তৃতীয় আশ্রম

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

চতুরাশ্রম – পৃথিবীর আর সমস্ত নিয়মের ধারা মেনেই মানবনির্ধারিত – সেহেতু কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক। মনুর বিধানেরও পূর্ববর্তী যুগে যখন আর্যশ্রেষ্ঠরা এই বিধানগুলি ভারতবর্ষীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে গুল্মলতার ন্যায় জড়িয়ে দিয়েছিলেন – তখন একটি অত্যন্ত সাবেকী নিতান্ত মানবিক প্রতিক্রিয়াকে অবহেলা করেছিলেন – মানুষের স্বেচ্ছাধীনতা।
অবশ্য সনাতন ধর্মের মৃত্তিকায় মানবিক ইচ্ছার শিকড় গভীরে শাখাপ্রশাখা বিস্তারের সুযোগ পায়নি কোনোদিনই । ইচ্ছামাত্রই কোনো না কোনো পক্ষপাতী মোহের উৎসবিশেষ। সনাতন ধর্মের চরমে রয়েছে যে মোহহীন কর্মযোগী মানবসত্তা – তার ধারণার সাথে স্বেচ্ছাধীনতা কিঞ্চিৎ সমান্তরাল গতিপথেই অগ্রসর হয়।
সেহেতু আজীবনের ন্যায় সৌবল শকুনির – স্বেচ্ছান্ধ ভগিনীকে এবারও কেউ প্রশ্ন করেনি তাঁর আসলে বাণপ্রস্থে কেমন লাগছে।
বিবাহের সময় গান্ধাররাজ সুবল যখন শান্তনব ভীষ্মের প্রস্তাবে – কুরুবংশগৌরব ভেবে প্রায় রাজি হয়েও শুধু হবু জামাতার জন্মান্ধত্বের কারণেই সম্মতি জানাতে দ্বিধা করছিলেন – গান্ধারীকে কেউ প্রশ্ন করেনি তাঁর এই প্রস্তাবে ঠিক কেমন লাগছিলো।
সর্বাঙ্গসুন্দরী আর্যরমণী হয়েও শুধুমাত্র শতপুত্রপ্রাপ্তির বরলাভের জন্য কুরুবংশের রাজত্বে অক্ষম তনয়ের আজীবন জায়া ও ধাত্রী হবার সময়ে কেউ তাঁকে প্রশ্ন করেনি – তাঁর কেমন লাগছে।
নিজের পতি এবং পুত্রকে সম্পূর্ণ বিপথে চালিত দেখেও বহুদিন - সমকাল তাঁকে প্রশ্ন করেনি তাঁর কেমন লাগছে। করলো যখন তখন সম্মুখে সদ্যবিবস্ত্রা কুরুলক্ষ্মীসমা পাঞ্চালী এবং তাঁর দিকে লোলুপ যেসকল – নির্লোম অমানুষপ্রজাতি তাঁরা কেউ গান্ধারীর সমঔরসজাত ভ্রাতা – কেউ নিজদেহাংশেপ্রাপ্ত পুত্র। তখন, একমাত্র সেই সময় পতির ধর্ম ছাড়াও তাঁর ধর্ম আছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছিল – সেই প্রতিবাদটুকু গান্ধারী করেছিলেন।
বাণপ্রস্থে আজ প্রায় তৃতীয় বর্ষ অতিবাহিত। হস্তিনাপুরের নাগরিক কোলাহল হতে বহুদূরে এই অরণ্যজীবনে – গান্ধারী এখনো সদাধর্মচারিণী। রাজনৈতিক আলোড়ন হতে এই বিচ্ছেদকালে জীবনোপান্তে গান্ধারীর ইচ্ছাগ্রাহ্য হবার কোনো দায় সনাতন আর্যপ্রথা চতুরাশ্রমের নেই।
গান্ধারী তাঁর প্রত্যাশাও করেননা।
~
গান্ধার প্রদেশের তুলনায় এই উত্তরভারতীয় বনানী প্রাকৃতিক অর্থে অনেক মনোরম। গান্ধার আর্যদের প্রায় আদি বাসস্থানের মধ্যে একটি। সেখানকার পার্বত্য সংস্কৃতির সাথে বিক্রিয়ায় – একটি নেহাৎ মিশ্র জীবনযাত্রা তৈরী হয়েছে সেখানে। বহুদিনযাবৎ।
গান্ধারীকে অতি শৈশব থেকেই তাই প্রস্তুত করা হয়েছে বিশুদ্ধ আর্যরাজপরিবারের কূলবধূ হিসেবে। গান্ধারের স্বাভাবিক যাযাবর এবং কিঞ্চিৎ অনার্য জীবনের উত্তাপ যাতে গান্ধারীর আর্যোচিত সংযমে – কোনো প্রতিকূল ব্যগ্রতার সৃষ্টি না করে তা নিঃসন্দেহ করতে মহারাজ সুবল প্রথম থেকেই চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি।
নিরুত্তাপ সম্মতিপ্রদান তাই গান্ধারীর সহচরী স্বাভাবিক আচরণ – আশৈশব।
তাই ধৃতরাষ্ট্র যেদিন থেকে রাজপ্রাসাদেই কুশাসনে শয়ন শুরু করলেন – গান্ধারী সেদিনও বিনাপ্রশ্নে সহচরী হয়েছিলেন।
আর যেদিন মহর্ষি বেদব্যাসের সম্মতিপ্রদানের পর ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুরকে তদোবধি যুধিষ্ঠিরের অনুবর্তী হতে বলে অরণ্যবাসী হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন – সেদিনও আশৈশব স্বভাবোচিত নিশ্চুপতায়, গান্ধারী একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন – স্বামীর অনুগমন।
এই গহীনে রাজনীতি নেই, যুদ্ধনীতি নেই, সাম-দান-দণ্ড-ভেদের পারিপাট্য নেই। শুধু অনাদি-অনন্ত অপেক্ষা – আসন্ন মৃত্যুর।
~
‘জ্যেষ্ঠা’।
অতিপরিচিত কন্ঠে গান্ধারীর চকিত ভাঙলো।
পাণ্ডবজননী পৃথা – নিকটেই দণ্ডায়মানা। মহামতি ক্ষত্তা বিদুর কিছুকাল পূর্বেই – আরো কঠোর তপস্যায় সিদ্ধিলাভের আকাঙ্খা অরণ্যের গহীনে বসবাস শুরু করেছেন। আজন্ম হস্তিনাপু্র সিংহাসনের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং তাঁর জন্মান্ধ জ্যেষ্ঠভ্রাতাটির পরমহিতের কর্তব্য – এখন আর বিদুরের স্কন্ধারূঢ় নয়।
জীবনোপান্তে পরম রাজনীতিজ্ঞ – ধর্মাচারী বিদুর – এখন তাই করতে চান – যা তিনি সারাজীবন চেয়েছিলেন। হস্তিনাপুরের কুরুবংশের ক্ষয়িষ্ণু ঘটমানতার চেয়ে বহুদূরে নির্লিপ্ত তাপসের বোধিলাভ – তাঁর পিতা ব্যাসের মতোই।
আজ স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্রও কিঞ্চিৎ শারীরিক দৌর্বল্যে প্রভাত থেকেই বিশ্রামে রয়েছেন।
আজকের দৈনিক কাজের ভার তাই হস্তিনাপুরের দুই কূলবধূরই।
মধ্যাহ্ন অতিক্রান্ত হয়ে – দিবাকর ধীর লয়ে অপরাহ্নের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এই অরণ্যবাস – হস্তিনাপুরের নাগরিকী ব্যগ্রতার চেয়ে বহুদূরে – সময়ও কিঞ্চিৎ ধীর এখানে।
‘জ্যেষ্ঠা – এখানে তুমি একাকী?’
গান্ধারী তাঁর চোখের আচ্ছাদনের মধ্যে থেকে শব্দের উৎস অভিমুখ নির্ণয় করলেন।
‘বিনা কারণেই। ধীরে ধীরে শীতকাল এগিয়ে আসছে পৃথা। এই সময়টা কুটিরের ভিতরে একটা অস্বস্তিকর শীতলতা লাগে অপরাহ্নে। তাই কুটিরের বাইরেই বসে আছি’।
‘আমারো। বার্ধক্য গ্রাস করছে জ্যেষ্ঠা’।
‘করছে কি বলছো? করে নিয়েছে প্রায়’।
‘তোমার নিকটে একটু বসি?’
~
গান্ধারী আর তাঁর দেবরাণীর সম্পর্কে এই আপেক্ষিক সৌহার্দ্যের সহাবস্থান – বরাবর পরিলক্ষিত।
কখনো – কেউ স্বাভাবিক সামাজিকতার গন্ডি লঙ্ঘণ করেননি – পারষ্পরিক সম্পর্কে।কুরুপান্ডবে র মহাযুদ্ধের পরও পারলৌকিক তর্পণে দুই কূলবধূকে সমকাল পাশাপাশিই দেখেছিলো।
কিন্তু দু’জনেই স্বভাব প্রগলভা নন। পাশাপাশি বসেও কথা শুরু করতে একটি নিতান্ত অজুহাত লাগে তাই। দুই কুরুবংশ বধূই কিছুক্ষণ সেই অজুহাতের অনুসন্ধান করলেন।
কুন্তীই শুরু করলেন – ‘অরণ্যবাসে কেমন লাগছে জ্যেষ্ঠা?’
গান্ধারী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন – ‘এটা তো স্বাভাবিক পৃথা। ব্যক্তিগত – ভালো লাগা খারাপ লাগার উর্ধ্বে একটা সামাজিক প্রথা। তাই তোমার প্রশ্নটাই কিঞ্চিৎ অবান্তর’।
‘আমি মানুষী ভালোলাগা খারাপ লাগার উর্ধ্বে এখনো উঠতে পারলাম কই’ – কুন্তীর চোখ শীতকালীন অপরাহ্নের মায়াময় সূর্যালোকে আবদ্ধ হলো – গান্ধারীর অজান্তেই।
গান্ধারী মৃদু হাসলেন।
‘হাসছো যে জ্যেষ্ঠা?’ – কুন্তী গান্ধারীর দিকে চোখ ফেরালেন।
‘নাহ। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ কিরকম দূরবর্তী বোধ মনে হয় এই জীবনসায়াহ্নে – একাকিনী জীবনে’।
‘একাকিনী?আমি আছি – তোমার স্বামী আছেন’।
‘হ্যাঁ তোমরা আছো’।
কুন্তী হঠাৎ করে উঠে গান্ধারীর মুখোমুখি দাঁড়ালেন।
চুপ করে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলেন – গান্ধারীর প্রায় আজীবন আচ্ছাদিত চোখের দিকে।
অন্ধত্বে অন্য ইন্দ্রিয়গুলি অধিক সজাগ হয়। গান্ধারী তাঁর সমস্ত অস্তিত্বে সেই স্থির দৃষ্টি অনুভব করলেন।
কিন্তু কিছু বললেন না।
নীরবতা ভঙ্গ করে খুব ঠান্ডা শীতল স্বরে কুন্তী প্রশ্ন করলেন – ‘তুমি কি এখনো আমাকে আগের মতোই ঘৃণা করো জ্যেষ্ঠা?’
~
গান্ধারী এই অভিযোগের প্রত্যুত্তরের কোনো প্রয়োজন অনুভব করলেন না। কিছুক্ষণ শান্ত নির্লিপ্তি নিয়ে বসে থেকে ধীরে ধীরে উঠে চলে যাচ্ছিলেন।
কুন্তী আজ আঘাত করতেই এসেছিলেন – ‘আমি কিন্তু জানি জ্যেষ্ঠা’।
‘আমার কলহ করার প্রবৃত্তি হচ্ছেনা পৃথা’।
‘আমি কিন্তু তাও জানি জ্যেষ্ঠা। তোমার প্রসবের পূর্বে – যুধিষ্ঠিরের জন্মসংবাদ পেয়ে – তুমি গর্ভপাত করতে চেয়েছিলে – নিজের হস্তে – নিজের গর্ভে আঘাত করে’।
গান্ধারী আর যেতে পারলেন না। স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলেন।
কুন্তী তাঁর মহাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে আহতকে আঘাত সহ্য করে ধীরে ধীরে দগ্ধ হবার অবকাশ দিলেন – তাঁর পরম পরাক্রমী তৃতীয় পুত্রটির মতো।
গান্ধারীর ভাঙাচোরা কন্ঠ অনেকক্ষণ পর ক্ষীণ প্রত্যুত্তর দিলো – ‘বাণপ্রস্থে আসার পূর্বে তুমি তোমার জেষ্ঠ্যপুত্র ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে বলে এসেছিলে – আমি ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে নিজের পতির পিতামাতার ন্যায় যত্নের উদ্দেশ্যে চললাম। তোমার – যত্নের – এটিই নমুনা?’
হঠাৎ শিরশিরে শীতলতা বয়ে এলো কোনো দূর উত্তর থেকে। সুদূর এক অগ্রহায়ণে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষের পর এই হাওয়া অনুভব করেননি কুন্তী ও গান্ধারী।
~
‘জেষ্ঠ্যতাত আমাদের দু’জনকে কুরুবংশের বধূরূপে কেন চিহ্নিত করেছিলেন জানো নিশ্চয়?’
‘জানি’।
‘তোমার স্বেচ্ছায় যেকোনো দেবতাকে আহ্বান করে গর্ভবতী হবার পূতমন্ত্র আর আমার শতপুত্রের বর। আর কিছু ভাবেননি উনি’।
‘হয়তো উপায় ছিলোনা বলেই – পিতামহী সত্যবতী এবং জেষ্ঠ্যতাতের কাছে। আমাদের পতিদের জন্মের সময়ের মতোই – ভগবান ব্যাসকে নিয়ে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করতে চাননি বলেই - ’
‘চাননি বলেই দু’টি সতেজ স্বাভাবিক নারীর ইচ্ছার কোনো মর্যাদা না দিয়ে একজন চিরঅন্ধ এবং একজন চিররুগ্নের হাতে সমর্পণ – নারীদুটির প্রাপ্তি মহান কুরুবংশ গৌরব – যেখানে স্বাভাবিক নৃপতি অন্বেষণেই তখন সবাই সদা চিন্তিত’।
‘আমরা তো সেই দুর্ভাগ্য – অথবা তুমি যাকে দুর্ভাগ্য ভাবছো তার বান্ধবী হতে পারতাম জ্যেষ্ঠা – তুমি আমাকে আজীবনকাল শত্রুই ভেবে গেলে’।
‘শত্রু?’ – গান্ধারীর অধর কিঞ্চিৎ বঙ্কিম হাস্য করলো – ‘আমি তোমাকে একসময় যুগপৎ ভাগ্যবতী ও বেশ্যা ভাবতাম কুন্তী’।
~
আরো কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো।
কুন্তী ধীরে ধীরে বললেন – ‘স্বামীর পুত্রচাহিদায় আমাকে বারংবার দেবতাদের আহ্বান করে যে হঠাৎ সংগমে লিপ্ত হতে হতো – সেটাকে দুর্বাসার আশীর্বাদ ভেবে ভুল কোরোনা দেবী’।
‘আশীর্বাদ নয়? তুমি সসাগরা ধরিত্রীর রাজচক্রবর্তী সম্রাট যুধিষ্ঠিরের গর্ভধারিণী – আশীর্বাদ নয়?’
‘আমি সারাজীবন স্বীকৃতির অন্বেষণে ধীরে ধীরে সমাপ্তি ঘটলো যে কাহিনীটির তারো উৎসমুখ জ্যেষ্ঠা। আমি দুর্ভাগা কর্ণেরও হতভাগ্যা জননী। এটা আশীর্বাদের কোন রূপ জ্যেষ্ঠা?’
‘তুমি ভুল করছো কুন্তী – তুমিএকপুত্রের শোক করছো – আমাকে দেখো - আমি শতপুত্রশোক নিয়ে তোমার থেকে ঠিক কতোটা দূরবর্তী হতাশাসলিলে অবলম্বন খুঁজছি’।
কুন্তী ধীরে ধীরে গান্ধারীর কাছে এগিয়ে এলেন।
‘একপুত্রশোক জ্যেষ্ঠা? পুত্রউৎপাদনের পর আজীবন সন্তাপ একপুত্রশোক? যৌবনে বৈধব্য - একপুত্রশোক? স্বামীর মৃত্যুর পরে অনাথ সন্তানদের নিয়ে হস্তিনাপুরে এসে রাজা ও তাঁর প্রধান মহিষীর চোখে অপাংক্তেয় জীবন – একপুত্রশোক? নিজের গর্ভজাত দুই পুত্রকে যুযুধান দেখা – একপুত্রশোক? পঞ্চপুত্রকে সস্ত্রীক তেরো বৎসর দূরে বনবাসী হতে দেখা, বিনাদোষে – একপুত্রশোক? আর এমন যুদ্ধে বিজয়ীপক্ষের মাতা হবার গৌরবিনী হবার সুযোগ পাওয়া, যার পরে নিজের পরমাত্মীয়ার সঙ্গেও বনে অস্বস্তিকর জীবন অতিবাহিত হয় – একপুত্রশোক?’
‘আমি এই যুদ্ধ চাইনি পৃথা’।
‘চাওনি। কিন্তু বহুকাল, বহু বহুকাল তুমি তোমার স্বামী এবং জেষ্ঠ্যপুত্রের অন্যায় চাওয়ার সামনে মূর্তিমতী ন্যায় হয়ে দাঁড়াতে পারতে – ভীমসেনকে যখন দুর্যোধন বিষপান করিয়েছিল – তখন আমি সাহায্যপ্রার্থিনী হয়েছিলাম দেবর বিদুরের কাছে - তোমার কাছে যেতে পারিনি। পঞ্চপুত্রের বনগমনের পর আমি আশ্রিতা ছিলাম বিদুরেরই – তুমি রাখোনি। আমাদের সম্পর্ক তো ভগ্নীসমা হওয়ার কথা ছিলো জ্যেষ্ঠা – সম্পর্কের চাহিদা মেনেই’।
গান্ধারী নীরব রইলেন
‘তুমি চিরকাল ধর্মশীলা উপাধি ধারণ করে রাজপ্রাসাদের নিভৃতে দূরত্বে থেকেছো। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের প্রতিবাদ করেছো – কিন্তু দুঃশাসন তোমার অন্তঃপুরে যখন রজঃস্বলা একবস্ত্রা কুরুকূলবধূর অপমান করেছে বাধা দাওনি, দুর্যোধনকে ধর্মের জয়ের আশীর্বাদ করেছো – কিন্তু ধর্মজয়ী হবার পর স্বয়ং ধর্মধ্বজ কেশবকেও যদুবংশ ধ্বংসের অভিশাপ দিতে, তোমার বাঁধেনি। এতো দ্বিচারিতা কেন সুবলতনয়া? এতো দ্বিচারিতা কেন?’
~
অরণ্যে গোধূলিকাল। শ্বাপদদের জলের অন্বেষণে যাবার সময়। খেচরেরা নীড়ে ফিরছে রোজকার ন্যায়। পর্ণমোচী উদ্ভিদরাজিতে পরিপূর্ণ এই অরণ্য। আসন্ন শীতের অপেক্ষায় তারা সজীবতা ঝরিয়ে তাপসের উদাসীন রূপ ধারণ করছে একে একে।
পরিযায়ী দূরাগত কিছু পাখির ঝাঁক চলে গেল সূর্যের সামনে দিয়ে – এই মহান আসন্ন অন্ধকারের প্রতীক্ষায় থাকা অরণ্যের কোথায় হস্তিনাপুরের সংযমবৃত্তি, কোথায় নিয়ম?
এই রাজ্যটি আর্য সভ্যতার ধর্মশীলতার বাইরে এখনো - মানুষের স্বেচ্ছাধীন।
স্বেচ্ছা নীরবতা ভেঙে কুন্তী বললেন - 'তোমার স্বামীর পুত্রস্নেহ আর অন্ধত্বে তবু একটা স্বাভাবিকতা ছিলো জ্যেষ্ঠা। তোমার এই নিরপেক্ষতা,ধর্মশীলতা - সবই আরোপিত, কৃত্রিম এবং সেই কারণেই পতনোন্মুখ অধর্মের মতোই - সদাভঙ্গুর। তুমি পুত্রকে যথাযথ শাসন করোনি না করতে চাওনি গান্ধাররাজনন্দিনী?'
গান্ধারীর পক্ষে অবিমিশ্র নীরবতাই শ্রেয় ছিলো, তবুও অসময়ে সরব হলেন - 'এতো অভিযোগ নিয়ে আমার আর আমার স্বামীর সাথে বাণপ্রস্থে এলে কেন পাণ্ডবজননী?'
কুন্তী - কুন্তীভোজদুহিতা - সূর্যতপা পৃথা - তাঁর প্রথম প্রেমিকের দ্যুতিই যেন ধারণ করলেন দুই নয়নে। অটল পবিত্রতা নিয়ে তাকালেন গান্ধার পর্বতরাজ্যের রাজতনয়ার চোখে। সেই মুহূর্তকাল গান্ধারীকে আঁখিপল্লবদুটিকে আচ্ছাদনের ভিতরেও, নিমীলনের অবকাশটুকু দিলোনা।
সমগ্র কুরুবংশের বিপথে যাওয়ার হতাশা মুছে ফেলতেই এক অটল নিরপেক্ষ সত্যধারণ করেই কুন্তী বললেন - 'তোমাকে শাসনের শেষ মার্গ দেখাতে'।
'শেষ মার্গ? মৃত্যুদণ্ড? সে তো হস্তিনাপুরেই দিতে পারতে'।
কুন্তী মৃদুহাস্যে বললেন -
'ভালোবাসা জ্যেষ্ঠা। মানুষ মানুষকে যে অধিকারটা দিয়ে দিলে সব অমলিন হতো - হস্তিনাপুরে, বাণপ্রস্থে অথবা পৃথিবীতে অন্য কোথাও'।
অস্তমিত ভাস্কর তাঁর প্রথম প্রেমিকার কথাটির মর্যাদা রাখার জন্য, সেই অস্তকালকে, সেইদিন, একটু বেশিই রাঙিয়েছিলেন কিনা - তা এখন আর জানার উপায় নেই।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান