নিশিরাত, বাঁকাফাঁদ, আকাশে... দ্বিতীয় পর্ব

অনির্বাণ দাস

 


প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে
দ্বিতীয় পর্ব
৩।
আরেকটু হলেই ঘুগনির প্লেট ছিটকে পড়ত রাস্তায়। এত জোরে কেউ সাইকেল চালায়? ক্যাচালের বদলে কেবলে গেল দুজনেই। কয়েকদিন ধরেই এখানে ওখানে চোখাচোখি চলছিল। তাই বলে কথা নেই বার্তা নেই এ’রম রাস্তার মাঝখানে হুড়মুড় করে কোত্থেকে সাইকেল নিয়ে এসে...তোমার নাম কী? কে কে আছে বাড়িতে? কোন ক্লাসে পড়ো? তুমি কি চিকেন বিরিয়ানি ভালবাসো নাকি মাটন? চিকেন চাউ নাকি ভেজ? ক্রিকেট না র্যািকেট? জিনসে কিন্তু তোমাকে বেশি মানায়... এত কথা কি ওই দু এক মুহূর্তে বলা যায়? কথা তো আরও ছিল। দু’জনেই তাই বাক্যহারা, দুজনেই তাই থতমত- কে কাকে কী বলবে। কতটুকু বলবে। বলতে পারা কি এতই সোজা? বলা যায়, বলো? বুক ধুকপুক করে না? যদি খচে যায়? ‘না’ করে দেয় যদি?
গোলবাজার ব্যাপারটাই এ’রকম। মধ্যিখানে জলবৃত্তের মতো কয়েকটা রাস্তা আর দুই ধারে দোকান পসার। দিনে রাতে বেচাকেনা চলে। অনেকের সঙ্গে অনেকের দেখা হয়ে যায় তেলাপিয়া মাছ কিনতে গিয়ে।
বড় বড় মুদি দোকানে খাতায় লিখে রাখো, খদ্দের ব্যাগ ভর্তি করে গেরস্থালির এটা ওটা খরিদ করে নিয়ে যায়। মাসের শুরুতে টাকা দিয়ে দেবে। ও নিয়ে চিন্তা নেই। পালায় না কেউ। সবই তো চেনাশোনা। বয়স্ক মানুষ পরপর কয়েকদিন না এলে খবর নেয় সব্জিওয়ালা। নতুন গুড় উঠলে বিশেষ একটা দুটো আলাদা করে রেখে দেয় বিশেষ দুয়েকজনের জন্য। লাভ কি করে না? করে ঠিকই, তবে লাভ শব্দেরও তো কত দেশ, কত দিগন্ত, কত পারাপার। সবই কি আর টাকাপয়সার দাঁড়িপাল্লায় ওজন করতে আছে? এক কোণে কচুর লতি, ভাঁড়ালি আর বকফুল নিয়ে প্লাস্টিক পেতে বসে আছে যে বুড়ি আর তার তিন/চার বছরের নাতনি- একেকদিন নিয়ে আসে কচু ফুল আর হাঁসের ডিম। থানকুনি পাতা, পুঁই শাক আর মাঝেমাঝে কাঁঠালের বীজও নিয়ে আসে। মেয়েটাকে ছেড়ে চলে গেছে বর। মারধোর করত। অন্য কার সঙ্গে একটা ভেগে গিয়ে কোথায় যেন সংসার করেছে। মেয়ে এসে উঠেছে মায়ের কুটিরে, বাচ্চা কোলে নিয়ে। বাড়ি বাড়ি বাসন মাজে, উঠোন ঝাঁট দেয়, কাপড় কাচে। নাতনিকে কোলে নিয়ে বুড়ি এসে বসে বাজারে। রথের মেলায় এবছর একটা ঘট কিনেছে। ওটায় এখন থেকেই জমাচ্ছে দু-চার টাকা করে। নাতনিটার নামে কেনা। মেয়ে সন্তান, বিয়ে সাদি তো দিতে হবে আজ হোক কাল হোক। এক বৌদিমণি একটা পুরনো সোয়েটার সেদিন দিয়ে গেল বাচ্চাটাকে, আজ বুড়ি পলিপ্যাকে করে বাসক পাতা নিয়ে এসেছে কয়েকটা। ঐ বৌদি খোঁজ করছিল, সেদিন তো ছিল না। সঙ্গে দুটো কুমড়ো ফুলও আছে। বড়া ভেজে খাবে। আহা মাসি মাসি বলে ডাকখোঁজ করে বাজার এলেই, বড় ভাল মেয়ে। ভগবান ভাল করুক। মালসা থেকে জল নিয়ে বুড়ি ছিটিয়ে দেয় কলমি আর ব্রাহ্মী শাকের আঁটিতে।

বাইরের দিকে বিরাট ঢালাই করা খোলামেলা চত্বর। সন্ধ্যায় এসে জোটে যত রাজ্যের ছেলেপুলে! মেয়ে দেখতে আসে। আড্ডাও হয়। কত বাইক, কত সাইকেল, কত সাজ-পোশাক, কত মুখ। হাতে হাতে মোবাইল। মাল্টিমিডিয়ার বাগানে যে কোথায় ব্লু-টুথ অন করে রাখছে- দেওয়া নেওয়ার এই এক বাজার। হাতে হাতে বিশ্ব। বিষময় হয় যত, ততো বেশি করে ডানা গুটিয়ে নেয় বিস্ময়। চাইলেই যদি পাওয়া যাবে, অভাব-অনুভূতির তীব্র আকুলতাই যদি না থাকবে, এই রূপের সংসারে কে আর খোঁজে অরূপরতন। মোবাইলে পানু দেখতে দেখতে কোচিং থেকে দলবেঁধে ফেরে কিশোর কিশোরী। কাঁধে স্কুলব্যাগ। ব্যাগে বড়ু চণ্ডীদাস, ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র, ভারতের অর্থনীতি, পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার। ভাত খেতে বসেও এঁটো থালায় টুক করে প্রিয় নামটি লিখেই আবার যে মুছে ফেলা- সে সব এখন চলে না। চলে ফেসবুক। খেতে বসেও একসাথে ভার্চুয়াল মাছের কাঁটা বাছে কমিউনিটির ফ্রেন্ডরা। স্ট্যাটাস লেখে- ও আজ আমায় একটাও কিস করল না। অমনি হামলে পড়ে দুনিয়া। এই যে আমি খাবো আমি খাবো একটা ব্যাপার- এটা সর্বত্রই একটা চলমান সত্য, সর্ব যুগে। একজনকে খেয়ে বেঁচে থাকে আরেকজন। তার দিকেও যে তাকিয়ে আছে আরেকটা ক্ষুধার্ত চোখ, জিভ চাটছে- ভুলে যায়। অত ভাবার সময় কোথায়? শুরু হয়ে যায় লুঙ্গি ড্যান্স। কী এক ভাষায় কী সব যেন বলতে থাকে ছোটা হাতিতে পনেরোটা বক্সের পিছনে লুকিয়ে থাকা ডি.জে। আর মুখ থেকে কেরোসিন ছিটিয়ে বাতাসে খেলা দেখাতে দেখাতে যায় আরেকজন। তার পেছনে রণপায়ে ছুটে আরেকজন। সামনে পিছনে কিলবিল করে দাদা ভাই বাচ্চা বুড়ো মা বোনেরা। ঝিলিক-মিলিক ইকির-মিকির কী সব নেশাময় লেসার আলো। মুখ থেকে মুখে। আলাদা করা যায় না কাউকে। রিদমের তালে তালে হাত তুলে নেচে যাচ্ছে। কোথায় যাও ভাই? জানি না। কেন যাও? জানি না। কেন এসেছিলে? জানি না। কে তুমি? জানি না, জানি না কিস্যু জানি না। এত জেনে হবে কোন বাল? আচ্ছা অনেক মারিয়েছেন এবার ফুটে যান, নইলে বাড়া... পনেরো ষোলোর কোমরেও মেশিন গোঁজা থাকে এখন পাত্র বিশেষে... মুখে মালের গন্ধ... দাদা দিদিরা কাজে লাগায়... এ বাড়িতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের দিদিমণি শেখায় বিকেলবেলা এসে রোজ... ভাবনা কাহারে বলে সখী... পাশের বাড়িতে বেড়ার ঘরে চুল্লু মেরে এসে বৌ-এর চুলের মুঠি ধরে খিস্তিপাঠ সেরে ঘুমোতে যায় প্রতিবেশী... আর বিরাট একটা হাঁ সেই কবে থেকে এই শোভাযাত্রার শেষে অনন্ত অপেক্ষায় বসে আছে, ক্লান্তি নেই তার, চোখে ঘুম নেই। আসবে... আসবে... আসতেই হবে... পালাবি কোথায়? একে একে জীবনের টুনিলাইট দিয়ে ডিজাইন করা সব ক’টা ভ্যান ঢুকে যেতে থাকে সেই হাঁ-এর ভিতর... একটাই দড়ি দিয়ে একজনের সঙ্গে আরেকজন বাঁধা পড়ে আছে... তুমি আমি সে ও তাহারা... তাসাপার্টি ঢুকে যায়... তারপর জেনারেটার... সেও ঢুকে যাবে... পীরবাবার ঢিবি আরেকটু বেশি জঙ্গলে ছেয়ে যাবে ছোটবেলার পুকুরের পাশে... সেই পুকুর যে প্রতিবছর মানুষ টেনে নিত... কপালে সিঁদুর লাগানো শ্যাওলা পড়া অতিকায় কালো সেই কালমৎস কে না দেখেছে... কে না দেখেছে তার হাঁ... স্কুলের পাশেই তো পুকুর... পুকুরের পাশেই তো টিফিন পিরিয়ড... বিড়ি খাওয়া শেখা ঢিবির জঙ্গলে বসে... আর? আর এখনো অনেক ক্লাস বাকি... ছুটির ঘণ্টা দেরী আছে...

অনির্বাণ দাস

অনির্বাণ দাস


কবিতা আর লেখালেখির জগতে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত অনির্বাণ দাসের। “অহর্নিশ” পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন বহুদিন, বর্তমানে “বাতিঘর” পত্রিকার সম্পাদনায় নিযুক্ত। “ডাকাডাকি”, “এসো”, “বিষণ্ণ আসবাব”, “লোডশেডিঙের মাঠ”, এবং সর্বশেষ কবিতার বই “ব্লেড” পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। “ঘটি গরম এসপেশাল” অনির্বাণের প্রথম গদ্যের বই।

আপনার মতামত জানান