিখলাম? একটু লীলা করলাম ধরে নিন।
ছন্দে লেখা চলবে না, এমন কোনো ফতোয়া পুনরাধুনিকে নেই। থাকলে সেটা ছেলেমানুষি হয়ে যাবে। ছন্দে একজন লিখতে বাধ্য যদি তিনি সত্যিই কবিতার ধারণার কাছে পৌঁছতে চান। ছন্দছাড়া শব্দটা থেকেই ছন্নছাড়া শব্দটা এসেছে। একজন ছন্নছাড়া কবিতা লেখককে অধুনান্তিকে মানায়, পুনরাধুনিকে মানায় না। ছন্দের ব্যাপারটাকে যারা ৮+৬ বা ৪৮+৬ বা ৭+৫-এর কাঠামোয় বন্দী করে রেখেছেন, প্রকৃতিস্থ ছন্দ আসলে বহুদিন তাঁদের খাঁচা থেকে পালিয়েছে, তাঁরা শুধু তারজালি নিয়ে বসে আছেন, প্রাণহীন।
ছন্দের কোনো বিদ্যায়তন হয় না। ছন্দে লিখতে শেখা যায় না। জগতের সবকিছুই ছন্দে চলছে। কিন্তু মাত্রা গুণছে না। মাত্রাকে ভাঙছে নিজের খেয়ালে। এক সময় আধুনিক ছিল প্রকৃতিকে অস্বীকার করার নাম। সেই আধুনিক জন্ম নিয়েছিল শিল্প বিপ্লব থেকে। এই আধুনিকের কবিতায় ছিল কৃত্রিমের তাগিদ। প্রকৃতিস্থ ভাষাকে সে অস্বীকার করেছিল নিজের নিয়মে।
আমাদের আধুনিক জন্ম নিচ্ছে ভুবনগ্রাম থেকে, সারা পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় রেখে দেখার সুযোগ থেকে। আজ আমাদের প্রকৃতিস্থ হতে হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। বুঝতে হবে যা কিছু মানবিক, সবই প্রাকৃতিক। আজকের ছন্দ কোনোভাবেই কৃত্রিম হতে পারে না। গাছের একটা পাতা যখন হাওয়ায় দোলে, সে সেন্টিমিটার মিলিমিটারের নিক্তি মেপে দোলে না। তার অনিয়মিত ছন্দেই আছে প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের ছন্দ তাকে অনুসরণ করবে, একীকৃত হবে।
নিজের স্বভাবকে অতিক্রম করা একজন পুনরাধুনিকের অশেষ গন্তব্য হতে পারে, নিজের প্রকৃতির হাত তিনি ছাড়তে পারেন না।
প্রচলিত ছন্দকে যারা মানেননি, তাঁরাই কবিতায় ছন্দের দেবতা হয়ে উঠেছেন। উদাহরণগুলো নিজেরাই স্মরণ করুন প্লিজ। ছন্দকে আকাশ বানান, কারাগার নয়, একজন পুনরাধুনিকের এটুকুই ওড়ার।
কিন্তু শুধু ছন্দ নয়, আরো ঢের ভ্রান্ত অনুশাসন আমাদের কবিতার ধারণাকে আকার দিতে চায়, সীমাবদ্ধ করতে চায়। অলঙ্কার শাস্ত্রের কথা ভাবুন। অলঙ্কারের ব্যাপারটা আবার অন্যরকম। এমন কোনো অনুশাসন নেই যে অলঙ্কার ব্যবহার করতেই হবে। বরং এই অনুশাসন আমাদের সমকালীন কিছু বিশেষ ঘরাণার কবিতায় প্রচলিত যে অলঙ্কার ব্যবহার করা চলবে না, করলেই আপনি নাকি মূল্যহীন হয়ে পড়বেন। এঁরা একটা ব্যাপার ভেবে দেখেন না, অলঙ্কারগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়নি, প্রতিটি অলঙ্কার জন্ম নিয়েছে আমাদের প্রতিদিনের ভাষা-ব্যবহার থেকে। একটা অলঙ্কারও নেই, যা আমরা কথা বলার সময় প্রয়োগ করি না। তবু এমন কবিও তো আছেন যিনি উপমা ব্যবহার করাকে দুর্বলতা মনে করেন, অথচ নিজের অজান্তেই বলে ওঠেন, ‘আমি জীবনানন্দের মতো হতে চাই না।’
যে কোনো অনুশাসন আপনার শেকলে একটা নতুন গ্রন্থি যোগ করে, এবং আপনার ডানা থেকে একটা পালক খসিয়ে দেয়। কেউ কেউ সেই গ্রন্থিটিকে কবিতা ভাবেন, পালকটিকে মূল্য, কিন্তু তিনি কবি নন। তিনি সামাজিকভাবে সম্ভ্রান্ত হয়ে উঠতে পারেন অচিরেই। অনুশাসন মেনে নিলে আমাদের সমাজ পুলকিত হয়। তার অভ্যাসে ধাক্কা লাগে না।
একজন পুনরাধুনিক কবি সম্ভ্রান্ত নন।
সম্ভ্রান্ত শব্দটা আসলে এক গালাগাল মাত্র। সম্যকরূপে ভ্রান্ত।
আমাদের কৌমসমাজে ওই শব্দটা হয়ে যায় দিকু। দিকু মানে তথাকথিত ভদ্রলোক, যারা প্রকৃতিস্থ হতে ভুলে গেছে।
আর দুর্বোধ্যতা? ওটা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই শুধু এই বাক্যটি ছাড়া যে, আমি আজ অবধি একটা কবিতাও বুঝতে পারিনি।

অনুপম মুখোপাধ্যায়

অনুপম মুখোপাধ্যায়


জন্ম ১৯৭৯। শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। একমাত্র পেশা : বিতর্কের বাইরে থাকা।
অধুনান্তিক পরিসরে লেখালেখি শুরু করে একটা সময় অনুপম বুঝতে পারেন, এই পরিসরে সংশয় এবং ক্লান্তি ছাড়া একজন কবির কিছু দেওয়ার নেই তাঁর পাঠককে। বুঝতে পারেন সংলাপের স্থান ক্রমেই নিয়ে চলেছে প্রলাপ। কাব্যগ্রন্থগুলোর নামকরণ থেকে শুরু হয়ে দুই মলাটের ভিতরে ও বাইরে অসংলগ্নতাকে ব্যঞ্জনা হিসেবে ভুল করছেন কবি, সমালোচক এবং পাঠকেরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পান, বাংলা সাহিত্যের কোনো বাজার না থাকলেও বাজারিয়ানার রাজত্ব চলছে। যে বইগুলো আধুনিকের স্বর্ণযুগে বটতলায় বিকোত, সেগুলোই হয়ে উঠেছে মূলধারা, এবং সিরিয়াস সাহিত্য চলে গেছে প্রান্তে, প্রায় বিনাশের কিনারায়। এই পরিসরে কবিতাচর্চার এবং জীবনযাপনের অর্থকে যদি পুনরুদ্ধার করতেই হয় তবে একলা চলতে হবে, অনেকের পাশে। গোষ্টী এখানে সংঘের মুখোশ পরেছে। সেই মুখোশের আড়ালে মুখ লুকোতে চাননি অনুপম। ব্যক্তিগতভাবে একটি বিপ্লবের সূচণা করতে চেয়েছেন।সম্পূর্ণতার দিকে যাত্রা, যা কদাপি ফুরোবে না। তার নাম পুনরাধুনিক। না, re-modern নয়। বলতে পারেন neo-modern। নতুন আধুনিক। এই শতাব্দীর নিজস্ব আধুনিক। সময় এবং স্থানের আদল ও আদরকে স্বীকার করেই।

আপনার মতামত জানান