ফিসফাস- ১১০

সৌরাংশু

 

লেখাটা লিখতে একটু দেরী হয়ে গেল বলে পাঠক পাঠিকারা মার্জনা করবেন। আসলে একটু অন্যরকম করে শুরু করব ভেবেছিলাম। হয়তো একটা কবিতা টবিতা। সৃষ্টির আদিকালে আমি খান কতক কবিতা পাড়ার চেষ্টা করেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা খচ্চরের ডিমের থেকে বেশী দূর এগোয় নি। তাই লিখেতে বসে,

মেঘের আদর
গোলাপি চাদর
আমিও বাঁদর
তুমিও বাঁদর

এর বেশী এগোন গেল না। তাই আর কি এট্টু দেরী হয়ে গেল। আসলে বাঁদর সেই রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মানবর্দ্ধন ও মানভঞ্জন করে আসছে। সেই যে কবিগুরুর অমোঘ উক্তি- ‘এই ঘরে একটি বাঁদর (বাঁ দোর) আছে’ সেই থেকে শুরু। তারপর সেই ‘হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ’। প্রেমেন মিত্র। এ ছাড়া বিশেষ পড়েছি কি না মনে পড়ছে না। পাঠক পাঠিকারা একটু স্মরণ করিয়ে দিলে বাধিত থাকব।

সংস্কৃত সাহিত্যে তো বাঁদরদের গুরুত্ব অপরিসীম, তারা তখন রাম নাম লিখতে পারত রাবণকে ল্যাজে বেঁধে তিন ভুবনের পারে আলুকাবলি খাওয়াতে পারত। প্রযুক্তি বিদ্যাতেও তাদের গুণগান ছিল। প্রথম উল্লেখযোগ্য সেতু বন্ধন বাঁদর ইঞ্জিনিয়ারের হাতেই হয়েছিল। আর হনুমানের কথা তো বললামই না। এতই প্রতিভাবান ছিল যে উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল না। সারাজীবন হরিমটর আর রামকথাতেই চালাতে হল।

সে যাই হোক, আমাদের মধ্যেও একটা বাঁদরামির প্রবণতা কম বেশী দেখা যায় বলে বদনাম আছে নাকি আমরা বাঁদরের বংশধর। তবে কি না বাঁদর না হলে তো আর মানুষ হিসাবে গণ্যও করা যায় না। তা আমি খান দুই বাঁদরামির গল্প বলব। আপনারা ধৈর্য ধরে শুনতে পারেন।

প্রথমটি গত বুধবার সংঘটিত হল! এর সঙ্গে বাঁদরের প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ নেই, কিন্তু বাঁদরামির আছে। মানে বাঁদরদের মতো সক্ষমতা তো মানুষের থাকে না, আমরা খালি চেষ্টা করতে পারি। আর্বান রানিং বলে একটা বস্তু হয়েছিল যেটা অক্ষয়কুমার থামস আপের বিজ্ঞাপনে প্রভূত প্রচার করেছিলেন। সে কিছু না, জানলার কার্নিশ, সিঁড়ির রেলিং, ম্যাজেনাইন ফ্লোর, ঝুলন্ত বাদুড় ইত্যাদি ছুঁয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে বালীগঞ্জীয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো।

তা এক কালে সে সব আমারও খুব মজাই লাগত। খুব যে করতে পারতাম তা নয় তবুও চেষ্টার তো কমতি ছিল না। বর্তমানে কোমর বেড়ে ৩৫, ফিটনেসের অবস্থাও খুব দারুণ কিছু না আর চটকানো হাঁটু তো আছেই। তো সে সব দিকে খুব যে মাড়াই তা নয়। আরে বাবা বয়সটাকে তো বোতলবন্দি রাখা যায় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে উপায়ান্তর থাকে না যে। দুর্গাপূজা নিকটবর্তী হতে যত আরম্ভ করেছে। রিহার্সালের বহরও ততই বাড়ছে। তো বুধবার সপরিবারে রিহার্সাল বেড়াতে বেরোচ্ছিলাম। কিন্তু আমার পার্শ্ববর্তিনী কিছুতেই আর নীচে এসে পৌঁছতে পারছেন না। অন্যান্য বহু মহিলার মতো ওনার সাজুগুজুর প্রতি জেন্ডার বায়াস নেই বলে বেশ নিশ্চিন্তেই থাকি। তাই লিপস্টিকে যে সময় নষ্ট হচ্ছে না সে বিষয়ে নিশ্চিত। ফোনও এনগেজড। তাইলে?

এলেন তিনি মিনিট দশেক পর। এসে জানালেন, যে সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি বাড়ির ভিতর লোহার দরজা বন্ধ করে আপাত ঘুমোচ্ছে। বড় মেয়েটি প্রথমে আর তার পর তার মা এসে ফোন করে করে বেল বাজিয়ে বাজিয়ে হদ্দ হয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোনটিও এতক্ষণ উদ্ধারকার্যে মগ্ন ছিল।

এসব শুনলে কোন বিবেকবান বা রবীন্দ্রবান পুরুষই কি চুপ করে থাকতে পারে? আর আমার তো বনের মোষ তাড়াবার প্রবল তাড়না। ছুটলাম উপরে। গিয়ে পত্রপাঠ তিন তলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে শরীর গলিয়ে কার্নিশের উপর পা রাখলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, কার্নিশের উপর খুলে রাখা একটা জানলার গ্রিল সামনের বাড়ির ব্যালকনিটি ফুট চারেক দূরে। নীচে মেয়ের কান্না আর পিছে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার ক্রমাগত সাবধান বাণী। সব মিলিয়ে বেশ দোলাচলে।

আসল কথাটা হল ফিটনেস! বছর দুয়েক আগে হলেও এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন তো ওজন এবং বয়স পাল্লা দিয়েই বেড়েছে। ভদ্রমহিলাও দেখলাম বলছেন, “সিনহা জী, ছোড় দিজিয়ে! ও সো রহি হ্যায়। নিন্দ টুটনে কি বাদ হি খুলেগি!” আমি ভাবলাম হিরোগিরি দেখাবার সুযোগ কেই বা ছাড়ে। এক হাতে জানলার পাল্লার গোড়াটা শক্ত করে ধরে অপর হাত বাড়িয়ে চার ফুট দূরের ব্যালকনির কার্নিশে রাখা টবের চুলের মুঠি ধরে তুলে আনলাম অতীব সাবধানে। তারপর হস্তান্তরিত করলাম ভিতরে। খোলা গ্রিলটাও পায়ের তলা থেকে সরিয়ে একই গন্তব্যে পাঠালাম। তারপর যা থাকে কপালে বলে ষাট ডিগ্রি কোণাকুণি এক পায়ে লাফ মারলাম। ডান হাঁটুর শুবানাল্লাহ অবস্থার জন্য লাফ টাফ একটু সাবধানেই মারতে হয়। সেই হরিদার অমোঘ উক্তি, “সাবধানের বাবার মুখ ভর্তি দাড়ি আছে, সাবধানের মার নেই।” তাই এক পা।

নেমেই নিজেকে এবং নীচে দাঁড়ানো বাক্স প্যাঁটরাকে জানিয়ে হাঁক দিলাম, “পৌঁছ গয়ে।”

তারপর শুরু কসরত। দুটো দরজার লোহার আবরণ বন্ধ। কিন্তু ছোট ঘরের জানলাটা খোলা। সেখান দিয়ে ওয়াইপার দিয়ে প্রথমে কাঠের দরজার ছিটকিনি এবং তার পর লোহার দরজার আবরণ সরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে সেই হাচ-এর কুকুরটা “খ্যাউ খ্যাউ” করে তেড়ে এল। আমি ওসবে বিশেষ পাত্তা টাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম বেডরুমের দিকে। দেখি ভর সন্ধ্যা বেলায় গান চালিয়ে এসি চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ত্রয়োদশী কন্যাটি পাড়ি দিয়েছেন মালাবার হিলের ওপাড়ে।

বেশী না ঘাঁটিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়ে “হেঁ হেঁ” হাসি নিয়ে গাড়ির পানে ছুটলাম। পিছনে ম্যাণ্ডেটরী ‘থ্যাঙ্কু ট্যাঙ্কু’র বহমানতাকে উপেক্ষাই করে নিলাম। রিহার্সালে দেরী করা আমার নিয়ম বিরুদ্ধ। গুরুর বারণ আছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি পরশু অফিসের। এমনিতে মোদীবাবুর আগমনে সরকারী বাবুগিরির আলতামাসি আরামের দিন কেটে পড়েছে। তার উপর বায়োমেট্রিক, ফিঙ্গার প্রিন্ট আই বল ম্যাচিং ইত্যাদিন হাইটেক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একদম ২২১ বেকার স্ট্রিট। তার উপর তিনি আবার বাউণ্ডারী সীমানা বেঁধে দিয়েছেন ১০০ দিন।

দাও ব্যাটা ১০০ দিনে কে কত গাল গল্প লিখেছ তার হিসাব কিতাব। তা গল্প উপন্যাস লিখতে আমার প্রতিভা তো অপরিসীম মূলো। যখন তখন গুঁজে দেওয়া যায়। তাই যুগ্ম সচিবের ঘরে নিজের ডিভিশনের হাল হকিকত পৌঁছতে যেতেই তিনি যুতে দিলেন অর্ধপক্ক ব্যঞ্জনের সঙ্গে। এখানে যাও সেখানে যাও শেষে সচিবের কাছে যাও। সচিব মহোদয়া অত্যন্ত মিশুকে এবং এক্সপ্রেসিভ। সব কিছুই ওনার মুখে চলে আসে। গুরু গম্ভীর মিটিং-এ বসে কোন মহিলা সহকর্মী যদি পুরুষ সহকর্মীর প্রায় গায়ের উপর পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয় তাতেও তিনি ফুট কাটতে ছাড়েন না, “আরে দাস সাহাব, কোই সুন্দর লড়কি (পড়ুন পঞ্চান্ন বছরের মহিলা) আপকি উপর গির রহি হ্যায়, থোড়া তো হাস দিজিয়ে।”

তা তিনি দেখলাম তাঁর এবং যুগ্ম সচিবের পি এসের উপর মাথার উপর দাঁড়িয়ে হাঁউ মাউ করতে শুরু করেছেন আর পি এস যুগল বেচারা ১০ লাখের জায়গায় ১৫ কোটি লিখতে গিয়ে হোঁচট বিষম আর খাবি একসঙ্গে খাচ্ছে। আমাকে দেখেও তিনি বেশ বকা ঝকা করে দিলেন। আমি ওনাকে কিছু বলার আগেই। তারপর বলে দিলেন, “শরম আনে চাহিয়ে তুম লোগোকো, ইতনে ইয়ং অউর ইনটেলিজেন্ট হো মাগর কাম নেহি করতে হো অউর আভি হাস রহে হো।” ব্যাখ্যা করতে গেলাম না যে আমার কাজটা আমি করেই দিয়েছি। যার সমন্বয়ের কাজ তিনি দূর থেকে তখন গুলতির টিপ প্র্যাকটিস করছিলেন। মুখ দিয়ে বেরলো অমোঘ বাণী, “শরম তো আ রহি হ্যায় ম্যাডাম, ইসিলিয়ে আপনে আপ পে হাস রহা হুঁ।” এর পর আর কোন কথা হয় না।

যাই হোক কাজে লেগে পড়লাম, কিন্তু সন্ধ্যা ছটা নাগাদ পেটের ছুঁচো একটু নড়ে চড়ে বসলে চাড্ডি মুড়ির বন্দোবস্ত করতে সেকেন্ড ফ্লোরে গেছিলাম। গোলমালটা বাঁধল ফেরার সময়। স্বাভাবিক উদর বৃদ্ধি রোধ করতে এবং সক্ষমতা বজায় রাখতে আমি এলিভেটরের ব্যবহার করি না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিলাম ষষ্ঠ তলে তৃতীয় তলেই দেখলাম অফিস সময় পেরিয়ে গেছে বলে ল্যাজ বিশিষ্ট বানর কূলের কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে। বছর চারেক আগে এক উচ্চ পদস্থ অফিসারকে এই বানরকূলই বাথরুমের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিল ঘণ্টা চারেক। শেষে কেয়ারটেকার কয়েক জনকে নিয়ে এসে তারপর উদ্ধার করে।

আমার বরাবরের স্ট্র্যাটেজী, যা ফিসফাস-১এর পাঠক পাঠিকারা জানেন, তা হল ‘ইগনোর কর, ইগনোর কর মনা’। এখনও করছিলাম। কিন্তু দেখলাম তিনখানা বাঁদর আমার সহযাত্রী হল। পঞ্চম তলে গিয়ে দেখি আরও চারটে বসে এবং তার মধ্যে খান দুই বেশ বাছুরের সাইজের। ষষ্ঠ তলের দিকে পা বাড়াতে যাব, হঠাৎ নীচ থেকে উঠে আসা একটি বিচ্ছু বাঁদর কপাৎ করে লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চড়ে ফেলল। আর আরেকটি ধেড়ে আমার পিঠে একটা আলতো করে থাবড়া লাগালো। আরেকটি তখন আমার পায়ের ডিম ম্যাসেজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পাঠক পাঠিকারা, সত্যি বলছি। মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসছিল। কিন্তু ডর কে আগে জিত হ্যায় না? তাই কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা পঞ্চমতলের দরজায় ঢুকে গেলাম। তার একটু নিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম নাহ, ঘাবড়ালে চলবে না। বাঁদরগুলো বোধহয় মাটি পরীক্ষা করছিল। কিন্তু এ মাটি বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বাঁদরের চাঁটি, চলো যাই হাঁটি। ফিরে এলাম ফেলে আসা পথে। বানরকূল সসম্ভ্রমে রাস্তা ছেড়ে দিল। বিচ্ছুটির হয়তো ইচ্ছা ছিল আমাকে পথ দেখাবে। কিন্তু বড়রা বারণ করল বোধহয়। যে পথে যুধিষ্ঠির করেছে গমন সে পথ কখনই নয় যে কমন। ফিরে এলাম এক বুক নিশ্বাস আর বিজয় গর্ব সঙ্গে করে। জিজ্ঞাসা করলে বললাম, হাঁ ঝপকি তো লাগায়া থা! মাগর উসকো রিয়্যাক্ট নেহি করনা! সবাই বেশ চোখ বড় বড় করে শুনলো বানর বিজয় কাহিনী আর আমি আবার ছুটলাম সচিব এবং যুগ্ম সচিবের হৃদয় জয় করতে। যা সে দিন রাত দশটা পেরিয়ে পরের দিন চারটেয় শেষ হল বটে। কিন্তু সে আরেক হিমালয় ডিঙোবার গল্প।

স্প্রাইট কিন্তু সত্যিই একটা দারুণ ক্যাচফ্রেস বানিয়েছে। ডরের পরে জিত অবশ্যই আছে। অবশ্যম্ভাবী…

সৌরাংশু

সৌরাংশু


সর্বঘটে কাঁঠালি কলা (Jack of All Trades and blah blah…) অথবা আর ডবলু এ বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের গোঁজ প্রার্থী বলতে যা বোঝায় আদতে কোলকাতার কিন্তু অধুনা দিল্লীর বাসিন্দা, সরকারি চাকুরে সৌরাংশু তাই। দানবিক শরীর নিয়ে মানবিক বা আণবিক যে কোন বিষয়েই সুড়ুত করে নিজেকে মাপ মতো লাগিয়ে নিতে পারেন।

আপনার বাথরুমের দরজার ছিটকিনি আটকাতে হবে? বা কেঁদো বেড়ালটা রাত বিরেতে বড়েগোলাম হবার চেষ্টায়? পাড়ার নাটকে বিবেক নাই? রাজা খাজনা নিবেক নাই? চিন্তায় শান দিবেক নাই- ফোন লাগান +৯১৯XXXXXXX৩২-এ। ভৌম দোষ বাড়াতে বা বনের মোষ তাড়াতে মাইকের মতো গলা আর টুথপিকের মতো হাসি নিয়ে সৌরাংশু হাজির হবেন।

গল্প অল্প স্বল্প লিখলেও তিনি ফিসফাসেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে শীতের রোদে তেল মাখেন আর গিটকিরি দিয়ে রামা হৈ গান। না শুনে যাবেন কোথায়! বুম্বা দা বলেছেন, “মাআআ, আআমি কিন্তু চুরি ক্করিনি!” সৌরাংশু বলেন, “যাঃ আমি কিন্তু বুড়ি ধরি নি!” খেলতে নেমে হাঁপান না, গাইতে গলা কাঁপান না, নিজের দায় পরের ঘাড়ে চাপান না, শুধু ফিসফাসেই বন দাপান! এই হলেন সৌরাংশু!
www.fisfas.in

আপনার মতামত জানান